আজ হতে ঠিক দুই বছর আগে আমাদের সুজন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। আগামীকাল সুজনের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হতে চলেছে। সুজনের মৃত্যুর পর জার্মান প্রবাসের আহ্বানে সারা পৃথিবী থেকে যে অভূতপূর্ব সাড়া বাংলাদেশের মানুষ দেখিয়েছে তার তুলনা আর দ্বিতীয়টি হয় না। যে অর্থ চেয়ে আমরা আপনাদের নিকট আবেদন রেখেছিলাম তার থেকে কয়েকগুণ অর্থ আপনারা পাঠিয়েছিলেন। সেসবের সবই আপনাদের জানা, তবু আরেকবার চোখ বুলাতে পারেন সেই লেখাগুলোর উপর।  

অর্থ সহায়তা চেয়ে প্রথম পোষ্ট ও তৎপরবর্তী কয়েকদিনের আপডেট- জার্মানিতে এক হতভাগ্য তরুণের কথাঃ সুজনের মরদেহ পাঠানোর আপডেট

যারা অর্থ পাঠিয়েছিলেন সেই পাঁচশত মানুষের তালিকা- সুজনের জন্য আপনারা

এরপরই মূলত টাকার অংক দেখে আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। সুজনের বাড়ি ভাড়া, ধারদেনা, আনুষঙ্গিক খরচা, লাশ পাঠানো সব বাবদ খরচ করে বাকি টাকা পুরোটাই ওর পরিবারকে দিয়ে দিব নাকি দীর্ঘমেয়াদে কোন পরিকল্পনা হাতে নিব সেই ভাবনা আমাদের মাথায় আসল। কিন্তু মানুষের টাকা নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আমাদের নেই। তাই আমরা সেই সিদ্ধান্তের ভার মানুষের উপরেই ছেড়ে দেই। সব খরচার পর কিছু টাকা রেখে দিয়ে ফান্ড করার পক্ষে প্রায় নব্বই ভাগ ভোট পড়ে। কিন্তু ফান্ড তো দূরের কথা, প্রথমে জার্মানির বিখ্যাত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেরিয়ে লাশটা দেশে পাঠানোই ছিল সেসময়ের বড় চ্যালেঞ্জ। সবার সহযোগিতায় তা হল। এরপর বাকি অর্থ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু আমরা চাই এমন একটা ব্যবস্থা করে দিতে যাতে চাইলেই তাঁরা সেই টাকা সব খরচা করে ফেলতে না পারে। সুজনের পরিবার থেকে এই টাকা দ্রুত পাওয়ার আকুলতা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কিছুতেই একটি ফিক্সড ডিপোজিট না করে তাঁদের টাকা দেয়া যাবে না। বহু ঝামেলা পেরিয়ে অবশেষে টাকাগুলো সংস্কৃতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সুজনের পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই খবরের বিস্তারিত এখানে জানতে পারবেনঃ সুজনের পাশে জার্মান প্রবাসে

ফান্ডের জন্য রেখে দিলাম ৪২২২ (চার হাজার দুইশত বাইশ) ইউরো। কিন্তু এই ফান্ডের ব্যবহার কি হবে শুরুতে আমরা ঠাওর করতে পারিনি। যেমন, আমরা কি আরও একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করবো যার লাশ পাঠাতে এই অর্থ আমরা ব্যয় করবো, নাকি মেধাবীদের বৃত্তি দিয়ে শেষ করে ফেলব, নাকি বিপদগ্রস্ত কাউকে দান করে দিব? একসময় ভাবলাম একটা রেজিস্ট্রিকৃত সংগঠন করতে পারলে এই বাজেট দিয়ে শুরু করলে পরবর্তীতে আরও বহু কাজ মানুষের কল্যাণার্থে করা যাবে। বহু খোঁজাখুঁজির পর দেখলাম, এসবের জন্য যে সময় ও প্রস্তুতির প্রয়োজন তা আমাদের নেই, এছাড়া রেজিস্ট্রিকৃত সংগঠনের যে আমলাতান্ত্রিক প্যারা আছে, জার্মান ভাষায় বকলম আমাদের পক্ষে সেসব মোকাবেলা অসম্ভব। একারণে একটি সহজ পথে এই অর্থ কাজে লাগানোর পথ আমাদের খুঁজে পাওয়া জরুরী হয়ে পড়ে, যেখানে আমাদের সময়ও কম দিতে হবে। এসব প্রস্তুতি নিতে নিতে আমরা দুটি বছর পার করে ফেলেছি। এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী। 

ফাউন্ডেশনের লোগো

এবার আসল কথায় আসি। সুজনের নামে এই ফান্ড থেকে জার্মানিতে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের থিসিস চলাকালীন সময়ে শিক্ষাঋণ প্রদান করা হবে। ব্যচেলর বা মাস্টার্স থিসিসের সময় একটা সীমাহীন বেদনার সময়। এসময়ে কাজ ছেড়ে থিসিস করলে খাওয়ার পয়সা নাই, আবার কাজ করে থিসিস করা মানে পর্বতসমান চাপ। এসময়ে অল্প কিছু অর্থও অনেক বড় কাজে আসতে পারে বলে আমাদের সকলের অভিজ্ঞতা।
এই ঋণ মানে হলে প্রদেয় অর্থ আবার ফেরত নেওয়া হবে। একারণে আমরা এর নাম বৃত্তি রাখিনি, কারণ বৃত্তি দিলে সেই অর্থ শেষ হয়ে “সুজন ফাউন্ডেশন” এর বিলুপ্তি ঘটবে। কিন্তু আমরা এটিকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। এই ফান্ড থেকে যারা অর্থ পাবে, শিক্ষাজীবন শেষে চাকরি পাওয়ার পর সেই অর্থ ফেরত দিয়ে দিবে। আমরা জানি এই ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া ক্ষেত্রবিশেষে দীর্ঘ হতে পারে। সেখানেই আমাদের অবসর, অর্থ্যাৎ ঋণ দিয়ে আমরা বসে থাকব, যেদিন চাকরি পাবে সেদিন এই অর্থ ফেরত দেবে। এর মাঝে কেউ কেউ যদি ফেরত দেওয়ার সময় কিছু অর্থ বাড়িয়ে দেয় (বাধ্যতামূলক নয়) তাহলে ফান্ড বড় হবে, আরও বেশি শিক্ষার্থী উপকৃত হবে। এসবের মাঝেই যদি জার্মানিতে কোন শিক্ষার্থীর সুজনের মত দুর্ভাগ্যবরণ করে মৃত্যু হয়, যা আমাদের কখনো কাম্য না, তাঁদের জন্য প্রয়োজন বুঝে এই অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। 

এই শিক্ষাঋণের জন্য কিভাবে আদেবন করা যাবে তার জন্য এই লিঙ্কে যেতে পারেনঃ

সুজন ফাউন্ডেশনের শিক্ষাঋণ পেতে আবেদন প্রক্রিয়া

এই ফাউন্ডেশনের জন্য একটি ফেসবুক গ্রুপ খোলা হয়েছে। আগ্রহীরা জয়েন করবেনঃ

সুজন ফাউন্ডেশন ফেসবুক গ্রুপ

ফাউন্ডেশনের জন্য লোগো তৈরি করে দিয়েছে আমাদের জার্মান প্রবাসে ম্যাগাজিনের গ্রাফিক ডিজাইনার নাঈম। তাঁকে কৃতজ্ঞতা। এই ফাউন্ডেশনের দায়িত্বে রয়েছি আমরা তিনজনঃ

-হাসনাইন (ব্রেমেন)

-তানজিয়া (বার্লিন)

-জাহিদ কবীর হিমন (বার্লিন)

যেকোন প্রয়োজনে বা আপনাদের অভিমত ব্যক্ত করবার অনুরোধ রইল এই ইমেইলেঃ
[email protected]

এই ফাউন্ডেশন জার্মান প্রবাসের একটি অঙ্গ হিসেবে পরিচালিত হবে। একটি বিষয় মাথায় রাখবেন, ফাউন্ডেশনের অর্থ আপনাদের, আপনারা এর মালিক। পরিচালনার জন্য কাউকে না কাউকে থাকতে হয়, শুধুমাত্র সে লক্ষ্যেই আমরা। এবং সেই কারণে স্বচ্ছতার জন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আমাদের বিসাগ বা জার্মান প্রবাসের সাথে জড়িত কেউ এই অর্থ থেকে কোন ধরণের সুবিধাভোগ করার যোগ্যতা রাখবে না। তবু আমাদের কোন ভুল হবে না তা নয়। সেকারণেই আপনাদের কাছে অনুরোধ সেই ভুল ধরিয়ে দিবেন। পরিশেষে একটি কথাই বলতে চাই, ঐক্যবদ্ধ মানুষ পৃথিবী বদলে দিতে পারে। আমরা সবাই পরিবার পরিজন রেখে এই বিদেশে। আমাদের পাশে আমাদেরই দাঁড়াতে হবে। আমরা একত্র থাকলে এই ফাউন্ডেশন অনেকদূর যাবে এবং এর থেকে বহু মেধাবী শিক্ষার্থী উপকৃত হয়ে আরও অধিক মানুষকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে। আবারও আপনাদের কৃতজ্ঞতা জার্মান প্রবাসের সাথে থাকার জন্য।