প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ঠকঠক করতে করতে লেটার বক্সটার সামনে দাড়াতেই ভয়ে ঘামতে থাকলাম। আমি লেটার বক্স ভয় পাই। ভয় পাবার কারণ আনপ্রেডিক্টেবল চিঠি। কখনও হেলথ ইনস্যুরেন্স থেকে চিঠি আসে, পড়লে মনে হয় যেন বেঁচে থাকাটাই পাপ। আবার কখনও টেলিভিশন অফিস থেকে চিঠি আসে, ঘরে টিভি না থাকলেও বলে “টিভি নাই তো কি? ইন্টারনেটে স্ট্রিমিং করছিস না? টাকা দে?” এবারের চিঠিটি এসেছে হেলথ ইনস্যুরেন্স থেকে। তাই অনাকাঙ্ক্ষিত আশংকায় দরদর করে ঘামতে থাকলাম। আমি কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামে চিঠির খাম ভিজিয়ে নরম করে নিলাম। নার্ভাস মোমেন্টে নরম খাম খুলে চিঠি বের করতে সুবিধা হয়। আমি নরম খাম খুলে জার্মান ভাষায় লেখা চিঠিটি বের করলাম। তারপর অত্যন্ত মনযোগ সহকারে লাইন বাই লাইন পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু হায় একটি অক্ষরও বুঝতে পারলাম না। আমি কিছু না বুঝেই চিঠিতে চোখ বুলাতে থাকি। চিঠির ঠিক মাঝখানটায় গিয়ে আমার চোখ আটকে যায়। সেখানে বোল্ড হরফে গাড় করে একটি বিগ এমাউন্ট লেখা। বিগ এমাউন্টের আরও দু’লাইন নিচে গোটা গোটা করে লেখা ২০১৩, ২০১৪, ২০১৫।

জার্মান ভাষাঃ উচ্চারণ শুনুনঃ http://goo.gl/SqAtty

জার্মান ভাষা শিখতে ফেসবুক গ্রুপ:https://goo.gl/xAlwQ8

 অশনি সংকেত বুঝতে অর্থ জানার প্রয়োজন নেই, সংকেতই যথেষ্ঠ। ওই বিগ এমাউন্ট এবং সনগুলোই আমার অশনি সংকেত। গত তিনটি বছর তিলে তিলে বেঁচে থেকে কি পাপ করেছি, আমি সেটা জানিনা। আমার দুটো কিডনি বেঁচে দিলেও তো এত পয়সা উঠবেনা! পয়সার চিন্তায় আমার প্রচণ্ড বেগে টয়লেট চেপে যায়! এরপর আর নিজেকে ধরে রাখতে পারনি। আমি এক দৌড়ে টয়লেটে গিয়ে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। তারপর ঘরে ঢুকে ল্যাপটপ ওপেন করে গুগল ট্রান্সলেটর নিয়ে বসে পড়লাম, চিঠির মর্মার্থ উদ্ধার করতে হবে। দুর্বল হ্রদয়, নার্ভাস মাইন্ড, তাই চিঠির প্রথম ওয়ার্ড, “Bürgerentlastungsgesetz” টাইপ করতে গিয়ে তিনবার ভুল করে বসলাম। প্রায় পাঁচ মিনিট পর আমি শব্দটি সঠিক ভাবে টাইপ করতে সমর্থ হই। এরপর গোটা চিঠিটার দিকে তাকিয়ে হিসেব করে বের করলাম এই চিঠি ট্রান্সলেট করতে আমার ১০ মাস প্রয়োজন! আমি হাল ছেড়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে হাস-ফাস করতে থাকলাম। তারপর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলাম, “নানাবিধ টেনশনে দিনগুলো কাটে, ক্রমাগত পাশ ফিরি সিঙ্গেল খাটে!” এরপর সারা রাত আমার ঘুম হয়নি…



সকালে সূর্য উঠতেই আমি অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। ডেসটিনেশন সেবিন হেডলার। সেবিন হেডলার ইংরেজিতে দুর্বল, ইংরেজি ভয় পান। যেহেতু এমপ্লয়িদের ইনকাম ট্যাক্স, হেলথ ইনস্যুরেন্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো তিনিই দেখেন, তাই আমি সেবিন হেডলারকেই গিয়ে বললাম,“আমার চিঠিটা একটু ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করে দেন তো, কিচ্ছু বুঝিনাই!” চিঠি দেখে সেবিন হেডলারের নার্ভাস ব্রেক ডাইন হয়, তিনি ইংরেজি বলতে ভুলে যান। তিনি জার্মান ভাষায় লেখা চিঠিটি আমাকে জার্মান ভাষাতেই ট্রান্সলেট করে দেন। আমি কিছু না বুঝেই “ইয়া ইয়া” বলে মাথা দুলাতে থাকি। চরম অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম। কতবার না বুঝে “ইয়া ইয়া” করা যায়? আমি ডাঙ্গায় তোলা কই মাছের মত ছটফট ছোটফট করতে থাকলাম! কিন্তু এত বড় চিঠি, শেষই হয়না। আমি “এক্সকিউজমি” বলে আবারও টয়লেটে গিয়ে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। এছাড়া আর কি বা করার আছে?

নেক্সট ডেসটিনেশন হেলথ ইনস্যুরেন্স অফিস, মাই লাস্ট হোপ! এরপর চিঠির মর্মার্থ বুঝিয়ে দেওয়ার আর কেউ নেই! আমি হেলথ ইনস্যুরেন্স অফিসে ঢুকেই প্রথমে টয়লেটের অবস্থান সনাক্ত করলাম, তারপর ওইয়েটিং রুমে গিয়ে বসলাম। বলাতো যায় না, কি না কি অর্থ বলে, আবারও যদি নিজেকে স্বাভাবিক করতে হয়! মিনিট বিশেক অপেক্ষা করার পর আমার সিরিয়াল আসে। আমি পা টিপেটিপে অফিস রুমে গিয়ে ঢুকি। সুন্দর ছিমছাম রুম, চিঠিতে লেখা এমাউন্টার মতই বড়। রুমের কোনায় ডেস্কে বসে থাকা জার্মান মহিলাটিও বেশ সুন্দর। ঘোড়ার লেজের মত স্বরনালী চুল, বাঁশির মত খাড়া নাক, মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসে। আমাকে দেখে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হেসে বললেন, ”How can I help you sir?” আমি চিঠিটা এগিয়ে দিয়ে বললাম, “আপনাদের এখানে কি কিডনি রুগি আছে, ভাবছি কিডনিগুলো বেচে দিব!” মহিলা হেসে কুটিকুটি হয়ে বললেন, “কিডনি বেচতে হবেনা স্যার! আপনি গত তিন বছর ধরে হেলথ ইন্সুরেন্সের জন্য যত টাকা দিয়েছেন, এটা তারই হিসেব। গ্রাহকদের হিসেব জানানো আমাদের কর্তব্য!”

হায়রে, হিসেবই যখন জানাবি, ইংরেজিতে জানালিনা কেন? মাঝে মাঝে ব্রিটিশদের উপর প্রচণ্ড রাগ হয়। ভারতবর্ষ রুল করলি, একটু জার্মানিটাও রুল করতি। অন্তত অফিসিয়াল চিঠিগুলাতো ইংরেজিতে পেতাম!



জার্মান ভাষাঃ উচ্চারণ শুনুনঃ http://goo.gl/SqAtty

জার্মান ভাষা শিখতে ফেসবুক গ্রুপ:https://goo.gl/xAlwQ8