বিয়ারের বোতল দিয়ে যদি শোকের পরিমাণ মেপে ফেলা যেত, তাহলে চোখ বুজে বলে দেওয়া যায়, ম্যাক্সিমিলিয়ানের মনে এখন বেজায় দুঃখ। ঘরের মেঝে, কোনা কানাচ, সবখানে শূন্য বিয়ারের বোতলের রাজত্ব। টেবিলের নিচে আরও এক বাক্স অপেক্ষমাণ। ছিপি খুললেই শোকের ফেনিল ধারা হয়ে বেরিয়ে আসবে। ম্যাক্সিমিলিয়ান, মানে লতার বছর চারেকের বড় ভাই ম্যাক্সের সঙ্গে লতার চেহারার কোনো মিল নেই। লতা ছোটখাটো হালকা পাতলা গড়নের। সেখানে সাত ফিট ম্যাক্সের মাথা প্রায় চৌকাঠ ছুঁয়েছে। আমি ছয় হয়েও তার ঘাড়ের কাছে এসে মিলিয়ে গেছি। নিয়ম করে দৌড়ানো আমার পেটানো শরীর তার দশাসই আকৃতির কাছে নস্যি। জিম ইনস্ট্রাক্টর ভেবে ভুল হলেও ম্যাক্স আসলে পেশায় স্কুলশিক্ষক। কাছের শহরের একটা স্কুলে ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের অঙ্ক পড়ায়। বাবার খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে কালকে চলে এসেছে মায়ের কাছে। যা হোক, খুব সাবধানে শোকে গড়াগড়ি দেওয়া বোতলগুলো টপকে সোফাটার কাছে এসে পৌঁছালাম।

আজকে রাতে লতাদের কাঠের বাড়িটার দোতলায় ম্যাক্সের সঙ্গে আমার থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে। আর নিচের ঘরগুলোতে লতা, লতার মা ফ্রাউ স্নাইডার আর ফ্রাউ কেলনার। নির্দ্বিধায় বন্দোবস্ত মেনে নিয়েছি। কী একের পর এক ঘটনার পাকেচক্রে অযাচিতভাবে জড়িয়ে পড়েছি। সরল নিরুপদ্রব জীবনে অভ্যস্ত আমি। এত বৈচিত্র্য পোষায় না। লতাকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তাকে আনা গেছে ভালোয় ভালোয়। ব্যস, এটুকুই! কাল ভোরের আলো ফুটতেই আমি ফুট্টুস!

দুটা ঘর। আমাকে সোফা বেডটা দেখিয়ে ম্যাক্স অনায়াসে শোয়ার ঘরে বাকি বোতলগুলোর সদগতি করতে করতে ঘুমিয়ে যেতে পারে। কিন্তু না। সে ঠিক নাক বরাবর বসে আছে। তার পায়ের কাছে বসে থাকা হুমদো সিয়ামিজ বিড়াল কার্পেটে নখ ঘষছে। আমাকে বেশ কয়েকবার বোতল সেধেও লাভ হয়নি বলে দুজনের চেহারায় কিঞ্চিৎ হতাশা। ম্যাক্সকে দেখে মনে হচ্ছে সুদীর্ঘ কোনো গল্প বলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই রে, তাহলেই সেরেছে! আমার তো উল্টো ইচ্ছে করছে, বিড়ালটাকে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচে দিয়ে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে যাই। কিন্তু তা না করে ভদ্রতার খাতিরে চেহারায় কৃত্রিম আগ্রহ ফুটিয়ে গল্প শুরুর অপেক্ষায় সোফার কুশনে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসেছি। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি, ঠিক দুই মিনিটের মাথায় হাত-পা ছড়িয়ে নাক ডেকে কুম্ভকর্ণের ঘুম দেব। বিয়ারের বোতল মাথায় ভাঙলেও লাভ হবে না তখন।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর ম্যাক্স শুভরাত্রি জানিয়ে ঘুমাতে যাওয়ার জন্য ক্লান্ত পায়ে উঠে দাঁড়াল। তখনো আমি বিস্ময়ের ঘোর থেকে বেরোতে পারিনি। হেনরিখ স্নাইডার তাহলে লতা আর ম্যাক্সের আপন বাবা না? সৎ বাবা! কিন্তু ভাইবোন দুজন জ্ঞান হওয়ার পর থেকে স্নাইডার সাহেবকেই বাবা হিসেবে নিয়েছে। অমায়িক, ভালো মানুষ এই লোকটা তাদের কোনো দিন বাবার অভাব বুঝতে দেননি। আর লতার আসল বাবার যে নামটা ম্যাক্স জানাল, সেটা শুনে চমকে গেলাম। মাথিয়াস ম্যুলার নামটা কে না জানে। ডিসকভারি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি খুললেই তো তার নাম ভেসে ওঠে। বিখ্যাত অভিযাত্রিক। তিন-তিনবার এভারেস্টে চড়েছেন। এখন আছেন অ্যান্টার্টিকাতে। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ওপর খুব দারুণ একটা গবেষণার কাজে একদল নামকরা বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। তার করা ডকুমেন্টারির প্রতিটা পর্ব নেটফ্লিক্সে লাখ লাখ লোক হুমড়ি খেয়ে দেখছে।

তো ম্যাক্স আর লতা খুব ছোট থাকার সময়ে ম্যুলার সাহেব একদিন আবিষ্কার করলেন, ছানাপোনা, ঘরসংসার এগুলো খুবই একঘেয়ে আর বিরক্তিকর এক পিছুটান। এই পিছুটানের ভারে তিনি জীবনের যে চূড়ায় যেতে চান, সেখানে পৌঁছানো সম্ভব না। তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো এভারেস্টের পথে। সময় নষ্ট না করে নেপালের বেস ক্যাম্প থেকে কয়েক লাইনের এক চিঠি পাঠিয়ে দিলেন লতার মায়ের কাছে। সেই চিঠিতে ছোট্ট লতা আর ম্যাক্সের জীবন এলোমেলো হয়ে গেল। লতার গৃহিণী মা এক অদ্ভুত জীবনযুদ্ধে পড়ে গেলেন।

মজার ব্যাপার, সে যুদ্ধে তার সহযোদ্ধা হলেন ম্যুলার সাহেবেরই সবচেয়ে কাছের বন্ধু লতার সৎ বাবা হেনরিখ স্নাইডার। ওয়ান ম্যানস ট্র্যাশ ইজ এ্যানাদার ম্যানস ট্রেজার। ম্যুলার সাহেবের হেলায় ফেলে দেওয়া পরিবারটা তিনি কুড়িয়ে পাওয়া হিরের টুকরোর মতো আগলে রেখেছিলেন এতকাল। এই গভীর রাতের আপাত শোকবিহীন পিনপতন নীরব কাঠের দোতলায় বসে দেখতে পেলাম পিছুটান আর রক্তের টানের থেকেও বড় এক টান আছে এই জগতে। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার টানে হেনরিখ স্নাইডার নামের ভালোমানুষ লোকটাকে লতা আর ম্যাক্স মিলে যে চূড়ায় উঠিয়ে বসিয়েছে, ম্যুলার সাহেব চাইলেও এ জীবনে তার নাগাল পাবেন না। সেটা যে এভারেস্টের থেকেও উঁচু এক জায়গা। ম্যাক্সিমিলিয়ান তার গালিভারের মতো শরীর কাঁপিয়ে শিশুর মতো কাঁদছে। আমি বাধা দিলাম না।

ম্যাক্স যখন কথার ঝাঁপি খুলেই বসেছে, তখন আরও একটা ব্যাপার জানার জন্য মনে খচখচ করছে। কিন্তু এটা হয়তো ঠিক সময় না। ম্যাক্স মনের কথা বুঝতে পেরেই কিনা জানি না, চোখ মুছে বলে বসল, ‘কুকুরের বিষয়টা ভাবছ, তাই না?’ আমি কিছুটা কুণ্ঠার সঙ্গে ওপর-নিচ মাথা নাড়লাম।

ম্যাক্স-লতার নতুন বাবা এই অকূলপাথারে পড়া পরিবারটায় আশীর্বাদ হয়ে এসেছিলেন বটে। কিন্তু সঙ্গে করে একটা ছোট ঝামেলাও এনেছিলেন। ‘এই ব্যাপারটা একটা অভিশাপের মতন, বুঝলে…।’ ম্যাক্স কথাটা শেষ করতে পারল না। তার মাঝেই কোথা থেকে এক তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ভেসে এল রাতের আঁধার চিরে। চিৎকারটা নিচতলা থেকে আসছে। সবার আগে মনে হলো, লতা! তাকিয়ে দেখি ম্যাক্স নেই। হুড়মুড় করে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে গেছে। আমিও এক ঝটকায় নামলাম। লতার ঘরের দরজা হাট করে খোলা। বাকিরাও এসে ভিড় করেছে। বিড়ালটাও আমার আগে পৌঁছে হাজির। এলো চুলে উঠে বসা লতাকে হতবিহ্বল লাগছে। তার ঠোঁট ভয়ে নীল। সে দুঃস্বপ্ন দেখেছে। খোলা জানালা দিয়ে লোমশ একটা বিশাল কুকুর তার ঘরের ভেতর লাফ দিয়েছে।

এ রকম পরিবেশে কিছু বলা উচিত কিনা বুঝে ওঠার চেষ্টা করছি। তার আগেই দেখি ম্যাক্স বাদে বাকি তিন জোড়া চোখ ঘুরে গেছে আমার দিকে। হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমি আবার কী করলাম? ভালো করে খেয়াল হতেই দেখলাম, হাতে ভাঁজ করা টি-শার্ট ধরা। রাতে ঘুমানোর জন্য ম্যাক্সের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলাম। গল্প শুনতে শুনতে শার্ট খোলা হয়েছে বটে কিন্তু ম্যাক্সের দেওয়া টি-শার্ট আর গায়ে গলানো হয়নি। লতার চিৎকারে অমনি হাতের মুঠোয় নিয়েই নেমে এসেছি। কী মারাত্মক! লতার খোলা জানালা দিয়ে আসা মাঝ রাতের ঠান্ডা বাতাস হি হি করে কাঁপিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা যেন আরও পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়ে গেল। লতা, ফ্রাউ স্নাইডার আর ফ্রাউ কেলনারদের যথাক্রমে পঁচিশ, পঞ্চাশ আরে পঁচাত্তরের চোখের সামনে মানইজ্জতটা একদম গেল! তাড়াতাড়ি করে পায়ের কাছে ঘুরতে থাকা বিড়ালটাই কোলে তুলে নিলাম। মনে হলো ঘরের মেঝে ফাঁক হয়ে যাক, আমি বিড়ালসহ ঢুকে যাই। কিন্তু তার বদলে হাতের ভেতর ম্যাঁওপ্যাঁও করতে থাকা বদমাশ বিলাইটা ঘাড় বরাবর দিল এক খামচি। সেকেন্ডে মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে বাঁদরটাকে একটা চড় মারার জন্য হাত বাড়িয়েছি, কিন্তু তার গাল কই? গোঁফের পাশে না কানের নিচে? ঠাহর করতে না পেরে শয়তানটাকে পালানোর সুযোগ করে দিয়ে দ্রুত ড্রয়িংরুমে চলে এলাম।

ম্যাক্স পিছু পিছু বেরিয়ে এসেছে। ততক্ষণে আমি টি-শার্ট চাপিয়ে আবার কিছুটা ভদ্রস্থ হয়ে ঘাড়ের খামচিটা পরখ করে দেখছি। ম্যাক্সের সেদিকে খেয়াল নেই। তার সমস্ত চিন্তা তার বোনকেন্দ্রিক। কাছে এগিয়ে এসে মৃদু স্বরে বলল, ‘লতা খুব ভয় পেয়েছে। তুমি কিছু মনে না করলে আজকের রাতটা এই ড্রয়িংরুমের সোফায় কাটাতে পারবে? মা আর ফ্রাউ কেলনারের ঘুম দরকার। আমিও পারছি না। বিয়ার একটু বেশিই গেলা হয়েছে।’ ম্যাক্সের ঢুলঢুলে চোখের অনুরোধ ফেলা গেল না। বাকিটা রাত সেখানেই কাটল। কান খাঁড়া থাকল যদিও। কী বিচিত্র রাত। যেন শেষই হতে চাইছে না। লতার ঘরের দরজা আধা ভেজানো। মাঝে একবার উঠে গিয়ে জানালা লাগিয়ে দিয়ে আসলাম। যদি সত্যিই লাফ দিয়ে কিছু ঘরে ঢুকে যায়? বলা তো যায় না। লতার মুখের দিকে তাকালাম। এক গুচ্ছ চুল এসে কপালের একপাশটা ঢেকে দিয়েছে। যেন মেঘে ঢাকা ক্ষয়িষ্ণু চাঁদ। খুব ইচ্ছা করল আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিতে। হাত বাড়ালাম। কিন্তু কেন যেন আঙুলগুলো লতার চুল ছুঁয়ে ফেলার ঠিক আগ মুহূর্তে সরিয়ে নিলাম। সব ইচ্ছেঘুড়িকে আকাশে উড়তে দিতে নেই। খুব সাবধানে দীর্ঘশ্বাসটা লুকিয়ে ফেলে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলাম।

সোফায় ফিরে এসে দেখি ম্যাক্স অন্ধকারে ভালুকের মতো ঘাপটি মেরে বসে আছে। ঘুমাচ্ছে না কেন জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘তোমাকে কুকুরের ব্যাপারটা বলা হলো না তখন।’ হাত নেড়ে বললাম, ‘আরে, কোনো ব্যাপার না। কাল সকালে বললেও তো হতো। আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না।’ শীতল উত্তর এল, ‘সকাল হলেই তুমি ফিরে যাবে, আমি জানি, অনীক।’ আমি ধরা পরে যাওয়া চোরের মতো পিটপিট করে তাকালাম। বাতি নেভানো ঘরে ম্যাক্সের সেটা দেখতে পাওয়ার কথা না। কিন্তু মনে হলো সে ঠিকই টের পেয়েছে। অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে আমি শেষ মেষ বললাম, ‘ম্যাক্স, বল তাহলে, আমি শুনছি।’ এদিকে সত্যি বলতে, আমার আর কেচ্ছা-কাহিনি শোনার শক্তি নেই। এতটা পথ পেরিয়ে এসে শরীর-মন দুজনই বিশ্রামের জন্য আঁকুপাঁকু করছে।

ম্যাক্স তার বোতলে লম্বা চুমুক মেরে শুরু করল, ‘অনীক, তুমি ম্যাক্স ক্লারার নাম শুনেছ? নাম শুনে আবার ভেবে বসো না সে আমার জ্ঞাতি ভাই টাই গোছের কেউ, হাহাহা…।’ নামটা ঠিক শুনলাম তো? মাসখানেক আগে ‘ডাখাউ’ নামের মিউনিখের এক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে ঘুরতে গিয়ে এই নাম শুনেছি। জার্মানির ইতিহাসের ভয়ংকর এক নিষ্ঠুরতার নাম ম্যাক্স ক্লারা। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পেশায় ডাক্তার ক্লারার অনেক গিনিপিগ দরকার হতো। নাৎসী বাহিনীর হাতে মারা যাওয়া ইহুদিদের লাশ ছিল তার সেইসব গিনিপিগ। কিন্তু সে তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকের কথা। ম্যাক্সিমিলিয়ান কীসের গল্প বলতে চাইছে আসলে? (চলবে)