আধ মাতাল ম্যাক্স তার পনেরো কী ষোলো নম্বর বিয়ারের বোতলে টান দিতে দিতে বলেছিল, ম্যাক্স ক্লারাকে আমি চিনি কিনা। আমি হ্যাঁ বলতেই ম্যাক্স এক অদ্ভুতুড়ে গল্পের ঝাঁপি খুলে বসল। ম্যাক্স আর লতার সৎ দাদা মানে স্নাইডার সাহেবের বাবা জ্যাকব স্নাইডার ছিলেন জার্মানির লাইপজিগ শহরের জাঁদরেল ডাক্তার আর বিজ্ঞানী ম্যাক্স ক্লারার ছাত্র। ছাত্রের গবেষণার জন্য বরাদ্দ ছিল মামুলি ইঁদুর কী বড়জোর গিনিপিগ। কিন্তু ফুসফুসের ওপর গবেষণা চালাতে গিয়ে একপর্যায়ে তরুণ জ্যাকবের আরও বড় প্রাণীর দরকার হলো। সেটা মানুষের লাশ হলে সবচেয়ে দারুণ হয়। কিন্তু ক্লারা তার উৎসাহে ভাটা দিলেন। কারণ, ইহুদিদের লাশ ক্লারা একান্ত নিজের গবেষণার কাজে লাগাতেন। সেখানে ছাত্রকে ভাগ দিতে তার মন সায় দিল না। তার বদলে তিনি জ্যাকবকে পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো কুকুরের ওপর চালাতে বললেন। জ্যাকবও দেখল, প্রস্তাব মন্দ না। একবারে নিশ্চিত হয়েই মানুষের ওপর গবেষণা চালানো দরকার। কুকুর আর মানুষ শারীরতত্ত্বভাবে খুব কাছাকাছি। তাই গবেষণার ফলে আকাশ-পাতাল পার্থক্য হওয়ার আশঙ্কা ক্ষীণ।

কিন্তু জ্যাকবের গোটা তিরিশেক কুকুর লাগবে। যুদ্ধের ডামাডোলে নাৎসিপন্থী ম্যাক্স ক্লারার ততোধিক নাৎসি ঘেঁষা জ্যাকব তখন খ্যাপাটে এক বুদ্ধি বের করে ফেলল। লাইপজিগ শহরের চারপাশের গ্রামে নাৎসিরা মাইকিং করে জানিয়ে দিল, পোষা কুকুরকে বিনা মূল্যে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। অমুক তারিখে অমুক জায়গায় যেন যে যার কুকুর নিয়ে হাজির হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে ইউরোপ জুড়ে তুমুল জলাতঙ্কের প্রকোপ জার্মানির মানুষের মনে আছে। তাই লোকজনের কাছ থেকে সাড়াও পাওয়া গেল সেরকম।

পরের ঘটনা সোজাসাপটা। জ্যাকব বেছে বেছে ইহুদি মালিকের কুকুরগুলোকে হাইডোজের কিটামিন-রম্পুন ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলল। তার ডান হাত একটুকুও হাত কাঁপল না। বাকি কুকুরগুলো ঠিকই র‍্যাবিসের টিকা নিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে খ্রিষ্টান মালিকের পিছু পিছু বাড়ি ফিরে গেল। অবশ্য ইহুদিদের একটা দল জোট পাকিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল বটে, কিন্তু নাৎসিদের ফাঁকা গুলির শব্দে ভয়ে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়েছিল তাদের সেদিন। তবে কুকুরের ফুসফুসের ওপর জ্যাকবের গবেষণা ষোলো আনা সার্থক। ম্যাক্স ক্লারা আর জ্যাকব মিলে পরবর্তীতে ইহুদিদের লাশের ওপর সেই বিদ্যা ফলিয়ে মানুষের ফুসফুসে নতুন একধরনের কোষ আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিল। সেই কোষের নাম আবার দেওয়া হয় ‘ক্লারা কোষ’।

কিন্তু সমস্যার শুরু হলো আরও পরে। যুদ্ধের প্রয়োজনে জ্যাকবকে নাৎসিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধে যেতে হলো। কোনো এক অপারেশনে গিয়ে জ্যাকব শত্রুপক্ষের গ্রেনেড হামলায় পড়ে। ডান হাতটা উড়ে গিয়ে খাঁড়ির ভেতরেই কিছুটা দূরে ছিটকে পড়ে। কিন্তু কী আশ্চর্য, কোথা থেকে এক বিশাল কুকুর এসে ছোঁ মেরে জ্যাকবের ডান হাতটা নিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। তুমুল গোলাগুলি আর কামান-গ্রেনেডের ভিড়ে কুকুর আসল কীভাবে কেউ বলতে পারেনি।

যুদ্ধ শেষ। ম্যাক্স ক্লারা আর তার শিষ্যদের ধরপাকড় করে জার্মানি থেকে বের করে দেওয়া হলো। হাতকাটা জ্যাকব পরিবার নিয়ে লুকিয়ে এই ডার্মষ্টাডে চলে এল। অজপাড়াগাঁয়ের লোক শহুরে একজন ডাক্তার পেয়ে বিগলিত। জ্যাকবদের কোনো অসুবিধা হলো না। কিন্তু উনিশ শ পঞ্চান্ন সালের এক শীতের সকালে জ্যাকব স্নাইডারকে তার পোষা কুকুর বাজেভাবে কামড়ে দিল। জলাতঙ্কের চৌদ্দটা ইনজেকশন দিয়েও লাভ হলো না। জ্যাকব স্নাইডারের ভয়ংকর হ্যালুসিনেশন শুরু হলো। তার পায়ের কাছে নাকি কালো রঙের ত্রিশটা কুকুর বসে থাকে। জ্যাকব কুকুরের মতো থাবা গেড়ে প্রচুর লালা ফেলতে ফেলতে সপ্তাহখানেকের মাথায় মারা গেল। রেখে গেল তিনটা নানা বয়সী ছোট ছোট বাচ্চা আর তরুণী স্ত্রী।

তবে জ্যাকব মারা গিয়ে ভালোই হয়েছে। তাকে একটা বীভৎস মৃত্যু দেখতে হয়নি। দিন কয়েক বাদে তার তিন মাসের ছোট শিশু, মানে লতার সৎ বাবা স্নাইডারের সবচেয়ে ছোট ভাই জুলিয়ানকে খুঁজে পাওয়া গেল না। বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল দূরে একটা ভুট্টা খেতে যখন তাকে পাওয়া গেল, তখন বড় বড় নখের আঁচড়ে সেটা আর মানবদেহ বলে চেনা যায় না। সেটা কুকুরের কাজ কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এটুকু বলে ম্যাক্স আমার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘এখন বল তো, এর পরে আর কে অপঘাতে মারা গেছে? বলতে পারলে তোমার জন্য দুই বোতল বিয়ার পুরস্কার।’ আমি আর কী বলব। সব শুনে কেমন অসাড় অসাড় লাগছে। আর মনে হচ্ছে এই বুঝি ঘাড়ের পেছন থেকে ইয়া বড় কুকুর লাফ দিয়ে পড়ল বলে। হাত উল্টে বললাম, ‘জানি না, তুমিই বল না।’ ম্যাক্স একটু চুপ থেকে যে কথা শোনাল, তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। ‘এমিলি। শার্লট মানে লতার যমজ এমিলি।’ বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। ম্যাক্স বলেই যাচ্ছে, ‘শার্লট আর এমিলি নাম দুটো রাখা হয়েছিল বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক শার্লট ব্রন্টি আর তার বোন এমিলি ব্রন্টির নামে। আমার মায়ের খুব প্রিয় লেখিকা এই দুজন।’ হতভম্ব আমি কথার মাঝখানে দুম করে বলে বসলাম, কিন্তু তোমরা তো স্নাইডার সাহেবের রক্তের সম্পর্ক নও, তাহলে কীভাবে?’ ম্যাক্স ফোঁস করে লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠল, ‘জানি না, অনীক, ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে। এমিলির ব্যাপারটা ঘটার আগে আমি এসব কুসংস্কার পাত্তা দিতাম না। এমিলি মারা যাওয়ার পর থেকে লতার জন্য ভয় ঢুকে গেছে। তাই হয়তো এসব কাকতালীয় ঘটনাকে চাইলেও উড়িয়ে দিতে পারি না।’

ম্যাক্স আবার চুপ। লতার ঘরের আধ ভেজানো দরজার দিকে তাকালাম। মেয়েটা ঘুমিয়ে আছে রাজ্যের মায়া মেখে। চোখ ফেরানো দায়। তবুও চোখ ফিরিয়ে আস্তে আস্তে বললাম, ‘এমিলির কী হয়েছিল?’ উত্তরে ম্যাক্স আঠারো নম্বর বোতলের ছিপি খুলে বসল। তারপর শুরু করল, ‘এমিলি মারা যায় বছর পাঁচেক আগে। লতা আর এমিলি বাড়ি এসেছিল ক্রিসমাসের ছুটিতে। এক বিকেলে হাঁটতে বেড়িয়েছে দুজন। কোত্থেকে কার এক কুকুর এসে আচমকা ধাক্কা দিল। এমিলি ছিটকে পড়ল রাস্তায়। সেকেন্ডের মাঝে একটা লরি চলে গেল মাথার ওপর দিয়ে। স্পট ডেড।’ আমি রুদ্ধশ্বাসে শুনে যাচ্ছি। দম ছাড়তেও ভয় লাগছে। লতার আর এমিলির দুর্ঘটনা প্রায় এক। স্নাইডার সাহেবের মারা যাওয়াটাও কুকুরকেন্দ্রিক। কিন্তু পার্থক্য, লতা দুর্ঘটনায় কুকুরের অংশটুকু আমি আর ফ্রাউ কেলনার মিলে ম্যাক্স আর তার মায়ের কাছ থেকে গোপন রেখেছি। এখন মনে হচ্ছে কাজটা ভুল হয়নি। পরিবারটা এমনিতেই বিরাট আতঙ্কের ভেতর আছে। কিন্তু সেই আতঙ্ক এখন আমার ভেতরও ঢুকে গেছে, তার কী হবে?

ম্যাক্স উঠে দাঁড়াল, ‘অনেক রাত হয়েছে, অনীক। ঘুমিয়ে পড়, কেমন?’ ঘুম কী আর আসে? এপাশ-ওপাশ করে কাটল রাতটা।

পরদিন ঝলমলে সকাল। গির্জাটা উঁচু একটা টিলার মতন জায়গায়। লতাকে হুইলচেয়ারে বসিয়ে আনতে হয়েছে। এখন রীতিমতো হাত ব্যথা করছে। গালিভার ম্যাক্স কেন যেন ইচ্ছে করে এই দায়িত্বটা আমার কাঁধে সঁপে দিয়েছে। তখন কী আর হ্যাঁ-না বলার সুযোগ থাকে? নিজেকে এখন আমার মহারানির সেবায়েত মনে হচ্ছে। রানি ভিক্টোরিয়ার সিংহাসন ঠেলে নিয়ে চলছি। লতা হাজারবার ‘সরি সরি, কষ্ট দিচ্ছি, ক্রাচটা দিলে নিজেই হেঁটে যেতে পারি…’ ইত্যাদি মেয়েলি কথাবার্তা বিরামহীনভাবে বলে বলে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। উত্তরে বলা উচিত ছিল, ‘আরে নাহ্, এ আর এমনকি।’ কিন্তু উল্টো দিয়েছি কষে এক ধমক, ‘অ্যাই মেয়ে, অ্যাই, বলেছি না চুপ করে থাকতে? এত কথা বলার কী আছে, উফ্!’

মেয়েটা সেই যে চুপ মেরে গিয়েছে, এখন পর্যন্ত আর কোনো কথা বলেনি। সে আজকে একটা ছাই রঙের টপের সঙ্গে কালো স্কার্ট পড়েছে। টিলার ওপরে ওঠার সময়ে আচমকা বাতাসে তার স্কার্ট নৌকার হাওয়া লাগা পালের মতো উড়ে মেরিলিন মনরোর ‘দ্যা ফ্লাইং স্কার্ট’ হওয়ার জোগাড় হয়েছিল। আঁতকে উঠে কোনোমতে সেটাকে পাকড়াও করে হাঁটুর নিচে গুঁজে দিয়েছি। তখনো লতা অস্পষ্ট একটা ধন্যবাদের মতন কী যেন আওড়ে আবার কুলুপ এঁটে চুপ। নিস্তব্ধতাটা বিকট ঠেকছে। আজকের দিনে লতার সঙ্গে এতটা রূঢ় না হলেও চলত। তাও আবার সামান্য কারণে। মাফটাফ চাইতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু মাফটা গলার কাছে এসে আটকে আছে। মুখ ফুটে বলা যাচ্ছে না। তাই অসহায়ের মতো চুপ করে থাকাই হলো।

গির্জার ভেতরটা একেবারে হিম। অথচ বাইরে উষ্ণ সকাল। ম্যাক্সের ভয়ে নাকি নেহাত ভদ্রতায়, কোনটার কারণে সকালটা থেকে গিয়েছি, জানি না ঠিক। এখন ঠান্ডায় জমছি বসে বসে। লতাকে বাকিদের সঙ্গে সামনের সারিতে বসিয়ে দিয়ে এসেছি। আর আমি বসেছি বেশ খানিকটা পেছনের সারিতে। ইচ্ছে করেই। প্রশ্নবোধক চাহনি এড়াতে হয়তো বা। পাদরি সাহেব বাইবেল খুলে পড়া শুরু করেছেন। আমার সেদিকে মন নেই। কালকে ম্যাক্সের বলা কথাগুলো কানে ভাসছে। রাতের অন্ধকারে ম্যাক্সের কাহিনি রীতিমতো রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে। কিন্তু এখন, এই ফকফকে দিনের আলোয় সব কেমন গাঁজাখুরি আর হাস্যকর লাগছে। তবুও কোথায় যেন একটা অস্বস্তি খচখচ করছে। (চলবে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।