আমার একটা নাম আছে- সেটা আমার একটা পরিচয়; আমার একটা ধর্ম আছে- বিশ্বাস আছে সেটা আমার অন্য একটা পরিচয়; জাতিগতভাবে বাঙালি-সাঁওতাল-মারমা-চাকমা-মুর বা অন্য একটা পরিচয়; নাগরিকত্বের হিসেবে একটা রাষ্ট্রের নাগরিক- সেইটা একটা পরিচয়; আমার পেশাগত একটা পরিচয় আছে; আমার রাজনৈতিক একটা পরিচয় আছে কিংবা আমার অন্য অনেক পরিচয় আছে বা থাকতে পারে। কিন্তু এসবের কোন পরিচয় নিয়েই আজ আমি আসিনি; আজ আমি এসেছি খুব একটি সহজ পরিচয় নিয়ে- মানুষ! আমার অন্য আরো হাজার পরিচয় থাকতে পারে- ভালো কিংবা খারাপ, কিন্তু সবার আগে আমি মানুষ।

কতটুকু সীমার মধ্যে থাকা লেখকের ধর্ম আমি সে বিষয়ে তর্ক করতে আসিনি, ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেওয়ার শাস্তি কি হওয়া উচিৎ সে বিষয়েও তর্ক করতে আসিনি, মুক্ত চিন্তার ব্যপকতা নির্ধারণ করতেও আসিনি আমি, পেট্রোল বোমার জন্য দায়ী কারা সে ব্যাপারে তর্ক করতেও আসিনি, একটি সড়ক দূর্ঘটনার জন্য কে দায়ী- চালকের অসতর্কতা বা অদক্ষতা, বাজে রাস্তা নাকি গাড়ির বাজে অবস্থা সেটা নিয়ে মন্তব্য করতে আসিনি, নৌ-দূর্ঘটনার পিছনে কারা দায়ী সে ব্যাপারে গবেষণা করতেও আসিনি, আসিনি ভবন ধ্বসে, পাহাড় ধ্বসে কিংবা আগুন লেগে মৃত্যুর দায় চাপাতে, গুম-খুন-অপহরণের পিছনের কারণ সন্ধানেও আসিনি, আসিনি হত্যাকাণ্ডের দায় কারো ওপর চাপাতে, আমি বলতে আসিনি ধর্মীয় মৌলবাদ দায়ী, নাস্তিকতা দায়ী, নিরাপত্তাহীনতা দায়ী, পুলিশ-প্রশাসনের ব্যর্থতা দায়ী, সরকারের বা বিরোধীদের লাগামহীনতা-মনুষ্যত্বহীনতা দায়ী, রাষ্ট্রযন্ত্রের অপারগতা দায়ী, নোংরা রাজনীতি দায়ী।

আমি বলতে পারতাম, একটা মৃত্যু-উপত্যকা তুল্য বদ্বীপ সৃষ্টির জন্য ত্রিশ লক্ষ প্রাণের রক্ত নদী বয়ে যায়নি; আমি বলতে পারতাম এই জন্য আমাদের পূর্বপুরুষেরা পাকিস্তানি সেনাশাসকের বিরুদ্ধে স্বাধিকার আদায়ে আন্দোলনে নামেনি যে একদিন সেই বাঙালি সেনাবাহিনী-ই গুলি চালাবে দেশের আদিবাসীদের স্বাধিকার আদায়ের শান্তিপূর্ণ মিছিলে, আমি বলতে পারতাম বাঙালি ভাষার মর্যাদের তরে এই জন্য জীবন দেয় নাই যে সেই ভাষায় সাহিত্য চর্চা বা বিজ্ঞান চর্চা করতে মৌলবাদীদের তোপের মুখে পড়তে হবে কিংবা মুক্তচিন্তার নামে ধর্মে আঘাত আসবে, কিংবা বলতে পারতাম একজন শ্রমিক এই কারণে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেনি যে তাঁর উত্তরসূরিদেরকে কারখানায় কর্মরত অবস্থায় পুড়ে মরতে হবে বা তাঁদেরই কর্মস্থলের ভবন ধ্বসে কবর রচিত হবে, আমি বলতে পারতাম আরো অনেক কথা স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া হত্যা আর অপমৃত্যুকে উদ্ধৃতি দিয়ে।

শুধু বলব, আমরা ব্যর্থ হয়েছি মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্য দিতে; মায়ের গর্ভে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা জীবনটা রাস্তায় হঠাৎ একটা গাড়ির ধাক্কায় চলে যাওয়ার জন্য নয়, জলে ডুবে, পেট্রলবোমার আঘাতে, ভবন ধ্বসে, ভবনে আগুন লেগে, রাস্তায় মিছিলের গুলিতে কিংবা পথের ‘পরে চাপাতির আঘাতে চলে যাওয়ার জন্য নয়। যতদিন পর্যন্ত আমরা একটা হত্যা বা অপমৃত্যুতে একটা মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এই ভেবে সোচ্চার না হতে পারব, ততদিন পর্যন্ত এই অপধারার যবনিকা ঘটবে না।

আমরা যদি একজন মানুষকে একজন মানুষ হিসেবে ধর্তব্যে আনতে না পারি, তবে সেটা একজন মানুষ হিসেবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় ব্যার্থতা।