শিরোনাম দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ব্যঙ্গাত্নক রসরচনা “শিম কীভাবে রান্না করতে হয়” বইয়ের সাথে আমার লেখার কোন মিল নাই, তবে শিরোনামটি রসিক সৈয়দ সাহেবের বই থেকেই ধার করেছি। 

চাতক পাখি যেমন গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়ে মরে এক ফোটা পানির তরে, বিবর্ণ বিদেশ বিভূঁইয়ে ব্যাচেলরদের জীবন সেই চাতক পাখির মত। বড় ভাই-ভাবীদের বাসায় একটিবার দাওয়াত পাওয়ার জন্য “মোরা যুদ্ধ করি” ভাব। কিন্তু সকলের ভাগ্যে সেই শিকে ছিঁড়ে না। এর জন্য দরকার বহু ত্যাগ তিতিক্ষা। এই তিতিক্ষার আরেক নাম “তৈলমর্দন”। এই কাজে যে পারদর্শী নয়, দেখবেন ডর্মের পাশের জন স্যুটটাই পরে বড় ভাইয়ের খৎনা দিবসে দাওয়াত খেতে যাচ্ছে কিন্তু আপনি এদিকে চুলোয় ভাত পুড়িয়ে সেই পাত্র ঘষছেন আর ললাটজল মুচ্ছেন। সেই ভাইদের জন্য দরদী এই আমি কিছু টিপস নিজে হাজির হয়েছি। যথাসময়ে যথাস্থলে এর ব্যবহারে বিফল হলে মূল্য ফেরত।

দাওয়াত দেওয়ানেওয়ালা যে বড় ভাই ভাবী বা ফ্যামিলি আছে, সর্বাগ্রে তাঁদের রাজনৈতিক বিশ্বাস সম্পর্কে ধারণা থাকা বাধ্যতামূলক। যেমন ধরুন, ভাইটি জামাতি ঘরানার হলে আপনার যে ব্যবহার হবে, ভাইটি আওয়ামী ঘরানার হলে ব্যবহার করতে হবে তার উল্টোটি। বুঝলেন না? বুঝিয়ে বলছি। ধরুন ভাইটি বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর বিচার চায়, তবু শুধু কিন্তু কিন্তু… করে, আন্তর্জাতিক মানের হচ্ছে না, ভারত পাকিস্তানের সীমান্তে দুইজন ভারতীয়কে পাকিস্তান জওয়ানেরা মারতে পারলে ভাইটির চোখে মুখে ঝিলিক দেখা যায়, যেকোন দেশের সাথে খেলায় সে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়, ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে চায় জামাতিরা গণহত্যা করেনি, বঙ্গবন্ধুর যে পরিণতি শেখ হাসিনারও একই পরিণতি হবে ভেবে দিন গুনে- তাহলে ধরে নেওয়া যায় ভাইটি জামাতি। এর সাথে দেখা হলেই প্রথমে লম্বা সালাম দেওয়া বাধ্যতামুলক, সাথে “ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহু” বলতে ভুলবেন না। ভাইটি সালামের উত্তর দেয়ার আগেই তাঁকে কথা বলার কোন সুযোগ না দিয়ে, কোন কারণ বা প্রসঙ্গ ছাড়াই আপনাকে শুরু করতে হবে এভাবে, ”স্বৈরাচার হাসিনাকে হঠাইতে সেনাবাহিনীর ভাইয়ারা কি সত্যিই এগিয়ে আসবে না? দেশ ও জাতির প্রতি তাদের কি কোন দায়িত্ব নেই? দেশটা দিন দিন ইন্ডিয়া……”। দেখবেন ভাইটির মুখে সুখ সুখ ভাব, চোখ আর ঠোঁটের কোনা হালকা কাঁপছে, অর্থ্যাৎ আপনার তিতিক্ষা (তৈলমর্দন) কাজে দিয়েছে। এরপর ভাইটির আর একটি কথাই বলার আছে, “চল বাসায় যাই, দেখি তোমার ভাবী কি রান্না করছে। পাকিস্তানি বাসমতী চাল কিনেছি সেদিন, পাকিস্তানি বাসমতী চালের ভাত আমার কাছ এত ভাল লাগে এটি ছাড়া একদিনও চলে না!”

ভাইটি যদি আওয়ামী ঘরানার হয় তাহলে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যেতে হবে আপনাকে। ক্ষমতায় থাকা মানুষকে সুখী করা সহজ। তাঁদের সব অবৈধ কাজকে বৈধ করে দিবেন, ব্যস হয়ে গেল।

দেখা হলেই দাদা বলে ডাক দেবেন। ডাকে মায়া থাকতে হবে, যেমন দাদাআআআআআ। অবস্থা বুঝে আ আ একটু বাড়িয়ে-কমিয়ে দেবেন। কথায় কথায় বলতে পারেন, “ভোটে যদি সামান্য দুই নম্বরি থাকেও সেটা জায়েজ আছে, রাজাকারদের বিপক্ষে সবই জায়েজ, ওরা বলে বাইশ হাজার কোটি টাকা পাচার হইছে, কোন দেশে হয় না পাচার, আচ্ছা বলেন তো দাদা বাইশ হাজার কোটি কোন টাকা, দেশ তো এখন মধ্যম আয়ের, স্বাধীনতার চেতনাই আসল কথা, একাত্তুরে কত রক্ত……!” এরপর ভাইটি আপনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকবে, আপনি দ্বিধান্বিত হবেন কি হতে যাচ্ছে ভেবে। ভাই হঠাৎ ভাবীকে ডাক দেবে, “বেদানা, বেদানা কই গেলা, সেদিন ইন্ডিয়ান শপ থেকে যে অমৃত নিয়া আসলাম সেইটা পুরোটাই ওরে দেও।”    

এসব ব্যাপারে আপনাকে ক্রিয়েটিভ হতে হবে। খুঁজে খুঁজে তন্ন তন্ন করে বের করতে হবে ভাই কিসে কিসে খুশি হয়। আরেকটা অতি জরুরী বিষয় ওই শহরে ভাইটির শত্রু (Rival) কে সেটি খুঁজে বের করা। ধরুন সেই শত্রু ভাইটির নাম ডিপজল। কথায় কথায় এই ডিপজলের গীত গাইতে হবে ভাইটির সামনে। ভাইটির বাসায় একদিন খেতে খেতে বলবেন, “ভাই, আপনি একবেলা যা রান্না করেন, ডিপজল ভাইয়ের সেটা একমাসের খরচা, দুনিয়ার কৃপণ ডিপজল ভাই। সে যে দিক দিয়ে হেঁটে যায়, আমি দেখলে অন্য পথ ধরি। ডিপজল ভাই ক্যামন জানি। যুক্তি বোঝে না, হাঁটে হেলেদুলে, কথা বার্তায় একেবারেই গেঁয়ো, দলান্ধ”। এর সাথে যোগ করবেন, “ডিপজল ভাই যদি আপনার লেভেলে আসতে চায় তাহলে তাঁকে আরেকবার জন্ম নিতে হবে”। এরপর ভাইটি বউয়ের দিকে তাকাবে, কড়াভাব নিয়ে বউকে বলবে, “দেখছ না ওর পাত খালি, মুরগীর সবচেয়ে বড় রানটা ওরে দেও”।

ভাইটিকে কোনভাবেই রাগানো যাবে না, তাঁর যত ভুলই থাক, অন্যরা সেই ভুল নিয়ে যত হাসাহাসিই করুক, আপনিও হাসবেন কিন্তু ভাইটির অন্তরালে। সামনে গিয়ে মোসাহেবি ভাব নিতেই হবে সফল হতে হলে। মাঝে মাঝে বাজার করতে হেল্প করবেন, ঘর দুয়ার পরিষ্কার করতেও কুণ্ঠাবোধ করতে মানা। আরও একটা জরুরী ব্যাপার হল, অন্যদের সামনে ভাইটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করতে হবে, সেসব সত্য নাকি মিথ্যা সেটা ভাবলে সফলতার দুয়ারে পড়লো কাঁটা! আপনার মুখে থাকবে তেলতেলে হাসি, অন্তরে একবেলা খাওয়ার চিন্তা। ভাইটি কত জ্ঞানী, সে কত দামি দামি কথা বলে ও জামাকাপড় কেনে, সপ্তাহে কতদিন গরু খায়, ভাবীর সাথে তাঁর কত গভীর প্রেম, সে কত সমাজ দরদী এসবকিছু আপনার মুখে মুখে ফিরতে হবে সবার সামনে। তবে সেখানে যদি ডিপজল ভাইটি উপস্থিত থাকে তাহলে আপনাকে একটু রয়ে সয়ে বলতে হবে, যদি আপনি ডিপজল ভাইয়ের থেকেও দাওয়াত পেতে চান। মনে রাখবেন, ভুল জাগায় ভুল বকলে দুই জাগাতেই বঞ্চিত হবেন। সেদিন আমাকে দোষ দিলে চলবে না। একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের দাওয়াত মিস।

এবার আসি ভাবীদের কীভাবে তৃপ্তি দিবেন। ধরুন কোন একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভাবী বিধবার সাদা শাড়ী পরেছে। কিন্তু ভুলেও বলতে যাবেন না আপনাকে কেমন জানি বয়স্ক বয়স্ক লাগছে। বলতে হবে, ভাবী আপনাকে অনেক রঙ্গিন লাগছে, টিপটা যা মানিয়েছে না… আপনার পোশাক সব থেকে গর্জিয়াস। পৃথিবীতে এমন কোন ভাবী নেই যাঁদের সুন্দরী বললে খুশি হয় না। সুতরাং ধ্রুপদী এই দাওয়াই অবশ্যই ব্যবহার করবেন। দেখবেন ভাবীরা খুশিতে আপনার উপর এলিয়ে পড়ছে। 

এক্ষেত্রে আরেকটা কাজ খুবই সূক্ষ্মভাবে আপনাকে করতেই হবে। অন্যভাবীদের নামে হালকা দুর্নাম। মনে রাখবেন ভাবীদের সুনির্দিষ্ট কোন শত্রু নাই, একজন ভাবীর শত্রু দুনিয়ার সব ভাবী। আপনার ভাবীর কাছাকাছি বয়সের আরেকটা ভাবীর নামে বলবেন, “দেখছেন ভাবী, চমচম ভাবী ক্যামন শাড়ি পড়েছে? ব্লাউজের নিচ দিয়ে থলথলে ভুঁড়ি ঝুলে পড়েছে, অনেক বয়স্ক লাগছে, শাড়ির রঙটাও দেখেন কেমন কিটকিটে খ্যাত! যেন পুরান ঢাকা থেকে এসেছে”। সাবধান, এই তুলনা কোন বয়স্ক ভাবীর সাথে করতে যাবেন না, নইলে হিতে বিপরীত হবে। ভাবীর যদি বাচ্চা থাকে, তাহলে আপনার কোল থেকে নামানো যাবে না। বাচ্চা যতই গুলুগুলু ওজনদার হোক না কেন, কোলে নিতেই হবে। এটা আপনার দাওয়াতের ইনভেস্টমেন্ট! মাঝে মাঝে খেয়াল করবেন ভাই-ভাবী কখন তাকাচ্ছে আপনাদের দিকে, তখনই টুক করে বাচ্চাকে একটা কিস মেরে দেবেন। আপনার প্রতি ভাইয়া ভাবীর শুভদৃষ্টি অনেক বেড়ে যাবে। পরের হপ্তায় আপনার একক নিমন্ত্রণ ঠেকায় কার সাধ্যি!

মোট কথা আপনাকে হতে হবে গেম অব থ্রোনসের সেভেন কিংডমসের রাজসভার সেই পিটার বেইলিশ অথবা কানকথার উস্তাদ নপুংসক ভ্যারিসের মত, যে কিনা ক্ষমতাবানদের শুধু হ্যাঁ হ্যাঁ করে যাবে, ঝোপ বুঝে কোপ মারবে আর নিজের স্বার্থ হাসিলে অচল থাকবে। তবে শুধু বড় ভাই ভাবীদের মধ্যেই আপনার লক্ষ্যকে স্থির রাখা যাবে না, সমবয়সী বন্ধু সহপাঠীদের সাথেও আপনাকে হতে হবে কৌশলী। কূটনীতিতে ছাড়িয়ে যেতে হবে মৌর্য্য সম্রাটদের রাজ-উপদেষ্টা, প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ-দার্শনিক চাণক্যকে। সর্বদা কমিউনিটিতে আপনাকে ভিখেরীর ভান ধরে থাকবে হবে, সবাইকে বুঝাতে হবে এই ইহজগতে আপনার থেকে অভাবী আর দ্বিতীয়টি নেই। এতে করে কেউ আপনার থেকে টাকা ধার চাওয়ার দুঃসাহস তো দেখাবেই না, উল্টো মাঝে মাঝে রেঁধে খাওয়াবে। আপনার লজ্জা তো দূরের কথা, সামান্য ইজ্জতও থাকা যাবে না, চরম অপমানেও হাসিমুখ করে থাকতে হবে।

এতকিছুর পরেও যদি দেখেন ভাইয়া-ভাবী-সহপাঠীরা আপনার প্রতি ঠিক সুবিচার করছে না, আপনার সামনেই অন্যরা গোঁফে তেল দিতে দিতে দাওয়াত খেতে যাচ্ছে তাহলে শেষ চেষ্টা হিসেবে আপনাকে ডেবোরা পার্কার ও মার্ক পার্কারের সাড়া জাগানো বই “সাকিং আপঃ এ ব্রিফ কনসিডারেশন অব সাইকোফ্যান্সি” (Sucking Up: A Brief Consideration of Sycophancy) বইটা পড়তে হবে। এই বইয়ে সমাজের স্তাবকদের (Sycophant) মনস্তত্ব, তাঁদের মস্তিষ্ক কীভাবে ফাংশন করে, পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষেত্রে তারা গিরগিটির মত কী করে রং বদলায় সেসব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই বই পড়েও কাজ না হলে আপনার ভবিষ্যৎ বিধাতার পক্ষেও আঁচ করা সম্ভব নয়। আপনার বাংলাদেশে গিয়ে এক সদস্য বিশিষ্ট রাজনৈতিক দল করার চেয়ে ভাল কোন বুদ্ধি আপাতত দিতে পারছি না।


ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন
বার্লিন থেকে
৬ জানুয়ারি ২০১৯