2

১৯শে মার্চ ২০১২, অনেক ভোরে ব্রেমেন থেকে বার্লিন এর উদেশ্যে রওনা হলাম। যেহেতু বার্লিন এ কোনো পরিচিত ভাই-বন্ধু ছিলনা তাই উদ্দেশ্য ছিল দিনে দিনে যদি পাসপোর্টটি নবায়ন করা যায় তাহলে আর রাতে থাকার যামেলা নাই। সকাল ১০ টায় যাবতীয় কাগজপত্র সহ দূতাবাসে উপস্থিত হলাম। অনেকক্ষণ বসে থাকার পর রিসেপশন-মেডাম এর সাথে কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেল। যতক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম তার বেশিরভাগ সময়টাই উনি ফোন এ ব্যস্ত ছিলেন। অপেক্ষা করতে খুব ক্লান্ত লাগছিল কিন্তু একটু পরেই আবিস্কার করলাম, একজন মানুষ অনেক ক্লান্ত শরীর নিয়ে বসে আছে। বার বার ঘুমের জন্য ঢলে ঢলে পড়ে যাচ্ছে। আমি রুম এর ভিতরে ঢুকতেই উনি যেন একটু সতেজ হলেন, আমার সাথে গল্প করার সুযোগ খুজতেছেন বুঝতে পারলাম। জিজ্ঞাসা করলাম- আপনি কোথায় থেকে আসছেন? এই শুরু করলেন উনি বিরাট কাহিনী, ভদ্রলোক চেগ থেকে আসছেন সারা রাত জার্নি করে, ভোর  বেলা থেকে দূতাবাসের সামনেই অপেক্ষা করছিলেন। সকাল ১০ টা  পর্যন্ত কিছু না খেয়ে না ঘুমিয়ে ভদ্রলোক বসে আছেন কিন্তু জানেন না কখন উনি কর্তব্যরত অফিসার এর সাথে কথা বলতে পারবেন।উনার গল্প শুনে নিজেকে কিছুটা ভাগ্যবান মনে হলো এই ভেবে যে, এমন একটা দেশে আসছি অন্তত আমাদের দেশের দূতাবাস আছে, তাছাড়া ব্রেমেন থেকে সেটার দুরত্ব ও খুব একটা বেশি না।

অবশেষে, রিসেপশন-মেডাম এর সাথে কথা বলার সুযোগ পেলাম। সমস্ত কিছু বর্ণনা করলাম, কিন্তু উনি এক বাক্যে উত্তর দিলেন “আপনার টাকা আমাদের একাউন্ট এ জমা না হলে কোনো পাসপোর্ট ইস্স্যু করা যাবেনা”।  আমি যতই উনাকে ব্যাংক ট্রান্সফার এর কথা বলি, রশিদ দেখাই, কোনভাবেই উনি বুঝতে চান না। আমার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে, পাসপোর্টটা আমার জরুরি দরকার, অনেক ভাবেই উনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তারপর রিসেপশন-মেডাম রীতিমত আমাকে একটা বিশাল লেকচার শুনিয়ে দিলেন, ” আপনারা সময় মত যোগাযোগ করেন না, শেষ মুহুর্তে আইসা শুধু জরুরি জরুরি করেন, আপনারা জানেন না কখন মেয়াদ শেষ হবে ? এইসব। আমি বললাম – “মেডাম আমি ২ মাস ধরে যোগাযোগ এর চেষ্টা করছি, ফোন করেছি, মেইল দিয়েছি।  কিন্তু আমাদের সম্মানিত এম্বেসীর কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি, ইমেইল এর কোনো উত্তর পাইনি। উনি বললেন যোগাযোগের কি দরকার পোস্ট করে পাসপোর্ট পাঠায় দিলেই তো হয়। উনাকে বোঝানোর বৃথা চেষ্টা করছিলাম যে যোগাযোগ না  করে পাসপোর্ট পাঠাব আর আপনারা তিন  মাস পর উত্তর দিবেন আমরা আপনার কোনো পাসপোর্ট পাই নাই, আপনি যোগাযোগ না করে পোস্ট করছেন কেন?

যাই হউক অনেক অনুরোধ এর পর উনার একটু খানি দয়া হলো মনে হলো, আমাকে বসাই রেখে উনি ভিতরে অফিসার এর সাথে কথা বলতে গেলেন।  প্রায় ৪০ মিনিট পর ভিতর থেকে অন্য এক মহিলা এসে খুবই কর্কশ কন্ঠে ডাকছেন – এই পাসপোর্টটা কার? এই পাসপোর্টটা কার?  অপেক্ষমান  অবস্থায়  কাউকে ডাকার সিস্টেম টি  খুবই অদ্ভূদ  লাগলো। পাসপোর্ট এর বাহির দেখে কারো  সাধ্য নাই বোঝার পাসপোর্ট কার, উনার হাতে যেহেতু আছে, নাম ধরে বললেই ব্যাপার টা খুব সহজ হয়। যাইহোক উনার হাতে উকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম পাসপোর্ট টা কার এবং আবিস্কার করলাম সেটা আমার। রেসপন্স করতে একটু দেরী হয়ে গেল সেটা বুঝা গেল উনার বিরক্তিকর চেহারা দেখে। অনেক বিরক্তি নিয়ে আমাকে বললেন আপনার পাসপোর্ট আজ দেয়া যাবেনা, আমাদের একাউন্ট এ টাকা জমা না হলে পাসপোর্ট নবায়ন হবে না। বেশি জরুরি হলে আমাদের একাউন্ট এ আবার টাকা জমা দেন অথবা ক্যাশ জমা দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে যান। ১৪৫ ইউরো একবার ট্রান্সফার করেছি উনি আবার আমাকে নতুন করে টাকা দিতে বলেন, আমি একজন বাংলাদেশী হিসাবে খুব ভালো করেই জানি আমাদের সরকারী কোনো জায়গায় টাকা একবার ঢুকলে সেই টাকা আর বের করে আনা যাবেনা। তাছাড়া একজন ছাত্রের জন্য ১৪৫ ইউরো মানে কি সেটা কারো অজানা নয়।

শেষ চেষ্টা হিসাবে আবার গেলাম রিসেপশন-মেডাম এর কাছে, অনুরোধ করে বললাম আমি কি আপনাদের একাউন্ট সেকশন এর কারও সাথে একটু কথা বলতে পারি? উনি আপনার সাথে দেখা করতে পারবেন না, তাছাড়া দেখেন নাই উনি এইমাত্র বাইরে চলে গেলেন, রিসেপশন-মেডাম এর উত্তর।পিছনে ঘুরে দেখলাম একজন ভদ্রলোক লিফট এ ঢুকে চলে গেলেন। আমি সিড়ি বেয়ে নিচে নামলাম দ্রুত, যদি উনার সাথে একটু কথা বলা যায়। সমস্যা খুলে বললে হয়ত রাজি হতে পারেন, নিচে নেমে দেখলাম উনি মনের সুখে সিগারেট্ টানতেছেন।সালাম দিয়ে উনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোনো লাভ হলনা। উল্টো আবার সেই লেকচার, দেখেন-আমরা তো সরকারী চাকরি করি, আমাদের অনেক নিয়ম মানতে হয়, টাকা জমা না হলে পাসপোর্ট দেয়ার কোনো নিয়ম নাই ইত্যাদি।

অবশেষে,আবার সেই রিসেপশন আপার কাছেই আসলাম, কি করা যায় সেটা জানার জন্য। উনি বললেন আপনি আপনার ঠিকানা আর পোস্ট এর খরচ দিয়ে যান আমরা পাসপোর্ট পাঠায় দিব আমাদের একাউন্ট এ টাকা জমা হওয়া মাত্রই। আমি তাই করলাম এবং ব্রেমেন ফিরে এলাম, আর শুরু হলো অপেক্ষার পালা। ১৯শে মার্চ ছিল সোমবার, টাকা যেহেতু একদিন আগেই  ট্রান্সফার করেছি, মঙ্গলবার সকালেই টাকা চলে যাওয়ার কথা, যেহেতু  দুইটি ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংক তাই সর্বোচ্চ ৩ টি কার্যদিবস লাগতে পারে।

(চলবে )

এম, আর, পি বা ডিজিটাল পাসপোর্ট করবেন যারা :পর্ব ১

প্রবাসী বাংলাদেশীদের MRP পাসপোর্টের সাতকাহন