ডঃ বেগম জাহান আরার জন্ম ১৯৩৭ সালে। ঢাবিতে বাংলায় এমএ করে ভারতের পুনে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন ভাষাবিজ্ঞানে। শতাধিক বইয়ের রচয়িতা। একসময় রেডিও টিভিতে নিয়মিত নজরুল গীতি করতেন। অবসরকালীন সময়েও নিরন্তর তিনি বাংলাভাষার বানানরীতি নিয়ে গবেষণা করে চলেছেন। বিভিন্ন পুরষ্কারে ভূষিত মহীয়সী এই নারী বর্তমানে জার্মানির হাসবুর্গে বসবাস করছেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ এই সাক্ষাৎকারে কিছু স্থানে তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ বানান ব্যবহার করেছেন। আমাদের জার্মান প্রবাসে (জা প্র) বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রমিত বাংলা বানানরীতি অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু এখানে উনার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা সেই শব্দগুলোর চলিত বানানরীতি প্রয়োগ থেকে বিরত থেকে তাঁর নিজের দেওয়া বানানগুলোই রেখে দিলাম।

জা প্রঃ ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি গেল, একজন ভাষাবিদ হিসেবে বাঙলা ভাষার অবস্থান কোথায় দেখতে পান?
জাহান আরাঃ ফেব্রুয়ারি মাসকে আমি বলি একুশের মাস। ভাষার মাস। পুর্ব- পাকিস্তানি হিশেবে আমাদের প্রথম গণতান্ত্রিক চেতনা স্ফূরনের মাস। বই মেলার মাস। নান্দনিক সাহিত্য সৃজনের মাস। লেখক পাঠকের আনন্দের মাস।

বলা হয়ে থাকে, বাঙলা পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম ভাষা। সেইদিক থেকে বিশ্বভাষার দরবারে বাঙলা ভাষার অবস্থান গৌরবের। আর বাঙলাদেশে কিছু সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর ভাষা আছে। কিন্তু বাঙলা আমাদের মাতৃভাষা। আত্মপরিচয়ের ভাষা। আমাদের রাষ্ট্রীয় ভাষা। আমাদের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, প্রেম, রণ, আন্দোলন সংগ্রামের ভাষা। শিক্ষা সাহিত্য সংস্কৃতির ভাষা। এক কথায় আমাদের জীবনাচারকে সার্বিকভাবে ধারণ ও লালনের ভাষা। কাজেই আমাদের জীবনে বাঙলার অবস্থান প্রিয় জীবনের মতোই শীর্ষে।
আমাকে ভাষাবিদ বলেছো। কয়েকটা ভাষা জানি বটে। তবু এতো বড়ো বিশেষণ আমার জন্য নয়। ভাষাবিজ্ঞানের ছাত্র আমি। ভাষার পাঠ আমার খুব ধ্যানের। আনন্দের। মগ্নতার।

জা প্রঃ বাঙলা বানান নিয়ে বহুদিন যাবত বলতে গেলে একাই কাজ করছেন, ফল কিছু পেয়েছেন কি?
জাহান আরাঃ হ্যাঁ। বাঙলা বানান, বলা ভালো, প্রমিত বাঙলা বানান সংস্কার নিয়ে আমি কাজ করি। এর শুরু হয়েছে অনেক আগেই। উনিশ শতকে। রবীন্দ্রনাথও বানান সংস্কারের পক্ষপাতী ছিলেন। বৈয়াকরণ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ড. এনামুল হক, প্রমূখ পণ্ডিতেরা বলেছেন, বাঙলায় দীর্ঘ ধ্বনি নেই। অর্থাৎ বাঙলায় ‘ঈ, ঊ’ এবং তাদের কার বাঙলার বিষয় নয়। তাঁদের মতে, দীর্ঘ- ঈ / ঊ বা দীর্ঘ ঈ / ঊ-কার দিলেই উচ্চারণে দীর্ঘত্ব আসেনা বাঙলায়। কিন্তু মুশকিল হলো, পণ্ডিতেরা নিজেদের কথা নিজেরাই মানেননি। নিজেদের গ্রন্থের বানানে তাঁরা দীর্ঘস্বর লেখেছেন। বাঙলা একাডেমিও যথাসাধ্য বাঙলা বানানে দীর্ঘ-ঈ/ঊ এবং তাদের কার পরিহারের কথাই বলেছে। দেশি বিদেশি সমস্ত শব্দে ‘ই-কার’ দিতে হবে। কিছু ব্যতিক্রম কয়েকটা শব্দের ব্যাপারে। যেমন; গাভী, রানী, পরী। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বলেছে, তৎসম শব্দ ছাড়া সব ক্ষেত্রে হ্রস্ব-ই এবং তার কার ব্যবহৃত হবে। একেবারে গুবলেট করে ফেললাম আমরা।
আমি বলার চেষ্টা করছি, বাঙলায় দীর্ঘ ধ্বনি নেই, তাই প্রমিত বাঙলা বানানে ‘দীর্ঘ-ঈ / ঊ বা ঈ / ঊ-কারের’ প্রয়োজন নেই। কিন্তু কিছু শিক্ষিত সংস্কৃতমন্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মৌলবাদী মানুষ কিছুতেই ‘দীর্ঘ-ঈ / ঊ’-কে ছাড়বেন না। অন্যকেও ছাড়তে দেবেন না। এটা সংক্রামিত হয়েছে প্রকাশক গোষ্ঠীর মধ্যে। আধুনিক কোনো ব্যাখ্যা তাঁরা জানেনও না, মানবেনও না। তাঁরা ১৮০১ সালের সাধু গদ্যের বানানের ছাঁদে বানান সংস্কার করেই বই ছাপাবেন। আমিও বাধ্য হয়ে লেখি। একেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ধ্বনিবিদ্রোহী” বানান। মানে, যেমন উচ্চারণ করা হয়, বানান তেমন নয়।

আবার ‘স্বাস্থ্য’ বানান লিপিতে থাকলেও তা উচ্চারণ করা অসম্ভব। স্মরণ, শ্মশান, পদ্মা, ইত্যাদি বানান দেখে উচ্চারণ করলে কেমন হবে, পাঠক নিজে নিজে উচ্চারণ করলেই বুঝতে পারবেন। বাঙলায় ‘স / শ / ষ’ নিয়ে আমরা বিব্রত। বৈয়াকরণেরা বলেছেন, ‘ণ / ষ’ প্রাচীন বাঙলাতেই লুপ্ত হয়েছে। সেটাও আমরা মানতে চাই না ( বৈয়াকরণেরাও মানেননি)। বাঙলা বানানের গায়ে সেই যে সংস্কৃতানুকারী ফোঁটাকাটা পণ্ডিতেরা ‘সংস্কৃতের নামাবলী’ (রবীন্দ্রনাথ, আমার মতে, হিজাব) জড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেটা আর খোলা যায় না। কিন্তু একুশ শতকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অত্যাশ্চর্য অগ্রগতির কালে আমরা বাঙলা বানান নিয়ে এমন দোটানায় থাকবো, বিজ্ঞানলগ্নতার দিকে কিছুতেই যাবো না, এটাই মানতে কষ্ট হয়।

কিছু কিছু পরিবর্তন দেখা যায় প্রজন্মের প্রমিত বাঙলা বানানে। এসবতো ফেইসবুকেও দেখা যায়। হ্রস্ব-ই কারের ব্যবহার বেড়েছে। ‘শ’ বোঝানোর জন্যে ‘শকাল, আশল, আশন’ বানান লেখা দেখা জায়। এটাকে সাফল্যই তো বলা যায়। হোক না নগন্য। আসলে বানান হলো ভাষার জমিন। সহজে নড়ানো যায় না। অনেক অনেক কাজ। ব্যক্তি মানুষের দ্বারা খুব কিছু একটা এগোনো যাবে না। রাষ্ট্রীয় সমর্থন দরকার। ভাষা-পরিকল্পনা অনিবার্য।

ঘুরতে ভালবাসেন তিনি

জা প্রঃ আজকের প্রজন্ম বাঙলা ভাষাকে কতোটা গভীর ভাবে অনুধাবন করতে পারছে বলে আপনি মনে করেন?

জাহান আরাঃ প্রজন্ম চায়, বাঙলা সহজ হোক। ওরা চায়, বানান সহজ হোক। ব্যাকরণ দুর্বোধ্য থাকবে না। এই কথাগুলোর গূঢ় অর্থ হলো, সংস্কার চাই। ভাষাকে আধুনিক করা চাই। আধুনিক মূল্যায়ন চাই। এই চাওয়াটার মূল্য দেয়া যাচ্ছে না। ইংলিশ মিডিয়ামে কিছু ছেলেমেয়ে পড়ে। সে আর কতো জন? কোটি কোটি মানুষ হাটে বাজারে গঞ্জে গ্রামে পথে ঘাট বাসে রিক্সায়, নিপাট বাঙলাই তো বলে। হোক না তা আঞ্চলিক বাঙলা। আমাদের কাজ প্রমিত বাঙলা নিয়ে। সাধারণ মানুষের সামাজিক, অর্থনীতিক এবং রাজনীতিক কাজ কর্ম বাঙলাতেই চলে। কেউ কেউ এখন বলতে চান, প্রমিত বাঙলা বলার দরকার কি? এটা বেলাইনের তর্ক। তবে বাঙলা ভাষাকে প্রজন্ম ভালোবাসে গভীর ভাবে। আমার কাছে তাই মনে হয়। মুখে যতোই পুটুর পাটুর করুক, বাঙলা ভাষাকে আঘাত করে কেউ কথা বললে, তারা বরদাস্ত করে না। প্রজন্মের এই বাঙলাভাষা প্রেমী মনটাকে আমি ভালোবাসি। সম্মান করি।

জা প্রঃ বাঙলাদেশে সাহিত্যচর্চা নিয়ে বলুন।
জাহান আরাঃ বাঙলাদেশে সাহিত্যের চর্চা আছে, বাড়ছে। একুশের বইমেলার সময় সেটা বেশি করে চোখে পড়ে। এক প্রকাশক জানালেন, এই বছর নাকি পাঁচ হাজার বই প্রকাশিত হবে। তরুণেরা লেখালেখির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। কবিতার লেখক বেশি। গল্প উপন্যাসের সংখ্যাও একেবারে কম নয়। গুনগত মান নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। এটাও মনে রাখতে হবে, স্বাধীন বাঙলাদেশের বয়স মাত্র ৪৮ বছর। সম্ভাবনাগুলো বিকশিত হতে, সাহিত্যের শিল্পগুন সম্বৃদ্ধ হতে আরও সময় লাগবে। উত্তরণের এই সন্ধি সময়ে স্বাভাবিকভাবেই সাহিত্যের চর্চায় কিছু দল গোষ্ঠী দেখা যায়। এটা এক ধরনের দুর্বলতা। কয়েকজন মিলে পরস্পরের পিঠ চুলকানোর প্রবণতা সীমাবদ্ধতাই সৃষ্টি করে। এর ফলে দলবহির্ভূতরা দলে ভর্তি হবার জন্য হ্যাংলা হয়ে ওঠে। সাহিত্যের মন্ময় জিনিসটা গড়ে উঠতে পারে না। ফলে সাহিত্য সমালোচনার চেয়ে স্তাবকতার বংশ বাড়ে। বাড়ে অসূয়া। সাহিত্য পুরস্কারের বেলায় এইসব দলবাজি বা স্তাবকতার প্রভাব যে নেই তা বলা যাবে না। তবে আমার বিশ্বাস, এগুলো একদিন থাকবে না। প্রতিভার মূল্যায়ন হবে।

জা প্রঃ বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের সাহিত্য তৈরি হচ্ছে না কেনো?
বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে, মানে বিশ্বমানের সাহিত্য রচনার জন্য আরও কিছু সময় প্রয়োজন। কথাটা বলেই নিয়েছি। সাহিত্য তো দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি ইত্যাদি বহির্ভূত কোনো জিনিস নয়! উন্নয়শীল দেশ হিশেবে নানা অস্থীরতার মধ্যেও বিশ্বমানের কিছু সাহিত্য সৃষ্টি হয়। দেশের মুষ্টিমেয় লোকে তার খবর পেলেও বিদেশে তার নাম কেউ জানতে পারেনা। কারন, অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমাদের সত্যিই করুণ অবস্থা। গুনে মানে ভালো ভালো কাজ অনুবাদ না হলে বাইরের জগতে তার নাম পৌঁছুবে কি করে? কাজটা বাঙলা একাডেমি প্রতিষ্ঠান সাত্বিকতার সাথে করতে পারতো। আসলে বইমেলার আয়োজন করা কিন্তু একাডেমির কাজ নয়। তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁছার মতো হয়ে যায় ব্যাপারটা। এটা প্রকাশকদের সমাজই বেশ করতে পারে বলে মনে করি। এখনও বাঙলা অনুবাদ সাহিত্য চর্চার ব্যাপারে অনেকের আস্থা বাঙলা একাডেমির ওপরেই। আমারও। এটা হতেই হবে। নইলে বিশ্বমানের সাহিত্যের সাথে বাঙলা মিলবে কি শর্তে? শিক্ষিত প্রজন্মকে অনুবাদের ব্যাপারে আগ্রহী এবং উতসাহী করে তোলাও একটা বড়ো কাজ।

জা প্রঃ এবার নিজের কথা বলুন। জীবনের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়েছেন। অভিজ্ঞতার ঝুড়ি বিশাল। অতীত দিনের বাঙালির জীবনাচার আর আজকের দিনের জীবনাচারে পার্থক্য কি কি?
জাহান আরাঃ নিজের কথা বলতে বলেছো। সবচেয়ে কঠিন কাজ নিঃসন্দেহে। লম্বা জীবনে যতোটা দেখেছি, তার কতোটুকুই আর বলা যাবে? বিচিত্র পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পথ চলেছি। চলবো বলেই চলেছি। কোনো বাধা মানিনি। আমাদের কালে মুসলিম পরিবারে মেয়েদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ একেবারেই ছিলো না। তার দুটো কারনঃ এক, সামাজিক বাধা; দুই, বাল্যবিবাহ। আমিও বাল্যবিবাহের কন্যা। বিয়ের পরে অনেক সংগ্রাম করে লেখাপড়া করতে হয়েছে।
আমাদের কোনো অভিযোগ ছিলো না এই সব নিয়ে সেকালে। দেশাচার এবং পারিবারিক মূল্যবোধের বিষয়গুলো তো জানতামই। মধ্যবিত্ত পরিবারে আমরা আটজন লেখাপড়া করেছি। সেটাও খুব আনন্দের স্মৃতি, যা অনেকের ভাগ্যে হয়নি। আমার জন্মশহর রাজশাহী থেকে ১৯৫২ সালে আমরা মাত্র ৭ জন মুসলিম মেয়ে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিই। কলেজে গিয়ে দেখি ৩ জন এসেছে। বাকিদের বিয়ে হয়ে গেছে। পর্দাপ্রথা থাকলেও আমাদের পরিবার ছিলো উদার। বাবা আমাকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখিয়েছিলেন। ম্যাট্রিকে গান আমার ঐচ্ছিক বিষয় ছিলো। ততকালীন পুর্ব-পাকিস্থানে গানের পরীক্ষায় আমি প্রথম স্থান অধিকার করি। শহরের অনুষ্ঠানাদিতে গান গাইতাম আমি। সেজন্য আমার ধর্মপ্রাণ বাবাকে কিছু নিন্দা মন্দ কথা শুনতে হতো। তখন এসবের মর্ম বুঝিনি। এখন বুঝি খুব ভালো করে, কি অসাধারণ উদার অভিজাত একটা পরিবারে আমি বেড়ে উঠেছিলাম।
আমাদের বাড়িতে মহিলাদের কিছু পর্দা ছিলো। খোলা রিকশায় তাঁরা কোথাও যেতেন না। মা ভাবি কোথাও বেড়াতে গেলে দুইঘোড়ায় টানা পালকি গাড়িতে যেতেন। আমরাও কতোবার মায়েদের সাথে সেই পালকি গাড়িতে করে বেড়াতে গিয়েছি। এমন মুসলিম পরিবার রাজশাহী শহরে তখন ছিলো হাতে গোনা। ‘হাতেম খান’ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পাড়া হিশেবে পরিচিত ছিলো। বাবা মায়েদের পাড়াপ্রতিবেশির সাথে মেলামেশা ছিলো বেশ আন্তরিক। কাছাকাছি বাড়িতে রান্না করা খাবার দেয়া নেয়াও হতো। প্রতিবেশি বন্ধুদের সাথে আমরা ভাইবোনের মতো মিশেছি। বড়োভাইদের বন্ধুরা ছিলো বড়োভাইয়ের মতোই। আদর শাসন দুইই করতেন তাঁরা। বড়ো ভাইয়ের বন্ধুরা মাকে ‘মা’ বলে ডাকতেন। এখন এইসব কথা শোনায় রুপকথার মতো। দিন বদলে গেছে। পাড়া প্রতিবেশিদের মধ্যে আত্মীয়সুলভ আসা যাওয়া, পারস্পরিক ভাব ভালোবাসা, উপহার দেয়া নেয়া, এখন আর চোখেই দেখিনা। এখনকার কমিউনিটি লাইফে কেউ কাউকে চেনে না।

জা প্রঃ আপনার মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা অনেক শুনেছি। সেই সব দিনের কথা কিছু বলুন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা গ্রামে গ্রামে পালিয়ে থেকেছি সাত মাস। সে এক ভয়ংকর স্মৃতি। প্রতি রাতে মনে হতো, পরের দিন সূর্যোদয় বুঝি আর দেখা হবে না। প্রতিদিন মৃত্যুর গলা ধরে বেঁচেছি। গ্রামে দুইবার আমরা সপরিবারে ধরাও পড়ি। অনিবার্য মৃত্যুকে দেখেছি বেয়নেটের সামনে দাঁড়িয়ে। রাজাকারেরা চোখের সামনে দিয়ে নিয়ে গেছে আমাদের যাবতীয় ব্যবহার্য জিনিস পত্র। মাটির দাওয়ায় খেজুর পাতার পাটিতে, তার নিচে ইঁটের বালিশ দিয়ে ঘুমিয়েছি। খাওয়া দাওয়ার কষ্ট ছিলো। নতুন গ্রামে পালালে কেউ না কেউ কিছু খেতে দিতো। সে কথা ভোলা যায় না। এইসব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে লেখেছি আমার “অয়নাংশ” চার খন্ডের সাগা উপন্যাস। প্রথম খন্ড ইংরেজি এবং মারাঠিতে অনূদিত। বাঙলাদেশে প্রথম খন্ডটি “কমর মুশতারী সাহিত্য পুরস্কার” পেয়েছে। ‘লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’ এই বইয়ের কয়েক কপি সংগ্রহ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দুই মাস আমরা ভারতে পলাতক জীবনে ছিলাম। দেশে ফিরে দেখি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের বাসাতে কিছুই নেই। সমস্ত বাড়ির দরজা জানালা হা হা করে খোলা। যেনো পরিত্যক্ত বাড়ি। সেইসব দিনের কথা মনে না করাই ভালো। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধ আমাকে সর্বস্বান্ত করেছিলো। আবেগে কিছু লিখেছি বটে, কিন্তু এখন আর বলতে ভালো লাগে না। সবচেয়ে কষ্ট লাগে ভেবে, এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো, সেটাই যেনো অনেকের মনে নেই। স্বাধীনতা যেনো হঠাৎ হাওয়া থেকে এসেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন এবং সম্ভ্রমদান যেনো শুধুই গল্প। যেনো কোনো দিন দেশপ্রেমিক কেউ ছিলো না এই দেশে। তাই তো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকেও সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে এই দেশেরই বেজাত কিছু মানুষ। ভাবা যায়? এখনও ভাবি, প্রতিদিন ভাবি, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, লক্ষ শহিদের পবিত্র প্রান, লক্ষ মা বোনের নির্যাতন, কেমন করে সস্তা শব্দাবলী হয়ে গেলো?

জা প্রঃ নিজের প্রিয় বইগুলো সম্বন্ধে বলুন।
জাহান আরাঃ লেখকের জন্যে বই হলো সন্তান সমতুল্য। কাকে ছেড়ে কাকে ভালো বা কম ভালো বলবো? নানা ধরনের কাজ করেছি তো! উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা টেক্সট বইও তার মধ্যে আছে। আছে দুটো শিশুদের ব্যাকরণ। দশটা ছড়ার বই, বিশ্ব সাহিত্যের অনুবাদ (অনার্সে পড়ানো হয়), সুফী সাধনার ওপর একটা বই, কিশোর উপন্যাস, উচ্চারণের বই, উচ্চারণের ক্যাসেট, এইসব কাজের পাশাপাশি উচ্চারণ প্রশিক্ষনের কাজে ডাকলেই হাজির হয়েছি। কয়েক মাস থেকে “সাপ্তাহিক বাঙালি” (নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত) পত্রিকায় বানান উচ্চারণের লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। দেশের অন-লাইন পত্রিকায় লেখছি। দৈনিক পত্রিকায় মাসে তিন চারটা লেখা তো যায়ই।

জা প্রঃ জার্মানিতে প্রবাসী পাঠকদের উদ্দেশ্যে যদি কিছু বলেন
জাহান আরাঃ জার্মানিতে প্রবাসী বাঙলাদেশি এবং বাঙলাভাষী পাঠকদের কথা কিছু কিছু দেখেছি নানা লেখায়। কেউ উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্যে এইদেশে আছেন। কেউ এসেছেন ভাগ্যকে প্রসন্ন করার জন্যে। কেউ রীতমত প্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়ে বড়ো হয়ে গেছে। এঁদের একটা বিষয় খুব ভালো। বিশেষ করে বাঙলাদেশিদের মধ্যে দেশীয় উতসবের আয়োজন করা। যেমন, পয়লা বৈশাখ। খুব আয়োজন করে বাঙলা নববর্ষ পালন করে প্রবাসীরা। সেখানে বাঙলা গান, দেশের নাচ, আবৃত্তি, ইত্যাদি থাকে। প্রবাসে থাকলেও দেশের জন্যে বুকের গহীনে যে টান লুকোনো থাকে নিরন্তর, তারই একরকম প্রকাশ ফুটে ওঠে।
প্রবাসের তরুন প্রজন্মের দিকে আমরা চেয়ে থাকি। মানুষ যেমন চেয়ে থাকে সূর্যোদয়ের দিকে। ওরাই দেশের গৌরব বৃদ্ধি করবে। বিদ্যা অর্জন করতে যারা এসেছে, প্রবাসের নানাবিধ কষ্ট সয়ে যারা নিজেদের সম্বৃদ্ধ করতে চায়, হতে চায় দেশের কৃতী সন্তান, তারা সফল হোক, এই প্রার্থনা নিরন্তর।
হিমন, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ আমার কথা শোনার জন্য। এইদেশে আমি ১৯৮১ সাল থেকে আসি বার বার। আমার পরিবারের দশ জন সদস্য থাকে জার্মানিতে। ওদেরকে দেখতে, ওদের সাথে কিছু সময় কাটাতে আসি। বাড়তি পাওনা তোমার মতো প্রজন্মের সাথে পরিচয়। ভালো থেকো। জীবনের অন্বিষ্ট পুরন হোক। শুভেচ্ছা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জার্মান প্রবাসের সম্পাদক জাহিদ কবীর হিমন
ছবি ডিজাইনে সহায়তা করেছে আমাদের ম্যাগাজিনের গ্রাফিক্স ডিজাইনার নাঈম
৮ই মার্চ ২০২১