মধ্যপ্রাচ্যে খেলাফতের সুবর্ণসময় ছিল আব্বাসীয় শাসনামলে (৭৫০-৯৩৫)। সেই শাসকদের একজন খলিফা হারুন আল-রশিদ (৭৮৬-৮০৯) নিজেকে “পৃথিবীতে ইশ্বরের ছায়া” উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর রাজ্যে ঘোরাঘুরি করতেন দুই পাশে দুই জল্লাদ নিয়ে। ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে তাঁর অনবদ্য অবদান থাকার পরও এটা তিনি করতেন একথা প্রমাণ করতে যে, যখন তখন যেকারো প্রাণ নেয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। কিছুকাল আগ পর্যন্ত প্রকাশ্যে কাউকে পেটানো আর কোপানো দেখলে আমার এই “ইশ্বর” খলিফার কথা মনে হত। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে এসব দেখলে আমার শুধু মনে হয় ছাত্রলীগের কথা যেদিন তারা রাজপথে পিটিয়ে মানুষ মেরে লাশের উপর নৃত্য করেছিল।

আমরা যেন কেউ কেউ নিজেকে ইশ্বর ঘোষণা দিয়ে বসে আছি যারা পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, বনে-বাদারে যেখানে ইচ্ছে সেখানে, যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে একটা তরজাতা মানুষকে কুপিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলতে পারি, পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙ্গে দিতে পারি এবং এসবের জন্য কারো কাছে কস্মিনকালেও কোন জবাবদিহির প্রয়োজন হবে না। ছাত্রলীগ নামক এই নরকের কীটদের অতীতে চোখ ছিল সম্পদ, বিত্তলাভ, জমি দখল নদী দখল, টেন্ডারবাজিতে। এরপর এরা আসল প্রেমের দাবী নিয়ে। প্রেম দাও নইলে চাপাতির কোপ খাও। আপনাদের মনে থাকার কথা সিলেটে  ছাত্রলীগ নেতা বদরুল খাদিজা নামের একটি মেয়েকে প্রকাশ্যে কুপিয়েছিল। প্রেমের  উপরেও বদরুলদের একচেটিয়া দখল চাই। ঢাকার পল্টনে বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ড তো বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছিল।

কিছুদিন ধরে কোটা নিয়ে আন্দোলন হচ্ছে। প্রায় সকল স্তরের মানুষ এই কোটার সংশোধন চায়। প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয়ই চায়, নইলে তাঁকে দিয়ে সংসদে কোটা বাতিলের কথা বলানোর সাধ্য কার। তাঁর ঘোষণার পরও কালক্ষেপণ দেখে গুটিকয় ছেলে পেলে মানববন্ধনের মত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে ছাত্রলীগের যে হামলার সম্মুখীন হল, এর চেয়ে হতাশা আর দুঃখের কিছু হতে পারে না। আমরা কি রামরাজত্বে বসবাস করছি যেখানে কেউ কোন প্রতিবাদ করতে পারবে না? প্রতিবাদ পছন্দ না হলে পুলিশ আসবে, তারা মেরে তুলে দিবে। ছাত্রলীগের এই অধিকার কেন থাকবে? ছাত্রলীগের মনে রাখা উচিত বাংলাদেশের জাতির পিতা এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই চতুর্থ শ্রেণীর কর্মকর্তাদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে গিয়ে বহিষ্কার হয়েছিলেন। এই সেদিন সেই বহিষ্কারাদেশ তুলে নেয়া হল। 

মানুষকে মারার বা হত্যার এই উদগ্র নৃশংস বাসনা কেন মানুষের? কখন সমাজের রাষ্ট্রের মানুষ এমন হত্যালীলায় মেতে উঠে। ডঃ আকবর আলী খানের একটা বই “পরার্থপরতার অর্থনীতি”-তে একটা অধ্যায় আছে ‘শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি’ নামে। অর্থ দিয়ে কাজ বাগিয়ে নেয়া আধুনিক অর্থনীতিরই একটা অংশ, যেন তা নিয়ম। কিন্তু যখন কেউ বড় বড় প্রকল্পে কাজ দেয়ার জন্য টাকা নেয় অথচ কাজ দেয়না, এবং এর জন্য অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়ে সেই অবস্থাকে বলা হয় শুয়োরের বাচ্চাদের অর্থনীতি। পরবর্তীতে এই টার্ম নিয়ে একজন একটা প্রবন্ধে লিখেছিলেন, যখন এই ‘শুয়োরের বাচ্চাদের’ প্রকোপ কোন দেশে বেড়ে যায় তখন সাধারণ মানুষেরা এমন মারামারি, নৃশংসতা, হত্যাযজ্ঞে নেমে পড়ে এবং কোনধরণের অপরাধবোধে ভোগে না। আমরা কি তবে এখন শুয়োরের বাচ্চাদের আবর্তে পড়ে গেছি?

২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের পর হুমায়ুন আহমেদ স্যার লিখেছিলেন, সাপের পেটে সাপ জন্মায়, বনের হিংস্র বাঘের গর্ভে বাঘ, মানুষই একমাত্র প্রাণি যারা মানব ও দানব উভয়ের জন্ম দেয়।  ছাত্রলীগের সবাই নয়, কেউ কেউ মানুষের গর্ভে জন্ম নেয়া দানব। কিন্তু তাই বলে যারা হতাশার কথা লিখে বেড়াচ্ছে এই কথা বলে যে, আমরা নষ্ট হয়ে গেছি, আমরা পচে গেছি ইত্যাদি, তাদের সাথে আমার দ্বিমত আছে। নীরিহ নিরাপরাধ মানুষের উপর হামলার পর চারিদিকে যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে তা বিরাট এক আশা ব্যাপার। ঘরে বসে দু’কথা লিখে দেয়া রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করার চেয়ে ঢের বেশি স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ বটে, তবুও তা প্রতিবাদ এবং এই যুগে তার মূল্য রয়েছে।

আমরা যে সকল ধর্মের সকল মতের সকল শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণে একটি সমতাভিত্তিক উন্নত অর্থনীতি, ধর্মনিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, জঙ্গিবাদমুক্ত সমাজব্যবস্থা কামনা করি, বর্তমানে হেফাজত বা জামাত শিবির যদি তাতে বাধা হয় তাহলে এককভাবে এই ছাত্রলীগ সেখানে বাধার পাহাড়। পরিশেষে, অপরিণামদর্শী এই দানবদের গ্রেপ্তার করে কঠোর সাজার মুখোমুখি করা হোক এই মুহুর্তে এর থেকে বেশি চাইবার কিছু নেই।

 

৪ জুলাই ২০১৮
জাহিদ কবীর হিমন
আখেন, জার্মানি