-আপু অনেক ইচ্ছে ছিল রিসার্চার হওয়ার, পিএইচডি করার, এখন মনে হচ্ছে আর হবে না
-সেকি! কেন?
-না, শুনলাম নাকি এক্সট্রা আইনস্টাইন ক্রোমোসোম না থাকলে এইসব হওয়া যায় না
-সে না থাকুক, স্বপ্ন আছে তো? না সেটাও নাই?
-জ্বি, আপু আছে
-তাইলে এসব উড়ো কথায় কান না দিয়ে বরং স্বপ্নটা সত্যি করার প্রিপারেশন নাও, পড়ালেখা করে দেখো পিএইচডি করতে কি লাগে আর না লাগে
-জ্বি আপু, অনেক থ্যাংকস
-হুম, বাই দা ওয়ে, এইসব উদ্ভুতূড়ে ইনফো কোন দুনিয়া থেকে জোগাড় কর!!!

যদি আপনারও নানা মুনির নানা মতে এই দশা হয় তবে জনাব এই পোস্ট আপনার জন্য।

১) প্রাক পিএইচডি মোটিভেশনঃ

বাইরে পড়তে আসা অনেকের-ই ইচ্ছে থাকে মাস্টার্স শেষ করে পিএইচডি করার। অনেককেই দেখেছি ২ বছর মাস্টার্স করতে না করতে সেই ইচ্ছে হাপিশ হয়ে গেছে। তাদের দোষ দিই না, প্রবাসজীবনে প্রতি মুহূর্তের টিকে থাকার সংগ্রাম বড়ই কঠিন। নিজের ‘ব্রেড এন্ড বাটার’ যোগান দিয়ে চমৎকার রেজাল্ট করা এবং মোটিভেশন টিকিয়ে রাখা বড়ই কঠিন কাজ। আর সেই কাজ যদিও বা করতে পারলেন, আপনার সামনে পরবর্তী বাধা হিসেবে হাজির হবে ‘পরস্বার্থে নিবেদিত বড়ভাই’[এই গোত্রের সঠিক লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে আমি সেই কলেজ জীবন থেকেই সন্দিহান!]আপনাকে নিয়ে সদাচিন্তিত ভাইয়ের প্রথম বাণী হবে, ‘কি হবে পিএইচডি কইরা ? সারাজীবন কি পড়ালেখাই করবা নাকি?’ আপনি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই বুলেটের গতিতে ধাক্কা হানবে পরবর্তী প্রশ্ন, ‘পিএইচডি করে চলতে পারবা?’ ব্যস, এইখানে আপনি কুপোকাত। পিএইচডি ফান্ডিং আর ভূমিকম্প এক জিনিস- হলে বুঝবেন আচ্ছা কিছু একটা হচ্ছে। ঘটনা ঘটার আগে জানার উপায় নাই। মাস্টার্স শেষে চাকরি-তে যে ফিনান্সিয়াল সিকিউরিটি আছে সেটা পিএইচডি-র ক্ষেত্রে অনেকটাই অনুপস্থিত। অনেকটাই বললাম, কারণ আপনি মিটআরবাইটার হিসেবে চাকরী পেতে পারেন এবং একই সাথে পিএইচডি করতে পারেন। এই ব্যাপারে বিস্তারিত পরে বলছি।

এইসব প্রশ্নের থোড়াই কেয়ার করি বলি ভাইকে প্রবোধ দিলেই ছুটবে অমোঘ ব্রহ্মাস্ত্রঃ ‘বুঝলাম পড়ালেখা করতেছ, ভালো কথা, দেশ-দশের উপকারে লাগবা, তাই বলে বাবা-মার খেয়ালও তো রাখবা নাকি? মানে বিয়ে-শাদি, হেঁ হেঁ’- হয়ত মেয়ে বলে শেষোক্ত কথাটি আমি বহুবার বহুবিদভাবে শুনেছি। (এইখানে আপামণিদের জন্য একটা ছোট টিপস-যারা এই ধরনের কথা বলে তাদের থেকে শখানেক হাত দূরে থাকুন, জীবনে শান্তি বজায় থাকবে।) শুধু তাই নয়, এই স্বখ্যাত(স্ব+বিখ্যাত)মহান বাংলাদেশী ভাই বলেছিলেন যারা জার্মানিতে চাকরি পায় না তারাই পিএইচডি করতে যায়। ঠিক কি হেতু উনার এই বয়ান সেটা আমার জানা নেই, তবু উনাকে অন্ধভাবে ফলো করতে থাকা বহু ছেলেমেয়ে-ই পিএইচডি বিমুখ হয়েছিল।

দুঃখের বিষয় অনেক বড় ভাই-আপু যারা শুধুমাত্র মাস্টার্স করেছেন তারা পিএইচডি করা মানে সময় নষ্ট টাইপ কথা বুঝিয়েছেন, আর যারা পিএইচডি করছেন তারা বুঝিয়েছেন পিএইচডি করা মানে আইনস্টাইন/নিউটন লেভেলের আইকিউ, ঝুড়িভর্তি পাবলিকেশন আর অতিমানবিক যোগ্যতার দরকার।

এই সব লোকের কথায় বিচলিত হওয়ার দরকার নাই। কোন এক অজানা কারণে বাঙ্গালির হীনমন্যতার কমতি নেই। আমি যেটা করছি সেটা আর কেউ করলে আমার ভাব কমে যাবে অথবা আমি যা পারি নাই সেইটা তো আর কাউকে করতে দেয়া যাবে না টাইপ মেন্টালিটির লোকই বেশি পাওয়া যায়। অথচ চাকরি বা পিএইচডি কোনটাই ফেলনা নয়, দুটোতেই যোগ্যতা লাগে। তাই আগে ভাবুন নিজে কি চাইছেন। যোগ্যতার মাপকাঠি গুলো জেনে নিয়ে নিজেকে পরিমাপ করুন, যদি কমতি থাকে তাহলে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজক্ষেত্রের বিভিন্ন পিএইচডি-র অফারগুলোতে দেখুন তারা কি চাইছে।

জার্মানদের থেকে কিছু শিখুন আর নাই শিখুন অন্তত প্ল্যানিং করাটা শিখুন। মাস্টার্স সার্টিফিকেট তুলে এরপর আপু আমার গ্রেড খুব বাজে, আমি কি পিএইচডি করতে পারব টাইপ প্রশ্ন করার চেয়ে আগে থেকে প্ল্যান করে গ্রেড-টা নিদেনপক্ষে ‘Gut’ রাখার চেষ্টা করুন। মাস্টার্স থিসিসটা ভালভাবে শেষ করুন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রফেসর আপনার থিসিস দেখতে চাইবে। অথবা এটার ভিত্তিতেই নিজ ইন্সটিটিউটে অফার পেতে পারেন। খুব জরুরি না হলেও জার্মান ভাষায় একটু ধার দিন। মোদ্দা কথা আপনার নিজের উপর ভরসা রাখুন যে আপনি পারবেন। ওহ হ্যাঁ, এত কিছুর ভিতরে আবার স্বপ্ন দেখতে ভুলবেন না যেন।

পরের পর্বে থাকছে পিএইচডির রকমসকম এবং এপ্লিকেশন পদ্ধতি।