ডাইরি ১১, এপ্রিল


আমার মায়ের কাছে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনেছি, শুনেছি তখন পাকিস্তানি আর্মিদের ভয়ে মানুষ লুকিয়ে থাকতো, হারিকেনে কালো কাগজ লাগানো হতো, জানালার কাচ কালো কাগজে ঢেকে দেওয়া হতো, যাতে বাইরে থেকে আলো দেখা না যায়। আর্মিরা আমাদের নানাবাড়ীর চাল ডালের গুদামে আগুন দিয়ে দিয়েছিলো। এরপর ভেতরের দিকে কিছু পোড়া চাল ডাল ছিল সেগুলো দিয়ে ঢালা খিচুড়ি রান্না হতো বাড়িতে। আমার নানাবাড়ি এবং আরো তিন চার পরিবার তখন অন্য গ্রামের এক আত্মীয়ের বাড়িতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। এক এক পরিবার মানে তখন ১২ থেকে ১৫ জনের বেশী সদস্য। এতো মানুষের খাওয়া আর ঘুমানোর জায়গা করাও চাট্টিখানি কথা না। সেইসব যুদ্ধের দিনগুলোর যখন গল্প শুনেছি খুব এডভেঞ্চার লাগতো, মনে হতো, “ইশ! কেন যে তখন জন্মায়নি, এরকম একটা যুদ্ধ কেন দেখিনি!”
কিন্তু প্রকৃতি আমাদের এই জেনারেশনকে বঞ্চিত করেনি। এবার আমাদের সামনে ও অনেক কিছু দেখার আছে। করোনা ভাইরাস এর সংকটে আমি রুটি বানানো শিখে গেছি। এদেশের চাল হয়না, আমাদের দেশগুলো থেকেই আসে চাল,ডাল। যেহেতু যোগাযোগ বন্ধ তাই চাল সংকট, রুটির আটাই ভরসা। ভারতের চাল, মসলা, কাচামরিচ এখন আর নিয়মিত আসছে না। স্টুটগার্টের ইন্ডিয়ান দোকানে শুনেছি একজন করোনা রোগী পাওয়া গিয়েছিলো তাই দোকান লকডাউন।
লন্ডনে এখনি খাবারের দাম তিন চার পাঁচগুণ বেড়ে গেছে। আমাদের এখানে ভারতের সাথে যোগাযোগ বন্ধ বলে বাজারে চাল আর কাঁচামরিচ সংকট। জার্মানিতে যদিও বাজারে লোকাল খাবার আছে এখনো প্রচুর তাই দাম বাড়েনি। কিন্তু এখানে ফলমূল যেমন কলা, শাকসবজি আসে স্পেন, সাউথ আমেরিকা থেকে। স্পেনের যে অবস্থা এরপর শাকসবজি আর খাবার কতদিন আসবে সেটাই প্রশ্ন! মাঝে মাঝে দু একটা চালান যা আসে সেটা আবার সময় মতো না গেলে আর পাওয়া যায় না। আমাদের এখানে পরিবেশবাদীদের ক্যাম্পেইন ছিলো ; Eat regional, eat local. কেননা অনেক দূর দূরান্ত থেকে পৃথিবীর এক এক প্রান্ত থেকে খাবার আনতে অনেক কার্বন বা গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ ঘটে। সেটাও করোনা ভাইরাস পরবর্তীতে মানুষের ভাবতে হবে আবার।
জার্মানিতে একটা নিউজ দেখলাম করোনা ভাইরাস পরবর্তীতে এরা গাড়ি নয় বরং কৃষিতে মনোযোগ দিতে চাই। হুমায়ুন আহমেদ এর অয়োময় নাটকে মহামারীর দৃশ্য দেখেছিলাম। গুটি বসন্তের ভাইরাস কে ডাকা হতো শীতলাদেবী, যে বাড়িতে শীতলা দেবী ঢোকে সে বাড়ি ছারখার করে দিয়ে যায়। ইটালির পর নিউইয়র্কে এখন শীতলা দেবীর অবস্থান। নিউইয়র্ক আর ইটালিতে পরিচিত যারা আছে এদের মনের অবস্থা আর পরিবারের অবস্থা কেমন সহজেই অনুমান করা যায়। নিউজগুলো দেখে দূর থেকেই রাতে ঘুম আসে না। এইজন্য মোবাইল ফেসবুক নিউজ সব মাঝে মাঝে বন্ধ থাকে। শীতলা দেবীর প্রস্থান পরবর্তী সংকট পৃথিবীর মানুষ কিভাবে সামাল দিবে জানিনা।
ইংল্যান্ড তাজা খাবার, ফলমূল, শাকসবজির জন্য আশেপাশের দেশগুলোর উপর নির্ভরশীল। স্পেন, ইটালির করোনার ভগ্নদশার প্রভাবে ইংল্যান্ডের বাজারে খাবারের দাম উর্ধমূখী। আর বাকিদের অতিরিক্ত কেনাকাটার জন্য বাজারের তাক খালি। লন্ডনে প্রাইমারি স্কুলের একজন বান্ধবী থাকে, “সে আমি কেমন আছি জানতে খোজ করেছিলো, বলেছিলো ওদের খাবার নেই বাজারে।” কিছুদিন পরে আমি খোজ নিলাম সে খাবার পেয়েছে কিনা জানতে, উত্তর এলো, “তার ভাই আইসিইউতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত।”
ইতোমধ্যেই চাকরির ছাটাই শুরু হয়ে গেছে। আশেপাশের দুজনের চাকরি চলে গেছে। সকালে একটা জার্মান ফ্রেন্ড কল দিয়ে বলল চাকরি চলে গেছে ওদের অফিসে একশভাগ ছাটাই মানে অফিস আর চলবে না। আগামী দুবছর এরকম অর্থনৈতিক মন্দা থাকবে আরও বেশীও হতে পারে। সে তার দাদীর কাছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের অর্থনৈতিক মন্দার গল্প শুনেছে।সেই গল্প বলল, আমিও সেসব গল্প শুনেছি আমার এক জার্মান টিচার এর মুখে। তখন তিনি শুধু আটা সিদ্ধ করে বাচ্চাদের খেতে দিয়েছেন। ইউরোপ এর যুদ্ধবিদ্ধস্ত মন্দা অর্থনীতিতে, খাবারের তীব্র সংকটে আমেরিকা তখন প্রথম মোড়ল হিসেবে আবির্ভূত হয় (জেনেটিক্যালি মডিফাইড গম) খাদ্য নিয়ে। এবারে হয়তো আমেরিকার নিজেকে রক্ষা করতে হলে অন্য দেশের সাহায্য দরকার।
ইউরোপে এর আগে কোনদিন কেউ এরকম ইস্টার দেখেনি। এখন হয়তো অনেক লাক্সারি প্রজেক্ট বাতিল হয়ে যাবে, মিলিয়নিয়াররা দায়গ্রস্থ হবে, স্কলারশিপের ফান্ড কমে যাবে প্রথম ধাক্কায়। কিন্তু ভাইরাস ইমুউনিটি নিয়ে গবেষণার ফান্ড শুরু হয়ে গেছে।
এরা উন্নত দেশ এদের অনেক রকম ফান্ড আছে, পরিকল্পনা আছে বেকার ভাতা আছে অবশ্য যদিও সেটা তাদের নাগরিকদের জন্য। গতকাল একজন পাকিস্তানি মেয়ে এসেছিল কোন টাকা নেই। বাংলাদেশের জার্মানএলুমনাই গ্রুপে অনেক এপ্লিকেশন এসেছে ফান্ড এর জন্য লেখা ছিলো কারো কারো দু এক সপ্তাহের বেশী খাবারের টাকা নেই।
কিন্তু বাংলাদেশ কি সব পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে? ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে যাচ্ছে!গার্মেন্টসে শতশত অর্ডার বাতিল হয়ে গেছে, যাচ্ছে, যাবে। অনেকে আর চাকরি ফেরত পাবেনা, চাকরি হারাবে।
বাংলাদেশ ২০১৭ এর বন্যা পরবর্তী চালের বাজার পরিস্থিতিই সামাল দিতে পারেনি, বন্যায় চালের দাম বেড়েছিলো । ২০১৯ এ পেয়াজের সংকট এবং পেয়াজের দাম নিয়ে ও তো প্রচণ্ড অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। এখন যদি মাঠের ধান না কাটা যায় কিছুদিন পরে বন্যা আসবে পানিতে এমনতেই সব তলিয়ে যাবে। খামারিদের গরু, ছাগল হাস -মুরগীর খাবারের চালান বন্ধ। বেশী দামে খাবার কিনলেও পশু খাবার সংকট সুতরাং মাছ মাংসের বাজারেও দাম বাড়বে অচিরেই। গরুর দুধ নিয়ে গ্রামের কৃষক বিপাকে, শহরে চালান বন্ধ।
স্বাভাবিক অবস্থাতেই সরকার পলিসির ব্যর্থতার কারণে খাবারের বাজার সামাল দিতে পারেনা। সাথে এখন যোগ হয়েছে বাংলাদেশের করোনা।
যেই করোনা ভাইরাস শুরুতে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যেতো, সেটা তাদেরকে বাধ্য করা যেতো কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক পলিসির অভাবে এখন সরকার পরিস্থিতি লেজেগোবরে করে ফেলেছে।
কতদিন এই লক ডাউনে মানুষ থাকতে পারবে!
যাদের এখনো অনেক লোভ, দুঃস্থ ভাতার টাকা লুটপাট করে গোডাউন ভরছে, দুর্নীতির অনেক টাকা! এরা কি জানে যে, প্রথম ধাক্কায় অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব দিনমজুর কৃষক শ্রমিকদের উপরে গেলেও সেটার প্রভাব অল্পদিনের ভেতরেই শহরে ও আসবে। কৃষক শ্রমিকরা না খেয়ে মরে গেলে কে শহরের লুটেরাদের প্লেটে খাবার এনে দেবে? শহরে তো কোন ধানক্ষেত নেই, ফসল নেই, ডিম – দুধ নেই, শাকসবজি নেই, মানুষ কি খাবে? মানুষ কি টাকা খেতে পারবে?
সবার নিশ্চয়ই একাত্তর পরবর্তী দূর্ভিক্ষের কথা মনে আছে। সেই সময় ও নেতা পাতিনেতা এবং চোরের দল ত্রাণের খাবার লুট করেছিলো! এখনকার ত্রান চোরদের ছবি দেখে কেন জানি বারবার তখনকার ত্রাণচোরের কথা মনে পড়ছে! তখনকার সেই দুর্ভিক্ষ যতনা ছিলো প্রাকৃতিক তার থেকে অনেক বেশী ছিলো মনুষ্যসৃষ্ট! মজুতদারদের মজুতের প্রতিযোগিতা সেই বাজার পরিস্থিতি আরো জটিল করেছিলো, চালের দাম হয়েছিলো অসভাবিক উর্ধমুখী । সেই কৃত্রিম খাদ্যসঙ্কটে দেশ বেসামাল লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা গিয়েছিলো। মানুষের ভেতর পুঞ্জিভূত ক্ষোভ ফুসে উঠেছিলো! এখনকার আওয়ামীলীগ কি সেরকম পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে! বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কি যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া আছে!
এবারে যখন অনেক ধানের ফলন হয়েছিল তখন কৃষকরা অভিমানে অনেকে ফসল আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলো কারণ বাজারে কম দাম ছিল, সেটাও মজুতদারদের একচেটিয়া বাজার দখলের কারণে । তখন সরকারের পলিসির ব্যার্থতায় বাজারে কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়নি ফলে অনেক কৃষক ধান চাষ ছেড়ে দিয়ে রিকশা চালাতে ঢাকা এসেছিলো।
একজন রিকশা ওয়ালার পিঠে লেখা দেখেছিলাম, ” করব না আর ধানের চাষ, দেখবো তোরা কি খাস! “
একদিন হয়তো আবার ভোর হবে, হয়তো সেদিন পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নিবে। সেদিন একটা নতুন পৃথিবী হবে।সেই পৃথিবীতে মানুষ হয়তো অনেক বদলে যাবে, একটা নতুন সকাল হয়তো হবে আবার! সেই ভোরের অপেক্ষায়!