অনেকদিন পর পড়াশুনার বাইরে কিছু লিখতে বসলাম। ২ ঘণ্টা রান্না করে এক সপ্তাহের শুধু রাতের খাবারের দুশ্চিন্তা মোচন করে আসলাম, অনেক ক্লান্ত। এই ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তার কারণে কাউকে দোষারোপ করতে পারবো না, কারণ আমি সেই শ্রেণীর বাঙালিদের মধ্যে একজন, যারা পরদেশে এসে “অন্তত একবেলা ভাত না খেলে থাকতে পারিনা” এই দোষে পাপী।

জার্মানিতে আসার পর অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, “পড়াশুনা কেমন?”, “অনেক কঠিন?”, “জার্মানিতে যেতে কি কি লাগে?”, “সিজিপিএ কতো লাগে?”, “খরচ কেমন?” – আরও অনেক প্রশ্ন। এইখানে আসার আগে প্রস্নগুলো আমারও ছিল এক সময়। শুধু প্রথম ২ টি প্রশ্নের আংশিক উত্তর দেয়ার আগেই বলে নিচ্ছি, আমি এইখানে যা লিখছি সেটা আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে (RWTH Aachen) যে বিষয়ে (Master’s in Automotive Engineering-International Program) পড়ছি সেই অভিজ্ঞতা থেকে শুধুমাত্র আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলছি।

এইখানে ক্লাসে কিভাবে পড়ানো হয়ঃ

ক্লাসে প্রতিটা সাবজেক্ট পড়ানো শুরু করার আগে সেখানে কি শেখানো হবে সেটার একটা Outline/Preview দেয়া হয়, এরপর কোন একটা পার্টিকুলার বিষয় পড়ানোর শুরুতে সেটার একটা ছোট-খাটো Historical Review দেয়া হয় – কেন একটা যন্ত্র/পদ্ধতি দরকার হয়েছিল, সেটার পিছনে Theory/Concept কি, সেগুলোর Physical Meaning/Significance কি, Solution Concept কে প্রথম এনেছেন এবং তিনি কি চিন্তা করেছিলেন, সেটা Improvement কেন দরকার হল, কি কি Improve করা হল – এইভাবে ধাপে ধাপে এগিয়ে যায়। একটা কনসেপ্টের পিছনে কি কি চিন্তা করা হয়েছে এবং কেন করা হয়েছে সেটা না জানলে তুমি নতুন Concept কখনই Develop করতে পারবে না, unless you are the Einstein। আর ক্লাসে কোন একটা স্টেটমেন্ট দেয়া হল – আপেলকে কেটে চার ভাগ করা হয়েছে, প্রতিটি ভাগ সমান এক-চতুর্থাংশ, শুধু এ কথা বলেই শেষ না, তোমাকে Precisely কেটে দেখানো হবে যে কথাটা সত্য অথবা Real Example Demonstrate করা হবে। প্রফেসর যত বড় নামকরা বিজ্ঞানীই হোক না কেন, তার কথা বিশ্বাস করার প্রশ্নই উঠে না যতক্ষণ প্রমাণ দেখানো হবে বা Real World Process তোমার সামনে দেখানো হবে। প্রতিটা ক্লাসের জন্য সেমিস্টারের শেষে একটা Evaluation Sheet দেয়া হয় যেখানে তোমাকে Anonymous Feedback দিতে হবে – ক্লাস কেমন লাগছে, প্রফেসরের পড়ানোর ধরণ কেমন, ক্লাসের বাইরে প্রয়োজন হইলে তাকে পাওয়া যায় কিনা, সে কি সময় মত ক্লাস শুরু/শেষ করে কিনা অথবা ক্লাস Miss করে কিনা অথবা Replacement Tutor ছিল ক’বার, ক্লাসে যে Real World Materials দেখানো হয়েছে সেটা কেমন, ক্লাসে পড়াশুনা কি তোমার Normal Pace এর চাইতে বেশী কিনা, কিভাবে লেকচার আরও ভাল করা যায় – এবং এই Evaluation খুবই Seriously নেয়া হয় যেটার উপর পরের সেমিস্টারের Course Structure আর Lecturer নির্ভর করে।

***********************একই রকম /এই রিলেটেড আর্টিকেল পড়তে পারেন  *******************

আন্ডার-এস্টিমেট!!

ইউনিভার্সিটি র‍্যাংকিং(Ranking) এর চেয়েও যা গুরুত্বপূর্ণ!

*******************************************************************************************

ব্যাচেলর্সে কিভাবে পড়াশুনা করে এসেছিঃ 

আমি অন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারবো না, কিন্তু আমি আমার প্রাক্তন বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বিভাগে যা পড়াশুনা করেছি সেটার দৃষ্টিকোণ থেকে বলছি। প্রকৌশলের সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হইল Mathematics যেটার উপ্রে ৪ টা কোর্স করে দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলছিলাম – যেখানে Differential Equations শুরু করানো হয়েছিল কিভাবে একটা Given Equation Solve করা যায়, সেগুলো কোথা থেকে আসলো, সেগুলোর পিছনে কোন Real World Process কাজ করছে সেটার কোন পাত্তাই নাই, Laplace Transformation/Fourier Analysis পড়ানো শুরু করানো হয়েছিল কিছু ফর্মুলা শিখিয়ে যেগুলা আপ্লাই (গাধার মত মুখস্ত করে) করে Problem Solve করলে পরীক্ষায় ভাল গ্রেড পাওয়া যাবে। Fluid Mechanics এর উপ্রে ৩ টা কোর্স করছি – Fluid Flow এর জন্য তিনটা Equation (Mass Conservation, Energy Conservation, Momentum Conservation) কিভাবে Derive করা লাগে সেটা দিলে এক্সামে কোপাইয়া লিখে দিসি, সেগুলো Real World এ কোথায় ও কিভাবে লাগে অথবা কোথা থেকে সেগুলো আসলো আর কেনই বা আসলো সেগুলো পড়ে কি কবে বড়লোক হইসে, ক্লাসে Ideal Fluid এর জন্য বই থেকে Equation বোর্ডে লিখে দেয়া হয়েছিল, কোথা থেকে Equation গুলো আসল, কেনই বা আসলো সেটা বের করে পড়া তোমার দায়িত্ব, আর ফাইনালে টাইটানিক ডুবে যাওয়ার শঙ্কা তো আছেই। Machine Design এর উপ্রে ২ টা কোর্স করছি আর ৩ টা Mechanics এর কোর্স করছি – ক্লাসের করানো Problem দিলে Step-by-Step ধুমাইয়া টানা মুখস্ত লিখে দেই কিন্তু একটা Real World Problem দিলে পেন্সিলের পিছনের অংশ কামড়াইতে কামড়াইতে শেষ হইয়া যায় কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবো এইডা মাথায় Spark করে না। আমি এইখানে শুধু সাধারণ ছাত্র বলছি এই কারণে যে বিশেষ/জিনিয়াস কিছু ছাত্র আছে যারা ক্লাসে না পড়ানো হইলেও নিজের ইচ্ছা/গরজে প্রতিটা বিষয় আসলেই জানার জন্য পড়ে, এই শ্রেণী অনেকটা বাঘের দুধের মত।

***********************একই রকম /এই রিলেটেড আর্টিকেল পড়তে পারেন  *******************

ব্যাচেলর স্টাডি

FH নাকি TH কোনটা?

*******************************************************************************************

সমস্যা কোথায়ঃ

২ জায়গার পার্থক্য দেখিয়ে এই কথাগুলো বললাম কেন? ইউরোপে পড়াশুনার সিস্টেম যে আলাদা সেটা জানতাম আগেই, ধাক্কা খাওয়ার জন্য আগেই কিছুটা প্রস্তুত ছিলাম। এক সেমিস্টার শেষ করলাম, নিজের জানার মধ্যে যে কতো বিশাল একটা অপূর্ণতা সেটা বুঝে চলছি প্রতিনিয়ত। কিভাবে ও কোথায় “কেন??” প্রশ্নটা করবো এটাই বুঝতে পারি না অনেক ক্ষেত্রে। এইখানে যারা মাস্টার্স করতে আসে তাদের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় ধরেই নেয় যে তুমি তোমার ব্যাচেলর্সে যে যে বিষয় পড়ে এসেছ সেটা তুমি পুরোপুরি জানো, তুমি একপার্ট, নতুন করে সেটা রিভিউ করা হবেনা। কারণ তুমি যদি বাইরে পড়তে এসে আগের পড়া রিভিউ করার জন্য পড়াশুনার ৮০% সময় ব্যয় করো, তাহলে টিকতে পারবেনা। পারবে – যদি তোমার অফুরন্ত সময় আর টাকা ২ টাই থাকে, বাবা-মাকে দেখভাল করার কোন চিন্তা মাথায় না থাকে। এইখানে এসে Lightweight Design এর উপর একটা কোর্সে ক্লাস করেছি, যেটার জন্য ব্যাচেলর্সের Mechanics আর Machine Design এর আদ্যপ্রান্ত জানা বাধ্যতামূলক। “আরে Mechanics এর উপ্রে ৩ খান কোর্স করছি আর মেশিন ডিজাইনে ২ খান গোল্ডেন এ+ পাইসি” – একটা নতুন Hub ডিজাইন করতে দেয়া হল তোমাকে, সব গুলো Design Constraint দিয়ে দেয়া হবে, এইবার তুমি কি সেটা ডিজাইন করতে পারবে? কোন জায়গায় কোন Key বা Spline ব্যবহার করা দরকার ও কেন? অথবা একটা Existing Gearbox দিয়ে দেয়া হল, সেটাতে কি কি সমস্যা আছে এবং সেগুলো কিভাবে দূর করা যায় – সেটা কি তুমি জানো?

***********************একই রকম /এই রিলেটেড আর্টিকেল পড়তে পারেন  *******************

ব্যাচেলর এবং আমার অভিজ্ঞতা

Say no to Bachelor in Germany-rather come for Master (ব্যাচেলর নাকি মাস্টার?)

Fachhochschule এবং University এর মধ্যে পার্থক্য

*******************************************************************************************

তাহলে কী করা যায়ঃ

এখন প্রশ্ন হইল, তাহলে শিখবো কিভাবে আর সাথে রেজাল্ট ভাল করবো কিভাবে? রেজাল্ট ভাল করার কি দরকার আছে? দরকার আছে অবশ্যই, কারণ দুনিয়ার যেখানেই যাও – জব কিংবা মাস্টার্স, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তোমার রেজাল্ট দেখেই প্রথমত মূল্যায়ন করা হবে, তারপর তুমি জানো কি জানো না সেটা পরে বিচার হবে। এই ক্ষেত্রে বলতে পারো, আমি একটা Particular Subject এর উপর Expert, আমার রেজাল্ট ভাল করার দরকার নাই, কোন রকমে টেনেটুনে পাস করতে পারলেই জব আমাকে খুঁজে নেবে বা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার করা প্রজেক্টের কাজ দেখলে আমাকে নতুন-জামাই এর মত আদর দিয়ে রাজভোগ খেতে ডেকে নিয়ে যাবে – তাহলে সে কথা ভিন্ন, কারণ “আমি সেই মাপের এক্সপার্ট হবো, রাত-দিন একটা বিষয়ের উপর নিরন্তর পরিশ্রম করব, অন্য বিষয় গোল্লায় যাক” এই Decision নেয়ার মত Guts লাগে যেটা সবার থাকেনা। আর রেজাল্ট খারাপ করলে তো “তুমি ড্রেনের একটা কীটের চেয়েও নিকৃষ্ট কিছু, তোমার জীবনের আর আশা নাই, উপর থেকে মই নামায় না কেন? উঠে যাও তাড়াতাড়ি” এই সমস্যা আছেই। এখন তাইলে Solution কি? – “আমি ভাল মত জানতেও চাই, ভাল রেজাল্টও করতে চাই”। Solution হইল তোমার মনের মধ্যকার হাজার হাজার প্রশ্ন তৈরি করা, তোমার সদিচ্ছা, পড়াশুনার পিছনে অনেক অনেক সময়। সারাদিন ক্লাস-ল্যাব করে আসার পরও তোমাকে রাতে তোমাকে বই নিয়ে বসতে হবে, প্রতিদিন ক্লাসে যা পড়ানো হইল সেটার কনসেপ্ট সেদিনই ক্লিয়ার করে রাখ, ছুটি বা ক্লাস টেস্ট আসলে বা এক্সামের সময় “কুত্তা Fight” দিব এই চিন্তা মন থেকে Delete করে দাও। জার্মানিতে বিশেষ করে চাইনিজ আর জার্মানদের পড়ালিখার সিস্টেম এরকম, ক্লাস শেষ হইলে তারা হই-হুল্লোর করে চা’র দোকানে যাবেনা, সোজা লাইব্রেরিতে যাবে, আর কখনই একা না – দল বেঁধে একসাথে পড়ে কারণ ৫ মাথা অবশ্যই ১ মাথা থেকে ভাল Performance দিবে, ডিনারটা শেষ করে রাত ১০-১১ টায় রুমে আসে, ঘুমিয়ে আবার সকালে উঠে লাইব্রেরীতে সীট ধরার জন্য দৌড় – একে বলে পড়াশুনা। নিজেকে নিরন্তর প্রশ্ন করো, না জানলে শিক্ষকের কাছে যাও, সেখানে Solution না পাইলে হাজার হাজার আর্টিকেল আছে নেটে, মনে যা ইচ্ছা হয় Google কে জিজ্ঞেস করো, শিক্ষক তোমাকে হতাশ করলেও সে তোমাকে কখনও হতাশ করবেনা, দিন রাত ২৪ ঘণ্টা আছে তোমার পাশে। আর বইকে মহাভারত মনে করার কিছু নাই, একটা কথা লিখা আছে সেটাই ঠিক এটা মনে করার কিছু নাই, তোমার মনে এইটাও আসতে পারে – এই Fuel Injector টা এরকম কেন? এইটা এইভাবে না Design করে এইভাবে হইলেই তো ভাল হইত, তোমার মনের কথা শিক্ষককে বল, উনি কি বলেন, যতক্ষণ তুমি তোমার বিপরীত মতের মানুষের সাথে Argue করতে পারবেনা ততক্ষণ কিছুই শিখতে পারবেনা। রেজাল্ট খারাপ করলে কখনও মন খারাপ করো না, পরীক্ষার খাতায় গাদা গাদা Derivation মুখস্ত লিখার মধ্যে কোন কৃতিত্ব নেই। তুমি যদি একটা সাবজেক্টের গভীরে যেতে গিয়ে পরীক্ষায় ভাল করতে না পারো তাহলে সেটা তোমার দোষ না, সেটা পরীক্ষা সিস্টেমের দোষ যেটা তোমাকে মূল্যায়ন করতে পারেনাই। নিজের মন ও বিবেকের কাছে সবসময় পরিস্কার থাকো – “আমি এটা জানি, এইখান থেকে আমি যেকোনো Conceptual Reason Explain করতে পারবো” এই কথা যেন বীরের মত বলতে পারো। আর নিজে শিখেই কখনও ক্ষান্ত থেকো না, আরেকজনকে সেটা শেখাও, তোমার জানার মধ্যে যা অপূর্ণতা আছে সেটা বুঝতে পারবে। আর একটা সাবজেক্ট পুরোপুরি জেনে খুব খারাপ রেজাল্ট করা একটু কঠিন, খুব ভাল রেজাল্ট নাও হইতে পারে কিন্তু বাইরে আপ্লাই করার মত রেজাল্ট করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। আর কেউ যদি তোমার রেজাল্ট দেখে উপহাস করে, করতে দাও, তুমি একটা কথাও বলবে না, সময় সব কিছুর জবাব দেবে।

***********************একই রকম /এই রিলেটেড আর্টিকেল পড়তে পারেন  *******************

সফল প্রবাসী

বিষয় পরিবর্তন

*******************************************************************************************

উপরের কথাগুলো চিন্তা করো, নিজেই নিজেকে যাচাই করো নিজের মনের কাছে প্রশ্ন করে, CGPA’র ভিত্তিতে নয়। বাইরে আসার জন্য তুমি কতোটুকু প্রস্তুত বা কি কি করা দরকার – সে উত্তর পেয়ে যাবে আশা করি। তারপর সিদ্ধান্ত নাও তুমি কি করবে, আমি আর কোন উত্তর/মতামত দিচ্ছি না। আর জার্মানিতে এসে পড়াশুনা শেষ করে জবের Future কি সে চিন্তা না হয় পরেই করলে…আগে পুরো বিশ্বের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলো। 🙂