১. জার্মানিতে আকাশে বাতাসে টাকা ওড়েঃ

সেদিন একজন দেখি হিসাব দিসে কিভাবে মিনিমাম স্যালারিতে ১৩০০ ইউরো ইনকাম সম্ভব পার্ট টাইম চাকরি করে।

সে লিখসে জার্মানিতে শনি রবি জব করলে ঘন্টা প্রতি ডাবল পে করে। তখন ঘন্টা প্রতি ২০ ইউরো ইনকাম সম্ভব। আর স্কিল বাড়াইলে এমনিতেই প্রতি ঘন্টায় ১৫-২০ ইউরো পাওয়া সম্ভব।

যে জার্মানিতে একবার হলেও পা ফেলছে, সে জানে রবিবার এখানে সব বন্ধ। ইমার্জেন্সি কিছু সার্ভিস শুধু খোলা থাকে। এখানে ঘন্টায় ইনকাম শুরু হয় ৯.৫০ ইউরো থেকে।

দেশ থেকে মনে হয় আরে ঘন্টায় ৯৫০ টাকা!!

অনেক টাকা।

আসলেই টাকার পরিমান ভাল কিন্তু আপনি যদি সপ্তাহে ২০ ঘন্টার কাজ পান, তাহলে মাসে ৭৬০ ইউরোর মত পাবেন। কোভিডের কারনে পার্ট টাইম সব জব আপাতত বন্ধ। মাসে ৮০ ঘন্টা কাজ পাওয়া খুব টাফ। আর যদি পানও ৭৬০ ইউরো, এখান থেকে আপনার হেলথ ইন্সুরেন্স কাটবে ১১০ ইউরো, বাসা ভাড়া ২০০-৪০০ ইউরো (শহরের ওপর নির্ভর করে), খাবার খরচ ১০০-১৫০ ইউরো, ট্যাক্স/পেনশন থেকে আরো কাটবে ৬০ ইউরো মত, এছাড়া হাবিজাবি খরচ আরো থাকবে ৫০-১০০ ইউরো। এগুলা হিসাব করে দেখবেন হাতে খুব বেশি টাকা থাকবে না। এছাড়া পদে পদে বিভিন্ন এক্সট্রা খরচ তো আছেই।

২। ভার্সিটি চয়েজঃ

জার্মানির একটা বিষয় অন্যান্য দেশের সাথে পার্থক্য হচ্ছে এখানে চাইলেই বেশ ভালো ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া যায় খুব ভাল অনার্সের রেজাল্ট না থাকলেও। আর র‍্যাংকিং দেখে সবাই মনে করে ভালো র‍্যাংকড ভার্সিটিতেই যাব।

ভর্তি হবার পর সবাই হায় হায় করে!!!

জার্মানিতে ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া সবচেয়ে ইজি। বাকি সব কিছুই কঠিন। বিশেষ করে পাশ করে বের হওয়া।

আমাদের ভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে ব্যাচেলরে ভর্তি হইসে ১০০০ হাজারের মত স্টুডেন্ট। ৪-৭ বছর পর পাশ করে বের হইসে ২০০-২৫০ স্টুডেন্ট। বাকিরা মাঝপথেই ঝরে পরে। দেশে মোটামুটি মাস্টার্স শেষ করে সবাই ১-২ বছরের মধ্যে। এখানে ভালো ভার্সিটিতে মাস্টার্স শেষ করতে আপনার ৩-৬ বছর লেগে যেতে পারে। শুধু বাংলাদেশিদের কথা এটা না, এটা মোটামুটি সব দেশের মানুষের জন্যই সত্যি। অনেকেই শেষ না করে ভার্সিটি সুইচ করে। তাহলে কি করতে হবে? বাস্তবতা বুঝতে হবে। আপনি জার্মানির টপ ৫/১০ ভার্সিটিতে চান্স পাইসেন দেখেই পড়তে হবে এখানে সেটা না। আপনার চাহিদা কি এটাও মাথায় রাখবেন। কেউ যখন RWTH ইউনিভার্সিটিতে আসতে চায়, আমি নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করি। আমি বলি অন্য ইউনিভার্সিটিতে হলে ঐখানে যেতে। কারন হল এটা সম্পূর্ন একটা রিসার্চ ইউনিভার্সিটি। এখানের কারিকুলাম এমনভাবে সাজানো যে এরা আশা করে আপনি মাস্টার্স এর পর পিএইচডি করবেন বা রিসার্চ করবেন। এখান থেকে পাশ করতে গড়ে ৩-৫ বছর লেগে যায়। আর পড়াশোনা অসম্ভব কঠিন। এখানে কারিকুলাম এমনভাবে সাজানো যেটা আপনাকে পদে পদে পাশ করতে বাধা দেয়। তখন অটোমেটিক ডিপ্রেশন চলে আসে। এর চেয়ে যদি আপনি মোটামুটি র‍্যাংকড এর ভার্সিটিতে যেয়ে ২-২.৫ বছরে পাশ করে ফেলেন, তাহলে সব দিক থেকে বেটার। এমন না যে RWTH থেকে ৪ বছরে পাশ করে আপনি এর থেকে খারাপ র‍্যাংকড ভার্সিটির স্টুডেন্ট থেকে অনেক বেশি ইনকাম করবেন। বিদেশে জীবন অনেক কঠিন, নিজের হাতে একে আরো কঠিন করার দরকার নাই। সবচেয়ে বড় বিষয় হল জার্মানির সব ভার্সিটিতে একটা স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করে। এমন হবে না যে দেশের বুয়েট আর হাতিয়া কলেজ ইউনিভার্সিটি মাঝে যে গ্যাপ সেইরকম থাকবে।

তাহলে কি ভাল ভার্সিটিতে ভর্তি হব না? অবশ্যই হবেন। কিন্তু নিজের ওজন বুঝে। আর যাদের সাথে পরামর্শ করবেন তারা কেমন স্টুডেন্ট এটাও বুঝতে হবে। আমি যদি Technical University of Munich থেকে ৩ বছরে পিএইচডি করা কাওকে জিজ্ঞেস করি এখনকার পড়াশোনা অনেক কঠিন নাকি, সে অবশ্যই বলবে না। কিন্তু তার স্ট্যান্ডার্ড আর বাকি ৯৯% স্টুডেন্ট এর স্ট্যান্ডার্ড এক না।

৩। জার্মান ল্যাংগুয়েজ এবং রেসিজমঃ

জার্মানিতে জার্মান ল্যাংগুয়েজ ভাল না জানলে পদে পদে বিপদ।

অনেক সময় এমন হয় যে আপনাকে হেল্প করার কাওকে পাবেন না। জার্মান না জানার কারনে ফ্র‍্যাংফুর্টে নামার পর থেকেই রেসিজমের শিকার হয়েছি আমি। দোকানে যেয়ে যখন বলেছি “প্লিজ ইংরেজিতে কি কথা বলা যাবে?”আমাকে বলেছে “প্লিজ, দোকান থেকে বের হয়ে যাও।

“আপনি কোন পার্ট টাইম জব খুজছেন? ভাল ল্যাংগুয়েজ না জানলে পাওয়ার আশা না করাই ভাল। জার্মানির অল্প কিছু জায়গায় যেমন বার্লিনে ইংরেজি দিয়েও কাজ চালানো যায়। অন্য জায়গায় ততটা না।আইটি জবেও ওরা দাবি করে ল্যাংগুয়েজ দরকার নাই কিন্তু বাস্তবতা হল আপনার থেকে কম যোগ্যতা সম্পন্ন কেউ যদি জার্মান পারে, সে আপনার থেকে বেশি প্রায়োরিটি পাবে।

আমি এখানে প্রথম জব পাওয়ার আগে প্রায় ১০০-১৫০ জবে এপ্লাই করেছি। যেগুলার ফাইনাল রাউন্ডে গিয়েছি, সব জায়গায় একটাই কথা “আমরা জার্মান জানা এমন কাওকে প্রেফার করছি। সরি।”

আর রেসিজমের কথা বললে শেষ হবে না। বাসা খুজছেন? ল্যাংগুয়েজ না জানলে বাসা দিবে না। খাটি জার্মান ছাড়া অনেক সময় বাসা দিবে না।

জার্মানির ইস্টে এখনও অনেক রেসিজম আছে। যারা জার্মানিতে অনেক দিন ধরে আছে, এমন যতজনের সাথে কথা বলেছি, তারা বলেছে ইস্টের দিকে না থাকতে। অসংখ্যবার এই কথা আমাকে বলেছে “You are in Deutschland, you must know Deutsch.” রিসেন্ট সময়ে জার্মানিতে কট্টর ডান পন্থীদের অনেক উদ্ভব হচ্ছে।আর জার্মান নিয়ে অতিরিক্ত ঝামেলা করে বয়স্ক এবং সেকেন্ড জেনারেশন জার্মান যাদের বাবা-মা এইখানে ইমিগ্রেশন নিয়ে এসেছে। এদের মধ্যে জাতিগতভাবে নাক উচু ভাব প্রবল। এরা না জার্মান, না নিজের দেশের। কিন্তু নিজেদের মনে করে সেরা।পরিবার ছেড়ে হাজার হাজার কিলো দূরে বিরূপ পরিবেশে এসে এগুলা শুনে ডিপ্রেশন এড়ানো খুব কষ্ট।

-তবীব ইবনে মাযহার

আখেন, জার্মানি।