ঘড়ির কাটায় ঠিক নটা বাজে, টিক টিক টিক…ঢুলুঢুলু চোখে এক এক করে পি.এইচ.ডি স্টুডেন্টগুলো ঢুকছে। গতরাতে ডিপার্টমেন্টের ক্রিসমাস পার্টি ছিল তো! কেউ আবার সাথে করে স্যান্ডুইচ-বার্গার নিয়ে এসেছে। কনফারেন্স রুমেই ব্রেকফাস্টটা সেরে নিবে। ঠিক নটা পাঁচ মিনিট তেরো সেকন্ডে প্রফেসর এসে হাজির হলেন। চেয়ারে বসেই হুংকার দিয়ে বললেন, “Start!”।

আমি ছোট বেলায় যত দোয়া দুরুদ শিখেছি সব পড়ে বুকে ফু দিয়ে মিন মিন করে প্রেজেন্টেশোন দেয়া শুরু করলাম। সুপারভাইসর বলেছে প্রেজেন্টেশোনের সময় অডিয়েন্সের দিকে তাকিয়ে আই কন্টাক্ট করতে হয়, এতে অডিয়েন্সের এটেনশোন বারে। আমিও মনে মনে তাহের শাহ্‌ এর “আই-টু-আই” গানটা গেয়ে আই কন্টাক্ট করতে থাকলাম! যারা “আই-টু-আই” গানটা শুনেন নি তাঁদের জন্য নিচে লিংক দেয়া হল। না হাসলে মূল্য ফেরত!!

প্রথমে পি.এইচ.ডি স্টুডেন্টর দিকে তাকালাম, তারা চেয়ারে আয়েশ করে ঠেস দিয়ে মুচকি মুচকি হাসে আর স্যান্ডুইচ-বার্গার চিবোয়, যেন বাইজি নাচ দেখছে, “নাচ মেরি ময়না তুই পয়সা পাবি রে…” নিজেকে জলশা ঘরের নর্তকী মনে হচ্ছিল!! সাথে সাথে চোখের দৃষ্টি পরিবর্তন করে ফেললাম। এবার প্রফেসরের সাথে আই কন্টাক্ট করছি। প্রফেসর ভুরু কুচিয়ে কুতকুত করে আমাকে দেখেন, মুখে হাত দিয়ে কি যেন ভাবেন, তারপর আঙুলের ফাঁকে ফুচকি মেরে স্লাইডের দিকে তাকান!! প্রফেসরের সাথে আই কন্টাক্ট আমার গলা মিন মিন থেকে মিউ মিউ তে নামিয়ে নিয়ে এল! গলা দিয়ে আর স্বর বেরোয় না! নাহ! এই আই কন্টাক্ট আর নিতে পারছিনা। কিছু একটা করতেই হবে। ছোটবেলায় প্রতি শুক্রবার একটা ফকির আকাশের দিকে তাকিয়ে “বাবা গোওওও, আমি অন্ধওওওওওও…” বলতে বলতে রাস্তা দিয়ে যেত। আমিও মনে মনে “বাবা গোওওও, আমি অন্ধওওওওওও…” বলে আকাশের দিকে তাকিয়ে বহু কষ্টে প্রেজেন্টেশোন শেষ করলাম।

এবার প্রশ্ন-উত্তর সেশন। আমি মিউ মিউ করে বললাম, “If you have any question, please feel free to ask?” পি.এইচ.ডি স্টুডেন্টগুলো ফিল ফ্রি হয়ে মঙ্গল গ্রহের মাটি খুঁড়ে প্রশ্ন করতে থাকলেন। তারা একটা একটা করে প্রশ্ন করেন, আমার দিকে তাকান, আমি “Well….” বলে সুপারভাইসরের দিকে তাকাই!! সুপারভাইসর সাইন্টেফিক ভাষায় কি কি যেন বলেন, পি.এইচ.ডি স্টুডেন্টগুলো মাথা নাড়ান, আমি কিছু না বুঝেই “Yes! Yes! Exactly! Exactly” বলি। প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে আমি যখন মাটির সাথে মিশে গেলাম, তখন প্রশ্ন-উত্তর পর্ব শেষ হয়।

সুপারভাইসর কানের কাছে এসে ফিস ফিস করে বললেন, “প্রেজেন্টেশোন ভাল হয়েছে। Dont worry, its just an optional presentation, না দিলেও চলত (এই optional প্রেজেন্টেশোনটার জন্য সুপারভাইজর আমাকে দু-দুটো সপ্তাহ গাধার মত খাটিয়েছেন! ফাইনাল প্রেজেন্টেশোন তো এখনও বাকিই আছে! ) But, দিয়ে কিন্তু ভাল হয়েছে বুঝলে? তোমার কনফিডেন্স লেভেল কত বেড়েছে দেখেছ?”

আমি মাননীয় স্পিকার হয়ে বললাম, “Yes! Yes! Exactly! Exactly! By the way, what is confidence??”