প্রায় ছয়শো বছর পূর্বে চতুর্দশ শতাব্দীতে ব্ল্যাক ডেথ যখন চীনে প্রথম দেখা দেয়, সেই মহামারী ইউরোপ পর্যন্ত আসতে সময় নিয়েছিল প্রায় দশ বছর। এতে ইউরোপ-এশিয়ার প্রায় বিশ কোটি  তথা ৩৭ শতাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করে। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরের এক লাখ অধিবাসীর মধ্যে মারা যায় পঞ্চাশ হাজার। ১৫২০ সালের মার্চে গুটি বসন্ত নিয়ে ইউরোপ থেকে প্রথম নৌকা ভিড় করে মেক্সিকোর পোতাশ্রয়ে। পুরো মেক্সিকোতে সেটি ছড়িয়ে পড়ে ডিসেম্বরের মধ্যেই এবং পরিশেষে মারা যায় ২০ লাখ মানুষ, বেঁচে থাকে মাত্র ২ লাখ। 

এদিকে এবারের করোনা ভাইরাস চীন থেকে ইউরোপে আসতে সময় নিয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহ। এই উদাহরণ দিয়ে লোকরঞ্জনবাদীরা বলেই চলেছেন দেশে দেশে দেয়াল তোলার কথা, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কথা। এই সুযোগে তারা একপ্রস্থ বিশ্বায়নের বিরোধিতাও করে নিচ্ছেন। যারা “আমরা আমরা” ভুলে শুধু “আমি আমি” করে তাদের এখন পোয়াবারো। তারা মোক্ষম যুক্তি পেয়েছে ইতালির ঘটনায়। দক্ষিণ ইতালির যে স্থানে করোনা ভাইরাসের প্রথম সূত্রপাত ঘটে সেখানে প্রচুর টেক্সটাইল মিলের কারখানা, চীনের সাথে ওই শহরের ব্যবসা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চীনের সাথে যদি ইতালি তাৎক্ষণিক সম্পর্ক ছিন্ন করতো তবে কি মহামারী আজ এই পর্যায়ে পৌঁছাত?

কঠিন যুক্তি, আপাতত অবশ্যই সঠিক কথা। কিন্তু সুবিধাবাদী রাজনীতিকরা দেশে দেশে মানুষে মানুষে বিভাজনের এই সুযোগ শুধুমাত্র করোনাকালীন সময়েই সীমাবদ্ধ রাখবেন না সেটি বোঝা কষ্টকর নয়। ট্রাম্প ইতিমধ্যেই বলেছেন, দেয়াল তোলার কথা কেন আমি বারেবারে বলি তার গুরুত্ব নিশ্চয়ই সবাই এখন বুঝবে। কিন্তু যখন মধ্যযুগের ওই প্লেগ চীন থেকে এসে ইউরোপে গণহারে মানুষ মেরেছে তখন বিশ্বায়ন বলতে কিছুই ছিল না, ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল নামেমাত্র। কিন্তু তাতে কি মহামারী আটকে ছিল? আজকে বৃটেনের দৈনন্দিন শাক সবজি ডাল আটা ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যের ত্রিশ শতাংশ যায় ইউরোপ হতে। বিশ্বায়নের মাত্রা এত দূর হওয়ার পরেও এবারের মহামারীতে মৃত্যুর সংখ্যা এখন পর্যন্ত অতীতের মহামারী থেকে থেকে কম নয় কি? কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা কম হলেও, বিশ্বায়নের প্রভাবে মহামারী ছড়াতে তো সময় লাগছে কম। তাহলে বিশ্বায়ন-সমস্যা তো রয়েই যাচ্ছে।

মানুষের ভেতরের সবচেয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত বৈশিষ্ট্য হল তারা সামাজিক জীব। তারা একে অপরের বিপদে অগ্রগামী হয়, নানাপ্রকার সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। ভাইরাসের মত গোপন এককোষী প্রাণী মানুষের এই অনিন্দ্য সুন্দর আচরণের সুযোগ নেয়। বর্তমান পৃথিবীর মানুষ ইতিহাসের যেকোন সময়ের তুলনায় অধিক সামাজিক আর নিবিড় যোগাযোগের ভেতর বাস করে। অবশ্যই এটি বিশ্বায়নের ফল আর এর কারণে যেকোন ভাইরাস মানবজাতিকে অতীতের যেকোন সময়ের চাইতে দ্রুতহারে বিপদে ফেলতে সক্ষম। 

কিন্তু ঘটনার বিপরীতেও ঘটনা আছে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না মানবজাতির ইতিহাসে বিজ্ঞান এই মুহুর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী, এবং এটি শুধু শক্তিশালীই হতে থাকবে, তাসের ঘরের মত বিজ্ঞানের জয়যাত্রা রোধ হবে না। আশার কথা হল করোনা ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স বের করতে বিজ্ঞানীরা সময় নিয়েছে মাত্র দুই সপ্তাহ। বিজ্ঞান যখন মহামারীর কারণ বুঝতে পারে তখন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সহজ হয়ে যায়। ১৯৬৭ সালে গুটি বসন্তে আক্রান্ত হয় ১৫ লাখ মানুষ, মারা যায় ২ লাখ। কিন্তু এর ভ্যাকসিনের ব্যাপক প্রচার ও প্রয়োগের ফলে ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ঘোষণা করে, মানবজাতির জয় হয়েছে কারণ বসন্তরোগ সম্পূর্ণ নির্বাপিত হয়েছে। ২০১৯ সালে পৃথিবীর কোথাও একটি মানুষের মৃত্যু তো দূরের কথা, বসন্ত রোগে একটি মানুষ আক্রান্তও হয়নি। 

বিজ্ঞানের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া বিশ্ব আর কী কী করতে পারে? এই মুহুর্তে পৃথিবীর দরকার সঠিক দক্ষ নেতৃত্ব আর বৈশ্বিক সংহতি। ২০১৪ সালের ইবোলা আক্রমণে যখন পশ্চিম আফ্রিকা পর্যদুস্ত, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, তখন পৃথিবীতে পরিপক্ষ নেতৃত্ব ছিল যারা ওই মহামারীতে প্রজ্ঞাসুলভ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের পর হতে পৃথিবীর অক্ষ ঘুরে গেছে। আমেরিকা নেতার পদ হতে পদত্যাগ করেছে। এই নেতৃত্ব মনে করে পৃথিবীর প্রতি তাদের কোন দায় নেই, তাদের আছে শুধু “স্বার্থ”(Interest)। আমরা দেখতে পেলাম কোনধরনের আলোচনা ছাড়াই আমেরিকা ইউরোপের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করলো, তবে বৃটেন বাদে। করোনার ভ্যাকসিনের উপর একক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জার্মানির একটি ফার্মাসিউটিক্যালসকে এক বিলিয়ন ডলার অফার করেছিল তারা। এতকিছুর পরেও যদি আমেরিকা আজকের মহামারী থেকে উদ্ধারে বিশ্বনেতৃত্বের আসনে আসতে চায়, বাকি বিশ্ব কি এমন একটি দেশকে বিশ্বাস করতে চাইবে যে দেশের প্রশাসন কোন দায় নিতে চায়না, যারা ভুল স্বীকারকে দুর্বলতা মনে করে, নিয়মিতভাবে সকল দোষ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজে শুধু বাহবা নিতে ইচ্ছুক এবং যাদের প্রধান মোটো হল “মি ফার্স্ট”?

নেতৃত্বের এই খড়াকালীন সময়েই আরেক বিপদ আমরা দেখতে পারছি। মানুষ যে আসলেই “মানুষ” তা প্রমাণ করার সময় সকালে বিকালে আসে না, তা আসে কালে ভদ্রে। দুর্যোগের সময় ভবিষ্যৎ বিপদের কথা ভেবে পৃথিবীব্যাপী মানুষের ক্রোধ, লোভ, ভোগবাদীতার উগ্ররূপ ধরা পড়েছে। সুপারশপে খালি তাকের দিকে বৃদ্ধদের তাকিয়ে থাকার মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের এই রূপকে প্রকাশিত করেছি। কিন্তু বিপদের এই সময়ে আমাদের প্রয়োজন আরো বেশি বৈশ্বিক সংহতি আর সহমর্মিতা। জার্মানি নিজে বিপদে থেকেও সম্প্রতি ইতালি এবং ফ্রান্স থেকে ভাইরাসে আক্রান্ত কয়েকজন গুরুতর রুগী নিজেদের বিমানে উড়িয়ে এনে এখানে চিকিৎসা দিচ্ছে। পৃথিবীর এই মুহুর্তে এটিই সবচেয়ে বেশি দরকার। 

মানুষের কোন বিপদই মানুষের বিবর্তনকে রুখে দিতে পারেনি। সত্তুর হাজার বছর পূর্বে আজকের মানুষ কোন দিক দিয়েই একটা শিম্পাঞ্জি হতে শ্রেষ্ঠ ছিল না। সেই মানুষ বিবর্তনের ধারা বেয়ে আজকে পৃথিবী শাসন করছে, তারা ঘোষণা করেছে “মানুষই” শ্রেষ্ঠ। এর একটিই কারণ, মানুষের রয়েছে তীব্রভাবে ভালবাসার ক্ষমতা যা মানুষকে জীবজগতের নেতৃত্বে আসীন করেছে। মহাবিপদের এই দিনে মানবজাতিকে জয়ী হতে গেলে ভালবাসার মত অপূর্ব এই ক্ষমতার কথা ভুলে গেলে চলবে না।

ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন
বার্লিন থেকে
২৯.০৩.২০২০