নাজমুন নেসা পিয়ারি বাংলাদেশি সাহিত্যিক ও সাংবাদিক, দীর্ঘকাল আছেন জার্মানিতে। গেল বছর সাহিত্য ক্যাটাগরিতে অর্জন করেছেন বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণরসায়নে মাস্টার্স করেছেন। পড়িয়েছেন সিদ্ধেশ্বরী কলেজে। এরপর জার্মানিতে এসে ডয়চে ভেলেতে যোগ দেন সেই সত্তুর দশকের মাঝামাঝিতে। জার্মানিতে সাংবাদিকতা, লেখালেখিসহ বাঙ্গালি সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে তাঁর রয়েছে অনবদ্য অবদান। নারী দিবস উপলখ্যে জার্মান প্রবাসের (জা প্র) আয়োজনে থাকল তাঁর একটি সাক্ষাৎকার। 

জা প্রঃ ১। পৃথিবীর সবচেয়ে দরিদ্র দেশের একটি বাংলাদেশ, পিছিয়ে পড়া সমাজব্যবস্থা। সেইরকম একটা সমাজে বেড়ে উঠে আপনি প্রাণ-রসায়নের মত একটি জটিল বিষয়ে পড়লেন ঢাবিতে। সেই সময়ের, সেই সমাজের কথা জানতে চাই। কীভাবে সম্ভব হল আপনার এগিয়ে চলা?

পিয়ারিঃ দরিদ্র কথাটা আপেক্ষিক। দরিদ্র কোন দিক দিয়ে? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দারিদ্র হয়তো ছিল বা আগের মতো না হলেও এখনও কোন কোন ক্ষেত্রে তা আছে। তবে সেই সময়ে মানুষের জীবনে চাহিদা ও প্রলোভন কম ছিল — তাই জীবনকে মানুষ সহজ ভাবে নিতে পারতো। সে জীবনেই আনন্দ খুঁজে পেতো। অর্থনৈতিক দারিদ্র থাকলেও আমাদের চিন্তা চেতনার দরিদ্রতা কখনোই ছিল না। আমাদের রাজনৈতিক চেতনা ঐতিহ্য সমৃদ্ধ এবং গতিময়। আমাদের এই চেতনার কারনেই একসময়ে রবীন্দ্রবিরোধিতার ভেতর দিয়েও আমরা এগিয়ে গিয়েছি — ধরে রেখেছি নিজস্ব সংস্কৃতি। বিশ্বে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নিজের যায়গা করে নিয়েছে।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন কৈশোর যৌবনের সন্ধিক্ষণ — সেই সময়ে আমি ধ্রুপদী চলচ্চিত্র গোষ্ঠীর সাথে জড়িত ছিলাম। নিয়মিত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ছবি দেখতাম। ধানমন্ডি আঁলিয়স ফ্রসেজে ফরাসি ভাষা শেখার ক্লাস করতাম। ছবি আঁকতাম। বুলবুল ললিত কলা একাডেমিতে রবীন্দ্র সঙ্গীতের চর্চা করতাম। স্কুলে পড়ার সময়েই বাড়িতে প্রাথমিকভাবে সঙ্গীত শিক্ষকের কাছে হাতেখড়ি হয়। পহেলা  বৈশাখ, রবীন্দ্রজয়ন্তী ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম। স্কুলে নৃত্যগীত সব অনুষ্ঠানে থাকতাম। স্কুলের ব্যান্ড ও গার্লস গাইডেও সক্রিয়  ছিলাম। তাই আমার স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়র দিনগুলো ছিল প্রাণ-প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ ও বর্নাঢ্য। এরপরও কি ভাবা যাবে যে আমাদের সমাজ পিছিয়ে ছিল?

বাংলা একাডেমিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে গ্রহণ করছেন একুশে পদক ২০২০

জা প্রঃ ২। হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী, পড়লেন বিজ্ঞান, এরপর জার্মানিতে আসলেন সাংবাদিক হয়ে, শেষকালে হলেন সাহিত্যিক। এমন বিবর্তন কেন হল? জার্মানিতে আসার গল্পটা কেমন ছিল?
 
পিয়ারিঃ আমার চিন্তার জগত ছোটবেলা থেকেই  বিচিত্র ও বহুমুখি। স্কুলের কথা দিয়েই শুরু করি। আমার বাবা আমাকে কামরুনননেসা স্কুলে একবারে ক্লাস ফোর-এ ভর্তি করতে নিয়ে যান। আমাকে দেখে একজন শিক্ষয়িত্রী বলেছিলেন “আপনারা কেন ভীড় বাড়ান — এতটুকু মেয়েকে নিয়ে এসেছেন?” যাহোক ভর্তি করে দিয়েছিলেন অবশেষে। বাবাই ঘুম ভাঙ্গলে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অক্ষর শেখাতেন, পড়াতেন — এভাবেই আমার পাঠ শুরু। স্কুলে ড্রইং-এ ভাল ছিলাম। আমার সহপাঠী বিজলী এখনও আমাদের বন্ধুদের আড্ডায় বলে ওঠে — “পিয়ারি যে কি চমৎকার  ছবি আঁকতো — ক্লাসে সবার আগে মুহুর্তেই কি সুন্দর আপেল এঁকে ফেলেছিল — তা আমি কোনদিন ভুলবো না।”
বাবার ইচ্ছাতেই বিজ্ঞান পড়তে হলো। ইন্টারমিডিয়েট সাইন্স গ্রুপে পড়ার পর ভেবেছিলাম আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। কিন্তু রেজাল্ট ভাল হলো তার ফলে আরো জোড় করলেন সাইন্সের বিষয় পড়তে হবে। যেহেতু বাবা ছিলেন রসায়নের জনপ্রিয় শিক্ষাবিদ। তাঁর ছাত্র-ছাত্রীরা তাঁকে খুব ভালবাসতেন। আমার মা ছিলেন সাহিত্য অনুরাগী ও অতিথি পরায়ন। আমাদের বাড়ীতে ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত্র  আসতো। তখন আমাদের পুরানা পল্টনের বাড়ীর পাশের চিলতে লেক, দূরে ফকিরাপুল, নুয়ে পড়া বাঁশঝাড়, আমাদের বাড়ীর পাশের স্কুলের খোলা মাঠের ওপরে তারা ভরা আকাশ আমাকে ভাবিয়ে তুলতো। যার খানিকটা  বর্ননা বুদ্ধদেব বসুর আত্মাজৈবনিক লেখায় আছে। পুরানা পল্টনেই বুদ্ধদেব বসুর বাড়ী ছিল। সে যাই হোক অনিচ্ছাতেই বিজ্ঞান পড়ি। জীবন ও হৃদয় সবসময় সমান্তরাল থেক একসাথে মেলে না। ভাল লাগলো কার্জন হলের সুন্দর ভবন, ফুলের বাগান  — রাস্তার ধারের ইউকালিপটাস গাছ আর বায়োকেমিষ্ট্রি বিভাগের পুরনো দিনের কাঠের সিঁড়ি। সব মিলিয়ে ১১/১২ জন শিক্ষার্থী সুযোগ পেয়েছিল, তার ভেতর মেয়ে ছিলাম আমরা ৪ জন। বায়েকেমিষ্ট্রিতে মাস্টার্স শেষ করে চাকুরি নিলাম সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজে। এখানে দুপুরে ক্লাস শেষ করে ধানমন্ডি দুই নাম্বার রোডে আর্ট গ্যালারিতে জল রং, তেল রং-এর ব্যবহার শেখার জন্য ক্লাস করতাম। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আমিরুল ইসলাম ক্লাস নিতেন। এভাবেই আমার ছবি আঁকার বাসনা কিছুটা পূরণ হলো। সেই সময়ে কবি শহীদ কাদরীর বিখ্যাত কবিতার বই “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা” কাব্যগ্রন্থের প্রচছদ আমি অঁকি। আমার অনুবাদ গ্রন্থ “পিয়ানো টিচার” এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই “সততার অসীম আকাশ”-এর প্রচ্ছদও  আমার করা।

জা প্রঃ ৩। আপনার সাথে কথা হবে আর শহীদ কাদরীর কথা উঠবে না তা তো হয় না। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি ছিলেন, ছিলেন আপনার স্বামীও। তাঁর সেই বিখ্যাত কবিতা “প্রিয়তমা তোমাকে অভিবাদন” আপনাকে উদ্দেশ্য করেই লেখা। আপনার কাছে শহীদ কাদরীর ব্যাপারে জানতে চাই, কীভাবে পরিচয়, বিয়ে।

পিয়ারিঃ শহীদ কাদরীর সঙ্গে আমার পরিচয় কোন এক আসরে। ওর ভরাট গলায় সুন্দর উচ্চারণে বিষ্ণুদেব বা সুধীনদ্রনাথ দত্তের কোন কবিতার লাইন ঠিক মনে নেই, বলতে বলতে ও যখন থেমে গিয়েছিল পরের লাইনটা আমি বলে দিয়েছিলাম। তখনই চমকে ওঠে। এভাবেই পরিচয়। আমি বেশী সময় ওখানে ছিলাম না। সন্ধ্যা হতেই বাড়ী ফিরে যাই। পরদিন সে সময়ে শহীদ রমনা পার্কের রেস্টুরেন্টের ক্যাফেতে বসে তার কোন অনুরাগীকে পাঠিয়ে দেয় সিদ্ধেশ্বরী কলেজ থেকে আমাকে নিয়ে যেতে। ছেলেটি বলে “শহীদ ভাই অসুস্থ অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন — রমনায় বসেছেন আপনাকে নিয়ে যেতে বলেছেন কফি খাবেন বলে। রমনা পার্ক তখন বেশ দৃষ্টিননদন ছিল — সবুজ আর ফুলের শোভায়। সেখানে গিয়ে দেখি শহীদ গলায় মাফলার জড়িয়ে টেবিলে ওষুধের শিশি রেখে বসে আছে। পরে জেনেছিলাম আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য অফিস পালিয়ে এসেছে সেটা আমি যাতে বুঝতে না পারি তাই এত নাটকীয়তা। এরপর প্রতিদিনই আমার সঙ্গে দেখা করতে চাইতো। যাকে বলে হুরমুড় করে প্রেমে পড়লো। এর ভেতর ২৫ শে মার্চের সেই কালরাত্রি এলো। সেদিন বিকেলে ওর সঙ্গে আমার দেখা করার কথা ছিল — হঠাৎ ও আমাদের  বড়ীতে এসে আমাকে বললো “আজ শহরের অবস্থা বেশী ভাল না, বাড়ীতেই থাকো — আজ দেখা হবে না।”  ওর কবিতায় আছে “রাষ্ট্র মানেই মহিলা বন্ধুর সাথে এনগেজমেনট বাতিল”! সেদিন রাতেই ঘটে গেল ভয়াবহ কান্ড। গুলির শব্দে আর মানুষের রক্তে ঢাকা শহর ভাসতে শুরু করলো। প্রথমে কিছুদিন বাবার কর্মস্থল ময়মনসিংহে থেকে পরে অবশ্য আমি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। মাঝে ঢাকায় ফিরে আসার পর শহীদ কাদরীর সঙ্গে দেখা করা অসম্ভব হয়ে পরে। সে বলে আবার যদি আমরা কোথাও চলে যাই তখন কি হবে! সে তো কোন ভাবেই আমাকে খুঁজে পাবে  না। এতটাই অস্থির হয়ে ওঠে যে তখন কারফিউ ব্রেকে ওর উদ্যোগে ঐ মহা দুর্যোগের মধ্যেই কাজী অফিসে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে করি। সে সময়ে আমার মাথায় বিয়ের কোন ভাবনাই ছিল না।
“তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা” কবিতাটি শহীদ কাদরীর একটি কালজয়ী প্রেমের কবিতা বলে আমি মনে করি। এ কবিতাটি লিখেছিল ওর  যৌবনে প্রচন্ড প্রেমের আবেগ থেকে। যখন ওকে   অনেকে নারী বিমুখ বলেই জানতো। বড় ভাই শাহেদ কাদরী ও ছোট বোন নাজিফাকে বলেছিল সে কোনদিন বিয়ে করবে না। কবিতাটি প্রকেশের পর সেই সময়ের তরুনদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আমাকে দেখলে পরিচিতদের অনেকে দুষ্টুমি করে আমার উদ্দেশ্যে এ কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করতো। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলা একাডেমির সাহিত্য পত্রিকা “উত্তরাধিকার”-এ, আমাকে উৎসর্গ করে। পরে “তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা” নামে বই  প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সাল। উৎসর্গে লিখেছিল:
পিয়ারিকে —
গানগুলো যেন পোষা হরিণের পাল 
তোমার চরণ চিহ্নের অভিসারি।

জা প্রঃ আপনার কর্মজীবন সম্পর্কে বলবেন
পিয়ারিঃ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নানা কারনে বিদেশে আসি। সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের পরিচয় নিয়ে শিল্প, সাহিত্য, দর্শন ও  ইতিহাস সমৃদ্ধ একটি দেশে চাকুরি করাটাও তার একটি কারণ ছিল। তবে আমার স্বপ্নের দেশ ফ্রান্স ও ফরাসি ভাষা —এখনও কারো মুখে ফরাসি ভাষা শুনলে আমি মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ি। যেখানে চাকুরি নিয়ে আসি সেই ডয়েচে ভেলেতে বাংলা বিভাগের শুরুর একটা কাহিনি আছে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের দূতাবাস ছিল সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানির রাজধানী বনে। বনের পাশের শহর কলোনে ছিল ডয়েচে ভেলের অফিস। ২৯ টি ভাষায় প্রোগ্রাম ছিল।  তখন বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ছিলেন প্রয়াত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরি। তাঁর সঙ্গে কোন এক অনুষ্ঠানে প্রয়াত সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্টের দেখা হয়। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান চাচ্ছিলেন বিশ্বে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির পরিচিতি ঘটাতে। হুমায়ুন রশিদকে ভিলি ব্রান্ট বলেছিলেন — তোমার দেশ তো স্বাধীন তোমার আর ভাবনা কি? হুমায়ুন রশিদ তাঁকে বলেন, “দেখুন আপনাদের বহির্বিশ্বের জন্য বিভিন্ন ভাষায় প্রোগ্রাম আছে। আমার দেশে বাংলা ভাষায় এত মানুষ কথা বলে অথচ আপনাদের এই ভাষায় কোন প্রোগ্রাম নেই।” তারপরই ডয়েচে ভেলের উদ্যোগে ১৯৭৫ সালে পরীক্ষণমূলক ভাবে বাংলা অনুষ্ঠান শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে নিয়মিত অনুষ্ঠান চালু হয়। প্রোগামে একটি নারী কন্ঠের জন্য ঢাকায় তারা অনেকে আবেদনকারীর ভেতর পরীক্ষা নীরিক্ষা করে আমাকে নির্বাচন করেন। প্রথমে তিন বছরের চুক্তিতে বাংলা বিভাগে যোগ দেই। তারপর বাংলা, ইংরেজী ও জার্মান বিভাগে নিয়মিত ফ্রিল্যান্স কাজ করি। জার্মান বিভাগে একটি মঞ্চ অনুষ্ঠানে যোগ দিতাম। এটি প্রতিমাসে জার্মানির বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হতো। এর নাম ছিল শটাটবুমেল অর্থাৎ “নগর পরিক্রমা”। এই মঞ্চ অনুষ্টানটি পরে জার্মান রেডিও  থেকে সারা বিশ্বে বসবাসরত জার্মানদের জন্য প্রচার করা হতো। উদ্দেশ্য ছিল দেশের বাইরে থেকেও তারা যেন নিজের দেশের কথা জানতে পারেন। এই অনুষ্ঠান যেখানে অনুষ্ঠিত হতো সেই শহর সম্পর্কে একটি সহজ ধাঁধা থাকতো — সারা বিশ্বের শ্রোতাদের কাছ থেকে সেই ধাঁধার উত্তর আসতো। ধাঁধার  সঠিক উত্তর বাঁছাই করার জন্য আলাদা একটি বিভাগ ছিল।  সঠিক উত্তরগুলো থেকে লটারী করে ৯৯ টি পুরষ্কার দেওয়া হতো। যার মধ্যে প্রথম পুরষ্কার ছিল লুফথানসা বিমান সংস্খা থেকে জার্মানি ভ্রমনের  বিমান টিকেট সহ এক সপ্তাহ জার্মানিতে বেড়ানোর সুযোগ। পরে ডেয়েচে ভেলের গন সংযোগ ও মার্কেটিং বিভাগ সম্পাদকের একটি পদের বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করলে আমি ঐ বিভাগে চাকুরিটি পাই। একযুগেরও বেশী সময় এই পদে কাজ করি। পশ্চিম ও পূর্ব দুই জার্মানি একত্রিত হয় ১৯৮৯ সালে এবং একত্রিত জার্মানির রাজধানী স্থানান্তরিত হয় বার্লিনে। আমি রাজধানী আসতে আগ্রহী ছিলাম। বার্লিনে “ডাস কোর” নামে একটি সংস্থায় কালচারাল এটাশে হিসাবে খন্ডকালীন কাজে যোগ দেই।

বর্তমানে জার্মান পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ে জার্মান কূটনীতিবিদদের বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য খন্ডকালীন কাজ করি। আমি ডয়েচে ভেলেতে কাজ করার পাশাপাশি সবসময়ই দেশের পত্রিকায় লিখতাম। দেশে দৈনিক ইত্তেফাক, ডেইলি স্টার, অবজার্ভার, ইনডিপেনডেনট পত্রিকায় নিয়মিত লিখতাম। বনে ইন্টারনাৎসিওন নামে একটি সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশিত হতো — সেখানেও মাঝে মাঝে লিখতাম। কলোন মেসে অর্থাৎ কলোন মেলার জন্য প্রতিমাসে একটা আর্টিকেল লিখতাম। বার্লিনে আসার  পর আমি নতুন করে সৃজনশীল লেখায় মনোনিবেশ করি। ঢাকায় যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন আমার প্রথম কবিতা সেই সময়ের “দৈনিক পাকিস্তান” পত্রিকায় ছাপা হয়। এছাড়াও “সচিত্র সন্ধানি”তে  কিছু কবিতা ছাপা হয়।

জা প্রঃ নোবেলজয়ী দুজন জার্মান (একজন রোমানিয়ান জার্মান) সাহিত্যিকের বই আপনি অনুবাদ করেছেন। অনুবাদে আগ্রহ হলেন কেন?
জার্মানিতে এসে লেখালেখি বাদই দিয়েছিলাম। ২০০৫ সালে আবার এ জগতে প্রবেশ করি। অঙ্কুর প্রকাশনীর প্রকাশক মেজবাহ আহমেদ নোবেল বিজয়ী জার্মান  লেখিকা এলফ্রিডে ইয়েলিনেক-এর  “পিয়ানো টিচার” বইটির কপি রাইট কিনে আমাকে তা সরাসরি জার্মান ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করার প্রস্তাব করেন। আমার প্রথম গ্রন্থই পাঠক প্রিয়তা পায়। তখন “দৈনিক জনকন্ঠ” আমাকে নিয়ে কভার স্টোরি করে লেখে “সত্তুরের দশকে ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গন মাতিয়ে রাখা নাজমুন নেসা পিয়ারি নতুন রূপে এলেন — অনুবাদ নিয়ে “।  

জা প্রঃ ৫। রোমানিয়ান-জার্মান লেখিকা হেরটা মুলারের যে বইটি আপনি অনুবাদ করেছেন তাতে আমরা দেখি যে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর স্টালিন তরুণদের তুলে শ্রমশিবিরে নিয়ে যায়। সেখানে সতেরো বছর বয়সী এক সমকামী তরুণের দুঃখগাধা বিধৃত হয়েছে নিদারুনভাবে।
পিয়ারিঃ হ্যাঁ এটি নোবেল বিজয়ী জার্মান লেখিকা হেরটা মুলারের “আটেম শাওকেল”। আমি বাংলায় নাম দিয়েছি “নি:শ্বাসের দোলা” এই উপন্যাসটি ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে যা নিয়ে  খুব একটা আলোচনা হয় না। বইটি অনুবাদ করতে আমি বহুবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি। সেটি অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা।

জা প্রঃ ৮। একুশে পদকের মত রাষ্ট্রীয় পদক পেয়েছেন। জীবনে আর কোন অপূর্ণতা আছে কি?
পিয়ারিঃ যেকোন প্রাপ্তিই আনন্দের — আর ভাষা শহীদদের নামে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পদক পেয়ে আমি তো নি:সন্দেহে গৌরব বোধ করি। লেখালেখির জগতে আছি এবং থাকবো। আমার লেখাতে বাংলাদেশের কথা আসবেই।

জা প্রঃ নারী দিবসে নারীদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন। বাঙ্গালি নারীদের এগিয়ে যেতে করণীয় কী কী বলে মনে করেন?
পিয়ারিঃ নারীদের আত্মাবিশবাস ও আত্মমর্যাদাবোধ বজায় রেখে চলতে হবে। তবে আমি মনে করি  আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীরা পুরুষের পাশাপাশি চলছে। এ নিয়ে নতুন করে আমার কিছু বলার নেই।

জা প্রঃ জার্মান প্রবাসের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ
পিয়ারিঃ তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, তোমার মাধ্যমে তোমাদের সকলকে শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জার্মান প্রবাসের সম্পাদক জাহিদ কবীর হিমন
ছবি ডিজাইনে সহায়তা করেছে আমাদের ম্যাগাজিনের গ্রাফিক্স ডিজাইনার নাঈম
৮ই মার্চ ২০২১