দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ইউরোপে গ্রীষ্ম আসে। তাও কি সবসময় আর প্রকৃতির দয়া হয়! মাঝে মাঝেই রোদ তো থাকেই না, গুঁড়ি গুঁড়ি বিরক্তিকর বৃষ্টিও চলে। এই করে করেই গ্রীষ্ম যেন টিকতেই চায় না। ওর আয়ুষ্কাল বড্ড কম। এপ্রিলের সময়টা যখন আসে তখন ইউরোপ গ্রীষ্মকে বরণ করতে প্রস্তুতি নিতে অস্থির হয়ে থাকে। বিখ্যাত কবি টি এস ইলিয়ট তাই বলেন, April is the cruellest month, কবির কাছে মনে হয় এপ্রিল যেন শেষ হতেই চায় না। কারণ এ মাস গেলেই তো গ্রীষ্ম শুরু, এপ্রিলই যেন গ্রীষ্মের আগমনের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে।   

সপ্তাখানিক হয় গেল শরৎ শুরু হয়েছে। পাতা ঝরার কাব্য চারিদিকে। প্রকৃতির যৌবন পড়তির দিকে। পাতাগুলো রঙ্গিন হয়ে উঠছে ঝরে পড়বে বলে। ঈশান কোনে কনকনে শীতের আগমনী বার্তা হুমকি দিচ্ছে। বার্লিনবাসীও তাই এই শেষ সময়ে যতটা পারে যে যার মত বাইরে ঘুরাঘুরি, পার্টি, খেলাঘুলা, পিকনিক করে নিচ্ছে। প্রায় সাত আট মাস এসবের কিছুই করা হবে না আর। বার্লিনে বাংলাদেশিরাও তাই সময় পাওয়া মাত্রই উপভোগের উপলক্ষ্য খুঁজে নিতে তৎপর। 

বার্লিনের ক্রিকেট ক্লাবের সদস্য রাজু আহমেদের আজ একই সাথে জন্মদিন ও বিবাহবার্ষিকী। একারণে সে সবাইকে নিয়ে একটা বিরাট গ্রিল পার্টির গণদাওয়াত দেয়। ভেন্যু সেই ঐতিহাসিক সুবিশাল টেম্পেলহফ ময়দান। প্রথম সমস্যা হল করোনার কারণে আউটডোর গ্রিল করা বারণ। একারণে ওদেরকে সব বাসা থেকেই রান্না করে আনতে হোল। বাংলাদেশে গরিমা দেখানোর একটি উপায় হল গণদাওয়াত। আগে দেখতাম আমাদের বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান হলে মাইকে দাওয়াত দিত। জার্মানিতে এসে এই বয়সে বুঝলাম সেটি কত উদ্ভট একটি পদ্ধতি। এখানে সব হিসাবের কাজ। আগে থেকে কতজন আসবে, কোন টাইমে পার্টি, ভেন্যু ইত্যাদি আগে থেকেই সুনির্দিষ্ট। তামাম দুনিয়ার সব কিছু বাঙ্গালিকে দিয়ে সম্ভব, কিন্তু সময়মত কোন কিছু শুরু করা বাঙ্গালির অভিধানে নেই। কিন্তু আমাদের অবাক করে দিয়ে আজ মোটামুটি ঠিক সময়েই শুরু হোল। গণদাওয়াতের একটি সমস্যা হল কতজন মানুষ আর কতখানি খাবার তা আগেই না জানলে আয়োজকের জন্য বিরাট প্যারা। সৌভাগ্যের দেবতা আজ বুঝি আয়োজকদের পক্ষেই ছিল। প্রায় চল্লিশজনের জন্য খাবার-দাবাড় সব যেন হিসাব করে খুবই সুন্দর-সুশৃঙ্খলভাবে হয়ে গেল।  

সকলে মিলে একটি ছবিতে হাস্যোজ্বল সবাই
সকলে মিলে একটি ছবিতে হাস্যোজ্বল সবাই

খাওয়া দাওয়ার পর বিদেশ বিভূঁইয়ে বাঙ্গালির কাজ থাকে দুটি, রাজনীতি আর ধর্ম নিয়ে আলোচনা করতে করতে ঝগড়া বাধিয়ে ফেলা অথবা গানবাজনা করা। আমরা অনেক বুদ্ধিমান প্রাণি হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে পেরেছি। আমরা গানবাজনা শুরু করেছি। যদিও কেউ কেউ গেল ক্রিকেট খেলতে। আমাদের সাথে তিনজন অতি সাংঘাতিক প্রথিতযশা শিল্পী ছিলেন গিটার নিয়ে। আমরা গলা মেলাবার চেষ্টা করলাম। সন্ধ্যা নেমে এল। ব্যক্তিগতভাবে আমি গলা মেলাতে গিয়ে দেখি গরু যায় একদিকে আরেকদিকে যায় লাঙ্গল। সবাই যে লিরিকে গায়, আমার লিরিক সম্পূর্ণ অন্যরকম। অপরদিকে আমার সুর যখন আমার নিজের কানে আসে, তখন নিজের গলা নিজেই চিনতে পারি না। আমার এই অধঃপতনের কারণ আছে। কৈশরকালে আমার আর আমার বড় ভাইয়ের জন্য ওয়ারড্রোবে দুইটা ড্রয়ার বরাদ্ধ ছিল ‘ব্যক্তিগত’ জিনিস রাখার জন্য। আমার ভাইয়ের ড্রয়ার ভরা আইয়ুব বাচ্চু, জেমস আর হাসানের ক্যাসেট। ওদিকে আমার ড্রয়ারে ছিল মার্বেল, ম্যাচ বক্সের তাস আর লোহার চেইন গাড়ী। গলার সর্বনাশ আমার সেকাল থেকেই। 

নব্বই দশকে বেড়ে উঠা এখনকার যুবকদের একটা সমস্যা হল, তারা সেই আইয়ুব বাচ্চু আর জেমস থেকে বের হতেই পারে। সজ্ঞীতানুষ্ঠান শুরুও হয় তাঁদের গান দিয়ে। ঘুরে ঘুরে ওই, সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে, কবিতা তুমি স্বপনচারিণী হয়ে খবর নিও না ইত্যাদি। আমার মতে এর একটি কারণ হল এসব গান শুনে শুনেই আমরা বড় হয়েছি, আড্ডা দিয়েছি বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের সাথে, প্রেম করেছি, আবার বেদনায় কাতর হয়েছি। আমাদের কাছে তাই ওসব গান সমস্যা নয়, ওসব আসলে ভালবাসা। চারিদিকে অপার ভালবাসা ছড়িয়ে দিয়ে আমরা মনোরম মুগ্ধতায় ভরা এক সন্ধ্যে কাটালাম পরিচিত-অপরিচিত বহু মুখ একসাথে নিয়ে।      

২৩ ভাদ্র ১৪২৭
ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন, বার্লিন থেকে 
সম্পাদক, জার্মান প্রবাসে

আরো পড়ুন
বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ১- কোরিয়ান খাবার-উৎসব

বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ২- মধুরেণ সমাপয়েৎ

বার্লিনের নীলাকাশে ঝকঝকে রোদ ৩- বার্লিন-ড্রেসডেন যুদ্ধ