আমি অনিক। সাদামাটা বৈচিত্রহীন। একঘেয়ে চরিত্র। তার উপর চেহারায় ভবঘুরে ভাব প্রকট। শুধু ভাবে নয়, আমি আসলেই ভবঘুরে। টাঙ্গাইলের ছেলে। স্কুল পেড়িয়েই ঘরছাড়া। ঢাকায় এসে পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি মেসে থেকে নটরডেমে পড়েছি। তারপর বুয়েট আর বাউন্ডুলে হলজীবন। মাস্টার্সের সুযোগে আবারো নতুন করে ভবঘুরের ঝোলা কাঁধে জার্মানির মিউনিখে উড়াল দেয়া। সেই পড়াশোনার পাটও চুকে গেছে দিনকয়েক হল। ভিনদেশী এই শহরে কপালগুনে একটা চাকরিও জুটিয়ে ফেলা হয়েছে। সামনের মাস থেকে কাজ শুরু। এ মাসটা তাই বেকার।
সময়ের অভাবে পড়ে থাকা কাজের একটা লিস্ট বানিয়েছি। লিস্টের তিন নাম্বারে আছে দাঁতের ডাক্তার দেখানো। আজকে সকাল সাড়ে দশটায় টারমিন। টারমিন মানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। জার্মানি আসা অবধি টারমিনে টারমিনে জীবন অতীষ্ঠ। ইউনিভার্সিটিতে থিসিসের প্রফেসরের সাথে দুই মিনিট কথা বলব। অফিসের দরজায় কড়া নেড়েই সেরে নেয়া যায়। কিন্তু না, তার জন্যেও টারমিন লাগবে। অতিমানবীয় প্রফেসর তার অতি ব্যস্ত ক্যালেন্ডার থেকে সপ্তাহদুয়েক পর দয়া করে সময় দিলেও দিতে পারেন। কিংবা নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, খুলবো, সবচেয়ে কাছের টারমিনই তিন সপ্তাহ পর। ঘোড়ার ডিম! মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়।
ভয় ভয় লাগছে। দাঁতের ডাক্তারের প্রতি সহজাত ভীতি কাজ করে। বছর দুয়েক আগে একরকম বাধ্য হয়ে গেলাম ডেন্টিস্টের কাছে। চারটা আক্কেল দাঁত একসাথে পাল্লা দিয়ে মাড়ি ফুরে ভীষণ বেকায়দায় বেড়িয়ে আসছে। পুরো আক্কেলগুড়ুম হয়ে গেলাম। এই ছাব্বিশ বছর বয়সে এত আক্কেল আমি কই রাখি, মাননীয় স্পিকার? যাহোক, ঠিক হল, দুই দফায় দুই দিনে দুটো করে দাঁত তোলা হবে। তো প্রথম দফার দিনে হাশিখুশি সরল চেহারার ডাক্তারমশাই সাঁড়াশীর মত দেখতে কলিজা হিম করা বস্তুটা মাত্র হাতে নিয়েছে আর সাথে সাথে আমি গাঁক গাঁক করে অস্ফুট স্বরে ইংরেজীতে আপত্তি জানালাম। সবে তখন জার্মানিতে এসেছি। জার্মান জ্ঞান বলতে ওই গুটেন মর্গেন পর্যন্তই। জার্মান ডাক্তার আমার চিঁ চিঁ শুনে থমকে গেল। ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে বলল, ”দেখো, তুমি কি বলছো, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমার ইংরেজী বেশী সুবিধের না। আমি আসলে ঘোড়ার ডাক্তার।” এই পর্যায়ে আমি চরম অবিশ্বাস নিয়ে তার দিকে তাকালাম। কোন মতে বললাম, কি বল তুমি; ঘোড়ার ডাক্তার মানে কি?? উত্তরে সে হড়বড় করে বলল, ”আমি আসলে ঘোড়ার দাঁতের উপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। মাত্র কয়েক বছর হল আরো পড়াশোনা আর ডিগ্রি যোগ করে মানুষের দাঁতের ডাক্তারির লাইসেন্স নিয়েছি। এখনো সপ্তাহে তিন দিন মিউনিখের আশেপাশের খামারগুলিতে ঘুরে ঘুরে ঘোড়ার দাঁত তুলি। আর বাকি দুইদিন এই চেম্বারে বসি। ঘোড়ার সাথে তো আমার জার্মান, ইংরেজী কোনটাই বলতে হয় না। কিন্তু এখন তোমার মত অনেক বিদেশী রোগী আসে। আমার খুব সমস্যা হয় কথা বুঝতে। তুমি কি আমাকে কোন উপদেশ দিতে পারো যে কেমন করে আমি আরেকটু ভালো ইংরেজী শিখতে পারি? আর হ্যাঁ, কি যেন বলছিলে তুমি, আবার বল তো? কোন সমস্যা?” আমার মনে হল ঝেড়ে একটা দৌড় দেয়া উচিত। একদম পেছন ফেরা যাবে না। কিন্তু আত্মায় কুলালো না। তার বদলে আমি দাঁত তোলার উঁচু চেয়ারের প্রখর আলোর নিচে তবদা খেয়ে ঝিম মেরে বসে থাকলাম।
সেই রোমহর্ষক ঘটনাই এখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবছি, যাব নাকি থাক আজকে? ডাক্তার যদি দাঁত ধরে নাড়াচাড়া দিয়ে অবস্থা আরো বেগতিক করে দেয়? শক্ত একটা যবের রুটি খেতে গিয়ে নিচের দাঁতের আনুবীক্ষনিক একটা অংশ ভেঙে গেছে। জার্মান রুটিও বটে। মাথায় মারলে মাথা ফেটে যেতে পারে। বাঙ্গালির ছেলে, কেন যে পাউরুটি ফেলে কাঠের টুকরা চিবাতে গেলাম! বাংলা ভাষার ব-বর্গীয় একটা গালি মনে আসছে। মেসে-হলে থাকার সুবাদে বঙ্গীয় ব- আর চ-বর্গীয় বিশেষ শব্দভান্ডারের ওপর ভালো দখল আছে। ঢোঁক গিলে বিশাল শক্তিশালী বাংলা গালিটা গিলে ফেললাম। বাইরে থেকে দাঁতটা দেখলে বোঝার উপায় নেই। কিন্তু জিভের ডগায় একটা অস্বস্তিকর অমসৃণতা সারাক্ষন উপস্থিতি জানান দিয়ে যাচ্ছে। নাহ, যাই; কারণ, এই টারমিন নেয়া হয়েছে তেরো দিন আগে। আজ না গেলে দেখা গেল তিন মাস পর আবার টারমিন পাওয়া যাবে। ততদিনে দেখা যাবে টিস্যু পেপারে মুড়ে দাঁত হাতে নিয়ে ঘুরছি। সুতরাং, যা থাকে কপালে, যাই আজকে। যা হয় হবে, হক মাওলা!
ডাক্তারের চেম্বার বাসা থেকে খুব একটা দূরে না। লিন্ডউর্ম ষ্ট্রাসে ৫২। ষ্ট্রাসে মানে স্ট্রীট বা রাস্তা আর কি। মিনিট বিশেকের হাঁটা পথ। মাথার উপর এক আকাশ রোদ। হেঁটে যেতে খারাপ লাগবে না। আর সমস্যা তো দাঁতে, পায়ে তো নয়, প্রবোধ দিলাম নিজেকে। কানে হেডফোনটা গুঁজে বেরিয়ে পড়লাম। ধীর লয়ে বেজে চলছে এড শীরান। গানের নাম ফটোগ্রাফ। গানটার ভেতর এক ধরনের বিভ্রম আছে। বিভ্রম আমার ভালো লাগে।
ফুটপাথ ধরে আমার পাশেই হাঁটছে আরেকজন। অল্পবয়সী এক তরুনী। বয়স পঁচিশেক হবে হয়তো। আমি অন্যমনস্ক। কিন্তু তার খুঁড়িয়ে চলা আমার দৃষ্টি এড়ালো না। তার বাম হাতে ক্রাচ, ডান পায়ে অতিকায় প্লাস্টার। প্লাস্টার নিয়ে হাঁটাচলার সুবিধার জন্যে হাঁটু পর্যন্ত মেডিকেল বুট। আন্দাজ করার চেষ্টা করলাম, প্লাস্টার আর মেডিকেল বুট, সব মিলিয়ে এই তরুনীর ডান পায়ের ওজন কত হতে পারে। পাঁচ, দশ, নাকি পনেরো? আমার পায়ের হাল্কা স্নিকার্সের তুলনায় তো নিশ্চিত বেজায় ভারী। কিন্তু হাঁটার গতিতে আমরা সমান। আমার তাড়া নেই, তাই কচ্ছপ গতিতে হাঁটছি। হঠাত কিসে যেন একটা ধাক্কার মতন খেলাম। তাল সামলাতে সামলাতে খেয়াল করলাম ফুটপাথ মেরামতের কাজ চলছে। ব্যারিকেডের মত দিয়ে রেখেছে ফুটপাথের এক পাশটা জুড়ে। সাইনবোর্ডও একটা বসিয়ে দিয়েছে। তাতে লেখা “বাউষ্টেলে”, মানে কন্সট্রাকশন সাইট আর কি। আর আমি অন্ধ সেই সাইনবোর্ডটাতেই ধাক্কা খেয়েছি। একেই বলে চোখের মাথা খাওয়া। আর ভাউ রে ভাউ, জার্মান বাউষ্টেলেও বটে। বাংলাদেশে তাও তো বর্ষাকালেই শুধু আল্লাহর দুনিয়ার সব খনন কাজ আর সৌন্দর্য্য বর্জনের, এ্যাই কি বলি, মানে বর্ধনের কাজ চলে। আর এই জার্মানমুলুকে বছর জুড়েই লেগে বাউষ্টেলের হাউ কাউ। মনে মনে গজগজ করছি আর মুখ দিয়েও এক দুটা গালি সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বেমক্কা। ভীষন বিরক্তি নিয়ে সতর্ক ভাবে হাঁটতে শুরু করেছি।
আমি বাউষ্টেলের গুষ্ঠি কিলানো বাদ দিয়ে অন্য দিকে মন দেবার চেষ্টা করছি। প্লাস্টারকুমারী আমার ক্ষনিকের বিরতিতে কিছুটা এগিয়ে গেছে। তার চোখ, কান, মাথা সব ঢাকা হালকা নীল রঙের একটা সুতি টুপিতে। এই আগস্টের ত্রিশ ডিগ্রির সকালে কোন পাগলে টুপি পড়ে বের হয়। পায়ের সাথে সাথে মেয়েটার মাথাটাও গেছে। আর আমি তাকে অল্পবয়সী তরুণীই বা ভাবছি কেন। পাশ দিয়ে, সামনে দিয়ে হেঁটে চলায় তার চেহারাটা তো এক বারও চোখে পড়ে নি। পঁচাত্তুরে বুড়িও তো হতে পারে। হাত থেকে ক্রাচ পড়ে গেলে তুলে দিতে গিলে খ্যাঁক করে উঠবে। এরকম তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে আমার ঝুলিতে। একবার বাসস্টপে অপেক্ষা করছি। বাস আসলো। আমি উঠতে যাচ্ছি। আমার সামনে এক নানির বয়সী ভদ্রমহিলা। হাতে বিরাট পেটমোটা বাজারের থলি নিয়ে বাসে উঠতে তার বেশ কষ্টই হচ্ছে। আমি ভদ্রতা করে হাত বাড়িয়েছি থলেটা বা তার হাতটা-যেটাই এগিয়ে দেবে, ধরবো বলে। আমাকে হতভম্ব করে বুড়ি নানু চিল-চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমাকে প্রায় একরকম ধাক্কা মেরে এক ঝটকায় বাসে চেপে বসল। আমি ঘাবড়ে গিয়ে কেমন ক্যাবলা হয়ে থমকে গেলাম। বাস ড্রাইভার মনে হয় এমন খিটখিটে জার্মান বুড়োবুড়ির দল আর আমার মত নির্বোধ ভিনদেশী যুবক দেখে অভ্যস্ত। সে আমাকে সহাস্য ইশারায় যেন বলার চেষ্টা করল, “হালকাভাবে নাও আর চুপটি করে বসো। এমনটি যেন আর করো না, নইলে কিন্তু কাম্মে দেবে, হাহাহা…।“ আসলেই, বলা যায় না, দিলেও দিতে পারে কামড়ে। আমি ভয়ে কাচুমাচু দিয়ে হাত গুটিয়ে সেই যে ঝিম ধরে জানালার পাশের সিটে গিয়ে বসলাম, আজ পর্যন্ত ভুলেও কারো দিকে হাত বাড়িয়ে দেই নি। প্লাটারকুমারী, থুক্কু প্লাস্টারনানুর নীল টুপি আমাকে টকঝাল স্মৃতিটা আবার মনে করিয়ে দিলো। তাই পড়ে থাকা ইট বালু, যন্ত্রপাতির তোড়ে সরু হয়ে আসা ফুটপাথে আমি তার থেকে দুই হাত নিরাপদ দুরত্বে সন্তর্পনে হাঁটছি। আকাশে কোত্থেকে একখন্ড ছাইরঙ্গা মেঘ এসে জুটেছে। আর আজব ব্যাপার হল, এই মেঘটা আমার সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে। কই যেন পড়েছিলাম, যদি যাও বঙ্গে, কপাল যায় সঙ্গে। মেঘ ব্যাটা কি কপাল হয়ে সঙ্গে সঙ্গে আসছে নাকি আজকে। কিন্তু আমি তো বঙ্গে নেই, আমি আছি জঙ্গে, মানে জার্মান মুলুকে। কিন্তু এই বংগ প্রবাদে বিশ্বাসী মেঘটা থেকে আচমকা একটা বাংলা বৃষ্টি নামলে সমূহ বিপদ। এই পথে বাস-ট্রাম এর লাইন নেই। আর সঙ্গে ছাতাও নেই। কাকভেজা হয়ে ডাক্তারের চেম্বারে পৌঁছাতে হবে। কেয়া মুশকিল! আনমনে হাত চলে গেল সাতদিনের না কাটা দাড়িতে আর কপাল বেয়ে নেমে আসা অবাধ্য চুলের ভিড়ে। মেঘ-বৃষ্টি, কাক-বক কি সব ভাবছি, এমন সময়ে কিছু একটা পতনের শব্দে চিন্তার ঘোর কেটে গেলো। মুহূর্তে সামনে তাকিয়ে দেখি প্লাস্টারকন্যার ক্রাচ মাটিতে আছড়ে পড়েছে।
ক্রাচের পতন অনুসরন করে ক্রাচের মালিকও হেলে পড়ে যাচ্ছে আলোর গতিতে। হাতের লাঠি ছাড়া একেবারে অসহায়। পুরো ছবিটা আমি যেন স্লো মোশনে ঘটে যেতে দেখছি। যেন কোন কোরিয়ান সিনেমার রূপক দৃশ্য। ক্রাচ মাটিতে পড়ে শূন্যে ডিগবাজি খাচ্ছে। নীল টুপি মেয়েটা তাল হারিয়ে পড়ে যেতে যেতে আকাশে হাত বাড়িয়েছে অদৃশ্য খড়কুটো ধরবে বলে। সব দেখেশুনে আমি কেমন হতবিহ্বল হয়ে গেলাম এক মুহূর্তের জন্যে। কিন্তু মুহূর্তটা শেষ হবার আগেই নিজের অজান্তেই অদ্ভূত ক্ষ্রিপ্ততায় ছ’ফুটি শরীরটা সামনে ছুড়ে একটা ঈগল ছোঁ মেরে ধরে ফেললাম মেয়েটাকে। যেন জন্টি রোডস স্টাইলের দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়ে আটকে দিলাম ভয়ংকর এক বাউন্ডারি। স্বস্তির নিঃশ্বাস্টুকু ফেলার সময় পেলাম না। কারণ আমি এবার তাকে সহ একসাথে পড়ে যাচ্ছি। আজকের পপাৎধরণিতল ঠেকাবে কোন ভূতে। কিন্তু ভূতকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে ফুটপাথ ফুড়ে গজিয়ে উঠলো প্রাচীন এক ল্যাম্পপোস্ট-যেটাকে একটু আগেও এখানে দেখে নি। নিজেকে মনে হল রুপকথার জ্যাক নামের যুবক আর ল্যাম্পপোস্টটা তার সেই গগনবিদারী শিম গাছ। বিস্ময়ে বিমূঢ় আমি পড়ে যেতে যেতে এক হাত বাড়িয়ে মরিয়া হয়ে তা-ই আঁকড়ে ধরে ফেললাম। আরেক হাতে তখনো প্রায় ঝুলন্ত, প্রায় পড়ন্ত অচেনা বিদেশিনী। নাকি সে-ই এদেশে দেশী আর আমিই বরং বিদেশী। এই বিপদের ভেতরও মাথাটা এত আগড়ুম-বাগরুম ভেবে যাচ্ছে দেখে অবাক হলাম। যাহোক, আমি নিজেকে সামলে নিয়ে আতঙ্কে নীল হয়ে যাওয়া মেয়েটাকে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলাম বটে, কিন্তু দেখলাম যে, ক্রাচের অভাবে দুই পায়ে ভর দেয়া অসম্ভব। আমি সংকোচ ঝেড়ে বলে বসলাম, “অসুবিধা নেই, আপনি আমার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়ান।“ জার্মান ভাষাটায় আবার বাংলার মত আপনি, তুমি আছে। সেও কিছুটা ধাতস্থ হয়ে আমাকে ধরে দাঁড়িয়েছে বটে কিন্তু আচমকাই আমার হাতঘড়িটায় তার নীল টুপিটা আটকে গিয়ে বেরিয়ে এল এক রাশ সোনালি চুলের বন্যা। ভীষণ অপ্রস্তুত আমি আলপটকা টুপিটা ছুটিয়ে এনে কোনমতে মেয়েটার হাতে গুঁজে দিয়ে এই প্রথম তার দিকে ভালো করে তাকালাম। সবুজ চোখের সাথে পিঠ ঢেকে নেমে আসা সোনালি চুলের স্রোত মিলিয়ে তাকে মনে হচ্ছে যেন ভূমধ্যসাগর থেকে উঠে আসা এক জলকন্যা। আমি এই অতি সৌন্দর্য্যে কাছে আড়ষ্ট হয়ে দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলাম। আরেক দিকে তাকিয়ে বললাম, “আপনি এই ল্যাম্পপোস্টটা ধরে একটু কষ্ট করে দাঁড়ান, আমি চট করে আপনার ক্রাচটা এনে দিচ্ছি।“
আমার কথা শেষ হবার আগেই দেখি এক লোক হন্তদন্ত হয়ে ক্রাচ কুড়িয়ে নিয়ে চলে এসেছে। তার মাথার হলুদ হেলমেট আর গায়ের ফ্লোরোসেন্ট রঙের জ্যাকেট দেখে বুঝলাম যে, ফুটপাথ মেরামতের লোক হবে। ক্রাচটা সে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ক্রাচের মালিকের কোথাও লেগেছে নাকি, সব ঠিক আছে কিনা ইত্যাদি ঝটিকা কুশলাদির একটা ঝটিকা ঝাঁপটা মেরে এক দৌড়ে কোত্থেকে একটা ফোল্ডিং চেয়ার নিয়ে আসলো। চেয়ারের হতচ্ছাড়া চেহারাটা দেখে মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। এতে বসলে হিতে বিপরীতের আশংকাই প্রবল। স্বর্ণকেশী এতক্ষনে নিজেকে পুরোপুরি গুছিয়ে নিয়েছে। আমার হাত থেকে ক্রাচ নিয়ে, চুলের রাশি আবার নীল টুপির শাসনে পুরে বেশ স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃতজ্ঞতার একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে খুব নম্রভাবে লোকটাকে জানিয়ে দিলো সে একদম ঠিক আছে, আর বসে বিশ্রাম নেবার দরকার নেই। লোকটাও ভদ্রতায় মাথা ঝাঁকিয়ে তার ফোল্ডিং সিংহাসনটা বগলদাবা করে বিদায় নিল।
আমিও তার পিছু পিছু সটকে পড়ব কিনা ইতস্তত করছি। এত “পথে হল দেরি” করে কি লাভ। বরং আমার এত সাধের ডাক্তারের টারমিনটা ছুটে যেতে পারে। তখন আরেক বিপদ। সটকে পড়ার জন্যে পা বাড়াতে গিয়েছি আর স্বর্ণকেশী এবার ঝকঝকে একটা হাসি দিয়ে কিশোরীর সারল্য নিয়ে আমার দিকে তাকালো। সেই হাসির সুর কাঁচের চুড়ির রিনিঝিনির মত কানে বেজে কেমন করে যেন আমার পালিয়ে যাওয়া থামিয়ে দিলো। বাধ্য হয়ে ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মত দাঁড়িয়ে পড়লাম। “উফ, আপনি যে আজকে কোথা থেকে দেবদূতের মত আসলেন। আমাকে ওভাবে সেকেন্ডের ভেতর খপ করে না ধরে ফেললে আজকে আমার ভাঙ্গা পা’টা আবার ভাঙ্গতো।“ বলেই সে একটা অদৃশ্য দুর্ঘটনার কাল্পনিক দৃশ্য দেখে শিউড়ে উঠল। “আমি কি ধন্যবাদ হিসেবে আপনাকে এক কাপ কফি খাওয়াতে পারি, প্লিজ না বলবেন না?” আমি সলজ্জ হাসিতে ধন্যবাদটা ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, “আরে না, না এতো এমন কিছু না। আর মাফ করবেন, আমার একটা টারমিন আছে, আজকে কফি খেতে পারছি না, সাবধানে চলবেন, আমি চলি।“
আসলে আমি পালিয়ে বাঁচতে পারলে বাঁচি, ভীষন অস্বস্তি লাগছে। আর তাড়া তো আছেই। পা বাড়িয়েছি যাবো বলে, অমনি শার্টের হাতায় টান পড়ল। চমকে থেমে গেলাম। এই মেয়ে তো ভয়ানক! “আমারো টারমিন আছে, আমারটাও ডাক্তারেরই। তাহলে কি যে যার কাজ সারার পর কাছের একটা কফি শপে আসতে পারি না। এই তো রাস্তার ওপারেই একটা ক্যাফে আছে। আর আমি…”। এই বলে সে ক্রাচটা হাতবদলের বিরতি নিল। বুঝলাম সে তার নামটা বলতে যাচ্ছে। শূন্য আগ্রহ অনুভব করলাম। জার্মান এই তরুণীর নাম আবার কি হবে। হয় ক্যাথরিন, নয় আনা। আর ছেলে হলে হত স্টেফান কিংবা মুলার। নামকরনের মত একটা মামুলি ব্যাপারে এদেশের মানুষের আগ্রহ বা সময় কোনটাই নেই। এরা ফক্সওয়াগন, বিএমডাব্লিউ বানিয়ে আর ফুটবল খেলেই কুল পায় না, তায় আবার বাচ্চাকাচ্চাদের নতুন নতুন নাম খোঁজা তো একেবারেই বাহুল্য। আমি অধৈর্য্য নিয়ে ক্রাচকন্যার বৈচিত্র্যহীন নামটা শোনার অপেক্ষায় অনিচ্ছায় দাঁড়িয়ে আছি। “আমি লতা।” চমকে গেলাম। পরক্ষনেই সে বলল, লতা, শার্লতা।“ আমি চমক কমে গেল। খালি একটু অবাক হলাম আর কি। জার্মান উচ্চারনে খটোমটো শার্লট হয়ে যায় শার্লতা। আর তাও সংকুচিত হয়ে এসে থামে লতায়। এখানে সব শার্লতার ডাকনাম লতা। কি আশ্চর্য! আর কি কোমল। আমাকে ভাবনা থেকে বের করে নিল লতার বাড়িয়ে দেয়া হাতটা। আমি হাতে হাত মেলানো এড়াতে এলোমেলো চুলে উদ্দেশ্যবিহীন হাত চালিয়ে বললাম, “আমি অনিক।”
(চলবে)
১৬.০৯.১৮

ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার; মিউনিখ, জার্মানি


হঠাৎ স্বর্ণকেশী! -দুই (পরের পর্ব)

হঠাৎ স্বর্ণকেশী!-তিন