১.

টাকা-পয়সা বেশি নেই হাতে। সস্তায় কি বিনে পয়সায় রিফিউজিদের জার্মান শেখায়, এমন একটা ইশকুলে ভর্তি হয়েছি। এতগুলো পাশ দেবার পর আবার ছাত্র সাজতে মন চায় না। কিন্তু উপায় নেই। জার্মান জানা না থাকলে এদেশে ডিগ্রি-ফিগ্রির বাজারি দাম খুব কম। যম্মিন দেশে যদাচার পালন করতে ভাষাটা তাই এবেলা শিখতেই হচ্ছে। তাছাড়া, বদমেজাজী কেরানীর অকারণ চোখ রাঙ্গানির সামনে এক তাড়া ফর্ম পূরন করে কাঠখড় কম পোড়াই নি। এখন পিছিয়ে গেলে পুরোটাই পন্ডশ্রম। অগত্যা, দু’হাত পকেটে পুরে ধীর পায়ে এগোলাম দমবন্ধ ক্লাসরুম বরাবর।

পাশের জনের সাথে পেন-ফাইট খেলতে থাকা পাংকু চেহারার ছেলেটার পাশের জায়গাটাই শুধু খালি। ছোকরার টি-শার্টের হাতা পাড়ার মাস্তানের কায়দায় গোটানো। আর কালো লেদার জ্যাকেট জুড়ে চোখা চোখা ধাতব বোতামের ছড়াছড়ি। পাশে বসে এক গুঁতো না খেলেই হয়।

‘কি সিস্টার, খবর ভাল?’। পাংকু বয় চান্স নেবার ভঙ্গিতে চোখ টিপি দিলো। পিত্তি জ্বলে গেল একেবারে। জবাবের ধার না ধেরে সে পটাং এক শক্তিশালী টোকায় বলপেনটা ছুড়ে দিল প্রতিপক্ষের দিকে। কি কপাল! কলম গিয়ে ল্যান্ড করল এই মাত্র ক্লাসে আসা ভদ্রমহিলার চার ইঞ্চি হিলের জুতার কাছে। পেন্সিল স্কার্ট পড়া বছর চল্লিশের ভীষন স্টাইলিস্ট ভদ্রমহিলা খপ্ করে সেটাকে তুলে নিখুঁত নিশানায় ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে পাঠিয়ে দিল। তারপর মিষ্টি হেসে টেবিলে ডাস্টার ঠুকে জানালো, ‘গুটেন মর্গেন, গুড মর্নিং। আমি এরিকা।  এই কোর্সটা আমিই নেবো’।

সরু চোখে তাকালাম। ‘ছাগল পিটিয়ে মানুষ’ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। সেই তো আবার পড়াশোনা। কেন যে ইংরেজি বলা কোনো দেশে না গিয়ে এই জার্মান মুলুকে পড়তে এসেছিলাম। এখন ল্যাও ঠ্যালা। খাও চক-ডাস্টারের বাড়ি।

সাবলীল হাসিটা ধরে রেখে এরিকা বলে চললো, ‘পড়তে বা পড়াতে কোনোটাই আমার ভাল লাগে না। আর জার্মান ভাষাটাও কঠিন। তার চেয়ে আসো গান-টান শুনি। বাই দ্যা ওয়ে, নিজেদের ভেতর ‘তুমি’ করে বললে সমস্যা নেই তো?’।

মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ক্লাসের সবাই নড়েচড়ে বসলাম। এরিকার ছেলেমানুষি কথাবার্তা মজা লাগতে শুরু করেছে। খুঁজেপেতে সে কোত্থেকে কতগুলো সিডি এনে তারই একটা পুরান-ধুরান দেখতে স্টেরিওটাতে চাপিয়ে দিল। গান নয়, বেহালা আর পিয়ানোতে ঝংকার তুলে চমৎকার ক্লাসিকাল সুর ভেসে আসছে। বিখ্যাত কারো কম্পোজিশন।

‘কেউ কি বলতে পারবে কার মিউজিক?’।  

এক বিটোফেন আর দুই মোজার্ট ছাড়া তৃতীয় কারো নাম জানি না। তাই বলে ঝড়ে বক মারার সুযোগ ছাড়ি কি করে। হাত উঁচিয়ে সগর্বে বিটোফেন চালিয়ে দেবো ভাবছি। আচমকাই পাশ থেকে পাংকু ছোঁড়া চুইংগাম চিবোতে চিবোতে চেঁচিয়ে উঠলো, ‘বাখ, বাখ!’।

ক্লাসের সবাই একযোগে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালাম। নির্ভুল শটে বক মেরে ছেলেটা একান-ওকান হাসছে। যদিও তার ‘হেভি মেটাল’ লেদার জ্যাকেটের সাথে ‘লাইট ওয়েট’ বাখ-বিটোফেন একেবারেই যায় না। এরিকা সুযোগটা কাজে লাগালো, ‘বিখ্যাত জার্মান কম্পোজার বাখের সুর ধরতে পারা লোক যেন তেন কেউ নয়। ইয়ং ম্যান, আমরা কি তোমার সম্পর্কে জানতে পারি? দু-চার লাইন বললেই চলবে’।

‘চুইংগাম গালেই নিয়েই বলবো, নাকি ফেলে দেবো?’। প্রশ্নের ধরন শুনে এরিকা দমে না গিয়ে হেসে ফেললো। এরকম লাফাঙ্গা ছেলে সে গন্ডাখানেক দেখেছে। তাই সহজ সমাধান বাতলে দিল, ‘গালে রেখেই বলো না‘।

ক্লাসের সবার অজান্তে শুরু হয়ে গেল পরিচয় পর্ব।  

২.

জামাল ছেলেটা ছয়মাস আগে সিরিয়া থেকে রিফিউজি হিসেবে এসেছে। আপাতত ম্যাকফিট নামের একটা ফিটনেস স্টুডিওতে কাজ নিয়েছে। আকার ইঙ্গিতে আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা জার্মানে কাজ চালিয়ে আসছিল। তবে অল্পে কাজ হবার দিন শেষ। ম্যানেজার হুমকি দিয়েছে, তিন মাসের ভেতর কাস্টমারের সাথে চোস্ত জার্মানে কথাবার্তা চালাতে হবে। নইলে রাস্তা মাপো। রাস্তা মাপামাপি এড়াতে জামাল এই কোর্সে ঢুকেছে। ‘চাকরিটা চলে গেলে বিপদে পড়বো। দেশে সামান্য ক’টা টাকা পাঠানো শুরু করেছি। তাও বন্ধ হয়ে যাবে’, চিন্তিত গলায় শেষ করল জামাল।

শুনে টুনে সামান্য চুপ এরিকা থেকে বললো, ‘হের জামাল, তুমি জায়গামত এসে পড়েছো। আর চিন্তা নেই। তিন মাসের ভেতর তুমি এমন মারদাঙ্গা জার্মান বলতে শুরু করবে যে ম্যানেজার ব্যাটা ভড়কে যেতে বাধ্য। কথাটা কাগজে লিখে রাখো। সই করে দিচ্ছি’।

এরিকার ডাকাবুকো ভঙ্গি ভাল লেগে গেল। চুইংগাম চিবানো পাংকু জামালকেও অত খারাপ লাগছে না। দেশে টাকা পাঠানো লোক খুব খারাপ হতে পারে না।

পরিচয় পর্বের কম্পাস ঘুরে জামালের পেন-ফাইট বন্ধুর কাছে থামলো। বয়স বোধহয় জামালের মতই পঁচিশ কি ছাব্বিশ। নাম মোস্তফা। তবে ‘মো’ বলে ডাকলেও নাকি চলবে জানালো। নাম ছেটে ফুল হাতা থেকে হাফ হাতার করার কেতা সে কই শিখেছে কে জানে। ছেলেটা ইরাক থেকে এসেছে। কুর্দিস্তানে তাদের বাড়িতে উড়ে আসা বোমায় যখন অর্ধেকটা দেয়াল ছাড়া আর কিছুই দাঁড়িয়ে থাকলো না, তখন সে সব ছেড়ে জার্মানি চলে এল। কিন্তু কিভাবে এল, একা না সপরিবারে-তার কিছুই জানা গেল না। এরিকাও আগ্রহ দেখালো না খুঁচিয়ে জানার।

তবে মো-এর পাশের মেয়েটাকে নিয়ে সবার ভেতর চাপা আগ্রহ কাজ করছে। রীতিমত চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছি সবাই। পোর্সেলিনের মত মসৃণ ত্বক আর এক পিঠ ঝলমলে সোনালি চুল নিয়ে মেয়েটা ঘর আলো করে বসে আছে। এতগুলো জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে সে সামান্য ইতস্তত করে জানালো, তার নাম মিনার্ভা। মনে মনে বললাম, ‘মেয়ে, তোমার নাম আফ্রোদিতি হলেও মানিয়ে যেত’। তা জানা গেলো, সে জাতে বলকান। বাড়ি বসনিয়া-হার্জোগোভিনায়। সেই পঁচানব্বইয়ে বসনিয়ার যুদ্ধ শেষ হলেও তার রেশ রয়ে গেছে। চাকরি-বাকরির কোনো ভবিষ্যৎ নেই দেখে সে দেশ ছেড়ে এসেছে জার্মানির ঠিকানায়।

নানা দেশে থেকে আসা উদ্বাস্তু মানুষের কথা শুনতে শুনতে মন অস্থির মন লাগছে কিছুটা। খবরের কাগজের পাতায় ‘রিফিউজি’ শব্দটায় যত সহজে চোখ বুলিয়ে গেছি, এখন দেখছি এর বাস্তবতা বেজায় কঠিন।

যুদ্ধ-বিগ্রহই আমার ক্লাসমেটদের একমাত্র সমস্যা না। মোটাসোটা সুখী চেহারার পঁয়তাল্লিশ বছরের আমিনার সমস্যা অন্য লেভেলের জটিল। ভাঙ্গাভাঙ্গা জার্মানে সে জানালো তার পাঁচ সন্তান। স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি, সব খানেই এক-আধটা ছেলেমেয়ে পড়ছে। অছর বিশেক আগে তুর্কি থেকে আসা অবধি এ পর্যন্ত ভালই চলছিল সব। মাস খানেক আগে ছেলেপিলের বাবা দুম্ করে আরেক ঘরে বিয়ে করে তাদের নমস্কার বলে দিয়েছে। এখন সে ঝপাং জলে পড়ে গেছে। এখন ভাষাটা ভাল মত রপ্ত করে যদি কোনো কিন্ডারগার্টেনে ছোটখাট চাকরি জোটানো যায়, তাহলে কিছুটা হলেও সাঁতরে তীরে ওঠা যাবে।

বেলারুশের মেয়ে সারার কাহিনীও কাছাকাছি। এতদিন জার্মান শেখার অবসর মেলে নি। ঘরকন্না করে কেটে গেছে দিন। ক’দিন আগে বেধড়ক মারধোর খেয়ে চোখে কালশিটে নিয়ে শিশু সন্তানকে হাতে নিয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে সে। এখন নিজের পায়ে না দাঁড়িয়ে আর উপায় নেই। টেবিলে খাতা-কলম সাজাতে সাজাতে অন্যমনস্ক ভাবে কথাগুলো বললো সারা।

পর্তুগাল থেকে ভাগ্যের খোঁজে আসা বেকার পেদ্রো আর শহরের শেষ প্রান্তে রিফিউজি ক্যাম্পের টিনের কনটেইনারে গাদাগাদি করে থাকা আফগান মেয়ে লিলির গল্প দিয়ে শেষ হল বিচিত্র এক পরিচয় পর্ব।

মন দিয়ে সবার কথে শুনছিলাম। সত্যি বলতে কি, এক সাথে এতগুলো ভাঙ্গাচোরা মানুষকে আগে কখনো দেখে নি। ক্লাসরুমের পিনপতন নীরবতা বড্ড কানে বাজতে লাগলো।

৩.

সপ্তাহখানেক গড়িয়েছে। যে ভাষা শিক্ষার দীক্ষা নিতে এখানে আসা, তার প্রতি কারো খুব একটা আগ্রহ নেই। জামালকে ক্লাসের আগে করিডোরে “ধূমপান নিষেধ” সাইনের নিচে বিড়ি ফুঁকতে দেখা যায়। এরিকার হিল জুতার ঠকঠক্ শুনলে সে তাড়াহুড়োয় সিগারেট লুকিয়ে কুল পায় না। যেকোনো দিন কার্পেটে মোড়ানো মেঝেতে আগুন ধরিয়ে এই পাঁচতলা দালানটা পুড়িয়ে ফেলা এখন সময়ের ব্যাপার ।

মোস্তফা ওরফে ‘মো’ বইপত্রের ধার না ধেরে মিনার্ভা নামের আফ্রোদিতির চারপাশে ঘুরে ঘুরে তাকে অতীষ্ঠ করে তুলছে। সেদিন যেচে পড়ে বলতে গেলাম, ‘দেখো, মেয়েটা গিয়ে এরিকার কাছে নালিশ ঠুকে দিলে তোমার বিনে পয়সার জার্মান শেখা শিকেয় উঠবে কিন্তু’। জবাবে উল্টো সে আমাকে জ্যোতির্বিদ্যা শিখিয়ে দিল, ‘মিনার্ভা একটা গ্রহ আর আমি উপগ্রহ। মহাকর্ষীয় বল এড়াই কি করে?’। ফিঁচেল হেসে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সরে যায় মো।

আমিনা আর সারাহ লাঞ্চ ব্রেকের সময়টা কাজে লাগায় নারী কল্যাণ সংস্থাগুলো অফিসে ফোন লাগিয়ে। আর কোথাও থেকে যদি কোনো সাহায্য মেলে। তাদের চাপা উৎকণ্ঠা দেখলে মায়া লাগে। তার ভেতরেও আমিনা এটা ওটা বানিয়ে নিয়ে আসে সবার জন্যে। আজকেও এনেছে। তুর্কি মশলা দেয়া ‘খুসখুস সালাদ’। বড় এক চামচ গালে নিয়ে উসখুশ বসে আছি। গলা দিয়ে নামছে না। ভালো মানুষ আমিনার কালো মানুষ জামাইটাকে এক হাত দেখে নিতে পারলে তবেই না আরাম করে সালাদ খাওয়া যেত।

হোমওয়ার্কের পাতাগুলো সাদাই রয়ে যায়। লাঞ্চের সময়টা কাজে লাগালে ঠিকই শেষ করে ফেলা যায়। সেদিকে থোরাই কেয়ার করে রাস্তার ওপাশে এশিয়ান রেস্তোরাঁ ‘ঠ্যাঙ লং’-এ চলে যাই লম্বা লম্বা পা ফেলে। ধোঁয়া ওঠা থাই রেড কারি নামিয়ে ফিরে এসে আধো ঘুমে কাটিয়ে দেই বাকিটা ক্লাস।

জার্মান খুব কঠিন ভাষা। এরিকা তো প্রথম দিনেই বলে দিয়েছে। সুতরাং, ‘সেহেনস্উর্দিকাইট’ মানে ‘দর্শনীয় স্থান’ আর ‘বুন্দেস্টাগস্ওয়াহল্’ হল গিয়ে ‘জাতীয় নির্বাচন’ – ভাষা বিদ্যা এটুকুতেই আটকে রইল।

৪.

অথচ জার্মান ‘বে আইন্স’ বা ‘বি ওয়ান’ লেভেল পাশ দেয়াটা হাতের মোয়া না। এই সার্টিফিকেট ছাড়া কাজেকর্মে ডাক পাওয়া মুশকিল। মোদ্দা কথা, বাকি জীবন ‘কর্ম খালি নাই’ শুনে যাবার বিরাট আশংকা।

দেখেশুনে এরিকার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গতে বেশিদিন আর লাগলো না। একদিন ব্যাকরণ বইটা দড়াম্ বন্ধ করে গলা খাঁকরি দিল সে, ‘হোমওয়ার্ক আর করতে হবে না আজকে থেকে’। এমন ঘোষনায় চিন্তিত হবার বদলে একান ওকান খুশিতে ছেয়ে গেলাম সবাই। 

খুশি মিলিয়ে যেতেও বেশি সময় লাগলো না। হোমওয়ার্ক এখন ক্লাসওয়ার্ক হয়ে গেছে। জমা না দিয়ে বাড়ি যাওয়া যায় না। আর কলম চালানোর পাশাপাশি চোয়ালটাও চালাতে হচ্ছে সমানে। এরিকা এক একটা কাগজের গোলা ছুড়ে দেয় একেকজনের দিকে। কাগজে লেখা বিষয়ে প্রত্যেককে পাঁচ মিনিট অং বং বলে যেতে হয় জার্মানে।

আজকের খেলা সামান্য ভিন্ন। একটা থিম দিয়ে দিয়েছে এরিকা। চোখ নাচিয়ে সে বললো, ‘ধরো, আজকে বিকালে বন্ধুর জন্মদিনে দাওয়াত আছে। সেখানে যেমন খুশি তেমন সাজতে হবে। তো কে কি পড়ে যাবে, দু’কথায় গুছিয়ে বলো তো’।

এই কয় দিনে কম বেশি সবার মুখ খুলে গেছে অল্পবিস্তর। সংকোচও বিদায় নিয়েছে কিছুটা। অদ্ভূত ব্যাকরণ আর কিম্ভূত উচ্চারনে গড়গড়িয়ে বলে গেল মিনার্ভা, সে কারুকাজ করা লাল-সাদা ঘেরওয়ালা ঐতিহ্যবাহী বলকান গাউন পরে সবাইকে ভড়কে দেবে। গলায় আর হাতে থাকবে রূপার ভারী গয়না। মিনার্ভাকে সে পোশাকে কল্পনা করে কয়েক মুহূর্তের জন্যে কারো মুখে যেন কথা সরলো না।

এবার কাগজের গোলা ছোড়া হল মো-কে তাক করে। গোলাটা ক্রিকেটের ক্যাচে চটজলদি লুফে নিলেও হাতড়ে হাতড়ে শব্দ খুঁজে জোড়া দিয়ে বাক্য গড়তে বেশ বেগ পেতে হল তাকে।   বার কয়েক ঢোক গিলে বহুকষ্টে বলে গেল, সে উন্টারহোজে আর ক্রাভাটে পরে বন্ধুর পার্টিতে যাবে।

আর সাথে সাথে ক্লাসের সবাই হো হো হাসিতে ফেটে পড়লাম টেবিল চাপড়ে। উন্টারহোজে-ক্রাভাটের ‘বঙ্গানুবাদ’ যথাক্রমে আন্ডারওয়্যার আর নেক-টাই। ভোকাব্যুলারিতে দুর্বল মো ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে থাকলো। শব্দার্থটা বোঝাতে এরিকা বোর্ডে গিয়ে রাজার নতুন পোশাকের একটা ক্যারিকেচার আঁকল একটানে। ভুল ধরতে পেরে মো বেচারা লজ্জায় দেয়ালে মিলিয়ে যেতে চাইলো। বিনোদনের কমতি নেই আমাদের এই হ-য-ব-র-ল জার্মান ইশকুলে।

৫.

আনন্দ-বেদনা হাত যে ধরাধরি করে চলে, তার প্রমান মিললো দিনয়েক পরেই। পেঁজা তুলোর মত তুষার পড়ছিল সেদিন।

লাঞ্চের বিরতি চলছে। বেজার মুখে জামাল বসে আছে গাছের ছায়ায়। তার পাশে পেদ্রো, মো আর আরো জনাদুয়েক। কফি হাতে ফিরছিলাম। জবর শীতে জবুথবু দশা। গরম কফি ঠান্ডা মেরে শরবত হতে এক মিনিটও নেয় না। তাও কি ভেবে এগিয়ে গেলাম ঘোট পাকিয়ে বসে থাকা দলটার দিকে।  

পেদ্রোর মুখে ঘটনা শুনে দমে গেলাম। জামালের ফিটনেস স্টুডিওর চাকরিটা আর নেই।  ম্যানেজার জবাব দিয়ে দিয়েছে। তিন মাস অপেক্ষার ধার ধারে নি সে। খামোখা ভাঙ্গা জার্মান জানা সিরিয়ার এক রিফিউজি যুবককে কাজে রেখে কাস্টমার খোয়ানোর মানে নেই। নতুন বিজ্ঞাপন দিলে নাইট শিফটে কাজ করার লোক জুটে যাবে অগুনতি। ভাত ছড়ালে কাকের অভাব হয় না।

দিন শেষে জামাল, পেদ্রো, মো-আমরা সবাই যে এক ঝাঁক কাক এদেশে আর চাকরির বিজ্ঞাপন যে এক থালা সাদা ভাত-এই তেতো সত্য জেনে মনটা বিস্বাদে ভরে গেল।

সেদিন জামালকে হাজার জোর করেও আর ক্লাসে নেয়া গেল না। সে কানে বাখ-মোজার্ট গুঁজে গুঁড়িগুঁড়ি তুষারের ভেতর ঠায় বসে থাকলো।

৬.

দেখতে দেখতে বি-ওয়ান পরীক্ষার দিনক্ষন ঘনিয়ে আসছে দশ নম্বর বিপদ সংকেত হয়ে। আসল পরীক্ষার আদলে নকল ‘মক্-টেস্ট’ নেয়া শুরু করলো এরিকা। শোনা, বলা আর লেখা, এই তিন কাজে পাঁচ ইন্দ্রিয় বিক্রি করে দিলাম আমরা।

সবচেয়ে নড়বড়ে ছাত্র মো। সেও কোমর বেঁধে লাগলো। আর জামালের উন্নতি চোখে পড়ার মত। খসখস কলম চালিয়ে নির্ভুল জার্মানে দরকারী চিঠি লেখায় সে রীতিমত ওস্তাদ বনে গেল। যেমন, সে এক সপ্তাহের জন্যে বার্লিন যাচ্ছে অফিসের কাজে। এ কয়দিন যেন প্রতিবেশী হের্ রিখটার দয়া করে বাগানের গোলাপ গাছে পানি দিয়ে যায়। আর পোস্ট বাক্সে কাগজপত্র আসলে সেগুলো নিজের কাছে রেখে দেয়। বাক্সের চাবি পাপোশের নিচে রাখা আছে…ইত্যাদি। এরিকা সেই চিঠিগুলো আমাদের পড়ে শোনায় আর দরাজ হেসে বলে,  ‘জামাল, তু তো কামাল কার্ দিয়া!’।

আমিনা আর সারাহও সরকারী অফিসের নম্বর টেপা বাদ দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মন দিল। ভালমন্দ মিলিয়ে তাদের এগোনোটাও একেবারে খারাপ হল না। এলেবেলে ক্লাসটা আস্তে আস্তে পাল্টে গেল মনোযোগী ছাত্রছাত্রীর দঙ্গলে। বাজি ধরে এ যাত্রায় পাশ না করলে যাদের ভবিষ্যৎ কেঁচে গিয়ে ভূত হয়ে যাবে।

তারপর চলে এল মাহেন্দ্রক্ষন। এক মুঠো বলপেন বগলে চেপে ঢুকলাম পরীক্ষার হলে। সময় যে ডানা ঝাঁপটে কই উড়ে গেল, সে হুঁশ আর রইলো না কারো।

বেঢপ হেডফোনটা কানে বসাতেই শুরু হয়ে গেল  এ-নাইন্টিন হাইওয়েতে বাস উল্টে দুর্ঘটনা ঘটেছে। সেখানে কতগুলো গাড়ি দুমড়েছে। কয় গাড়ি পুলিশ আর অ্যাম্বুলেন্স এসেছে আর ক’জনের ঠ্যাং ভেঙ্গেছে তার বিস্তারিত রেডিও নিউজ শুনে জবাব লিখতে হল শূন্যস্থান পূরণের ফাঁকা জায়গায়।

এরপর লিখিত পরীক্ষার পালা। একটা চাকরির দরখাস্ত করে আর দ্বিতীয়টা বাড়ি ভাড়া চেয়ে চিঠি লিখতে গিয়ে কলম ভেঙ্গে যাবার দশা।

শেষ পর্ব হিসেবে গোটা তিনেক ছবি ছড়িয়ে দেয়া হল টেবিলের উপরে। মিনিটখানেক করে কথা বলতে হবে প্রতিটা ছবি ঘিরে। শপিং ব্যাগ কাঁধে তরুনীর ছবি দেখিয়ে নারী শিক্ষার সাথে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা মিলিয়ে ভুংচুং বলে চললাম পাঁচ মিনিট। তারপর জুঁটি বেঁধে দু’জন দু’জন করে বসিয়ে দেয়া হল। জার্মান খাবার দাবারের ভেতর কোনটা কার ভাল লাগে, তা-ই নিয়ে  কথা চালাতে হবে। এই কথোপকথনেও নম্বর আছে। কি ভাগ্য, জুঁটি হিসেবে জুটলো কিনা মো। আলাপের ভেতর উন্টারহোজে নিয়ে না এলেই হয়। কিন্তু না, অবাক করে দিয়ে সাবলীল আলাপ চালিয়ে গেল সে।

সবগুলো পাট চুকে গেলে একটা মাত্র কলম বাদে বাকিগুলো হারিয়ে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন দেখি বাকিরা প্যাঁচামুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে। পাশ-ফেলের দোলাচল থেকে বেরোতে পারছে না কেউ। আমি নিজেও চেহারা করে রেখেছি আমচু বাংলার পাঁচ।

৭.

সপ্তাহখানেক পরের চিত্র। ক্লাস রুমে আবার সবাই। তবে এবার হাতে সার্টিফিকেট। সেখানে সোনালি-সবুজ কালিতে জ্বলজ্বল করছে, ‘বে-আইন্স’। জ্বলজ্বল করছে ক্লাসের পরিচিতি সব মুখগুলোও। একজনও ফেল করি নি আমরা। এরিকা পরম মমতায় একেক জনকে চেপে ধরে দম বন্ধ করে দিচ্ছে। এই ভালবাসার অত্যাচার সবাই উষ্ণ আলিঙ্গনে ফিরিয়ে দিলাম তাকে।

ছোটখাট পার্টির আয়োজন হয়েছে। স্টেরিওতে সিরিয়ান পপ ছেড়ে দিয়েছে জামাল। তাতে পা মিলিয়ে বলকান সুন্দরী মিনার্ভা নাচছে মৃদু তালে। গালে হাত দিয়ে হাঁ করে সেদিকেই তাকিয়ে মো। ওদিকে, পেদ্রো, সারাহ আর আমিনা মিলে এমাথা ওমাথা টেবিল সাজিয়ে ফেলেছে। হরেক দেশী খাবারের ঘ্রানে জার্মান ইশকুলের করিডোর অবধি ভুরভুর করে উঠছে।

সবার অলক্ষ্যে সার্টিফিকেটটাও একবার নাকে টেনে নিলাম। কাগজের মচমচে ঘ্রান। আহ্, বে-আইন্স! (সমাপ্ত)     

-ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার
পোস্ট-ডক্টরাল গবেষকঃ ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন,
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি