লেখাটি শুধুমাত্র নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য, কাউকে উৎসাহিত করার জন্য নয়। নিতান্তই অপারগ না হলে এই পথে পা না বাড়ানোই ভালো। আর ভালো কথা, লিখার শেষ অংশ শুধু নতুনদের জন্য যারা মাত্র আসছেন বা আসবেন বলে চিন্তা করছেন।

২০১১ তে যখন প্রথম জার্মানি তে পা দিলাম তখন অন্য সবার মতোই আমার মধ্যেও কাজ করছিলো উন্নত জীবনের স্বপ্ন। তা না হলে পরিবারের একমাত্র ছেলে হয়েও স্বার্থপরের মতো বাবা মা কে ফেলে ৫০০০ মাইল দূরে পাড়ি দেওয়ার মতো চিন্তা কখনোই আসতোনা। আর এই স্বপ্নে বিভোর হয়ে যখন মাস্টার্স প্রোগ্রাম শুরু করলাম বুঝতে পারলাম অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি। নিজের ইলেকট্রনিক্স ফিল্ড ছেড়ে চলে এসেছি থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স আর বায়োফিজিক্স এর অদ্ভুত দুনিয়ায়। কিছুদিন পরেই বোধোদয় হলো এই ফিল্ড আর যাই হোক আমার জন্য নয়। আশেপাশের চীন , রাশিয়ান, জার্মান, ইন্ডিয়ান দের যখন দেখি মচমচিয়ে, পূর্ণ উদ্দমে এই দুনিয়ায় বিচরণ করছে আমি তখন মাথার উপর দিয়ে যাওয়া ভিনগ্রহের শব্দগুলোকে কোনো রকমে বস্তাবন্ধী করার চেষ্টা করছি। আর ভাবছি মুক্তি দাও খোদা মোরে মুক্তি দাও। যাক প্রথম সেমিস্টার শেষ করার পর সিন্ধান্ত নিলাম এর একটা বিহিত করতে হবে। আর নিজের গালে নিজেকে হাজারো চড় দিলাম (মনে মনে ) এই চিন্তা করে কেন নিজের ফিল্ড ছেড়ে এডভেঞ্চার এর নেশায় পড়েছিলাম। সিন্ধান্ত নিলাম প্রোগ্রাম চেঞ্জ করবো। আমার ভার্সিটিতেই ইলেকট্রনিক্স ফ্যাকাল্টিতে ইন্টারন্যাশনালদের খুব সুন্দর একটা মাস্টার্স প্রোগ্রাম খুঁজে পেলাম। যথা চিন্তা তথা কর্ম। একটা মেইল করলাম কোর্স কোঅর্ডিনেটর কে বৃত্তান্ত জানিয়ে। আর বললাম আমি কেন তার প্রোগ্রাম এ ইন্টারেস্টেড। প্রমাণস্বরূপ আমার ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট সব পাঠালাম তার কাছে। প্রতি উত্তরে তিনি জানালেন যেহেতু এই সেমিস্টার অলরেডি শেষ হয়ে গিয়েছে তাই পরবর্তী সেমিস্টার এ ভর্তি করানো সম্ভব নয়।  তিনি উপদেশ দিলেন আমি যাতে পরবর্তী বছরের জন্য আবেদন করি।  বললেন আমার চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক।  উনার কথামতো পরবর্তী বছরের জন্য আবেদন করে দিলাম। যদিও এই কারণে এক বছর লস হয়ে যাবে, তবুও এই ভেবে নিজেকে আশ্বস্ত করলাম যে পুরোপুরি পাগল হয়ে যাওয়ার চেয়ে এক বছর লস দেওয়াটা বড় কোনো ক্ষতি হবে না।  যাই হোক খোদার অশেষ রহমতে ওই মাস্টার্স প্রোগ্রাম এ  চান্স পেয়ে গেলাম।  প্রোগ্রাম এর নাম ন্যানোইলেকট্রনিক সিস্টেমস, টি ইউ ড্রেসডেন।

পড়া তো শুরু করলাম এই প্রোগ্রাম এ, কিন্তু এখানে তো বাপের টাকায় বা জার্মান সরকার এর টাকায় চলি না, চলি নিজের টাকায়।  অতএব একটা কাজ দরকার।  আগের প্রোগ্রাম এ অনেক স্টুডেন্ট জব ছিল, কিন্তু ইলেকট্রনিক্স ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়াতে কোনো প্রফেসর এর কাছ থেকে পসিটিভ রিপ্লাই পাইনি।  ভাগ্যক্রমে ওই সময় জব পেয়েছিলাম ইলেকট্রনিক্স ফ্যাকাল্টি এর মাইক্রোসিস্টেম টেকনিক রিসার্চ চেয়ার এ।  ওখানে কাজ করেছিলাম ৬ মাস।  ওটাই ছিল আমার অভিজ্ঞতার পুঁজি।  আসলে আমার প্রথম টার্গেট ছিল কোনো একটা কোম্পানিতে পার্টটাইম জব এ ঢুকা।  কিন্তু অনেক গুলো রিজেকশন এর পর বুঝতে পারলাম কোম্পানি গুলো আসলে প্রথম সেমিস্টার এর স্টুডেন্ট দের জব দিতে চায়না। ইউনিভার্সিটিতে কাজ খুঁজতেই তাই মনোযোগ দিলাম।  প্রথম এপ্লিকেশন এ বাজিমাত হয়ে গেলো।  কাজ পেয়ে গেলাম RF চেয়ার এ।  ৬ মাস এর কন্ট্রাক্ট।  ভালোই কাটছিলো দিন।  ৬ মাস পর পেয়ে গেলাম নতুন আর একটা চেয়ার স্টুডেন্ট জব।  তাই আগের জব টা ছেড়ে দিলাম।  প্রথম সেমিস্টার শেষ।  দ্বিতীয় সেমিস্টার থেকে ১০ ক্রেডিটস এর মেজর প্রজেক্ট শুরু করার পালা।  একটু বাঙালি বুদ্ধি খাটানোর চেষ্টা করলাম।  এমন কোনো চেয়ার এ যদি প্রজেক্ট পেতাম যারা প্রজেক্ট এর জন্য আমাকে পে করবে।  খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গেলাম আমাদের এক রিসার্চ চেয়ার যারা স্টুডেন্ট জব অফার করছে।  আমি সুপারভাইসর এর সাথে এইভাবে কথা বললাম তোমার এই কাজ করতে আমি আগ্রহী তবে এটা পরবর্তী তে আমি আমার প্রজেক্ট হিসেবে রিপোর্ট লিখতে চাই।  সে আমার সিভি দেখে রাজি হয়ে গেলো।  অতএব পাশাপাশি ২ টা চাকরি প্লাস প্রজেক্ট।  দম ফেলার ও সুযোগ নাই।  কি আর করা জীবনে কিছু পেতে হলে কিছু তো পরিশ্রম করতেই হয়।

আরো ৬ মাস শেষ সাথে দ্বিতীয় সেমিস্টার ও শেষ। সেমিস্টার শেষ হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই একটা কল পেলাম।  ড্রেসডেনের কোনো এক কোম্পানিতে আমি অনেক আগে এপলাই করেছিলাম স্টুডেন্ট জব এর জন্য, ওরা আমাকে ইন্টারভিউ এর জন্য দেখা করতে বলছে। যথারীতি নির্ধারিত দিনে গেলাম ইন্টারভিউ দিতে।  ইন্টারভিউ দেওয়ার পরবর্তী এক সপ্তাহ পর  ওরা আমাকে জানালো চাকুরীতে জয়েন করতে।  আগের ২ জব এর সুপারভাইসর কে জানালাম।  ওরা সানন্দে জানালো কোনো সমস্যা নেই।  তবে প্রজেক্ট সুপারভাইসর বললেন এখন উনি আর পে করতে পারবেননা।  আমি তাতে রাজি হয়ে গেলাম কারণ আমার প্রজেক্ট তো শেষ করতে হবে।  যথারীতি ওই কোম্পানিতে কাজে যোগ দিলাম। সপ্তাহে ২০ ঘন্টা অরে বেতন ও  খারাপ না।  পরবর্তীতে মাস্টার্স প্রোগ্রাম এর পুরো সময় টা এই কোম্পানিতেই পার করে দিলাম। ইন্টার্নশীপ , থিসিস সব এখানেই করা।  পুরো ২ বছর কোম্পানিতে সময়টা কিভাবে চলে গেলো টেরই পেলাম না। গ্রাজুয়েশন শেষ ,এখন তো আর স্টুডেন্ট হিসেবে থাকা সম্ভব না।  নতুন চাকুরী খোঁজা শুরু করতে হলে।  অবশেষে গ্রাজুয়েশন এর ৩ মাস পর চাকুরী পেলাম নেদারল্যান্ডস এ। তাও আবার এইখানে মোটামুটি ১.৫ বছর পার হয়ে গেলো।  যদিও এখানে খারাপ লাগছেনা, তারপর ও জানিনা কি হয়।  ওই যে বলে না ইউরোপ এ যারা একবার জার্মানি এর মজা পেয়ে গেছে তারা ইউরোপ এর আর কোথাও মন টিকাতে পারবেনা।

জার্মান জীবনের কিছু বোরিং অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। এতদিন পরে এসে এই বিষয় টুকু অন্তত বুঝতে পারছি যে অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতা টেনে আনে। একটা চাকুরী আর একটা চাকুরী টেনে আনে। আমার একটা স্টুডেন্ট জব আর একটা স্টুডেন্ট জব টেনে নিয়ে এসেছে। যারা জার্মানি তে পড়তে আসবেন তারা এই বিষয় টুকু মাথায় রাখা জরুরি, ভালো প্রোগ্রাম , ভালো ইউনিভার্সিটি আপনাকে অনেক কিছুর দরজা খুলে দেবে। প্রোগ্রাম পছন্দ করার সময় খেয়াল রাখুন এই প্রোগ্রাম এর রিসার্চ অপসন কেমন। ইউনিভার্সিটি পছন্দ করার সময় খেয়াল রাখুন এই ইউনিভার্সিটি তে রিসার্চ অপর্চুনিটি কতটুকু। খেয়াল করলে দেখবেন আমার প্রথম বছর জার্মানি তে আমি পড়েছি একটা প্রোগ্রাম এ কিন্তু স্টুডেন্ট জব করেছি সম্পূর্ণ ভিন্ন আর একটি ফিল্ড এ। যা পরবর্তী তে আমার নতুন মাস্টার্স প্রোগ্রাম এ আমাকে কাজ পেতে সাহায্য করেছে।

শুধুমাত্র আসতে হবে এই চিন্তাতে তো চলে আসলেন জার্মানি। প্রোগ্রাম, ইউনিভার্সিটি, শহর কিছুই দেখলেন না। এরপর কি করবেন? বাপের টাকায় তো এক বছর, বাকিটা সময় কিভাবে পার করবেন। যাই করুন ভেবে চিনতে করুন। আজ এই পর্যন্তই। ভালো থাকবেন সবাই।


আরো পড়তে পারেনঃ