ফ্রাউ কেলনারের পেটমোটা ব্যাগটা কোলে নিয়ে বিরস মুখে বসে আছি মেয়েদের ট্রায়াল রুমের সামনে। ফেরার পথে ফ্রাউ কেলনার আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে একটা শপিং মলে নিয়ে এসেছেন। মিউনিখ পৌঁছাতে রাত আটটা পেরিয়ে যাবে। তাই টুকটাক ডিম-রুটি ইত্যাদি কেনাকাটা সেরে নেবেন। কালকে আবার কীসের যেন বন্ধ। কিন্তু কীসের ডিম-রুটি কেনা, ফ্রাউ কেলনার দুই হাত ভর্তি কাপড় নিয়ে ভেতরে গেছেন। যদিও পরিষ্কার নোটিশ টানানো আছে, তিনটার বেশি নেওয়া যাবে না। আমার মতো আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী অলস বসে হাই তুলছেন কিংবা ফোনে ভিডিও গেম খেলছেন। চেহারায় গাঢ় হতাশা। নারী জাতির খপ্পরে পড়লে যা হয় আর কী। নাহ, এমন ভুল করা যাবে না কখনো। ভাবতে ভাবতে ব্যাগটার দিকে তাকালাম। এক পকেট খোলা। হাল ফ্যাশনের ঝাঁ চকচকে স্মার্টফোনটা উঁকি দিচ্ছে। চেইন টানা আরেক পকেটে পিস্তল সেবাস্তিয়ান ঘুমাচ্ছে। লতা কী এক মহিলার সঙ্গে থাকে রে বাবা!

আচ্ছা, লতা এখন কী করছে? নিশ্চয়ই কাঠমুন্ডু নামের ধরিবাজ বিড়ালটা পায়ের কাছে নিয়ে বসে আছে ড্রয়িংরুমে। হাতে কী গরম এক মগ কফি? রেশমের মতো চুলগুলো কী কপাল ঢেকে নেমে এসেছে? শেষ বিকেলের আলোয় লতাকে আরেক পৃথিবীর অপ্সরীর মতো লাগার কথা। সবুজ মণির চোখ আর সোনালি এলোমেলো চুলে একাকার লতার মুখটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছি যেন। প্রতিমা গড়ার পর কারিগর যেমন দেখে। কল্পনায় ডুবে যেতে ভালো লাগছে।

বাঁধ সাধল সোমালীয় কী ইথিওপীয় চেহারার এক অল্পবয়সী মা। আমার বাদামি চামড়া দেখেই কিনা জানি না, সহজভাবে এগিয়ে এসে বললেন, ‘কিছু মনে না করলে দুই মিনিটের জন্য ওকে একটু দেখবেন? আমি এই দুটো জামা ট্রাই করে দেখব খালি। যাব আর আসব।’ হ্যাঁ-না কিছু বলার আগেই তিনি তার পাঁচ-ছয় বছরের ছেলেটাকে ধরিয়ে দিয়ে এক হাত উপচে পড়া জামাকাপড় নিয়ে উধাও হয়ে গেলেন। এদিকে ফ্রাউ কেলনারও বেরিয়ে এসে তার দাঁতের এক পাটি টিস্যু পেপারে মুড়ে আমার হাতে গুঁজে দিয়ে গেলেন। প্রাইস ট্যাগের সুতা দাঁতে আটকে নাকি পুরো পাটি খুলে এসেছে। আমি পুরোপুরি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এক হাতে ফ্রাউ কেলনারের টকটকে লাল হাতব্যাগ আর আরেক হাতে তার দাঁতের পাটি আর হাঁটুর ওপর পাঁজি চেহারার পিচ্চিটাকে নিয়ে ‘অ্যাজ আ মেটার অব ফ্যাক্ট’ ভঙ্গিতে বসে আছি। নিজেকে দশভুজা দুর্গা মনে হচ্ছে। যেকোনো সময় প্রয়োজন মাফিক বগল ফুঁড়ে আরও গোটা আষ্টেক হাত বেরিয়ে আসতে পারে। বলা যায় না।

বলা নাই, কওয়া নাই, কোলে বসা ইঁচড়ে পাকাটা থাবা মেরে দুই কান ধরে ফেলে ডিবি পুলিশের মতো জেরা শুরু করল, ‘এ্যাই, সত্যি করে বল তো, তুমি কি আমার মায়ের বয়ফ্রেন্ড নাকি?’ তব্দা খেয়ে গেলাম। তাড়াতাড়ি জুতসই উত্তর দিলাম, ‘আরে কী যে বল না? আমার তো গার্লফ্রেন্ড আছে। দেখলে না দাঁতের পাটি দিয়ে গেল? এখন কান ছাড় তো প্লিজ।’ আড়াই ফুটি ডিবি ইন্সপেক্টর কানটা অ্যায়সা জোরসে মুলে দিয়ে কী মনে করে আবার দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দিল। তারপরই আবার নতুন যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। চুল-দাঁড়ি নিয়ে টানাহেঁচড়া চলছে। অতিষ্ঠ লাগছে রীতিমতো। কিন্তু কান মলা খাবার ভয়ে মুখ বুজে সয়ে যাচ্ছি। এর চেয়ে কাঠমুন্ডু বিড়ালও বোধ হয় ভালো ছিল। কেন যে আজকে মাঝপথে গাড়ি থামাতে রাজি হলাম ভেবে নিজেকে শাপ-শাপান্ত করছি।

এর মাঝেই বিকট প্রিং প্র্যাং শব্দে ফ্রাউ কেলনারের ফোনটা বেজে উঠল। প্রায় লাফিয়ে উঠলাম। লতার ফোন! কিন্তু ধরা কী ঠিক হবে? অন্যের ফোন। আর ধরবই বা কীভাবে। হাত দুটো ফ্রাউ কেলনারের দাঁত আর ফাজিল ছেলেটার কাছে আটক। বগল ফুঁড়ে হাত বেরোনোর এই তো মোক্ষম সময়। কিন্তু কই, হাত তো গজাচ্ছে না। এদিকে পিচ্চি নিজের কপাল দিয়ে আমার কপালে একটা বেদম ঢুঁ মেরে দিয়েছে। মুহূর্তেই শপিং মলটা সর্ষে ফুলের খেত হয়ে গেল। কিন্তু সর্ষে খেত থেকে বেরোবার আগেই সে আচমকা ধাক্কা মেরে দৌড় দিয়েছে মাকে বেরোতে দেখে। ধাক্কা লেগে ফ্রাউ কেলনারের দাঁত ছিটকে পড়ে দূরের ম্যানিকুইনের বেগুনি রঙের ইভিনিং গাউনের নিচে গায়েব হয়ে গেল।

ঝুপ করে বসে টপ করে সরিয়ে আনতে হবে দাঁতের পাটিটা। কারও চোখে পড়ার আগেই। নইলে পারভার্ট গোছের কিছু ভেবে বসতে পারে লোকজন। এমন সময়ে, ‘কিছু কি খুঁজছেন? সাহায্য করতে পারি?’ ঝট করে উঠে দাঁড়ালাম। হাতের টিস্যুতে লুকানো ফ্রাউ কেলনারের যত নষ্টের গোড়া দাঁত। পাওয়া গেছে। আল্লাহ বাঁচিয়েছে! আমতা-আমতা করে কী যেন বলতে যাচ্ছি আর ফ্রাউ কেলনার বেরিয়ে এলেন ট্রায়াল রুম থেকে। ‘অনীক, আমার দাঁত কই, ব্যাগ কই? আর ম্যানিকুইন জাপটে ধরে কী করছ ওখানে?’ দেখলাম, আসলেই তো! ম্যানিকুইনের কোমর ধরে ভর দিয়ে উবু হওয়া থেকে উঠে দাঁড়িয়েছি। মাথাটা হেঁট হয়ে গেল একেবারে। যাতা সব কাণ্ডকারখানা আমার সঙ্গেই হয়? ধুস! সামনে দাঁড়ানো ভদ্রমহিলাকে অজস্রবার দুঃখিত দুঃখিত বলতে বলতে ব্যাগটা ছোঁ মেরে ফ্রাউ কেলনারকে এক রকম টানতে টানতে বেরিয়ে এলাম ওখান থেকে।

গাড়িতে বসে মনে পড়ল, লতা ফোন করেছিল। সে কথা বলতেই ‘কী বলল ও’, জানতে চাইলেন ফ্রাউ কেলনার। বললাম, আপনার ফোনে করেছিল। ধরি কী করে?’ ফ্রাউ কেলনার অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘তাহলে তোমার ফোন দিয়ে একবার খোঁজ নিলে না কেন? লতার কেমন বন্ধু তুমি? আজব ছেলে তুমি, অনীক!’ কেমন বন্ধু সেটা তো ভেবে দেখিনি। তবে আজব তো বটেই, কারণ লতার নম্বরটাই তো জানা নেই। নেওয়াও হয়নি এত ঘটনা আর অঘটনের ভেতর। লতাও তো জানতে চায়নি। তাই আমিই বা চাই কী করে? এই আড়ষ্টতা আমার আজীবনের। আমি ফ্রাউ কেলনারের কথার উত্তর না দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে চুপচাপ ড্রাইভিংয়ে মন দিলাম।

তারপর পেরিয়ে গেছে এক, দুই, তিন দিন করে এক সপ্তাহ। আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল বেঁচে থাকলে নির্ঘাত মাথা বরাবর অ্যানালগ ফোনের হাতল ছুড়ে মারতেন। যোগাযোগের এই স্বর্ণযুগে আমি পড়ে আছি ঘ্যাংর ঘ্যাং কুয়ার ব্যাঙ হয়ে। নাম না জানা একটা বিচিত্র অপেক্ষা নিয়ে সকালের রোদ মেখে, সন্ধ্যার তারা গুনে পার করে দিচ্ছি দিনগুলো। আর থেকে থেকে খালি মনে হয়, এই শহরে এত গাছ, এত সবুজ, তবুও যেন অক্সিজেনে বড় অভাব। আরও কিছু লতাপাতা থাকলে বোধ হয় ঠিকঠাক শ্বাস নেওয়া যেত।

চাকরিটা শুরু হতে আরও এক সপ্তাহ বাকি। ব্যস্ততা ভালো ওষুধ। কিন্তু ওষুধের অভাবে আপাতত দৌড়াদৌড়ি করে কাটাচ্ছি। সকাল-বিকেল দুই বেলায় দৌড়াই। আগে দৌড়াতাম নদীর পাড়ে। এখন দৌড়াই লতা আর ফ্রাউ কেলনার যেই বাড়িটায় থাকেন, সেই ব্লকটার চারদিকে। সেই তো আবার গ্রহ আর উপগ্রহ খেলা। এই কক্ষপথে কখন যে কীভাবে নিজের অজান্তে আটকে গেছি, জানা নেই। বাড়িটার সামনে বিশাল চেরি গাছ। তাতে দাঁড়কাকের বাসা। কাকের বাসায় তিনটা ডিম। সব মুখস্থ হয়ে গেছে। ফ্রাউ কেলনার পঁইপঁই করে বলে দিয়েছিলেন, যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করে যাই এক দিন। ইচ্ছে করেই যাইনি। তার বদলে ঘর অন্ধকার করে বসে থাকি লতার ক্লিপটা হাতে নিয়ে। কিংবা মানিব্যাগটা খুলে শ খানেকবার দেখি ছোট্ট নীল উলের বলটা। লতার সঙ্গে প্রথম যেদিন দেখা হলো, সেদিন আমার হাতঘড়িতে আটকে ওই যে তার নীল টুপি থেকে উলের সুতাটা খুলে এসেছিল। হাতের আঙুলে বল বানিয়ে সযত্নে রেখে দিয়েছি মানিব্যাগের আশ্রয়ে।

সাত দিনের মাথায় মাথাটা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেল। প্রতি রাতে ডিনার সেরে এক কাপ চা খাই। আজকে চা খাবার বদলে মানিব্যাগ থেকে উলের বলটা বের করে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি দিয়ে কোৎ করে গিলে ফেলতে গেলাম। ফ্ল্যাটের রাশিয়ান ছেলে ভ্লাদিমির কিচেনে কী একটা নিতে এসে দেখে বলটা মুখে পুরে ফেলছি প্রায়। ‘কী খাচ্ছ তুমি? বিয়ার-ওয়াইন ডিঙিয়ে এক লাফে লাল-নীল বড়ি? বাড়িওয়ালাকে জানিয়ে দেব কিন্তু।’ কথাটা যদিও পানির মতো ভদকা গিলতে থাকা ভ্লাদিমিরকে মানায় না। অভয় দিয়ে বললাম, ‘আরে ধ্যাত, কী বল, বনবন খাচ্ছি।’ বনবন লজেন্সের জার্মান নাম। কিন্তু ভ্লাদিমির নাছোড়বান্দা, ‘হাতে দাও, আমিও একটা খাই।’ বাধ্য হয়ে হাতের মুঠ খুললাম। অবাক ভ্লাদিমির বলটা আলতো করে তুলে পরখ করে দেখতে দেখতে বলল, ‘ঘটনা কী, ম্যান? ঝেড়ে কাশো তো? কিছু একটা বিহাইন্ড দ্য সিন আছে মনে হচ্ছে, হুম?’ ‘সিন টিন কিছু নেই, সরো তো, দৌড়াতে যাব’। বলে উঠে আসতে গেলাম আর ব্ল্যাক বেল্টওয়ালা ভ্লাদিমির ক্যারাটের এক প্যাঁচে ধরাশায়ী করে মেঝেতে ফেলে দিল। এই কাজ সে প্রায়ই করে। কাছের স্পোর্টস ক্লাবটায় একসঙ্গে যাই আমরা। অন্যদিন হলে আমিও একটা ফিরতি মার দিতাম। নয়তো অন্তত ব্লক করে মারটা আটকে দিতাম। আর আজকে এই চীনা জোঁকের হাত থেকে কোনোমতে ছুটতে পারলে বাঁচি। কিন্তু চাপাচাপি আর বেধড়ক মারামারির পাল্লায় পড়ে শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে বাধ্য হলাম, ‘থাম, থাম, বলি, বলি।’

আধা ঘণ্টা পর ভ্লাদিমির আবার একটা ঘুষি মারল। পেট বরাবর। বাম কিডনি ইন্না লিল্লাহ বলে মারা গেল মনে হলো। ‘অনীক, এটা তোমার গাধামির জন্য। আর কী কী গাধামি করে বেড়াচ্ছ দেখি তো।’ তারপর ফ্রিজ খুলে আবিষ্কার হলো দুই লিটারের আধ খাওয়া আইসক্রিমের বাক্স। টেবিলের ওপর পাওয়া গেল ল্যাপটপে চলতে থাকা ‘ব্রেকফাস্ট অ্যাট টিফানিস’। হেডফোন লাগিয়ে দেখছিলাম। এই নিয়ে সাতবার। ভ্লাদিমির এবার সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দৌড়াতে না যাবে বলছিলে, যাও। আর ফ্রাউ কেলনারের কাছ থেকে লতার ফোন নম্বরটা নিয়ে আসবে। নইলে বাসায় ঢোকা বন্ধ। এমন লুতুপুতু, কেঁচো-শামুক কোনো ছেলের এই বাসায় থাকার দরকার নাই।’ ভ্লাদিমিরের শেষ কথাটা গায়ে বিছুটির মতো লাগল। আমি কেঁচো!

কেঁচো থেকে এখন আমি এক লাফে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হয়ে যাব। গতি বাড়ালাম। বাইরে শান্ত রাত। আকাশটা তারায় তারায় ছেয়ে যাওয়া। চেরি গাছগুলো থেকে বেসামাল মিষ্টি ঘ্রাণ উড়ে আসছে। লতার বাসার কাছে এসে আস্তে আস্তে গতি কমিয়ে দিলাম। পায়ের শব্দে দাঁড়কাক দুটো বিরক্ত হয়ে গাছ থেকে উঁকি দিল। তাদের ছানা ফুটে গেছে। সকালেও ডিম দেখে গেছি। আরে, একি? লতার ঘরটায় আলো! স্বচ্ছ সাদা লেসের পর্দার ওপাশে দুটো ক্রাচ। জানালার সামনে ভর দিয়ে রাখা। বুকের ভেতর ধপ করে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিকল হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে অচল দাঁড়িয়ে পড়লাম। (চলবে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।