নয়হেরবার্গ ক্যাম্পাস, হেল্মহোল্টজ রিসার্চ সেন্টার, মিউনিখ

১.
আঙ্গুল গুনে বলতে গেলে বেশ ক’বছর আগের কথা।

ডানে-বামে বসা মেয়ে দু’টো ফ্যাঁচফোঁচ করে কাঁদছে। ইনুনি বিনুনি দিয়ে মরা কান্না জুড়ে দেয়ার কি হল, বুঝলাম না। পরীক্ষা তো আমারও খারাপ হয়েছে। বিরক্তিটা চেপে খাতা-কলম গুছিয়ে বেরিয়ে এলাম গ্রোসহাডের্ন হাসপাতালের লেকচার হল থেকে। মেয়েগুলোও বেরিয়েছে। রুমালে নাক মোছার ফোঁওওৎ শব্দে করিডোরের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। জোরসে পা চালিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি।

টোস্টার বিল্ডিং ছেড়ে স্টেশনের কাছের বেঞ্চিটায় এসে বসেছি। মিউনিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রোসহাডের্ন হাসপাতালটা এখান থেকে আসলেই পাউরুটির টোস্টারের মত দেখায়। যেন এই বুঝি প্রিং করে মচমচে পাউরুটি লাফিয়ে উঠবে। কার মাথায় যে এমন বলিহারি নকশার বুদ্ধি এসেছিল। এখানে রোগী আসবে আর এপিঠ ওপিঠ ভাজা ভাজা হতে থাকবে। হাসপাতালটাকে লোকে চেনেও টোস্টার বিল্ডিং নামে। বানিয়ে বলছি না এক রত্তি।

রোগী না হয়েও এই মুহূর্তে কান থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ফেল মানে নির্ঘাৎ ফেল। প্রায় সাদা খাতা জমা দিয়ে এসেছি। পিএইচডি করতে এসে যে ছ’মাস অন্তর অন্তর পরীক্ষায় বসতে হবে, এমনটা জানা থাকলে এত হুজ্জত করে এই জার্মান দেশে আসতামই না। তাও আবার ওপেন বুক কায়দায় পরীক্ষা। নামকরা মেডিসিন জার্নালে ছাপা হওয়া একটা সাইন্টেফিক পেপার সবার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন সব সেখান থেকেই করা। তারপরও লাড্ডু মেরে এলাম।

“এই পেপারে যে এক্সপেরিমেন্ট করা হয়েছে, সে ব্যাপারে তোমার মতামত কি? পরীক্ষাগুলো আর কি ভাবে করলে আরো ভাল হত বলে মনে করো? কি কি ফাঁক রয়ে গেছে সংক্ষেপে বলো তো…” ইত্যাদি। সারা জীবন বইয়ের পাতা চিবিয়ে মানুষ হয়েছি। পেটভর্তি পুঁথিগত বিদ্যা। নিজস্ব মতামতটা যে কি বস্তু, সেটা কি তিন কোনা নাকি চারকোনা, লাল না নীল-এর কিছুই ঠাহর করতে না পেরে আবোল তাবোল আর হযবরল কি সব লিখে দিয়ে এসেছি।

তিরিক্ষে মেজাজে মুখ ভচকে আছি। এর ভেতর মেয়েগুলো আবার এসে জুটেছে। আনা আর আন্দ্রেয়া। কেঁদেকেটে চোখ ফুলিয়ে বোলতার কামড়া খাওয়া চেহারা হয়েছে তাদের। “আমাদেরকে এত স্ট্রেস দেয়ার জন্যে পুরো গ্র্যাডুয়েশন স্কুলকে স্যু করা উচিত না, বলো?”। জবাব না দিয়ে কি করে পাশ কাটানো যায়, ভাবছি। বহু কষ্টে এই অবধি আসা। শ’খানেক প্রফেসর আর ডজন ডজন রিসার্চ স্কুল বরারবর দরখাস্তের পর বহু আরাধ্য স্কলারশীপ একখানা জোটানো গেছে। এখন স্যু ট্যু করে পিএইচডি করার সুযোগটা এক্কেবারে ঘেঁটে দিয়ে খালি হাতে দেশে ফিরলে আর মুখ দেখানো যাবে না। ছি ছিৎকার পড়ে যাবে।

“আমি আর এখানে পড়বোই না, ছেড়েছুড়ে বাড়ি চলে যাব একদম”। আনা’র কথাটা শুনে দুঃখের ভেতরেও হাসি পেলো। বললাম, “তোমার বাড়ি তো জার্মানিতেই, তুমি আর যাবে কই? যাবার তো কথা আমার। ওয়ান-ওয়ে টিকেট কেটে ভোঁ বাংলাদেশ।“

আনা ক্ষান্ত না দিয়ে বলেই চললো, “গবেষণা টবেষনা আমাকে দিয়ে হবে না। গ্রামে ফিরে গিয়ে বাবা-মার সাথে ভেড়ার খামারি করবো। ব্ল্যাক ফরেস্টের এক অজ গাঁয়ে খামারবাড়ি আছে। প্রচুর ভেড়া আমাদের।“ চুপ করে গাঁজাখুরি কথাবার্তা শুনে যাচ্ছি। দেশে গিয়ে কবুতর কিংবা ব্রয়লার মুরগীর ফার্ম দেয়ার বুদ্ধিটা হালকা ঝিলিক মেরে গেল। তবে তার আগে তো রিকশাওয়ালার সাথে বিয়েটা ঠেকাতে হবে।

আমাদের অতি শোকের বিশেষ কারণ আছে। গুজব শোনা যাচ্ছে, এটা প্রকারান্তরে একটা স্ক্রিনিং টেস্ট। এই পরীক্ষায় যারা ডাব্বা মারবে তাদের মানে মানে বিদায় করে দেয়া হবে। মুশকিলে পড়লাম। স্কলারশীপ তো দেখছি স্বাধীনতার মত নাজুক। স্বাধীনতা নাকি অর্জনের চাইতে রক্ষা করা কঠিন। বৃত্তি একটা কোনোমতে বাগিয়ে হাজার মাইল ঠেঙ্গিয়ে পড়তে আসার পর এখন যদি এরা পরীক্ষা নামক মিহি ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে ফেলে দিতে চায়, তাহলে গলায় মাদুলি ঝুলিয়ে সন্ন্যাসী বনে যাওয়া ছাড়া আর উপায় নেই।

কিন্তু যা হবার, তা হয়ে গেছে বোধহয়। নিরুপায় যে যার মত বেঁকেচুরে কেৎরে বসে আছি। কারো কাঁধ ঝুলে গেছে, কারো বা মাথায় হাত মাতমের ভঙ্গিতে। পলকবিহীন শূন্য দৃষ্টিতে মাছের মত কোন দিকে যেন তাকিয়ে আছি। সময় জ্ঞান আর নেই। দূরের গির্জায় ঘন্টা বাজলো ঢং ঢং। এমন সময়ে আচমকাই ভুঁই ফুঁড়ে এক চিড়িয়ার উদয়। আপাদমস্তক কালো আলখাল্লা আর গলায় ঝোলানো বিশাল ক্রুশটা দেখে পরিচয় বুঝতে অসুবিধা হল না। সন্ন্যাসের নাম নেয়া মাত্র সন্ন্যাস হাজির।

আন্দ্রেয়ার ফর্সা হাতে গাছের শিকড়ের মত আঁকাবাঁকা নীলচে সবুজ রগগুলো তাক করে থিয়েটারী কায়দায় সংলাপ ছুড়লো সন্ন্যাস বাবা। “এই যে হতাশা, এই যে গ্লানি- এ কিন্তু আমাদের পাপের ফল, জানো? শিরায় শিরায় নীল পাপ বইছে, দেখতে পাচ্ছো?“। সম্ভাব্য সুদীর্ঘ লেকচারটা থামিয়ে দিতে পাশ থেকে আন্দ্রেয়া বেফাঁস বলে ফেললো, “আরে ধ্যাঁৎ, শিরায় শিরায় তো কার্বন-ডাইঅক্সাইড। পাপ আসলো কোত্থেকে?“।

বুড়ো একটুও দমে না গিয়ে এক গাল হেসে লিফলেট বাড়িয়ে ধরলো এক তাড়া। “যীশুর দেখানো পথে একবার এসেই দেখো না। সব মুশকিল আসান হয়ে যাবে।“ এবার সেক্যুলার জার্মানির ঘোর নাস্তিক আনা আর আন্দ্রেয়া বুড়োটাকে হ্যাট্ না ভ্যাট্ কি যেন বলে ধমকে উঠলো। চক্ষুলজ্জায় পড়ে কাগজগুলো আমিই হাতে নিলাম। বুড়ো প্রায় কথা আদায় করে নিলো যেন সামনের রবিবার বান্ধবী দু’জনকে নিয়ে যেন গির্জায় যাই। শিরার নীল পাপ মোচন বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ হবে।

লিফলেট ভাঁজ করে গোটা চারেক উড়োজাহাজ বানিয়ে এদিক সেদিক উড়িয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম ফেল্টুস দলের তিন সদস্য। কিছু একটা খেতে হবে। বেশি দুঃখে পড়ে বেহিসেবী ধরনের খিদে পেয়ে গেছে। স্টেশনের সাথে লাগানো চাইনিজ টঙ্গ আছে একটা। সেখানে গিয়ে হামলে পড়লাম। মচমচে ভাজা চাওমিন যদি মনে একটু বল যোগায়, এই আশায়। উপর্যুপরি কয়েক প্লেট নামিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এলাম ম ম ঘ্রানটা সাথে নিয়ে। মন খারাপের দাওয়াই হিসেবে কতগুলো আইসক্রিমও হাপিশ করে দেয়া হল। একে একে, বেকারির কেক-পেস্ট্রি, চিনি ঠাসা কফি, কিছুই বাদ গেল না। ‘খেয়ে মরে যাবো’ জাতীয় আত্মঘাতী চিন্তা পেয়ে বসেছে আজকে।

চিন্তাটাকে আর বাড়তে না দিয়ে সেদিনের মত বিদায় নিলাম ওদের কাছ থেকে। কালকেই দেখা হচ্ছে। সামনের সেমিস্টারের ক্লাস বিরতি ছাড়াই আবার শুরু হবে। সারাদিন ল্যাবের খাটুনির পর ঘন্টাখানেক বাস-ট্রেন ঠেঙ্গিয়ে শহরের আরেক প্রান্তের ক্যাম্পাসে বিকাল থেকে রাত অবধি ক্লাস। নয়েহেরবার্গ আর গ্রোসারডের্ন ক্যাম্পাস দু’টোর মাঝে ঢাকা-টু-কুমিল্লার দূরত্ব। এই আপ-ডাউন অত্যাচারের বুঝি শুরু-শেষ বলে কিছু নেই। ফোঁওওওশ্ করে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

সুযোগ বুঝে ফকফকে আকাশ ঘুটঘুটে কালো মেঘ ডেকে এনে বৃষ্টি নামিয়ে দিলো। ভিজ চুপসে ফিরতি ট্রেন ধরলাম কোনোমতে। ঠান্ডা লাগিয়ে জ্বর বাঁধানো যাবে না কিছুতেই। কারণ, ল্যাবে কালকে পঁয়ত্রিশটা ইঁদুর অপেক্ষায় থাকবে আমার হাতে খুন হবার জন্যে। প্রথমে সিরিঞ্জে চোঁ করে টেনে তাদের রক্ত শুষে নেবো। তারপর ছোট ছোট ফুসফুসগুলো খুলে ফর্মালিনে চুবিয়ে দেবো টুপ্। বাহ্, পরীক্ষায় ফেল করার হতাশাকে হঠাৎ পাশবিক আনন্দে পাল্টে ফেলে বেশ নির্ভার লাগছে। ক্রুর হাসি ছেয়ে গেল একান ওকান। ২.
এক মাস পরের কথা।

কড়া গন্ধে মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। ঘ্রানটা সস্তা দেশি বিড়ির মত হলেও এগুলো আসলে বিশেষ ধরনের রিসার্চ সিগারেট। তারই বড় এক কার্টন খুলে একটার পর একটা সিগারেট জ্বালিয়ে ধরছি। সাদা ধোঁয়া সাপের মত নিঃশব্দে এঁকেবেঁকে ঢুকছে স্মোকিং চেম্বার নামের বাক্সটার ফুটো গলে। ধুম্রজালের আড়ালে মিশি কালো ‘ব্ল্যাক সিক্স’ জাতের ইঁদুরগুলোর অবয়ব প্রায় অস্পষ্ট।

ল্যাবের ক’জন আমরা প্রতিদিন পালা করে ইঁদুরকে বিড়ি টানানোর কাজ করি। এই বিড়ি ফোঁকা কার্যক্রম আমার পিএইচডি থিসিসের একটা অংশ। সিগারেট কোন উপায়ে ফুসফুসের কি ক্ষতি, তা দেখাই উদ্দেশ্য। নিয়ম করে দিন কতক পরপর কিছু ইঁদুরকে ছুরি-কাঁচির নিচে ফেলে পাঁজর খুলে ফুসফুস কেটে বের করে আনতে হয়। কিন্তু এই উদ্দেশ্য হাসিল করতে গিয়ে নিজেদের ফুসফুসই আবার ফোঁপরা হয়ে যাচ্ছে কিনা কে জানে। কারণ, স্মোকিং চেম্বার পুরোপুরি নিশ্ছিদ্র না। তাই কিছুটা ধোঁয়া ইঁদুরে খায় বটে, কিন্তু বাকিটা আমাদের পেটেও যায়।

বিড়ি-পর্ব সে বেলার মত চুকিয়ে বেরিয়ে এলাম। সাদা এপ্রোনের ভাঁজে নিকোটিনের রেশ। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে লোকে নিশ্চিত চেইন স্মোকার ভেবে ভুল করবে। যাহোক, ডেস্কে ফিরতে অ্যাটম বোম ফাটলো যেন। ল্যাবের লোকজন হইহই করে জানালো, গত মাসে নেয়া পরীক্ষার ফল চলে এসেছে। সেটা নাকি সেমিনার রুমের নোটিশ বোর্ডে ঝুলছে। চাপা আতঙ্ক নিয়ে পড়িমড়ি ছুটলাম সেদিকে। আশংকা আর বাস্তবতা মিলিয়ে দেখার চরম মুহূর্তটা ঘনিয়ে এসেছে বুঝি।

দুরুদুরু বুকে দেয়ালে সাঁটানো নামগুলো পড়ছি। চব্বিশ জনের তালিকা পড়তে পড়তে মাঝ বরাবর এসে আনা আর আন্দ্রেয়ার না্ম দেখে হোঁচট খেলাম। এরা তো দেখছি ভালোয় ভালোয় উৎরে গেছে। অথচ সেদিন বিনা গ্লিসারিনেই কত কেঁদে ভাসালো দু’জন। আরো নামতে নামতে নিজের নামটা মিললো ঠিক বাইশ নম্বরে। শেষ থেকে তৃতীয় হবার দুঃখে এবার একটা ভ্যাক কান্না দেবো নাকি শোকে পাথর হয়ে নট নড়ন চড়ন দাঁড়িয়ে থাকবো, ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। পরীক্ষায় ফেল নামের রিয়েলিটি চেক যেন বিরাশি শিক্কার চড় হয়ে গালে আছড়ে পড়লো ঠাস্। মাথাটা বোঁ চক্কর দিয়ে উঠলো এক পাক।

“এ্যাই, কি হল, খারাপ লাগছে নাকি?”। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পাশের ল্যাবের চাইনিজ ছেলেটা। শ্যান জো, যার নাম দিয়ে লিস্টি শেষ হয়েছে। “এই সব ফালতু পরীক্ষা-ফরীক্ষার ফল নিয়ে মন খারাপ করে ফায়দা কি? রাখো তো ওসব। তার চেয়ে চলো তোমাকে একটা দুর্দান্ত চাইনিজ চা বানিয়ে খাওয়াই”। হাত ধরে ল্যাবের কিচেনে জোর করে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো শ্যান জো।

জার্মানির উচ্চ শিক্ষার পাট আমার চুকেবুকে গেছে। এখন কোন বিমান থেকে বাড়ি ফিরে যাবার টিকেট কাটলে খরচ কত কম পড়বে, তারই হিসেব কষছি মনে মনে। কাতার না আমিরাত-এই নিয়ে যখন ভাবছি, তখন শ্যান জো কতগুলো কমলালেবুর খোসা চায়ের কাপে ফেলছে গুনে গুনে। তাতে ইলেকট্রিক কেতলির গরম পানি ঢালতেই মিষ্টি সতেজ ঘ্রান ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। স্বচ্ছ কাপে কমলা চা দেখতে লাগছে তরল সোনার মতন। দেখতে দেখতে দু’কাপ উড়িয়ে দিলাম অনায়াসে।

তৃতীয় কাপটা সন্তর্পনে হাতে নিয়ে “অনুভূতি কি?” জাতীয় প্রশ্ন ছুড়লাম শ্যান জোকে। “চব্বিশ জনের ভেতর চব্বিশ নম্বর হয়ে কেমন লাগছে? টোবিয়াস তোমাকে আস্ত রাখবে তো?“। টোবিয়াস শ্যান জো’র পিএইচডি সুপারভাইজার। শেয়াল মার্কা খ্যাঁক খ্যাঁক হাসি হেসে ছেলেটা জবাব দিল, “টোবিয়াস কোন **… (টুট্ টুট্)। সে আমাকে আস্ত রাখার কে? চাইনিজ সরকারের বৃত্তি যতক্ষন আছে, ততক্ষন কোনো টুট্ টুট্ আমার চুল পর্যন্ত ছুঁতে পারবে না।“

শ্যান জো’র থোড়াই কেয়ার ভাব চক্করের রহস্য পরিষ্কার হল তাহলে। কিন্তু আমার বৃত্তি তো আর চাইনিজ সরকার দেয় নি। দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেন্টার। সুতরাং, আজকে যে অবশ্যম্ভাবী খারাপী কপালে লেখা আছে, সেটা এড়ানোর উপায় নেই। আমার সুপারভাইজার আলি ইলদ্রিম আমাকে বাগে পেলে কচকচ্ শব্দ তুলে চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে। বিষন্ন মনে জানালার বাইরে তাকিয়ে অস্ফুট বললাম, “বিদায় পৃথিবী” গোছের কিছু একটা বললাম বোধহয়।

কমলা চা খেয়ে উঠে যাচ্ছি। শ্যান জো কমলালেবুর খোসাগুলো কাপ থেকে তুলে টিস্যুতে মুড়িয়ে পকেটে নিয়ে নিল। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছি দেখে নির্বিকার উত্তর দিলো, “এগুলো আমার পকেটেই থাকে সবসময়। রোদে শুকিয়ে আবার চা বানাবো। তিন মাস ধরে তা-ই করছি। প্রতিবার স্বাদ যেন আরো খুলছে। বুদ্ধিটা কেমন বলো তো।“

শুনে ভিমড়ি খেলাম। শ্যান জো ছেলেটার ট্রাউজারের পকেটে বাস করা তিন মাসের পুরানো কমলালেবুর খোসার চাইনিজ চা এবার উগড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কোনোমতে ঢোক গিলে কেটে পড়লাম কিচেন থেকে। ”পরের বারে আপেলের খোসার চা বানিয়ে খাওয়াবো, কেমন?“ বগলের কাছে বুক পকেট থেকে অতি প্রাচীন কিছু ফসিল দেখিয়ে বললো শ্যান জো। নেমতন্নটা হ্যাঁ-হুঁ করে এড়িয়ে গেলাম সাবধানে।

পা টিপে টিপে ল্যাবে ফিরছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সুপারভাইজারের খাড়া কানের রাডারে ধরা পড়ে গেলাম। আলী ইলদ্রিম জাতে তুর্কি। ঝাড়া ছ’ফুট পেটানো চেহারা নিয়ে অনায়াসে কোনো ঐতহাসিক তুর্কি সিরিয়ালে সেনাপতির রোল পেয়ে যেত। ঘোড়ায় চড়ে তলোয়ার ঘুরিয়ে শত্রু ঘায়েল করার দৃশ্যেই তাকে বেশি মানায়। তবে এই মুহূর্তে সে ঘোড়া-তলোয়ার ছাড়াই হা রে রে করে তেড়ে এসে তিড়িং লাফে পালিয়ে যাওয়া আমাকে খপাৎ আটকে ফেললো। তারপর অফিস রুমে টেনে নিয়ে বিকট শব্দে দরজা লাগিয়ে দিলো। প্রানটা আজকে বেঘোরেই যাবে।

পরের দশ মিনিট একশো পঞ্চাশ ডেসিবলে গলা চড়িয়ে যা যা হুমকি ধামকি দেয়া হল, তাতে কানের পর্দা সিরামিকের পেয়ালার মত ফেটে চৌচির। পরের পরীক্ষায় নাম যদি ওপর থেকে তিন জনের মাঝে না থাকে, তাহলে যেন যেই চুলো থেকে এসেছি, সেই চুলোয় বিদায় হই। ফেল্টুশ, ডাব্বা খাওয়া, মাথামোটা গবেট তার দরকার নেই। পারলে পিএইচডির কাজ ছেড়ে অন্য ল্যবে টেকনিশিয়ানের কাজ সন্ধান করি, সে পরামর্শও দেয়া হল।

বাক্যবাণে জর্জরিত হওয়া বুঝি একেই বলে। ছাড়া পেয়ে বেরিয়ে এসে কথার বাণগুলো গেঁথে যাওয়া তীরের মতই একটা একটা করে টান মেরে ওপড়াতে হল। কিন্তু মন খারাপের সময় নেই। দ্রুত হাতে ব্যাগ গুছিয়ে গ্রোসহাডের্ন ক্যাম্পাসে ছুটলাম। রাত ন’টা অবধি ক্লাস সেখানে। সুতরাং, শো মাস্ট গো অন।

দেড় ঘন্টা বাস-ট্রেন ঠেঙ্গিয়ে ক্লাসে এসে পুঁছে দেখি, একি কান্ড। ক্লাস কোথায়, ভুর ভুর ম ম সুঘ্রানে চারিদিক ভেসে যাচ্ছে। পরীক্ষার রেজাল্ট উপলক্ষ্যে বিশাল খানাদানার আয়োজন। ইটালিয়ান পিজ্জা অর্ডার করা হয়েছে। মোজ্জারেলার উষ্ণ, আদ্র সুবাস আর অলিভ অয়েলের ঝাঁ ঝাঁ আঘ্রান একেবারে কাবু করে ফেললো যেন সবাইকে। গ্র্যাড স্কুলের কো-অর্ডিনেটর এসে জানিয়ে গেল পিজ্জা পার্টির পর রেজাল্ট নিয়ে দু’কথা আলোচনা হবে। আর তারপর ক্লাস যথারীতি।

কিসের দু’কথা। যে দশ কথা শুনে এসেছি, তার কাছে দু,চার কথা যে বেজায় মামুলি। আর বাড়তি ঘাবড়ে না গিয়ে ভীষন মনোযোগে তিন কোনা একটুকরো পিজ্জা গালে পুরে দিলাম। অরেগানো আর রোজমেরির মেডিটারিয়ান স্বাদে চোখ বুজে এল আবেশে। এমন বেশরম ছাত্র জার্মান দেশে এর আগে আর এসেছে কিনা সন্দেহ।

৩.
শ্যান জো’র মত চাইনিজ বৃত্তির আশীর্বাদ না থাকলেও ঘোর বাঙ্গালির চিনা জোঁক স্বভাবটা তো আছে। সুতরাং, লেকচার হলের মেঝে খামচে পড়ে থাকলাম। ওদিকে, দু-একজন কে কোন দিকে গড়িয়ে চলে গেল। তাদের নাকি ক্লাস-পরীক্ষার চাপ আর সইছে না। সপ্তাহখানেকের নোটিশে কেউ রিসার্চ সেন্টার ছেড়ে দিল, কেউ বা শহরও পাল্টে ফেললো।

গ্র্যাড স্কুলটাও যেন হঠাৎ আজব ইশকুলে পাল্টে গেল। এখন থেকে নাকি আমরাই ছাত্র, আমরাই শিক্ষক। ছাগল পিটিয়ে মানুষ করার জন্যে পন্ডিতমশাই বলে আর কেউ থাকবে না। অদল-বদলটা ধরতে পারার আগেই হাতে আগামী ছ’মাসের রুটিন ধরিয়ে দেয়া হল। ক্লাসে চোখ মেলে ঘুমিয়ে কাটানোর আনন্দময় দিনগুলো ফুরিয়ে গেল বুঝি।

শুধু তা-ই না, কাগজে-কলমে পড়াশোনার পাশে হাতে-কলমে শিখতে এদিক সেদিক পাঠানো হবে আমাদের। আমচু মুখে রুটিনের হিজবিজ কাগজটা ঝাড়া দিয়ে ভাল করে পড়তেই দেখি সামনের সপ্তাহে ক্লাস-মনিটর সাবিনার সাথে আমাকে যেতে হবে দূরে শহরতলীর এক হাসপাতালে। উদ্দেশ্য, ফুসফুসের অসুখে ভুগছে এমন সব রোগীদের সরোজমিনে দেখে আসা। ক্লাস্রুমের বেঞ্চে বসে ঝিমালে শেখাটা নাকি সম্পূর্ন হয়ে ওঠে না। তাই বেঞ্চ থেকে উঠিয়ে রোগীর বেড-সাইডে নেয়া হবে আমাদের।

সোমবার। নিয়ম করে ইঁদুরকে সিগারেট টানিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে তৈরি। গোসহাডের্ন যাবো। আরেক ল্যাবের ছাত্রী সাবিনা অপেক্ষা করবে সেখানে। সুপারভাইজার আলী ইলদ্রিমের অফিসের সামনে দিয়ে পা টিপে টিপে পার হচ্ছি। ফেল মারার পর থেকে সে আমাকে চিহ্নিত শত্রু ঘোষনা দিয়েছে। তেলাপোকা মারতে লোকে যে রকম তেড়ে আসে, ঠিক তেমনি করে শাসাতে আসে।

‘অ্যাও!‘
ভাউ শুনে জমে দাঁড়িয়ে গেলাম। চেয়ার ছেড়ে আলী ইলদ্রিম উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রমাদ গুনবো কিনা ভাবছি, আর তখনি সে ট্রিক কোয়েশ্চেন ছুড়ে দিল, ‘রিসার্চ গ্রুপ লিডার হিসেবে এ পর্যন্ত ক’টা তুর্কিকে দেখেছো বলো তো?’। জবাবে আমতা আমতা করছি। ওপাশ থেকে বজ্রনাদ স্বরে উত্তর এলো, ‘একজনও নেই। সবাই রাস্তায় পাইপ বসাচ্ছে দেখো গিয়ে’। চোখ চলে গেল জানালা গলে। ক্যাম্পাসের এদিকটায় রাস্তা খোঁড়া হচ্ছে। বড় বড় পাইপ বসানোর তোড়জোড় চলছে। মিস্ত্রীদের প্রায় সবাই তুর্কি। কাজের ফাঁকে তারা ফুল ভল্যুমে দেশি গান শুনছে, ‘ওইনামা শিকিদিম্ শিকিদিম্…’।

‘আজকে আমিও ওদের দলে থাকতে পারতাম। পড়াশোনা আর ডিগ্রি করার চেয়ে রাস্তা খোঁড়াই কিন্তু সহজ। যা হোক, যে চুলায় যাচ্ছিলে, যাও।‘ বুঝলাম, তার এই সিম্বলিক কথাবার্তা বাংলাদেশী মায়েদের ‘লেখাপড়া না করলে পরের বাড়িতে বুয়া সেজে বাসন মাজতে হবে’-এই চিরকালীন হুমকিরই তুর্কি ভার্শন। মাথা নামিয়ে কেটে পড়লাম সে বেলার মত।

৪.
লাল রঙের ফক্সওয়াগনটা নিয়ে সাবিনা দাঁড়িয়ে ছিল স্টেশনের কাছে। আমাকে দেখতেই হাত নাড়লো মিষ্টি হাসি হেসে। ‘সিট বেল্ট কিন্তু লগবগ্ করে, ভালো করে বেঁধে নাও। বাবা-মা‘র সেকেন্ডহ্যান্ড গাড়ি থার্ড হ্যান্ড আমার হাতে এসে পড়েছে কিনা’। বেশ কসরৎ করে সিট বেল্ট বাঁধলাম। বার দুই স্টার্ট দেবার পর তিন বারের বার ইঞ্জিনে গুড়ুম গুড়ুম শব্দ তুলে গাড়ি ছুটলো গাউটিং হাসপাতাল বরাবর।

ল্যাবের ইঁদুর আর গ্র্যাড স্কুল- জীবন এর ভেতরেই ঘুরপাক খায়। আজকে তাই ওসব থেকে ছুটি পেয়ে হালকা লাগছে মনটা। সাবিনা আঙ্গুল তুলে দেখালো, ‘ওই দেখো ঘোড়ার পাল’। শহর যে কখন পিছে ফেলে এসেছি, খেয়ালই করি নি। শহরতলীর খামার বাড়ি, আস্তাবলে ঘোড়া আর মাঠে ভেড়ার দল দেখে ক্যালেন্ডারের পাতা ভেবে ভুল হতে চায়।

সাবধানে সাবিনার থার্ডহ্যান্ড গাড়ির জানালা নামিয়ে উঁকি দিলাম। ভীষণ তাজা বাতাসের একটা ঘুর্নি এসে ঝাপটা মেরে গেল চোখে-মুখে। রোদেলা আকাশে মেঘগুলো গা ভাসিয়ে চলছে গন্তব্যহীন। মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরিটা মাঠের পর মাঠ সবুজ ঘাসে জমে উঠেছে বেশ। শহুরে দাঁড়কাকের কা কা হঠিয়ে নাম না জানা পাখির কিচির মিচিরে চারপাশ জুড়ে অদ্ভূত এক স্নিগ্ধতা। পরীক্ষায় পাশ-ফেলের মামুলি সমীকরণটা ভুলে হেসে উঠলাম আপন মনেই। আহ্, এই তো জীবন।
ঘ্যাঁচ্ ব্রেকের হালকা ঝাঁকুনিতেই সিট বেল্ট আপনা থেকেই খুলে গেল পটাং করে। সাবিনার মুড়ির টিন ফক্সওয়াগন থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলাম দু’জন।

৫.
জার্মানটা যে ভাল করে জানা নেই-এ কথার তোয়াক্কা না করেই ডাক্তার ভদ্রলোক আমাদের ওয়ার্ডগুলো একে একে ঘুরিয়ে দেখাচ্ছেন। জার্মান মেয়ে সাবিনাও বেমালুম ভুলে গেছে যে তার পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশির দৌড় ‘গুটেন মর্গেন’ পর্যন্ত। জার্মানি এসেছি মাস ছয় হল। এর ভেতরে আর কতটাই বা মুজতবা আলী হয়ে ওঠা যায়। কি আর করা, বডি লাঙ্গুয়েজ আর এক-আধটা কথা ভাঙ্গা ভাঙ্গা বুঝে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে।

খানিক বাদে করিডোরের শেষ মাথার কেবিনটা দেখিয়ে ডক্টর রালফ্ বললো, ‘লাংস ট্রান্সপ্লান্টের এক রোগী আছে কেবিনে। দেখা করবে নাকি?‘। আমরা দু’জন উৎসাহে ওপর-নিচ মাথা নাড়লাম। গোটা ফুসফুস সরিয়ে আরেকজনের অঙ্গ বসিয়ে দেয়া হয়েছে, এমন কাউকে কাছ থেকে দেখার রোমাঞ্চটা যেন তেন নয়। রালফ্ ডাক্তার বিদায় নিয়ে ডিউটিতে ফিরে গেল, ‘দেখো, আবার বেশি সময় নিও না। আমার এক কলিগ এসে তোমাদেরকে বাকি ওয়ার্ডগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে‘।

দরজায় সামান্য টোকা দিয়ে উঁকি দিলাম, ‘আসতে পারি?’। জাপানি চেহারার মাঝবয়সী লোকটা বালিশে হেলানে থেকে অস্ফুট হ্যাঁ, হুঁ সায় দিল। তারপর পরিষ্কার ইংরেজিতে বলে উঠলো, ‘হ্যালো, আমি লিউ। তোমাদের কথা বলে রেখেছে ডক্টর রালফ্। তা কি জানতে চাও বলো তো?’। কি আবার বলবো, ইতস্তত করছি দু’জন। এবার লিউ নিজের থেকেই কথা পাড়লো।

লিউ আসলে থাইল্যান্ডের লোক। এদেশে আছে প্রায় বছর বিশেক। নিজের ব্যবসা আছে। আর আছে সিগারেটের মুদ্রাদোষ। সে তো অনেকেরই থাকে। কিন্তু বছর দুই আগে তার হাতে মেডিক্যাল রিপোর্ট ধরিয়ে ডাক্তার জানিয়ে দিল, ‘ব্যাড নিউজ, মিস্টার লিউ। তোমার ফুসফুস ফোঁপড়া হয়ে গেছে। ও দিয়ে বেশিদিন চলবে না। চাও তো তোমার নাম লিস্টে তুলে দিতে পারি। ডোনার পেলে একটা চান্স নিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে সময় বড্ড কম‘।

হতভম্ব লিউর মুখ থেকে কথা সরছিল না। তার বেঁচে থাকা হঠাৎ ফুরিয়ে এসেছে। বাঁচা-মরা নির্ভর করছে সদ্য মৃত কারো শরীর থেকে খুলে আনা এক জোড়া সুস্থ ফুসফুসের ওপর। সিগারেট নামের কয়েক ইঞ্চির ছোট্ট শলাকা কখন যে যমদূত হয়ে নীরবে ঘাঁড়ে নিঃশ্বাস ফেলছিল, বুঝতেও পারে নি লিউ।

‘কপালটা ভালো, জানো। এক বছরের মাথায় ডোনার জুটে গেল। এর ভেতর মরেও যেতে পারতাম, কি বলো? তোমাদের বিজ্ঞানের বদৌলতে আরেকটা জীবন পেলাম যেন’। জানালার বাইরে ভয়ংকর সুন্দর পৃথিবীটার দিকে তাকিয়ে অস্ফুট স্বরে আরো কি যেন বলে চললো লিউ।

কেবিনের বাইরে এসে বিচিত্র অনুভূতিতে মন ছেয়ে গেল। আজকে মানুষ রোগীর দেখা পেয়ে বড্ড বাস্তব ঠেকছে সবকিছু। লিউয়ের নতুন জীবন ফিরে পাবার পেছনে কত শত ছোট বড় বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে, আবছা হলে তার কিছুটা দেখতে পেলাম যেন। পাতার পর পাতা খটোমটো রিসার্চ পেপার পড়া আর শয়ে শয়ে ইঁদুর নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই প্রথম একটা লক্ষ্য খুঁজে পেলাম। লক্ষ্যটা পাশ করে কাগুজে ডিগ্রী বাগানো থেকে সরে এসে সত্যিকারের শেখার ইচ্ছেয় বদলে গেল আচমকাই। কাউকে নতুন জীবন উপহার দেবার চেয়ে চমৎকার আর কি হতে পারে?

৬.
সাবিনা সুবিধামত একটা স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে গেছে সন্ধ্যায়। বাসে উঠতেই সোমালিয়ান ড্রাইভার হেঁকে উঠলো, ‘সাবরিনা, কি খবর?’। তিরিশ-পঁয়ত্রিশের লম্বা-চওড়া জোসেফের মুখে হাসি লেগেই থাকে। এই পথে নিত্যদিনের আসা-যাওয়া। তাই আলাপ জমে গেছে। জোসেফের হাতে মিনিট পাঁচেক আছে। বাস-ট্রেন এদেশে ঘড়ি ধরে চলে। এই ফাঁকে সে এক কাপ গরম কফি নিয়ে বসেছে আয়েশ করে। কি মনে হল, প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম, ‘আচ্ছা জোসেফ, এ দেশে এসে খাপ খাওয়াতে কেমন সময় লেগেছে তোমার?’। কফি কাপে লম্বা চুমুকের পর জবাব এল, ‘তা অনেকদিন। রিফিউজি হয়ে এদেশে আসা। তারপর শ’খানেকের সাথে গাদাগাদি করে ক্যাম্পে থাকা প্রায় দেড় বছর। জার্মান ভাষা শিখে নিতে আরো এক বছর। দাঁত খুলে গিয়েছিল, জানো? হাহাহা…’। আগ্রহ নিয়ে জোসেফের গল্প শুনছি।

‘ভাষা জানলেই কি আর হয়। করে খাবার মত কাজ তো জানতে হবে। তখন এই বাস চালানো শেখা। জীবনে সাইকেলও চালাই নি। সেই আমি এক ধাক্কায় বাসের স্টিয়ারিঙে বসে গেলাম। কি আজব ব্যাপার, তাই না‘।

জোসেফ তো দেখা যাচ্ছে বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে এ অবধি এসেছে। সে তুলনায় আমি তো ফায়ারপ্লেসের উষ্ণ আরামে আছি। রিফুইজি ক্যাম্পের তুলনায় বিশ স্কয়ারমিটারের এক কামরায় রাজার হালে থাকি। নতুন কিছু শিখতে বিশাল মার্সিডিজ-বেঞ্জ বাস ঘোরাতে হচ্ছে না। পায়ের উপর পা তুলে সামান্য বইপত্র ঘাটলেই চলছে।

কফি শেষ জোসেফের। তবু সে বলেই চলছে, ‘কিন্তু কেঁচে গেল সব একদিন। লালবাতিতে গাড়ি টেনে ফেল করে বসলাম ড্রাইভিং পরীক্ষায়‘। ফেলের কথা শুনে নড়েচড়ে বসলাম। ‘ইন্সট্রাক্টরের কাছ থেকে দু’টো বিশ্রী গালিও খেলাম সেদিন। কিন্তু রিফিউজি হয়ে এদেশে এসেছি। উপায় বেশি নেই। মন শক্ত করে আবার ট্রেইনিং শুরু করলাম। আর এখন তো তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দিচ্ছি। পকেটে ঝকঝকে লাইন্সেন্স। বুঝলে সাবরিনা, চিনা জোঁকের মত কামড়ে পড়ে থাকতে হয়’। গমগমে হাসিতে বাস কাঁপিয়ে গল্পের ইতি টানলো জোসেফ দ্যা সোমালি ম্যান।

৭.
দিনগুলো দ্রুত কাটতে লাগলো। সবখানে ‘চিনা জোঁক’ থিওরি ফলাতে লাগলাম। গ্র্যাড স্কুলে নিজেই শিক্ষক সেজে লাংস্ ফিজিওলজির ওপর ক্লাস নিয়েছি। চার-পাঁচটা রিসার্চ পেপার প্রেজেন্ট করে সামান্য জাতে ওঠারও চেষ্টা করেছি। সমান্তরালে ইঁদুরকে বিড়ি ফোঁকানো আর ল্যাবের এক্সপেরিমেন্টও চলতে থাকলো জোড়ে সোড়ে। ওদিকে আরেকটা পরীক্ষার দিনও ঘনিয়ে এল ক্রমশ। এবার ফেল মারলে আর ডিগ্রী করে বেরোতে হবে না।

সেই আবার ওপেন-বুক এক্সাম। সেই আবার গ্রোসহাডের্ন হাসপাতালের লেকচার হল। ফারাক একটাই, কলমের ডগায়ে এবার তুফান মেল চলছে। প্রশ্ন সব জলবৎ তরলং ঠেকছে। আর উত্তরগুলোও যেন বড় বড় হরফে জ্বলজ্বল করছে কাগজের জমিনে। সময়ের আগেই পরীক্ষা-পর্ব চুকিয়ে বেরিয়ে এলাম।

ঘড়ির কাটা ঘুর্ণির বেগে ঘুরে আরো এক মাস উড়িয়ে দিল খুব সহজেই।

তারপর এলো সেই দিন। পরীক্ষার ফল টাঙ্গানো হয়েছে নাকি আজকে। শুনে চিন্তিত মুখে সেমিনার রুম বরাবর এগোচ্ছি। নাম খুঁজতে গিয়ে হোঁচট খেলাম। নাহ্, ভুল হয়েছে কোথাও। নিশ্চয়ই উল্টো করে সাঁটানো হয়েছে তালিকাটা। নইলে ওপর থেকে তিন নম্বরে এলো কি করে নিজের নাম!

নিঃশব্দে চাইনিজ ছেলে শ্যান জো এসে পাশে দাঁড়িয়েছে কখন যেন। তার নামটা আমার নামের প্রতিবেশী হয়ে চার নম্বরে ঝুলছে। ‘কি, এই খুশিতে এক দফা চা হয়ে যাবে নাকি?’। বুক পকেট থেকে আপেলের খোসার ফসিলগুলো বের করতে করতে বললো শ্যান জো। অতি আনন্দে ভুল করে সায় দিয়ে দিলাম।

ইলেক্ট্রিক কেতলীতে ধোঁয়া তুলে গরম পানি ফুটছে। মহা খুশী সুপারভাইজার আলী ইলদ্রিম কাঁধ ধরে জোরসে ঝাঁকিয়ে গেছে এক প্রস্থ। তার অফিস থেকে ফুল ভল্যুমে তুর্কি গান ভেসে আসছে, ‘ওইনামা শিকিদিম্ শিকিদিম্..’। (সমাপ্ত)

ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার

পোস্ট-ডক্টরাল গবেষকঃ ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন,

টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি