অনেকদিন ধরেই এই পেইজের জন্য লিখবো ভাবছিলাম, অনেকবার কথা দিয়েও কথা রাখতে পারিনি বলে দুঃখিত। কিন্তু এই পেইজের লেখকদের কলমের যে ধার তাতে নিজেকে ঠিক লেখকের জায়গায় ভাবতে পারছিলাম না। তার সাথে ব্যস্ততা আমাকে দেয় না অবসর। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণকেও ঠিক দায় থেকে মুক্তি দেয়া যায়না। কথায় বলে আউট অফ দা সাইট, আউট অফ দা মাইন্ড। সাইট থেকে দূরে গেলেও, মাইন্ড থেকে দূরে যেতে পারিনি। আর পারিনি বলেই অনেকটা সব সাহসকে পুঞ্জীভূত করে, সময়কে কিছু সময়ের জন্য ভুলে গিয়ে, ফেইসবুককে ছুটি দিয়ে বসে গেলাম। ‘যদি লিখার মধ্যে কোনো ভুল হইয়া যায়, তয় আমায় কিন্তু মাফ করে দিবেন কইয়া দিচ্ছি। মনে কিছু রাখবেন না কিন্তু। মন তো কয় শুরু করতে আবার ভয় ভয় করে, দেহা যাক কি হয়.. কি হয় দেহি।

জার্মানি বিষয়ক সব কিছু এত সুন্দর করে এখানে আলোকপাত করা হয়, মনে মনে আবার নতুন করে শুরু করতে ইচ্ছে করে জার্মানিতে যাবার জন্য। কত সহজেই না মানুষ সব তথ্য না চাইতেই পেয়ে যাচ্ছে। আজকে আমি জার্মানি বিষয়ক কিছু বলব না। অন্য সবার মতো আমারও জার্মানিতে হাজারো স্মৃতি মাথায় ঘুরপাক খায়। সেগুলো নিয়ে অন্য আর একদিন লিখব বলে প্রত্যয় প্রকাশ করছি।

আগেই কিছু কথা বলে দেয়া ভালো। আমাকে অনেকে ইমেইল, মেসেজ দিয়ে অনেক কিছু জানতে চায়। যদিও আমি কাউকে পারত পক্ষে নিরাশ করি না, কিন্তু আপনি যদি মনে করেন আমি আপনাকে সব করে দিবো, তাহলে বলে রাখা ভালো, আপনার জন্য বিদেশ গমন ঠিক হবে না। যেকিনা একটা ওয়েবসাইট দেখে পড়তেও পারে না, যেখানে সবকিছু দিনের মতো পরিষ্কার করে, পানির মতো সরল করে খাইয়ে দেয়া হয়েছে, সে পৃথিবীর কোথাও ভালো কিছু করতে পারবে বলে আমি মনে করি না। কাজেই আমার আজকে এবং আগামীদিনের লিখা হবে অনেকটা গাইডলাইনের মত, যা করার আপনাকেই করতে হবে।

আর একটা কথা না বললেই নয়। জার্মানি এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে আমি যদিও মাঝে মাঝে কিছু তুলনা করব, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে আমি কোনটাকেই ভালো খারাপ বলবো না। প্রতিটি দেশের কিছু সুবিধা আছে, আবার অসুবিধাও আছে। সেটা আমার কাছে যদিও দিবালোকের মতো পরিষ্কার, কিন্তু আমার লিখাটা তাদের জন্য হবে যারা জার্মানি ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াতে অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি করতে  আসতে চায়। কেন আসতে চায়, অথবা কেন আশা উচিত, অথবা অনুচিত সেই বিষয়েও অন্য একদিন লিখব বলে কথা দিচ্ছি যদি অনুমতি পাই।

এবার আসল কথায় আসি। জার্মানি থেকে অস্ট্রেলিয়া আসার ব্যাপারটা অনেকটা বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়া আসার মতোই যদিও কিছু সুক্ষ ও সরু পার্থক্য আমি বলব।

সত্যি করে বলতে, অস্ট্রেলিয়াতে আসার এত এত পথ আছে, যারা আসার মতো তাদের কাছে এটা এসএসসি তে গোল্ডেন এ+ পাবার মতোই সোজা। আর যাদের কাছে কঠিন, তাদের কাছে এটা এসএসসিতে ফেল করার মতোই কঠিন। সে যাই হোক।

অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি পাওয়া জার্মানির মতো অত কঠিন না। এখানে পিএইচডি পেতে গেলে দুভাবে যাওয়া যায়। একটা পার্মানেন্ট হিসেবে লোকাল পরিচয়ে। আর অন্যটা সরাসরি ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট হিসেবে। বলছি আন্তর্জাতিক ভাবে কিভাবে আশা যায়। পিএইচডি যেহেতো রিসার্চ, আর সেটা যেহেতো কোনো একজন প্রফেসর এর অধীনে করতে হবে, কাজেই প্রথমে প্রফেসরকে ইমেইল করতে হবে। এই ক্ষেত্রে জার্মানির মতো সরাসরি কোনো ওয়েব সাইট নেই যে সব তথ্য আর ইউনিভার্সিটি নাম পাওয়া যাবে। প্রতিটি ভার্সিটির সাইট এ গিয়ে রিলেভেন্ট সাবজেক্ট আর প্রফেসর খুঁজে বের করতে হবে। এর পর ইমেইল দিতে হবে। সেখানে অবশ্যয় নিজেকে নিজের মার্কেটিং করতে হবে। বাংলায় বললে, আপনাকে বিক্রি করতে হবে ইমেইল এর মাধ্যমে।

প্রফেসরকে ইমেইল লিখার পদ্ধতি আজকের লিখার প্রয়াস এর মধ্যে নেই। তবে শুধু বলে রাখি, আপনার লিখায় যেন ভদ্রতা, নম্রতার অভাব না থাকে যদিও আপনি অতটা ভদ্র অথবা নম্র না হলেও বাস্তবিক পক্ষে কোনো সমস্যা নাইক্কা। ইমেইলটা খুব বড় হবে না, আবার একেবারে দু লাইনও হবে না। মোটামুটি ছোট খাটো দু প্যারাগ্রাফ এর মধ্যে সব তুলে ধরতে পারলে ভালো।  ইমেইল বডিতে থাকবে সংক্ষেপে আপনার সব অর্জন, আপনি কেন মোটিভেটেড,  মোটামুটি কয়েকটা গুণ (সত্যি থাকতে হবে এমন কোন কথা নেয়) থাকলেই হবে।  আবার খুব বেশি গুন্ দেবারও দরকার  নেই। ভুলেও কঠিন কঠিন শব্দসম্ভার দিয়ে, ইন্টারনেট থেকে কপি করা যাবেনা। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ব যেটা সেটা হচ্ছে আপনার সিভি, যেখানে আপনার সব তথ্য থাকা উচিত।

উদহারণ স্বরূপ বলতে পারি, আপনার সব প্রকাশনার লিস্ট, আপনার সব একাডেমিক তথ্য, কাজের অভিজ্ঞতা, এমনকি আপনার প্রোগ্রামিং এর একটা লিস্টও থাকা উচিত। আপনার একাডেমিক রেফারেন্স থাকা উচিত যদিও হয়তো চাকরির আবেদনের সময় সেটা না থাকলেও চলে।  আপনার যদি কোনো একাডেমিক বড় অর্জন থাকে যেমন ধরেন, ডিস্টিংকশন অথবা স্কলারশিপ সেটাও উল্লেখ করতে ভুলবেন না। মোটামুটি যত ভাবে পারেন নিজেকে বিক্রি করবেন।

এই ক্ষেত্রে এটা মোটামুটি জার্মান সিস্টেম এর বিপরীত। জার্মানিতে চাকরির আবেদনের সময় যেমন ভুলেও ভুল তথ্য দেয়া চলবে না, তবে অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি আবেদনের সময় ব্যাপারটা এরকম নয়।  মানে আপনার যদি কোনো যোগ্যতা কোন বিষয়ে ১০% থাকে, সেটাও দিবেন। একটা কথা বলে রাখি, পিএইচডি স্টার্ট করার পর আপনি অনেক সময় পাবেন নিজেকে ঝালাই করার জন্য। কাজেই পাওয়া হচ্ছে আসল কথা। তাই বলে পুকুর চুরি করা মনে হয় না ঠিক হবে।

এতটুকু পর্যন্ত মোটামুটি পৃথিবীর সব ভার্সিটিতেই একই রকম। এর পরের অংশটা একটু ব্যতিক্রম অস্ট্রেলিয়ার জন্য। যদিও আমি জার্মানবাসীদের উদ্দেশ্য করে লিখছি, এটা মোটামুটি যারা অন্য দেশ থেকে আসবে তাদের জন্যও প্রযোজ্য।

প্রফেসর থেকে ইমেইল ব্যাক পেলে, বুঝতে হবে উনি আপনাকে কর্ণপাত করছেন। ভুলেও টাকা পয়সার কথা প্রথমে বলার দরকার নেই। বেশিরভাগ অস্ট্রেলিয়ান প্রফেসর জার্মান প্রফেসরদের মতো টাকার থলি নিয়ে বসে থাকেনা। আর থাকলেও সেটার উপর ভরসা না করায় ভালো। সেটা এমনিতেই আপনি পাবেন টপ আপ। প্রফেসর আপনাকে বলবে (মোটামুটি ৯০%) ইউনিভার্সিটিতে অনলাইন আবেদন করার জন্য এবং সেটা করার সময় যেন আপনাকে স্কলারশিপ এর জন্য বিবেচনা করা হয় আবেদন এর মধ্যে যেন সেটা অবশ্যয় থাকে। অনলাইন হলে ওখানেই থাকবে হিসেবে।

ইউনিভার্সিটি যেটা করে সেটা হচ্ছে, সবার এপ্লিকেশন একসাথে করে একটা প্যানেল কমিটিতে পাঠায়। এই পর সবার এপ্লিকেশন একটা একটা করে যাচাই করা হয় এবং সবার যোগ্যতা অনুসারে পয়েন্ট দেয়া হয়। যাদের পয়েন্ট উপরের দিকে থাকে, তাদের মধ্যে থেকে কল করা হয় স্কলারশিপ দিয়ে। বলে রাখা ভালো, এখানে স্কলারশিপ মোটামুটি ভালই। বছরে প্রায় ২৭০০০ ডলার পাওয়া যায় যেটা দিয়ে এখানে দিব্বি মজা করে চলা যায়। এর বাইরে উপরি পাওনা থাকে প্রফেসর এর নিজস্ব ফান্ড থেকে টপ আপ যেটা ৬০০০ থেকে ১৫০০০ পর্যন্ত হতে পারে। এতেও যদি আপনি সন্তুষ্ট না থাকেন, ইউনিভার্সিটিতে মার্কিং, টিচিং, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে উপরি আয় করা যায় যদিও সেটা সবার জন্য প্রযোজ্য হয় না।

ভার্সিটি প্রধানত দুই ধরণের অফার করে থাকে। যদি স্কলারশিপ পেয়ে থাকেন সেটা ভালো। যদি না পেয়ে থাকেন, তাহলে কমপক্ষে আপনাকে যেন টিউশন ফী না দিতে হয় সেটা ব্যবস্থা করে অফার দিয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে আপনি কোনো টাকা পাবেন না ঠিক, কিন্তু আপনাকে কোনো টাকা দিতেও হবে না। ভাগ্য ভালো থাকলে প্রফেসর কিছু আপনাকে দিতে পারে। কিন্তু আমি বলবো এভাবে আসাটা অনেক বিপদজনক যদি না আপনি প্রতিজ্ঞা না করে থাকেন যে অস্ট্রেলিয়াতে আসবেনই।

এর পর বলতে পারি, কিভাবে আবেদন করলে স্কলারশিপ পাবার সম্ভাবনা থাকে। জেনে রাখা ভালো, এখানেই জার্মানিতে অধ্যয়নরত ছাত্ররা পিছিয়ে যায়। আসলে, অস্ট্রেলিয়ান প্রফেসররা জার্মান ডিগ্রীকে অনেক গুরুত্ব দিলেও, কিছুটা নিয়মতান্ত্রিক জটিলতার কারণে, প্রফেসররা কোনো স্পেশাল ক্ষমতা দেখতে পারেননা। যেহেতো এটা একটা প্যানেল ঠিক করে, আর সবার মধ্যে যোগ্যতাকে পয়েন্ট দিয়ে সাজানো হয়, সেই পয়েন্ট বন্টনে জার্মান ছাত্ররা কিছুটা পিছিয়ে যায়। সব পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করলে লিখা অনেক বড় হয়ে যাবে, তাই সংক্ষেপে বলতে পারি, পয়েন্ট তালিকায় সেই এগিয়ে থাকে যার আছে ভুঁড়ি ভুঁড়ি প্রকাশনা। শুধু প্রকাশনা থাকলেই হবে না, সেটা থাকতে হবে অস্ট্রেলিয়ান সরকার কর্তৃক ঘোষিত কনফারেন্স অথবা জার্নাল লিস্টে। সেই সাথে আপনার যদি মাস্টার থাকে গবেষণা দিয়ে যেটা জার্মানিতে কখনো হয়না, মানে জার্মানিতে মাস্টার মানে স্কুলের মতো ক্লাস এ যাও, সেমিস্টার শেষে পরীক্ষা দাও, আর পাস করো, এই ক্ষেত্রে আপনার পয়েন্ট খুব বেশি হবেনা। যাদের মাস্টার কোর্স পুরোটা রিসার্চ হিসেবে থাকে তাদের পয়েন্ট অনেক বেশি হয় যেটা জার্মানিতে সম্ভব না। ৬ মাস থিসিস এক্ষেত্রে আপনাকে কোনো সুবিধা দেয় না যেহেতো আপনার মাস্টার হচ্ছে কোর্স ওয়ার্ক হিসেবে।

আরো কিছু আছে সেটা ধীরে ধীরে লিখবো। শুধু এতটুকু বলি, যদি অস্ট্রেলিয়াতে পিএইচডি করতে চান, তাহলে কমপক্ষে কয়েকটা পাবলিকেশন এখন থেকেই করে ফেলেন। আমি কথা দিলাম, এটা আপনাকে আপনার বৌ, জামাই, গার্লফ্র্যান্ড অথবা বয়ফ্রেইন্ড থাকার চেয়েও বেশি কাজ দিবে আর ফলাফলটা এর চেয়েও মধুর হবে।

আজকে এতটুকুই। তাহলে লাইগা যান। সেই সাথে আমার এই বাংলিশ মার্কা লিখার জন্য দুঃখিত। একটা কথা বলি, পিএইচডি কোন আপনার বিকল্প পরিকল্পনা হওয়া উচিত না।  এটা একটা পছন্দ হওয়া উচিত।ইংরেজিতে বললে আরো সুন্দর শুনায়। PhD shouln’t be an option, it’s a choice. এটা শুরু করা না যতটা সোজা, এটা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। তিন থেকে ৬ বছর (অস্ট্রেলিয়াতে সর্বোচ্চ চার বছর) নিজের মনকে ধরে রাখা খুব সহজ ব্যাপার না যদিও আপাত দৃষ্টিতে এটা সোজা মনে হয়।

অবশ্যই আপনাদের যাদের মনে কিছু প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে, কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই যোগাযোগ করতে পারেন। এজন্য নিচের মন্তব্য সেকশনে আপনার প্রশ্নটি করুন। আমি অবশ্যই সময় নিয়ে সঠিক উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব। ধন্যবাদ।

(চলবে…)


আরো পড়তে পারেনঃ

পি.এইচ.ডি কড়চা – পর্ব ১

পিএইচডি কি জিনিস? খায় না মাথায় দেয়?

উচ্চশিক্ষার ইতিকথা-তৃতীয় পর্ব (অষ্ট্রেলিয়া, স্কলারশিপ এবং সুযোগ-সুবিধা)