বাংলাদেশ সরকারের নিয়ম অনুযায়ী প্রত্যেক বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী ব্যক্তিকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হবে যদি তিনি সার্ক এর বহির্ভূত কোন দেশে যেতে চান। প্রয়োজনে বাংলাদেশে বসবাসরত/কর্মরত বিদেশী পাসপোর্টধারীরাও বাংলাদেশ থেকে এই সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে পারেন। (তথ্যসূত্র: উপ পুলিশ কমিশনার, উত্তরা থানা)

এই তথ্যটুকু আমরা অনেকেই সাধারণ জ্ঞান হিসেবেও জানি না। আবার অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে তখনি অবগত হই যখন আমরা যে দেশে যেতে ইচ্ছুক সে দেশের সংশ্লিষ্ট এম্ব্যাসি/প্রতিষ্ঠান যদি এই কাগজটি চায়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি আমার জ্ঞান অনুযায়ী জানি যে জার্মানিতে পড়াশুনার উদ্দেশ্যে যাওয়ার জন্য এই কাগজটি এম্ব্যাসি চায় না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মাননীয় ভিসা অফিসার এই কাগজটি চেয়ে বসেন আমার ভিসা হয়ে যাওয়া সত্তেও। উল্লেখ্য, এই ধরনের ঝামেলায় পরা ব্যাক্তিদের সংখ্যাটা নেহায়েত কম নয় এবং খুব শীঘ্রই আরও অনেকেই এর শিকার হতে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও হবেন ( ভিসা অফিসারের কথ্য অনুযায়ী)। সঠিক কী কারনে এই কাগজটি হঠাৎ হঠাৎ চাওয়া হচ্ছে তার সঠিক কারণ অফিসার আমাকে বলেননি তবে এতটুকু বলেছেন যে সাম্প্রতিক হলি আর্টিজান ইস্যুতে কিছু নির্দিষ্ট স্টেট থেকে নিরাপত্তা সম্পর্কিত নির্দেশনার এটি একটি অংশ বিশেষ☺।

প্রথমে ভয় পেয়ে গেলেও পরে ইউনিভার্সিটিতে মেইল করে এনরোলমেন্টের সময়সীমা বাড়িয়ে মাঠে নামি। আমি নিজে ঠিক যে পথে এগিয়েছি, তাই আমি আজকে লিখছি।

police-clearance-bangladesh

আমি পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছি ঢাকা থেকে কারন আমার স্থায়ী এবং বর্তমান ঠিকানা দুটি একই এবং ঢাকাতে। অফিশিয়াল তথ্য অনুসারে ( 1নং পয়েন্টে লিংকটি দেওয়া আছে) যদি আপনি ঢাকা হতে এই সার্টিফিকেটটি ইস্যু করাতে চান তাহলে আপনার পাসপোর্টে উল্লখিত স্থায়ী অথবা বর্তমান ঠিকানার যেকোনো একটি অবশ্যই ঢাকাতে হতে হবে এবং আপনাকে অবশ্যই ওই ঠিকানায় অবস্থান করতে হবে। আপনার দুটি ঠিকানাই যদি ঢাকার বাহিরে হয় তবে সেক্ষেত্রে আপনি আপনার নিকটস্থ থানায় বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন অতি শীঘ্রই।

1) প্রথমে ইনটারনেটে সার্চ দিন। সাইটটি হচ্ছে http://www.police.gov.bd/tab.php?id=4 । এতে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা পাবেন। প্রয়োজনে দরকারি তথ্য গুলো নোট আকারে লিখে নিন।

2) আপনার পাসপোর্টের ফটোকপি নিয়ে চলে যান কোন প্রথম শ্রেণীর সরকারী গেজেটেড অফিসারের কাছে সত্যায়িত করার জন্য। আপনার অফিশিয়াল অফার লেটারটিও প্রিন্ট/ফটোকপি করতে ভুলবেন না যেন। কারন আপনার অফার লেটারটি নির্দেশ করে আপনি ঠিক কী উদ্দেশ্য নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন।

এরপর আপনি সাদা কাগজের উপর একটি দরখাস্ত লিখবেন সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ কমিশনারের/পুলিশ সুপারের বরাবর। আমি নিম্নোক্ত ভাবে লিখেছিলাম:

To
The Police Commissioner,
Dhaka Metropoliton Police,
30, S Capt. Monsur Ali Sarak,
Ramna, Dhaka-1217.

Sub: Application for Police Clearance Certificate.

Respected Sir,
I would like to draw your kind attention that i want to go to ____(full address of the institution)___ to acheive my Masters degree on _____. My intended duration of staying is from ___ to __.

My particulars are given below for your kind consideration. Name….. Father’s Name ……. Mother’s Name…… Address……Passport No……Date of Issue…….

I therefore pray and hope that you would grant me the Police Clearance Certificate to study in Germany and oblige thereby.

Sincerely yours
Name
Signature (পাসপোর্ট অনুযায়ী)
Date
Mobile Number

3) এরপর আপনাকে চলে যেতে হবে সোনালী ব্যাংক এর যেকোন একটি শাখায় (তথ্যসূত্র: এস আই স্বপন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার, ঢাকা) 500 টাকার একটি ট্রেজারি চালান জমা দিতে। আমি মগবাজারে ওভারব্রিজের নিচের সোনালী ব্যাংক শাখায় গিয়েছিলাম। ব্যাংক এ গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেই বলে দিবে কোন কাউন্টার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটের জন্য টাকা জমা নেয়। নির্দিষ্ট কাউন্টারে আপনি গিয়ে চাইলেই আপনাকে একটি টাকা জমা দেওয়ার চালান কাগজ দিবে।

4) চালান কাগজটি আমি নিম্নোক্ত ভাবে পূরণ করেছি:
● চালান নং___(ব্যাংক পূরণ করবে)__; তারিখ _____
● বাংলাদেশ ব্যাংক/সোনালী ব্যাংক লিমিটেডের (সোনালী ব্যাংক এর উপর টিক চিন্হ ) ___(ঢাকা)___ জেলার __(মগবাজার)__ শাখায় টাকা জমা দেওয়ার চালান।
● কোড নং: 1 2201 0001 2681
( 1নং পয়েন্টে লিংকটি দেওয়া আছে)
● যাহার মারফত প্রদত্ত হইল তাহার নাম ও ঠিকানা: নিজ নাম।
● যে ব্যাক্তির/ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হইতে টাকা প্রদত্ত হইলো তাহার নাম, পদবী ও ঠিকানা: নিজ নাম ও তার নিচে নিজের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা লিখেছিলাম পাসপোর্ট অনুযায়ী।
●কি বাবদ জমা দেওয়া হইলো তাহার বিবরণ: পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট।
● মুদ্রা বা নোটের বিবরণ/ ড্রাফ্ট, পে অর্ডার ও চেকের বিবরণ: পাঁচশত টাকা মাত্র।
● টাকার অংক; টাকা: 500/-, পয়সা: 00/-; মোট টাকা: 500/-
● টাকা (কথায়): পাঁচশত টাকা মাত্র।
● তারিখ: _______

এরপর পূরণক্রত চালান কাগজটির দুই কপি ফটোকপি করুন এবং আসল পূরণক্রত কাগজটি উপরে রেখে বাকি দুই কপি ফটোকপির সাথে স্টেপলার পিন দিয়ে আটকিয়ে দিন এবং এই তিনটি কাগজেরই পিছন দিকে নিজের পাসপোর্ট অনুযায়ী সিগন্যাচার এবং মোবাইল ফোন নাম্বার লিখে কাউন্টারে জমা দিন। এরপর সিল মারা ও সই দেওয়ার পর আপনাকে মূল কাগজটি ফেরত দেওয়া হবে এবং আপনার নিজস্ব একটি কপি হিসাবে রাখার জন্য এটিকে ফটোকপি করুন।

5) এখন আপনি এই মূল চালান কাগজ, সত্যায়িত পাসপোর্টের ফটোকপি, অফার লেটার এবং পুলিশ কমিশনারের বরাবর লেখা আবেদন পত্রটি নিয়ে চলে যাবেন মিন্টু রোডের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে। গেটে বডি এবং ব্যাগেজ  চেকিং এর পর কম্পাউন্ডে  ঢুকে সোজা 109 নম্বর রুমে চলে যাবেন। ওখানে উপরে উল্লেখিত কাগজগুলো কাউন্টারে জমা দিন এবং পাসপোর্টে উল্লখিত যে ঠিকানায় আপনি আছেন এবং সংশ্লিষ্ট থানা কোনটি সেটি দায়িত্বরত অফিসারকে জানান। এরপর আপনাকে একটা টোকেন দেওয়া হবে যেখানে আপনার অন্যান্য তথ্যাদির সাথে আপনাকে একটি নির্দিষ্ট সিরিয়াল নম্বর, থানার নাম এবং সার্টিফিকেট ডেলিভারির সম্ভাব্য একটি তারিখ দেওয়া থাকবে। টোকেনটি এবং ডেস্কের উপর রাখা হেল্প লাইনের নম্বর দুটি টুকে নিয়ে বাড়ি চলে যান।

6) এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে আপনার জমা দেওয়া কাগজগুলো এবং আপনার তথ্যাদি ভেরিফিকেশনের নিমিত্তে একটি আবেদনপত্র চলে যাবে আপনার থানার ঠিকানায়। এরপর ওই থানা থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন এস আই আপনার ঠিকানায় আসবে আপনার পুলিশ ভেরিফিকেশনের জন্য(পাসপোর্টের জন্য ঠিক যেভাবে ভেরিফিকেশন হয়)। হাতে সময় কম থাকলে এবং আবেদনের তিন দিনের মধ্যে পুলিশ না আসলে হয় থানায় ফোন দিন না হয় নিজে থানায় গিয়ে ওদের তাড়া দিন। পুলিশ ভেরিফিকেশনের পর আপনার পূর্বে জমা দেওয়া যাবতীয় কাগজপত্র, পুলিশ ভেরিফিকেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার কর্তৃক আপনার চরিত্র সম্পর্কিত একটি লিখিত রচনা এবং উক্ত থানার ওসির সিল ও সাইন সম্বলিত ইংরেজীতে পূরণক্রত পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটটি বাকি কাগজগুলোর সাথে সংযুক্ত হয়ে এলাকার উপ পুলিশ কমিশনারের অফিসে চলে যাবে।

7) উপ পুলিশ কমিশনারের দ্বারা আপনার সার্টিফিকেটটি সত্যায়িত হয়ে পুলিশ মারফত এটি চলে যাবে মিন্টু রোডের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে।

8) মিন্টু রোডের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে সার্টিফিকেটটি আবার চলে যাবে পররাষ্ট্র মণ্ত্রনালয়ে সত্যায়িত হওয়ার জন্য এবং সেখান থেকে পুনরায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টারে ফেরত আসবে। এরপর সুন্দরবন কুরিয়ারের দ্বারা এটি আপনার ঠিকানায় পৌছে যাবে। অথবা টোকেনে উল্লেখিত তারিখে মিন্টু রোডে গিয়ে টোকেনটি 109 নম্বর রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারকে দিলেই আপনি আপনার সার্টিফিকেটটি হাতে পেয়ে যাবেন (যদি ততোদিনে সবকটি আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়)।

us_visa_interview

এরপর আসল কাগজটি এম্বাসি তে নিয়ে গিয়ে আপনার পাসপোর্ট বাবাজীকে ভিসা সহ উদ্ধার করে নিয়ে আসুন। আপনার এত পরিশ্রমের ফসল পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটটি এম্বাসি থেকে আসার সময় নিয়ে আসতে ভুলবেন না যেন। আপনি ভ্রমণের সময় অবশ্যই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটটি সঙ্গে রাখবেন ইমিগ্রেশনের ঝামেলা এড়ানোর জন্য (তথ্যসূত্র: ভিসা অফিসার)।

এখন কথা হচ্ছে, আপনার কি এই পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটটি করানো উচিত কিনা কেননা আপনার ক্ষেত্রে তো এম্বাসি এটা নাও চাইতে পারে। এই ব্যাপারে আমার কথা হচ্ছে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেটটি আগে করানো অথবা না করানো সম্পূর্ণ আপনার মর্জি। আর সার্টিফিকেটটি ইস্যু করার পর কতদিন পর্যন্ত এম্বাসির কাছে এটি গ্রহণযোগ্য থাকবে সেটি আমার জানা নেই।

সর্বশেষে বলবো, আমার একজন ক্লাসমেট আমার এই দূরাবস্থার সময় আমার পাশে না দাড়িয়ে বরংচ আমার ক্ষেত্রে কেন এই সার্টিফিকেটটি চাওয়া হচ্ছে তার জন্য এমন সব যুক্তি সে আমাকে দেয় যার জন্য আমি ‘প্যানিক অ্যাটাকের’ শিকার হয়ে একদিন সময় নষ্ট করি। আপনারা দয়া করে মাথা ঠান্ডা করে কাজে নামবেন এবং এই ধরণের মানুষের মন্তব্য গ্রাহ্য করবেন না।

সবার জন্য শুভকামনা রইলো! 😀

আমার গল্পটি ফুরোলো!