সামাজিক জীব মানুষ- বিধায় তাঁর পক্ষে বিচ্ছিন্ন থাকা অসম্ভব। কিন্তু এখন করোনা-কাল। মহাবিপদের কাল। বিশেষজ্ঞ আর সরকারগুলোর পরামর্শক্রমে আমরা সবাই ঘরবন্দি। যারা হোম অফিস করে বা যারাই ছাত্র সকলের জন্য এ এক দুঃসহ সময়। এই সময়ে একাকীত্ব, মানসিক চাপ (stress) আর অবসাদ ভর করা কাল্পনিক কিছু নয়। ঘরবন্দি সঙ্গহীন সময় শুরু হয়েছে বেশ কদিন, ইতিমধ্যে অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। কিন্তু বিপদের এই সময় কত দীর্ঘ হবে কেউ জানে না। একারণে এই কঠিন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে কী করে ভাল থাকবেন তাই নিয়ে বিবিসি কিছু পরামর্শ দিয়েছে। সেটি পড়ে নিতে পারেন এখানেঃ https://www.bbc.com/future/article/20200317-covid-19-how-to-stay-happy-during-the-coronavirus-outbreak

এছাড়া আমার ব্যক্তিগত কিছু কথা শেয়ার করতে পারি। প্রচুর মুভি দেখুন, বই পড়ুন। আমার ইংরেজি বই পড়ার অভ্যাস কম। আপনাদের থাকলে আমি দুটো বইয়ের কথা বলতে পারি। এক, “Sapiens- A Brief History Of Humankind” আর দুই,“Homo Deus- A Brief History Of Tomorrow”। দুটিরই লেখক Yuval Noah Harari। আমি দ্বিতীয়টি শেষ করে এখন প্রথমটি পড়ছি। কথা দিতে পারি ঠকবেন না। অবসর এই সময়ে কিছু বই অর্ডার করে ফেলুন। এর বাইরে যারা গান কবিতা পারেন সেসব একটু ঝালাই করে নিন। দেশে পুরনো বন্ধুদের সাথে কথা বলুন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মোটামুটি আমরা সবাই ভুল জানি বা কম জানি। প্রিয় বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস একজন বাংলাদেশি হয়ে না জানা কিন্তু ঠিক না। এই সময়ে তা জেনে নিতে পারি। এখন ফুল সবজি লাগানোর দিন। ঘরের কোনে জায়গা থাকলে বাগানবিলাস মন্দ হবে না। এছাড়া নতুন কোন রান্না শিখতে পারেন ইউটিউব থেকে। এর বাইরে প্রতিদিন নিয়ম করে পুরো ঘর, টয়লেট, কিচেন পরিষ্কার করতে পারেন প্রিয় কোন গান শুনতে শুনতে।  

এ তো গেল একাকীত্বে করণীয়। এবার একটি ভিন্ন বিষয়। করোনা ভাইরাস শুধু নয়, যেকোন বাহ্যিক ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস হতে আমাদের শরীর নিজেই যুদ্ধ করতে থাকে। এটিকে আমরা ইমিউনিটি সিস্টেম বলি। যার ইমিউনিটি সিস্টেম যত শক্তিশালী, ভাইরাস দ্বারা কুপোকাত হওয়ার সম্ভাবনা তাঁর তত কম। তাই এই ইমিউনিটি সিস্টেমকে আরো শক্তিদান করতে আমরা কিছু ব্যাপার অনুসরণ করতে পারি।


১। কমপক্ষে সাত ঘণ্টা ঘুমান। কম ঘুম শরীরে স্ট্রেস তৈরি করে, কর্টিসল হরমোনের তারতম্য তৈরি হয়, সেখান থেকে ইমিউনিটিতে প্রভাব পড়ে।

২। শরীরচর্চা করুন। এখন অঢেল সময়, যদিও বাইরে কম যাওয়া উচিত, তবু সন্ধ্যার দিকে ফুটপাত ধরে একটু দৌড়ে আসতে পারেন। আর শরীরচর্চার ভূমিকার কথা নিশ্চয়ই নতুন করে বলার কিছু নেই। লোক সমাগম যেখানে কম সেখানে হাঁটতে পারেন। কাছাকাছি খালি জায়গা না পেলে অন্তত ঘরেই কিছু ফ্রি হ্যান্ড করতে পারেন। কিন্তু ভুলেও যেখানে মানুষের আনাগোনা সেখানে যাবেন না।

৩। মদ্যপান বন্ধ করতেই হবে যদি ইমিউনিটি বাড়াতে চান। এটি ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। 

৪। ভিটামিন সি গ্রহণ করুন। ভাইরাস বা যেকোন বাহ্যিক শত্রুর হাত হতে শরীরকে বাঁচাতে এই ভিটামিন ঢাল হিসেবে কাজ করে। 

৫। ভিটামিন ডি হল আরেকটি কাজের জিনিস যা গবেষণায় প্রমাণিত যে এটি একটি  ইমিউনিটি বুস্টার। আমরা যারা শীতপ্রধান দেশে থাকি তাদের অধিকাংশই এই ভিটামিনের অভাবে ভুগি। এছাড়া শরীরে ইতিমধ্যে যত ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া রয়েছে তাদের সুপ্তাবস্তায় অকার্যকর রাখতে এই ভিটামিন ডি খুবই জরুরী। এর সাথে জিঙ্ক আর সেলেনিয়াম নিলে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বহুলাংশে বেড়ে যাবে। 

৬। সকালে খালি পেটে এক গ্লাস দুধের সাথে আধা চা চামচ হলুদের গুঁড়া মিশিয়ে পান করুন। আদা রসুনের ব্যবহার বাড়িয়ে দিন। 

৭। চিকেন স্যুপ, বোন ব্রথ এগুলো ভিটামিনের আধার। যারাই শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করত চান তারা অবশ্যই এটি করে খাবেন।


ইন্টারনেট থেকে পাওয়া এই সমস্ত টিপসের বাইরে ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে আর যা যা করণীয় সবাই তা জানেন। হাত ধোয়া, পরিষ্কার থাকা, মাস্ক পরা, ভীড়ের মধ্যে না যাওয়া ইত্যাদি সবাই মেনে চলবেন। যাদের একাধিক যৌনসঙ্গী রয়েছে তারা এই সময়ে বিরত থাকাই শ্রেয়। বিশেষ করে যারা সমকামী, যারা বিভিন্ন মোবাইল ডেটিং এপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মানুষের সাথে ডেট করেন, যাদের অপরিচিত একাধিক মানুষের সাথে যৌন সম্পর্ক রয়েছে, করোনার এই মহামারীর দিনে তাদের অতি সাবধান থাকা খুবই জরুরী।
    

আপনার শরীর যদি সামান্য খারাপ হয়ে থাকে, বুঝতে পারছেন না এটি কোন দিকে যাচ্ছে তবে আপনার করণীয় ঠিক করে দেবে একটি ওয়েবসাইট। বার্লিনের বিখ্যাত মেডিকেল ও রিসার্চ ইন্সটিটিউট শারিটে(Charité) আপদকালীন একটি ওয়েব এপ তৈরি করেছে যেখানে কিছু প্রশ্ন রয়েছে। একে একে সব প্রশ্নের উত্তর দিলে এটি আপনাকে বলে দিবে আপনার কি করা উচিত, কার সাথে যোগাযোগ করা উচিত, আর আপনার সার্বিক স্বাস্থ্যের একটা সারসংক্ষেপ। বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুনঃ https://covapp.charite.de/
  

পরিশেষে বলতে চাই, সবকিছু ভাগ্যের হাতে ছেড়ে না দিয়ে যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ যেন আমরা নিজেদের এবং আমাদের চারপাশে সবাইকে ভাল রাখতে পারি এই চেষ্টাই পৃথিবীকে এই মহামারী থেকে আজকে উদ্ধার করতে পারে। সকলের সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ জীবন কামনা করি।

আরো পড়ুনঃ 
বঙ্গসমাজ আর চৈনিক ভাইরাস
করোনা-কালের কথন

ধন্যবাদান্তে
জাহিদ কবীর হিমন
বার্লিন থেকে
২১.০৩.২০২০