:

কি কি ভীষণ মিস করি:

জানি এই পর্বটা হয়তো সবার কাজে লাগবে না। কিন্তু যারা যারা জার্মানি বা অন্য কোন দেশে যাবেন তাদের আসার আগে কিছু মনের ইচ্ছা যেন পূরণ করে আসতে পারেন তার জন্য এই লিখাটা কিছুটা হলেও দরকার হতে পারে ।  

আমি জিবনে কখনো ভাবি নি এত দূরে চলে আসবো । কিন্তু জিবনের অন্বেষণে কিভাবে কিভাবে যেন চলে আসলাম ছয় হাজার মাইল দূরে সবার থেকে দূরে । অনেকে প্রশ্ন করেন ভাইয়া কি কি মিস করেন । আজকে কি কি মিস করি সেই সব কিছুই বলবো ।

আমি ঢাকাতে আপুর বাসায় থাকতাম । যাদের বড় বোন আছে তারা জানেন বড় বোন আসলে মায়ের দ্বিতীয় রূপ । বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে পুরটাই কেটেছে আমার আপুর বাসায় । প্রতিদিন ক্লাস শেষে বাসায় গিয়ে যখন খাবারটা টেবিলে দেখতাম তখন কেন যেন এসব এত আবেগের বিষয় মনে হত না । সব থেকে বড় মাছের টুকরাটা যখন আমার জন্য রাখা হত তখনও বুঝি নি ভালবাসা আসলে বলে বুঝানো যায় না। উপলব্ধি করতে হয় ।  

তারপর চাকরি করার সুবাদে যখন পরিবারের কাউকে যেমন আপু বা আমার ভাগিনা ভাগিনিকে কিছু কিনে দিতে পারতাম তাদের থেকে বেশি খুশি হতাম আমি । কাউকে কিছু দেয়ার মাঝে যে কি আনন্দ লুকিয়ে থাকে তখন বুঝা শুরু করেছিলাম ।  

যখন দিনাজপুরে যেতাম আমার আম্মাজান আমাকে কি কি বানায় খাওয়াবে তা নিয়েই ব্যস্ত থাকতো সারাটা সময়। আম্মাজানের সাথে রাতে বসে বসে গল্প করাটা যে এত ভাল লাগতো বলে বুঝাতে পারব না ।

প্রতিবার দিনাজপুর থেকে ঢাকা আসার সময় আম্মাজান আমাকে খাবার তুলে খাওয়াতো । তার নিজের হাতে মাছের কাঁটা বেঁছে এক মুঠো খাবার সব কিছুকেই হার মানায় । বাসা থেকে বাস ধরার ঠিক আগে আম্মাজানের গালে একটা চুমু দিয়ে বিদায় নেয়া আমি এখন তার হাতের স্পর্শ থেকে অনেক অনেক দূরে। ভাইয়ার ভালবাসা আসলে কখনও প্রকাশ করার মত না ।এই ভালবাসা বেশি দেখানো যায় না । দুইজনে বুঝতাম কিন্তু প্রকাশ তো করা যায় না ওইভাবে ।  

পরিবারের অন্যসকল মানুষ যারা নিরন্তর ভালবেসে গেছে এবং এখনও নিরন্তর ভালবাসে আমাকে তাদের কথাই বার বার মনে পরে । সবকিছুর মাঝেও যেন কিছু নেই ।  

এবার আসি পরিবারের পরের কিছু মানুষের কথায়। সেইসব বন্ধু যারা সব সময় জিবনের সকল ভাল খারাপ সময়ে ছিল । রাস্তার মোড়ে ছোট চায়ের দোকানে ঘণ্টার পরে ঘণ্টা কাটানো সময় । আড্ডা শেষে কে বিল দিবে সেইটা নিয়ে আবার আড্ডা দিতে থাকা আমি এখন একা একা সময় কাটায় । এখানে হইত অনেকের সাথে কথা হয় আড্ডাও হয় কিন্তু সেই সব মূল্যহীন আড্ডা কখনো হয় না ।

পরিচিত ঢাকার রাস্তায় রিক্সা করে ঘুরে বেড়ানো, গিটারের তালে গলা সেরে গান গাওয়া, বন্ধুদের নিয়ে বা অফিসের কলিগদের সাথে ভ্রমণগুলো, পুরাণ ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বিরিয়ানির খোঁজ, ভার্সিটির জুনিয়রদের সাথে দেখা হলে পুরনো সৃতি মনে করে হাসাহাসি সব কিছু রেখে চলে আসা আমি আসলে এসবই মিস করি ।

খারাপ খবরগুলো যখন শুনি সবকিছু শুধু এলোমেলো লাগে । ভাল খবরগুলো কাছে থেকে দেখার বা উপলব্ধি করতে না পারাটা যে কতটা কষ্টের তা আসলে বলে বুঝানো যায় না ।

উৎসবের দিনগুলোতে শুধু ফেসবুকের স্ক্রল বারে সময় কাটানো খুব একটা উপভোগের নয় । এইযে রোজার মাসে একা একা সেহেরী করা বা ইফতারে নিজের মানুষগুলোকে না পাওয়া একটা বিষণ্ণতার কারণ । হয়তো এবারের ঈদে জীবিকার অন্বেষণে কোথাও কাজের মাঝে কেটে যাবে সময় । এভাবেই চলে যাচ্ছে সময়।

অনেকে বলতে পারেন এসব আমাদেরকে কেন বলতেছেন । আমাদের এসব জেনে কি লাভ? লাভ হয়তো তেমন একটা নেই । তবে দেশ ছেড়ে আসার আগে যেন পরিবারকে কিছুটা সময় দিতে পারেন বা বন্ধুদের সাথে কিছু ভাল সময় অতিবাহিত করে আসতে পারেন সেই জন্য আমার নিজের অনুভূতিগুলো শেয়ার করছি । এসব হইতো কেউ বলে না কিন্তু যারা দেশ থেকে দূরে থাকে, পরিবার থেকে দূরে থাকে সবাই কম বেশি এসব উপলব্ধি করে । দেশ থেকে, পরিবার থেকে, সবকিছু থেকে দূরে আসার আগে যেন কিছু ভাল সময় অতিবাহিত করে আসতে পারেন সেই জন্য এই লিখার প্রচেষ্টা ।  

আমার এই লিখাটা কাউকে দেশের বাইরে আসার জন্য নিরুৎসাহিত করার জন্য নয় । আসলে কিছু পেতে গেলে তো সবসময় কিছু না কিছু ছেড়ে দিতে হয় । কিন্তু আসার আগে পরিবারের সাথে কিছু সময় অতিবাহিত করা, বন্ধুদের সাথে ভাল কিছু সময় কাটানো হয়তো আপনাকে উজ্জীবিত রাখবে অন্যকোন দেশের কোন যান্ত্রিক শহরে । এখানে সব কিছুই পাবেন শুধু সেইসব কাছের মানুষের খুশির সময়ে, কষ্টের মুহূর্তে থাকতে পারবেন না ।  

ভাল থাকুক সেইসব কাছের মানুষ । সত্যি বলতে কি এখানে ইংলিশ,ডয়েচ,হিন্দি সব ভাষার মানুষকে পাবেন কিন্তু সেইসব কাছের মানুষের সাথে বাংলাতে কথা বলে কাটানো সময়গুলো পাবেন না ।

ধন্যবাদ 🙂