ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ট্রেনে করে ফিরছি।হঠাৎ ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই দেখলাম কেউ একজন ব্যস্ত হাইওয়ে ধরে আনমনে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছেন।সাইকেলটা খুব একটা ফ্যান্সি না,খুবই কমদামি টাইপের।বাইসাইকেলটা কাছাকাছি আসতেই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম এর চালক একজন মধ্যবয়সী জার্মান ভদ্রলোক যাকে আমি চিনি।এই ভদ্রলোকের নাম ডক্টর উভে ক্লাভিটার।জার্মান,ইংরেজি ও আমেরিকান সাহিত্যে ডক্টরেট করা এই ভদ্রলোক শিক্ষকতা করেছেন ব্রিটেনের ক্যামব্রিজ আর আমেরিকার সাউথ ক্যারোলিনা ও সেন্ট্রাল মিশিগান ইউনিভার্সিটিতে।

প্রফেসর ক্লাভিটারকে চেনার আরেকটি কারণ হলো কিছুক্ষণ আগেই আমি তাঁর ক্লাস করে ভার্সিটি থেকে বের হয়েছি।ক্লাস শেষ করে আমি ফিরছি ট্রেনে করে আর তিনি সাইকেলে।জার্মানিতে একজন ইউনিভার্সিটি প্রফেসরের বার্ষিক গড় আয় প্রায় ৮০ হাজার ইউরো যা বাংলাদেশি টাকায় অবশ্যই ৮০ লক্ষ টাকার ওপরে।প্রতি মাসে প্রায় ৭ লক্ষ টাকা কামানো ভদ্রলোক ৭ হাজার টাকার সাইকেলে করে বাসায় ফিরছেন।

বাংলাদেশে হলে বিষয়টা খুবই অস্বাভাবিক লাগতো।কিন্তু দেশটা জার্মানি বলেই এটি একটি খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।৮ কোটি মানুষের এই দেশে ৭ কোটিরও বেশি বাইসাইকেল আছে।বাইসাইকেলের প্রতি জার্মানদের এ এক অন্যরকম ভালোবাসা।অথচ যোগাযোগ ব্যবস্থা আর পরিবহণের জন্য জার্মানি বিশ্বের কাছে এক রোল মডেল।এক্ষেত্রে আমেরিকাও জার্মানির থেকে অনেক পিছিয়ে।আমার পরিচিত যতো আমেরিকান এখানে আছে প্রায় সবাই আমাকে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।জার্মানির বাস,ট্রেন,ট্রাম এতটাই আধুনিক আর ইন্টারকানেক্টেড যে মাঝে মাঝে ভাবতেই অকল্পনীয় লাগে।আর গাড়ির কথা তো বলাই বাহুল্য। প্রথমবার জার্মানিতে এসে যে ট্যাক্সিতে উঠেছিলাম সেটি ছিলো একটি মার্সিডিজ। শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে ৫/১০ মিনিটের জন্য যে বাসগুলো ব্যবহার করি তার প্রায় সবগুলোই মার্সিডিজ ব্র‍্যান্ডের।জার্মানি তো গাড়ির দেশ।সারাবিশ্বের গাড়ির বাজারে রাজত্ব করা অওডি,বিএমডব্লিউ,মার্সিডিজ বেঞ্জ,পোরশা,ভক্সওয়াগন এর গাড়িগুলো তো জার্মানরাই তৈরি করে।তাই বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসাবে স্পিডলিমিটবিহীন হাইওয়ে অটোবান যে জার্মানিতেই থাকবে তা আশ্চর্যজনক কোনো বিষয় না।

কিন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো জার্মানি সেই দেশ যেখানে প্রতিটি মেইন রোডে বাইসাইকেলের জন্য আলাদা লেন বা জায়গা বরাদ্ধ আছে।বাংলাদেশে আমি যে এলাকা থেকে এসেছি সেখানে কলেজ পড়ুয়া ছাত্রদের থেকে শুরু করে প্রায় সবারই মোটরবাইক আছে।রাস্তায় বের হলে সেখানে মানুষের চেয়ে বেশি মোটরবাইক দেখা যেতো।আর জার্মানিতে মোটরবাইকই একমাত্র পরিবহণ যা আমি রাস্তায় সবচেয়ে কম দেখি।কেউ সাইকেল চালিয়ে গেলে বাংলাদেশের মানুষ তাকে খুবই নিচু চোখে দেখে।হয়তো তাকে নিয়ে হাসি-তামাশাও করে।কারণ আমরা অনেক জাতে উঠে গেছি।এখন আর সাইকেল চালানোর দিন নেই।

জার্মানরা এখনো পুরোনো দিনেই আছে।এজন্যই তারা সব দিক দিয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে।নতুন মডেলের মোটরবাইকের বদলে ওরা এখনো নতুন মডেলের বাইসাইকেল কেনার কথা ভাবে।তারা জানে সাইকেল পরিবেশগত আর স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রাস্তায় বের হলেই টের পাওয়া যায় সাইকেলের প্রতি জার্মানদের ভালোবাসা।সব বয়সের আর সব পেশার মানুষরা চালাচ্ছে বাহারি মডেলের বাইসাইকেল।

বেশিরভাগ শহরের সাইকেল স্ট্যান্ডগুলোর বিশালতা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি এতো সাইকেল চালায় কে।রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কখনো কখনো পিছন থেকে আসা কোনো বাইসাইকেলের রিং এর আওয়াজ হয়ে যায় মিনি হার্ট-অ্যাটাকের কারণ।আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো এক অপ্সরী যেন চালিয়ে যাচ্ছে এই অতী সাধারণ বাইসাইকেল। হ্যাঁ,জার্মান মেয়েরাও বাইসাইকেল চালানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই।

এসব দেখে প্রায়ই নিজেকে প্রশ্ন করি-“এতো এতো গাড়ি থাকতে বাইসাইকেলের সাথে জার্মানদের এতো প্রেম কিসের?”
কোনো উত্তর না পেয়ে মনে মনে ভাবি- প্যাডেলে সবসময় পা আছে বলেই হয়তো এই জাতির সামনে এগিয়ে চলা কখনো থেমে নেই।কখনো থেমে থাকবে বলেও মনে হয় না।

৭ জুন, ২০১৮
বুখোম

Image may contain: bicycle, tree and outdoor