দশ মিনিটের মাথায় অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার ব্রিগেড আর তিনটা পুলিশের গাড়ি মিলে রাস্তা কর্ডন করে আলো-টালো জ্বেলে রাতটা একদম দিন করে দিল। লতা দারুণ কাজ করেছে। কী হলো, কী হলো করে পিনিক খাবার ভেতরেও সে বুদ্ধি করে পুলিশে ফোন করে দিয়েছে। দুর্ঘটনার খবর জানানোটাই নিয়ম।

না-কুকুর না-শেয়াল জন্তুটাকে যখন বিশাল একটা প্লাস্টিকের ব্যাগের ভেতর ঢোকানো হলো, আমি তখন ইচ্ছে করেই আমাদের গাড়ির সামনে ভেতরে বসা থাকা লতার জানালার সামনে দাঁড়ালাম। যেন লতা দৃশ্যটা ঠিক দেখতে না পায়। কাজটা সচেতন নাকি অবচেতন মনেই করলাম, জানি না। খামোখা মেয়েটার মনের ওপর আর চাপ বাড়িয়ে কী লাভ?

তিন-তিনটা গুলি খাওয়া নিথর পাশবিক দেহটা থেকে তখনো এক ধরনের জান্তবতা ঠিকরে পড়ছে। মেঘ সরে যাওয়া চাঁদের নরম আলো আর ভিড় জমিয়ে থাকা পুলিশের গাড়িগুলোর প্রখর আলো মিলে বাস্তব আর পরাবাস্তবের মাঝামাঝি একটা জগৎ তৈরি করে দিয়েছে বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া আজকের এই পথের ধারে। বারবার মনে হচ্ছে কোথাও কিছু একটা গন্ডগোল আছে। ধরতে পারছি না। বোঝা তো দূরের কথা। খালি মনে হচ্ছে আধিভৌতিক একটা থ্রিলার উপন্যাসের ভেতর ঢুকে গিয়েছি। উপন্যাসের নাম ‘কুকুরের অভিশাপ’ জাতীয় কিছু একটা।

কখন যে নিঃশব্দে ফ্রাউ কেলনার এসে পাশে দাঁড়িয়েছে, টের পাইনি। চোখাচোখি হতেই বুঝলাম, তার আর আমার উদ্দেশ্য অভিন্ন। লতাকে কোনো কিছু দেখতে না দেওয়া। এতক্ষণ হয়ে গেল, অথচ এই ভদ্রমহিলাকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারিনি। ফ্রাউ কেলনারের হাতব্যাগে আপেল কাটার ছুরির সঙ্গে নিকষ কালো পিস্তলটা না থাকলে প্রাণটা আজকে রাতে একদম বেঘোরেই যেত। পেশায় এককালের মিলিটারি নার্স ফ্রাউ কেলনার অবসরে যাওয়ার পরও জিনিসটার মায়া কাটাতে পারেননি। ট্যাক্স আর লাইসেন্স রিনিউ করে করে সেবাস্তিয়ানকে সঙ্গেই রেখে দিয়েছেন সযত্নে। সেবাস্তিয়ান তার পিস্তলের নাম। পুরো নাম সেবাস্তিয়ান কেলনার। তাজ্জব বনে যাওয়ার বদলে তাক লেগে গেল। একগাল হেসে ফেললাম মুগ্ধতায়। এই মুহূর্তে ফ্রাউ কেলনার আমার অভিধানে এক অতিমানবীর নাম। আমি তাকে গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে নতুন চোখে দেখছি। তার পিস্তলের গালভরা রাশভারী কোনো নাম তো থাকতেই পারে, পারে না? পিস্তলের নাম সেবাস্তিয়ান কেন, জার্মান ফুটবলার বাস্তিয়ান শোয়ানষ্টাইগার হলেও অবলীলায় মেনে নিতাম। জান বাঁচানো অস্ত্র বলে কথা! বেঁচে থাকো বাবা সেবাস্তিয়ান।

মুশকিল হচ্ছে, আমাদের আজকের এই অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর যাত্রার বাকিটুকু পথ এই অতিমানবীকে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমার পক্ষে বোধ হয় স্টিয়ারিং ঘোরানো সম্ভব হবে না। ফ্রাউ কেলনার গুলি চালানোর পর পুলিশ আসার অপেক্ষায় না থেকে কুকুরটাকে রাস্তার এক পাশে টেনে সরিয়ে আনার মতো বোকামি করে হাত মচকে ফেলেছি। কিংবা মচকে না গেলেও ডান হাত ভালো করে আর সোজা করা যাচ্ছে না। এখন নিজের আঙুল কামড়াতে ইচ্ছা করছে ক্ষোভে-দুঃখে। না জানি কপালে আজকে রাতে আর কী কী আছে।

প্রচুর পরিমাণে ফরম পূরণ আর পাতার পর পাতা সাইন করে করে এক কী দেড় ঘণ্টা পার হয়ে গেল। জার্মানি কাগজের দেশ। পান থেকে চুন খসলেই তাড়া তাড়া কাগুজে ফাঁপরে পরে যেতে হয়। আর সেখানে তো কুকুর চাপা দিয়ে ফ্রাউ কেলনারের গলফ গাড়ির চলটা উঠিয়ে ফেলেছি। পাতাকে পাতা উড়িয়ে পুরো ঘটনা দাঁড়ি, কমাসহ লিখে লিখে মহাভারত লিখে ফেলেছে মাঝবয়সী ইন্সপেক্টর। ধৈর্যের বাঁধ যখন প্রায় ভেঙে যায় যায়, ঠিক তখন পুলিশের গাড়িগুলো বিদায় নিল। হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম যেন।

ওদিকে উত্তেজনায় ফ্রাউ কেলনারের চোখ চকচক করছে। গাড়ির চাবিটা তার হাতে দিয়ে দিলাম দোয়া দরুদ পড়ে। সত্যি বলতে কী, আসলে ঠিক ভরসা পাচ্ছি না। অন্ধকার রাত। থেকে থেকে বৃষ্টি-বাদল চলছে। এখনো লতাদের গহিন গ্রামের বাড়িতে পৌঁছাতে ঘণ্টা চারেক তো লাগবেই। মনকে সান্ত্বনা দিলাম, যাক গেছে তো হাতের ওপর দিয়ে, জানটা তো বাঙালের ধরেই আছে এখনো। এই তো বেশি। কী যে যা-তা কাণ্ড একটা হয়ে যেতে পারত আরেকটু হলেই, ভাবতে গিয়েও ভাবতে চাইলাম না।

এর ভেতর অনেকক্ষণ একইভাবে বসে থেকে লতার পায়ে ঝি ঝি ধরে গেছে। সে চাইছে তাকে যেন আধ শোয়া করে দেওয়া হয়। আরেক বিপদে পড়লাম। তাহলে সিট বেল্ট বাঁধা হবে কেমন করে? ভ্রু কুঁচকে ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে বললাম, পারব না! লতা চি চি করেই যাচ্ছে নিচু স্বরে। ফাঁপর আর ফাঁপর। এবার বললাম, এ্যাই মেয়ে, চোওওপ! লতার অনুরোধ রীতিমতো ঘ্যানঘ্যান ঠেকছে। ধ্যাত! দাঁত কিড়মিড় করে আবার বকা দিলাম, নড়েচড়ে বস, ঝি ঝি চলে যাবে। মাঝখান থেকে ফ্রাউ কেলনার বলে উঠলেন, দাও না যেভাবে চাইছে সেভাবে ব্যবস্থা করে। তোমার সমস্যা কী অনীক? ফোঁস করে উঠলাম, কিন্তু এভাবে তো সিট বেল্ট বাঁধা যাবে না। হাইওয়ে পুলিশ গাড়ি থামিয়ে ক্যাঁক করে ধরলে কী বলবেন, বলুন তো? উত্তরে ফ্রাউ কেলনার যা বললেন, তাতে হাসব না কাঁদব, নাকি তাকেও কষে একটা ঝাড়ি মারব বুঝতে পারছি না। ভদ্রমহিলা বলে চললেন, ধরলে বলব, বাবারা, আমি বুড়ো মানুষ। এত নিয়মকানুন জানি না। আমাদের যেতে দাও। গাট্টাগোট্টা বাঁজখাই জার্মান পুলিশকে, বাবারা, ছেড়ে দাও, যেতে দাও জাতীয় কথাবার্তা বললে কত দূর কী কাজ হবে কঠিন সন্দেহ আছে।

কিন্তু যা হোক, শেষমেষ লতার ঘ্যানঘ্যানের জয় হলো। বেচারা তো আর শখ করে অনুনয়-বিনয় করেনি। অস্বস্তি লাগছে বলেই তো করেছে। আহারে লতাটা। মায়া লাগল ভীষণ। খুব সাবধানে আমার টান লাগা হাত দিয়েই তাকে এক রকম পাঁজকোলা করে শুইয়ে দিলাম। অনেক কসরত করে পিঠের নিচ দিয়ে সিট বেল্ট ঘুরিয়ে বাঁধতে গিয়ে ঘাম ছুটে গেল। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঘাম মুছে গাড়ি থেকে বেরিয়ে আসব। লতা আউ করে উঠল। থতমত খেয়ে থেমে গেলাম। লতার কোথাও লেগেছে কিনা বুঝতে পারছি না। তারপর চোখে পড়ল শার্টের বোতামে পেঁচিয়ে আটকে পড়া সোনালি চুল। দেখছি, দেখছি বলে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে চুল গেল আরও পেঁচিয়ে। গেরোটা ভালো করে দেখতেও পাচ্ছি না। চশমাটাও ড্যাশবোর্ডের ওপরে রাখা। হাইপারমেট্রোপিয়া আছে। বেশি কাছের জিনিস ঝাপসা দেখি। লতা এখন ঝাপসা এক অবয়ব। কেন যে টি শার্ট বদলে ভদ্রগোছের এই শার্ট গায়ে চাপিয়ে আসলাম। টি শার্টের কোনো বোতাম নেই। বোতামের বড়শিতে কোনো মৎস্যকন্যাও আটকে পড়ে না। বড় নখও নেই যে সূক্ষ্ম হাতে চুলগুলো বের করে আনব বোতাম ঘরের ফাঁদ থেকে। এদিকে ঘাড়ে লতার গরম নিশ্বাস পড়ছে। আচ্ছা, কুকুরটা যদি আসলেই ওয়্যারউলফ হয়, তাহলে লতা আবার ড্রাকুলা নয় তো? এত কাছে পেয়ে ঘাড় মটকে আমার এবি পজিটিভ রক্ত সব লোপাট করে নেবে নাতো? কী সর্বনাশ! লতার চুল থেকে তীব্র ল্যাভেন্ডারের ঘ্রাণ আসছে। কোথায় গেল কালকের ব্যান্ডেজ ব্যান্ডেজ ঘ্রাণ? মাতাল মাতাল লাগছে। লতা কিচিরমিচির করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না। কান ঝাঁ ঝাঁ করছে। নিরুপায় হয়ে ফ্রাউ কেলনারকে ডাকলাম। তার আপেল কাটার ছুরিটা এখন ভীষণ দরকার।

ঘ্যাচাং…! ফ্রাউ কেলনার বাতাস ফুঁড়ে উদয় হয়ে গাছের ডালাপালা কাটার দুই হাত লম্বা কাঁচি দিয়ে লতার এক ফালি চুল কেটে দিয়েছেন। তার মুখে বিজয়ের চওড়া হাসি। বললেন, বাগানের জন্য কাঁচিটা কালকেই কিনেছি। গাড়ির ব্যাক ডালা থেকে আর নামানো হয়নি। কী দারুণ কাজে লেগে গেল, তাই না, অনীক?

জবাব না দিয়ে অনীক মিয়া তখন খোলা বাতাসে হা করে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। ফ্রাউ কেলনারের ইনহেলারটা পাওয়া গেলে মন্দ হতো না। আরে, হাতের মুঠোয় কী? মুঠো খুলতেই দখিনা এক দমকা বাতাস এসে চুলগুলো উড়িয়ে নিয়ে গেল। লতার সেই এক ফালি চুল কোন ক্ষণে কীভাবে এসে যে হাতের মুঠোয় বন্দী হয়েছে, জানা নেই। হাত বাড়িয়ে আবার ধরতে চাইলাম। কিন্তু আঙুলের ফাঁক গলে ঝিকমিকিয়ে কী এক আঁধারে মিলিয়ে গেল সোনালি রেশমগুলো। ঠিক জোনাকির মতো। রুদ্ধশ্বাসে মুগ্ধ হয়ে দেখলাম সেই রেশমি ঝিলিক। চাঁদের আলোয় লেখা এই ছোট্ট গল্পটা আমি ছাড়া আর কেউ জানল না।

ফ্রাউ কেলনার হাঁক দিলেন, কি অনীক, এখানেই বাড়িঘর করে থেকে যাবে নাকি? লক্ষ্মী ছেলের মতো গাড়িতে এসে বস। নইলে গেলাম আমরা তোমাকে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিন স্টার্টের শব্দ। পড়িমরি করে এসে বসলাম। আড়চোখে পেছন ফিরে দেখি লতা আবার ঘুমিয়ে কাদা। নাক ডাকাও চলছে পাল্লা দিয়ে। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো ঘুমিয়ে থাকা লতা যেন রূপকথার সেই রাজকন্যা। সোনার কাঠি আর রুপার কাঠির পাহারায় যাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে অনন্তকাল ধরে। যে রাজকন্যার ঘুম আর ভাঙে না, রাজপুত্রের চোখে পলক আর পড়ে না…।

সিট বেল্ট বাঁধার সময়টুকুও পেলাম না। হ্যাঁচকা টানে ছিটকে পড়ার দশা। ফ্রাউ কেলনার একবারও ডানে বামে না তাকিয়ে, কোনো রকম ইন্ডিকেটর না দিয়ে জোরসে এক্সিলেটর চেপে ধরেছেন। আতঙ্কে সিঁটিয়ে গেলাম। লাফ দিয়ে গাড়ি একদম মাঝ রাস্তায়। সত্তর লেখা সাইনবোর্ড দেখিয়ে মিনমিন করে বললাম, একটু কী আস্তে চালানো যায়? ফ্রাউ কেলনার একটা দুর্বোধ্য ক্রূর হাসি দিয়ে ঘোষণা দিলেন যে আজকে রাতে তিনি তার বয়সের চেয়ে কম গতিতে গাড়ি চালাতে নারাজ। ওদিকে গতির কাটা এক শ পেড়িয়ে গেছে। আমি ঘোর অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে আছি এই ক্ষ্যাপা অতিমানবীর দিকে। আর ফ্রাউ কেলনারের নিরীহ গোলগাল কালো ফক্সওয়াগানটা হঠাৎ টকটকে লাল একটা খুনে ফেরারি হয়ে যেন অদৃশ্য সব পোরশে-মাজ্জারাতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বনপথের আঁধার ফুঁড়ে উড়ে চলছে দূর অজানায়। (চলবে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।

আগের পর্ব ১০

পর্ব ৯

পর্ব ৮

পর্ব ৭

পর্ব ৬

পর্ব ৫

পর্ব ৪

পর্ব ৩

পর্ব ২

পর্ব ১