পৌষ মাস হলে কি হবে, আকাশে গন গন করছে সূর্য। আহামরি গরম না হলেও একে শীত বলা যাবে না। হাতিরঝিল সেতুর সামনে গরমে বলতে গেলে ঘামছেন ইউটিউবার জামাল। ভারত-চীন যুদ্ধ চলছে। এটি নিয়ে এখনো স্ট্যাটাস দেয়া হয়নি। সকাল থেকে সারা ইন্টারনেট খুঁজে মনমতো মানবিক দুটি লাইন পাওয়া যায়নি যেটি কপি করে ফেসবুকে দেয়া যায়। ভিডিও সহকারী রিন্টুর আসতে দেরি হচ্ছে। মেজাজ চড়ে চড়ে যাচ্ছে। চেয়েছিলেন শিল্পী সমিতির নির্বাচন কভার করতে এফডিসিতে ঢুকবেন, পাসও যোগাড় করেছেন কিন্তু কিসের কি – মানুষের ভিড়ে সেটি সম্ভব হয়ে উঠছে না। এবারের সভাপতি প্রার্থী জায়েদ খান আর সেক্রেটারি হিরো আলম। দেশব্যাপী তুমুল জনপ্রিয় এই দুই ব্যক্তিত্বের আগের সেই বয়স নেই। সকালবেলার শিউলি ফুলের মত জায়েদ খানের দাঁতগুলো ঝরে গেছে। নকল দাঁত লাগাননি। জায়েদ খানের ভাষ্য, তাঁর জীবনে কোন দুই নম্বরী নেই, নকল দাঁত লাগানো তাই তাঁর নীতিবিরুদ্ধ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তরুণদের ক্রেজ জায়েদ খানের দাঁতের স্টাইল অনুকরণ করে অনেক তরুণ দাঁত ফেলে দিয়েছে। শুরুটা করেছিল হিরো আলম। একদিন লাইভে এসে হাতুড়ি দিয়ে নিজের দুটি দুটি দাঁত ফেলে দিলেন। রক্তাক্ত মুখে বললেন, যেখানে জায়েদ ভায়ার দাঁত নেই, সেখানে আমি কী করে দাঁত থাকে। সেই শুরু কপিক্যাট দাঁত ফেলার। দলে দলে তরুণরা দাঁত ফেলা শুরু করলো। এই ঘটনার সাথে জার্মান লেখক গ্যোটের ক্লাসিক বই “দ্য সরোজ অব ইয়াং ভের্টার” বইয়ের চরিত্র ভের্টারের কথা মনে পড়ে যায় জামালের। গল্পে ভের্টার বন্দুক দিয়ে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করে। বইটি প্রকাশের পর পুরো ইউরোপ জুড়ে ব্যাথাতুর আর দুঃখে ভারাক্রান্ত তরুণদের মাঝে ভের্টারের মত করেই আত্মহত্যা করার ব্যাপক প্রবণতা দেখা দেয়। ঘটনা প্রায় সোয়া দুইশ বছর আগের। বাংলাদেশে তরুণদের দাঁত ফেলা দেখে জামাল স্ট্যাটাস দিয়ে দুটি ঘটনার মাঝে মিলের কথা বলেছিলেন। কিন্তু কমেন্টে প্রায় চার কোটি হাহা পড়েছিল, ক্লাসিক বই নিয়ে লেখায় মানুষ তাচ্ছিল্য করেছিল, জনগণ হেসেছিল খুব। সেই থেকে জামাল জানে এই দেশে কি চলবে আর কি চলবে না।    

PWC এর এক জরিপে দেখা গেছে ১৫ – ২৫ বছর বয়সী প্রায় তিরিশ শতাংশ তরুণের সামনের দুটি দাঁত নেই। জামাল এখন আর তরুণ নেই বটে, কিন্তু একদিন ভিডিওতে এসে তাঁর দাঁত ফেলার ইচ্ছে আছে।      

ওদিকে লন্ডন থেকে বড় মেয়ে কল করে জানিয়েছে টিকটক ভিডিও করার সময় পা মচকে গেছে। মেয়ের সাথে লন্ডনে থাকা সাবেক স্ত্রীর উপর ক্রমবর্ধমান রাগ যেন আরেকটু বাড়লো। অনেক কাজের পরিকল্পনা করে সকালটা শুরু হলেও কিছু করা হচ্ছে না, এদিকে তাঁর মনে পড়ে যায় অতীত আর ভবিষ্যতের কথা!

প্রায় বিশ বছর আগে জামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে অক্সফোর্ডে জেনেটিক্সের উপর উচ্চশিক্ষার জন্য যান। পড়ালেখা শেষ করে অক্সফোর্ডেই গবেষকের কাজ শুরু করেন। ওখানেই শিরিনের সাথে পরিচয় এবং বিয়ে। জামালের ইচ্ছে ছিল শিরিনের সাথে দৈনন্দিন পারিবারিক জীবন সবাইকে দেখানোর জন্যে একটা ইউটিউব চ্যানেল করবেন। কিন্তু শিরিন রাজি হয়নি। এরপর শিরিন অন্তত একটা রান্নার চ্যানেল করুক- জামাল সেই ব্যাপারে একটু জোরই করতেন। কেইনবা করবেন না, আশেপাশে কত ভাবীরা ইউটিউবে কতকিছু করে বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে কিন্তু শিরিনের সেসবে মন নেই। শেষ পরিণতি ডিভোর্স।

ততদিনে জামাল ঠিক করে ফেলেছে তাঁর জীবনের লক্ষ্য। সে জানে কোন পরিস্থিতিতে ফেসবুকে কি লিখতে হয়। তাঁর ধারণা, বাঙ্গালির মন আহমদ ছফার পর তাঁর থেকে ভাল কেউ বুঝে না। জামাল জানে বাঙ্গালি যখন ধর্ষণের বিরুদ্ধে স্ট্যাটাস দেয়, সেটি ধর্ষিতার প্রতি সহমর্মিতা থেকে নয়, নিজে ধর্ষণ করে ওই আনন্দটুকু পায়নি সেই হিংসা থেকে ধর্ষককে গাল দেয়। যখন বাঙ্গালি দুর্নীতি নিয়ে নীতিবাক্যসূচক কথা লেখে, এর মানে হয় সে নিজে চোর, না হয় সে দুর্নীতি করতে পারছে না। সে যখন বড়লোকের বিলাসী জীবন নিয়ে ফেসবুকে নীতিবাক্য লিখবে, ধরে নিতে হবে অনৈতিক বিলাসী জীবনের প্রতি বাঙ্গালির অনীহা থেকে নয়, বরং সে ওই বড়লোকের মত জীবন যাপন করতে পারছে না তাই মনের খুঁতখুঁত মেটাতে তাঁকে স্ট্যাটাস দিয়ে সবাইকে জানাতে হয় বিত্ত থাকলে সে কতখানি সাদাসিদে জীবন যাপন করতো।

জনগণের ভাইরাল হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দেখে ২০২৫ সালে সরকার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়। সরকারের ভাষ্য- দেশের জনগণের বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই, দেশের জনগণের দরকার ভাইরাল হওয়া। তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থলে প্রকাণ্ড আকারে “সুন্দরবন ভাইরাল বিশ্ববিদ্যালয় (সুভাবি)” স্থাপিত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় সেফুদাকে এনে সেটির উদ্বোধন করা হয়। ২০২৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেফুদা সেখানে ভিসি ছিলেন। সেফুদার মৃত্যুর সময়ের কথা জামালের মনে আছে, জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে সারাদেশ দশদিন ব্যাপী শোক পালন করা হয়। অক্সফোর্ড থেকে ফিরে জামাল সুভাবিতে একটি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেছে। এরপরই তাঁর অনলাইনে ভাইরাল যাত্রা শুরু।

ফেসবুক টিকটক ইউটিউব মিলিয়ে তাঁর প্রায় দশকোটি ফলোয়ার। আয়ও কম নয়। ২০৩৫ সালে সরকার টিকটককে জাতীয় অ্যাপ ঘোষনা করে এবং দশের বেশি বয়সের সকলের মোবাইলে টিকটক ইন্সটল বাধ্যতামূলক করা হয়। জামালের সেখান থেকেই আয় বেশি। এসএসসি আর এইচএসসিতে “অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার উপায়” বিষয়টি আগে ঐচ্ছিক থাকলেও বিশ্ব ভাইরাল সংঘের (বিভিসি) দাবীর প্রেক্ষিতে এবছর থেকেই সেটি বাধ্যতামূলক। একারণে জামাল অনেক খুশি এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ। নোয়াখালী শহর থেকে দশ মাইল দূরের এক মফস্বলে জামালের দোকান- মোবাইল ও ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রির পাশাপাশি স্থানীয় স্কুলে “অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার উপায়” বিষয়ে পার্ট টাইম ক্লাস করায় জামাল। অনেকেই তাঁকে ভাইরাল জামাল ডাকে, তাঁর ভালই লাগে। কিন্তু এখানেই তাঁকে থেমে থাকলে চলবে না। ২০৩০ থেকে সরকার অনলাইনে ভাইরাল হওয়াকে একটি শিল্প হিসেবে ঘোষণা দিয়ে স্বাধীনতা পুরষ্কার চালু করে। প্রথম বছরেই মরণোত্তর পুরষ্কার পায় সেফুদা। একই সাথে টিকটক অপু, শাহরিয়ার নাজিম জয়, সালমান, হিরো আলম, রাবা, জার্মানির হাবিব-নাতালিয়া, প্যাট এন্ড ইভা, ফ্রান্স থেকে রাখি ও ক্রিম আপুকে একত্রে দেশের সর্বোচ্চ এই সম্মানে ভূষিত করা হয়। কন ছেলে বিদেশে গিয়ে সাদা চামড়ার কোন মেয়েকে বিয়ে করলেও প্রধানমন্ত্রী নিজে গিয়ে তাঁদের এই পদক তুলে দিয়ে আসেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠানও করা হয়। এদিকে গেল বছরেই সংবিধান পরিবর্তন করে সরকার দুটি গুরুত্বপূর্ণ আইন করেছে। এক, মৃত্যু পর্যন্ত জায়েদ খান আর হিরো আলমকে প্রতি বছর স্বাধীনতা পুরষ্কার দিতে হবে। দুই, প্রতি শুক্রবার রাষ্ট্রপতিকে এই দুই মহানায়কের সাথে সকালের নাশতা সারতে হবে। সেখানে দেশ আর সমাজ নিয়ে এই মহতী আত্মাদ্বয় রাষ্ট্রপতিকে নানা পরামর্শ দেবেন। জামালকে কি এখানেই থেমে থাকলে চলবে! যেতে হবে তাঁর বহুদূর।   

লাখ লাখ মানুষের ভিড়েও হাতিরঝিলের জলের দিকে তাকিয়ে জামালের মন হারিয়ে যায়। কোথায় ছিল তাঁর জীবন আর আজ কোথায়? আজও মনে পড়ে পনেরো বছর আগে প্রথম স্ট্যাটাস দিয়ে ভাইরাল হওয়ার কথা। “শাহরুখ খান নয়, সালমান খান নয়, সবথেকে আকর্ষণীয় আমার প্রিয় নবী (সাঃ)। একমত হলে লাইক ও শেয়ার করুন”- এই ছিল প্রথম স্ট্যাটাস যেটি তিনি লিখেছিলেন অক্সফোর্ডের জেনেটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক ল্যাবে বসে। সারাদিন ল্যাবে কাজ করে বিকেলে বাসার ফিরে দেখেন স্ট্যাটাসটি শেয়ার হয়েছে দেড় কোটিবার, লাইক প্রায় তিনকোটি, কমেন্ট লাখের কাছাকাছি।

অনলাইনে ভাইরাল হওয়ার গুরুত্ব জামাল এর পরেও পেয়েছে বহুবার। ঘটনাক্রমে বাংলাদেশের সাবেক দুই নেত্রী বেগম জিয়া ও শেখ হাসিনার মৃত্যুবার্ষিকী ১৬ই ডিসেম্বর, সেদিন আবার বিজয়দিবসও। একদিকে জাতির আনন্দ, একদিনের বেদনা। একারণে আর্মি স্টেডিয়ামে দুটি মঞ্চ করা হয়। এক মঞ্চে চলে দুই নেত্রীর জন্য শোকগাথা রচনা, অন্য মঞ্চে হিন্দিগানের সাথে বিজয়ের আনন্দ। সামনে দেশি বিদেশী দর্শকেরা থাকেন। গতবছর অন্যান্য রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মত ১৬ই ডিসেম্বরের এই অনুষ্ঠানও টিকটকে লাইভ হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ সার্ভারে সমস্যা হওয়ায় অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সারাদিন টিকটক বন্ধ ছিল। অভিমানে সরকার ঘোষণা করেছে ১৬ই ডিসেম্বর বলে জাতির জীবনে কিছু থাকবে না, এখন থেকে প্রতিবছর বিজয় দিবস আর দুই নেত্রীর মৃতুবার্ষিকী পালিত হবে ১৭ই ডিসেম্বর। 

বাংলাদেশে ফিরে জামালের শুরুটা একটু কঠিনই ছিল। প্রথমে মাঠে ময়দানে ওয়াজ রেকর্ড করে চলতো গবেষণা, কোন অংশটা জনগণ খাবে, সেই অংশটুকুই কেটে অনলাইনে দেয়া হত। রিন্টু ভিডিও কাটার কাজটি বেশ ভালই পারে। নতুন ছেলে। এর আগে কাজ করতো ফরহাদ। কিন্তু মারাত্মক এক অপরাধে ফরহাদকে বাদ দিতে হয়েছে। জামাল খুব গোছানো মানুষ। কম্পিউটারে সব সাজানো থাকে। খুঁজে পেতে সুবিধা হয়। ফরহাদ ভুল করে ওয়াজের ফোল্ডারে বিভিন্ন সময়ে মেয়েদের সাথে জামালের কিছু ঘনিষ্ঠ ছবি ও ভিডিও (সফট পর্ণ ) রেখেছিল। এরপর ইসলাম অবমাননার কারণে ফরহাদকে বাদ দিতে বাধ্য হয় জামাল। জামাল সব সহ্য করবে, কিন্তু ধর্মের অপমান নয়।

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। রিন্টুও চলে এসেছে। গুটি গুটি পায়ে ওরা এফডিসির সামনে আসতে সক্ষম হয়েছে। জায়েদ খান ও হিরো আলম সংবাদ শুরু করবেন। শুরুতেই তাঁরা নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা দিলেন। আরো একটি চমকপ্রদ তথ্য দিলেন। সরকার জাতীয় সংসদে স্থায়ী দুটি আসন তাঁদের দুজনকে উপহার দিয়েছে। তাঁদের সংসদীয় এলাকা থাকবে না, কারণ তাঁরা নির্দিষ্ট এলাকার কেউ নন, তাঁরা সারা দেশের সম্পদ। সংসদের এই আসনে বসে তাঁরা এমপিদের আলাপ শুনবেন। সরকার তাঁদের সেখানে চিনাবাদাম দিয়ে আপ্যায়ন করবেন। বাদামের জন্য আলাদা বাজেট রাখার ঘোষণাও হয়েছে। বাদামের খোসা ছাড়ানোর প্রশিক্ষণ নিতে তিরিশজন কর্মকর্তা এই মুহুর্তে চীনে। 

ইউটিউবার জামাল নিজের চ্যানেলে সংবাদ সম্মেলনটি লাইভ করে নিজের পাজেরো গাড়িতে চেপে বাড়ি রওনা করলেন। পাশে রিন্টু। ড্রাইভার ছুটিতে, জামাল নিজেই গাড়ি চালাচ্ছেন। শীতের দিনগুলো খুব ছোট, কিছুক্ষণ আগের লাল সূর্যটা ডুবে গেছে। জামালের মাথা ঝিম ঝিম করছে, ঘুম ঘুম ভাব। কিন্তু বাসায় ফিরেই যুদ্ধের স্ট্যাটাস দিতে হবে। আজকের রেগুলার টিকটকটাও বাকি আছে। অনেক কাজ বাকি! এত দ্রুত ঘুম ভাব আসলে জামালের চলবে কি করে! তাঁকে যে যেতে হবে আরো বহুদূর………  


বার্লিন থেকে
জাহিদ কবীর হিমন
সম্পাদক, জার্মান প্রবাসে
২৮ ফাল্গুন ১৪২৮

mm

By Jahid Kabir Himon

এডিটর (Editor): জার্মান প্রবাসে মাস্টার্স in Internet Technologies And Information Systems, Leibniz University Hannover. থাকিঃ বার্লিন, জার্মানিতে।

Leave a Reply