১৯০৫ সালে নিউইয়র্ক শহরকে বলা হত ঘোড়ার গোবরের শহর। ধীরে ধীরে মোটরযান বৃদ্ধি পেতে থাকল, সাথে সাথে ঘোড়ার খামারী, ঘোড়া ব্যবসায়ী সকলের প্রয়োজন ফুরালো। বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি দেখে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এই শতকের শেষ নাগাদ ডাক্তারের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে। কোন রোগে কি ঔষুধ বলে দিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এলগরিদম। প্রয়োজন ফুরাতে পারে শিক্ষকেরও। অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থাই হবে শিক্ষার মাধ্যম। কিন্তু এতকাল বাদেও, এত অসম্ভব প্রাযুক্তিক আর অর্থনৈতিক উন্নতি স্বত্বেও সমাজে ধর্মযাজক, পীরদরবেশ আর মোল্লাদের ঘাটতি পড়লো না।

উনিশ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিমে যখন শিল্পায়ন শুরু হয়ে গেছে সেই সময়ে মিশর দাস সংগ্রহের জন্য জয় করলো সুদান। ১৮২০ এর দশক থেকে ১৮৮০ এর দশক পর্যন্ত মিশর বৃটেনের সহায়তায় সুদানে তৎকালীন আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চাইল। মিশরের এ সিদ্ধান্ত সুদানের সমাজকে অস্থির করে তুললো। ১৮৮১ সালে মুহাম্মাদ আহমদ বিন আবদাল্লাহ নামের এক ধর্মাবতারের আবির্ভাব হল। তিনি নিজেকে ইমাম মাহাদী ঘোষণা করে বললেন, তিনি খোদায়ী আইন জমিনের বুকে বাস্তবায়ন করতে স্বয়ং খোদা হতে প্রেরিত হয়েছেন। সুদানের মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করল। সুদানীরা তাদের নতুন পাওয়া ইমামের নেতৃত্বে মিশরীয়দের হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করলো, ইসলামিক প্রজাতন্ত বানিয়ে শরীয়া চালু করলো। ওদিকে দীর্ঘ দশবছর যুদ্ধের পর আফগান মুজাহিদিনরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে হটিয়ে দেয় ১৯৮৯ সালে, এরপর আফগান কমিউনিস্ট সরকারের সাথে যুদ্ধ চলে আরো সাত বছর। অবশেষে ১৯৯৬ সালে তালেবান ক্ষমতা নিয়ে শরিয়া আইন চালু করে, আফগানিস্তানকে ঘোষণা করে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।
 
মিশরীয়রা যেকালে সুদানকে আধুনিকায়নের জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল, সেই সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এলাকা গুজরাটে উত্থান ঘটে দয়ানন্দ স্বরস্বতি নামের এক কট্টর হিন্দু নেতার যিনি হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরনে নেতৃত্ব দেন, বলা যায় আজকের দুনিয়ায় যার ছায়া পড়েছে মোদীর উপর। ১৮৭৫ সালে দয়ানন্দ গড়ে তোলেন “আরিয়া আশ্রম”, ঘোষণা করেন বৈদিক কোন ভাষ্যই কখনো মিথ্যে হতে পারে না। মোদীর ভারতে কট্টর দয়ানন্দের ভক্ত দেড়শ বছর পরেও বাড়ছে বৈ কমছে না। তেহাত্তুর বছর আগে স্বাধীনতা পাওয়ার সময় পাকিস্তানও দেশের নামকরণ করেছে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র।

অপরদিকে পশ্চিমের দেশগুলো ধর্মান্ধতা দূরে ঠেলে গ্রহণ করলো উদার ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শন, যার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীতে তারা সবদিক দিয়েই এগিয়ে গেল। ১৯৭০ সালে পৃথিবীতে মোট ১৩০টি দেশ ছিল, তার মাঝে মাত্র ৩০টি তে উদার গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল, যার অধিকাংশই ছিল ইউরোপের উত্তরপশ্চিমের কোনার দিকে।

একবাক্যে এত কথার অর্থ হল, যে দেশ যে সমাজ ধর্মকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে না রেখে রাষ্ট্রীক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে তারা কখনো অগ্রগতির মুখ দেখেনি। মানবজীবনের সর্বোচ্চ স্টুপিডিটি হল এটা বুঝতে না পারা। তৃতীয় বিশ্বে ভারতের অবস্থান কোনমতে থাকলেও আজকের সুদান আফগানিস্তান পাকিস্তানের দিকে তাকান, গত একশ বছরের ইতিহাস দেখুন এদের, কেন আমি স্টুপিডিটির কথা বললাম বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

পঞ্চাশ ষাটের দশকে কিউবাতে ফিডেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা বিপ্লব করলেন মার্কিন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। মার্কিনদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করেছে ওসামা বিন লাদেনও, করেছে আবুবকর আল বাগদাদী, করে চলেছে ইসলামিক স্টেট, তালেবান, হরকাতুল জিহাদ এমন অসংখ্য সংগঠন। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে যখন প্রায়-খোলাফায়ে রাশেদিনের সরকার ছিল তখন এমন সংগঠন ছিল ১২৫টি। বর্তমান ভারতকে মোদীর হাতে আর বিশটি বছর রাখুন, তখন ভারতেও রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের পাশাপাশি এমন বহু বিপ্লবী সংগঠন দেখা যাবে।

লাদেনের পরিকল্পনায় বহু মানুষ মরলেও তার নিজের হাতে মানুষ খুন করার প্রমাণ নেই, চে গুয়েভারার আছে। এছাড়া চে গুয়েভারা আর ওসামা বিন লাদেন উভয়ের শত্রুও এক। তবু ইতিহাস কেন দুজনকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে? কারণ চে গুয়েভারার সংগ্রাম ছিল জনমানুষের মুক্তির জন্য, লাদেনের মত শুধুমাত্র একটি সুনির্দিষ্ট গোত্রের জন্য নয়, যাদের বিশ্বাস, ধর্ম, সংস্কৃতি লাদেনের মতই। মুসলিম বিশ্বে আজ পশ্চিমাদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে। এসবের বিপরীতে একজন ফিডেল কাস্ত্রো বা চে গুয়েভারার মত বিপ্লবীর জন্ম হচ্ছে না কেন? কেন লাদেন আর বাগদাদীর মত দানব সৃষ্টি হচ্ছে এটি বুঝতে না পারা মুসলিম জাতির চরম নির্বুদ্ধিতা

ঈশ্বর, বিজ্ঞানী আর ভাইরাস- এ তিনের মাঝে একটা বিষয়ে দারুণ মিল। এরা সবাই বর্ণ-জাতি-গোত্র নিরপেক্ষ তো বটেই, ধর্মনিরপেক্ষও। ঈশ্বর যেমন তার আলো বাতাস পানি সকলকিছুই আস্তিক নাস্তিক হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান সকলকে ভোগ করতে দেন সমানভাবে, বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারও সুর্নির্দিষ্ট কোন দেশের জন্য নয়। তদ্রূপ ভাইরাস এমন এক জিনিস সেও কোন ভেদাভেদ করে না, সকলের মূল্য তার কাছে সমান। ইরাকের প্রভাবশালী মোল্লা হাদি আল মোদারেসি ঘোষণা দিয়েছিলেন, সৃষ্টিকর্তার পক্ষ হতে এই ভাইরাস এক গজব, তারা আল্লাহর সৈনিক। দুদিন যেতে না যেতেই সেই সৈনিক দ্বারা তিনি নিজেও আক্রান্ত হলেন। বাংলার মাঠে ঘাটে আজ শোনা যায় মুসলমানদের এটি ধরবে না কারণ তারা সুরা ফাতেহা পড়ে। জার্মানির এক ডানপন্থী নেতা বলেছে, সমকামিতার জন্য খোদার পক্ষ হতে এই ভাইরাস ছাড়া হয়েছে। ওদিকে পঙ্গপালের মত গোমূত্র পান করতে ভারতে যেন প্রতিযোগিতা লেগেছে। এই ভাইরাস যদি ঈশ্বরের সৈন্য হয় আর বিজ্ঞানীরা যদি এই ভাইরাসের ঔষধ বের করেই ফেলেন, তাহলে তা ইশ্বরবিরোধিতা হবে কিনা? এসব যারা বলে তারা আক্রান্ত হলে সেই ইহুদি নাছারাদের ঔষধ গ্রহণ করবেন কিনা?

আমি আপনি স্টুপিড কীভাবে বুঝবো? সুরা ফাতেহা পড়লে করোনা ধরবে না, আর গোমূত্রপানে করোনামুক্ত হওয়া যায়- এই দুটি কথার মাঝে যদি আমরা পার্থক্য পাই তবে মোটাদাগে ধরে নেওয়া যায় আমরা স্টুপিড। মুসলমানদের করোনায় ধরবে না, মন্দিরে করোনা ঢোকেনা, অণ্ডকোষে টোকা দিলে মুক্তি মিলবে, উপাসনালয় থেকে ভাইরাস ছড়ায় না এসব মনে করা চূড়ান্ত স্টুপিডিটি (ultimate stupidity)। মানবজাতির স্টুপিডিটির তালিকা বেশ লম্বা। আপনি কি এমন কোন রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেছেন যারা শুধুমাত্র আপনার ধর্মবিশ্বাসের কথা বলে, আপনার আপন সংস্কৃতি রক্ষার কথা বলে, এবং আপনার দেশে যে আরও ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি আছে তাকে অবমূল্যায়ন করে? আপনার কি কোনভাবে মনে হয় যে আপনার ধর্মের শাসন চালু হলেই চারিদিকে শান্তির সুবাতাস বইবে? অথবা নারীরা অবশ্যই পুরুষের থেকে কম বুদ্ধিমান? নাকি আপনি মনে করছেন করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক কোন ল্যাবরেটরি হতে নয়, বের হবে কোন উপাসনালয় হতে? তবে জেনে রাখুন এই মানবসভ্যতার জন্য আপনার এই স্টুপিডিটি একটি মারাত্মক বিষ। পৃথিবী যে প্রগতির পথে এগুতে পারছে না, আপনি তার একটি কারণ।


ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন
বার্লিন থেকে
০৪.এপ্রিল.২০২০