শিরোনামেই মিথ্যাচার করলাম, লিখবো আর কী? বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ এমন সর্বনেশে কথা বলায় পাঠককুল আমায় মুণ্ডুপাত করবে- সেই ঝুঁকি স্বত্বেও আগের পর্বের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে আমাকে এই মিথ্যার আশ্রয় নিতেই হোল। বার্লিনের ঔজ্বল্যহীন আকাশ আজ দুস্তর দুঃখী মেঘে ঢাকা, সে যে কতকাল হয়ে গেল কে জানে!

জার্মানির রাজধানী বার্লিন। পৃথিবীতে দুটি বিশ্বযুদ্ধ হয়েছে, দুটির পরিকল্পনাই এই শহরে হয়েছে। এই লেখা যখন পাঠক পড়বেন তখন বার্লিনে আমার তিন বছর পূর্ণ হবে। যে বাসায় থাকি সেখানেই তিন বছর হল! বাসাটি মূল শহরকেন্দ্র থেকে একটু বাইরে আর অপেক্ষাকৃত হইহুল্লোড় কম। আমি থাকি তিন তলায়। চার তলায় থাকেন একাত্তর বয়সী বৃদ্ধা ডাগমার। ওঁর কথা বলবার জন্যেই এই লেখা!

ব্যক্তিগত স্বাধীনতা আর নিরাপত্তা এখানে এত গুরুত্ব পায় যে, বছরের পর বছর পাশাপাশি থাকলেও এই দেশে কারো সাথেই প্রায় সুসম্পর্ক গড়ে উঠে না। ডাগমারের সাথেও আমার সম্পর্ক তেমন নয়, মাঝে সাঁঝে সিঁড়িতে দেখা পর্যন্তই! গেল বছর যখন করোনা শুরু হল তখম আমি বাসার প্রধান ফটকে একটি পোস্টার লাগিয়েছিলাম। লিখেছিলাম, বয়স্ক কারো বাজার করতে সাহায্যের প্রয়োজন হলে যেন আমাকে কল দেয়।

ডাগমার আমাকে কল দেয়নি, সিঁড়িতেই একদিন বলল কিছু বাজার করে দিতে। এরপর আরো একদিন। এরপর বহুদিন আর খোঁজ নেই! এই কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই অসময়ে দরজায় ঠকঠক। দেড় বছরেরও অধিককাল বাসা থেকেই অফিস করি বিধায় বাসাতেই ছিলাম। অতিরিক্ত মোটা হয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে কুঁজো হয়ে ঘরে ঢুকল ডাগমার। মোবাইলে সমস্যা, ঠিক করতে পারছে না। আমি করে দিলাম। কিন্তু সে চলে যাওয়ার পাত্রী নয়। কথা তাঁর শেষই হচ্ছে না!

আমাদের প্রজন্ম বয়স্কদের সাথে কথা বলতে বিরক্তবোধ করে। আমার হয় উল্টো! অধীর মনোযোগ দিয়ে ওঁদের কথা শুনতে আমার সবসময় বেশ আগ্রহ কাজ করে। ডাগমার এই বাসায় থাকে ষাট বছর। বেশ অবাক হলাম শুনে যে একই ফ্ল্যাটে ষাট বছর! ওঁর বয়স যখন এগারো তখন মা বাবার সাথে এখানে ওঠে। একে একে এই বাসাতেই বাবা মা ভাই বোনেরা মারা গেছে। চিরকুমারী সে। পরিবারের সবার মরা শেষ হয়েছে দশ বছর হল, এই দশ বছর ধরেই ডাগমার একা! আমাকে জানালো, সে মরার জন্যেই এখন অপেক্ষা করছে। একাকী শরীরটা আর চলছে না ইদানীং!

কথায় কথায় অনেক কথাই হল। যেকথাটি শুনে সবচেয়ে অবাক হলাম সেটি তাঁর শিক্ষাজীবন নিয়ে। বাসার কাছেই জার্মানির বিখ্যাত হুমবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে সে ইতিহাসে পড়েছে ৭২-৭৫ সালের দিকে। যে বিষয়টি জেনে আরো বেশি অবাক হলাম সেটি হল- ইতিহাস পড়তে গিয়ে দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে সে অনেক জেনেছে এবং সেই সূত্রে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে খুব ভাল করেই জানে। এরপর সে যা জানালো তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। বাহাত্তুর সালে শিক্ষার্থীদের একটি স্বেচ্ছাসেবক দলের হয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সাহায্য করতে বাংলাদেশে গিয়েছিল ডাগমার! এমন হতদরিদ্র দেশ কখনো দেখেনি সে। জাতির পিতা শেখ মুজিবের কথাও তিনি বললেন, বললেন তাঁর এবং বাংলাদেশের মানুষের মহান ত্যাগের কথা!

তিন বছরের অচেনা অজানা ত্রিকালদর্শী প্রতিবেশিনীর মুখে বাংলাদেশের বিজয়গাঁথা শুনে সামান্য আবেগে পেয়ে বসলো আমাকে! আমার আবেগ আর মুগ্ধতা তিনি ধরতেও পারলেন!  

৬ পৌষ ১৪২৮
বার্লিন থেকে জাহিদ কবীর হিমন
সম্পাদক, জার্মান প্রবাসে

আরো পড়তে ক্লিক করুন-
বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ১- কোরিয়ান খাবার-উৎসব
বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ২- মধুরেণ সমাপয়েৎ
বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ৩- বার্লিন-ড্রেসডেন যুদ্ধ
বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ৪- পিকনিক আর সঙ্গীতসন্ধ্যা
বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ৫- রাতের বার্লিন