N H Ashis Khan

বাংলার জন্য ভালোবাসা আমার এক পাকিস্তানি বন্ধুর বাংলা ভাষার প্রতি অনেক আগ্রহ। যখনি তার সাথে দেখা হয়, তখনি তাকে কিছুটা বাংলা শেখাতে হয়। বিষয়টা আমি খুব উপভোগ করি। কারণ যতোবারই তাকে বাংলা শেখাই ততোবারই মনের অজান্তে একুশের বিষয়টি আমার মাথায় চলে আসে। কিছুটা দখল থাকার পরেও আমি কখনোই আমার পাকিস্তানি অথবা ভারতীয় বন্ধুদের সাথে উর্দু বা হিন্দিতে কথা বলি না। কাজটা আমি সচেতনভাবেই করি। ওরা যখন বাংলা বলে না আমি তখন কেন উর্দু/হিন্দি আউড়াবো?মানুষের জীবনে ভাষা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ তা আমার মতো একটা দেশের ভাষা না জেনে সেই দেশে দিব্যি বাস করা মূর্খ পাবলিকদের চেয়ে আর কেউ ভালো জানে না।

শুধুমাত্র ভাষাটা ঠিকমতো না জানার কারণে এখনো ডোনারে ঠিক কতটুকু ঝাল খাবো কিংবা প্যাকেটে ঠিক কয়টা নষ্ট আপেল আছে সুপারমার্কেটে দাঁড়িয়ে তা বলার সাহস করি না।ইউনিভার্সিটির ক্লাসে একবার স্টুডেন্টদের মাতৃভাষা নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছিলো। সুযোগ পেয়ে নিজের মাতৃভাষা নিয়ে মোটামুটি বড়সড় একটা বুলেটিন দিয়ে দিলাম। প্রফেসর বললেন- আমি তো এ ভাষা সম্পর্কে খুব একটা জানি না। “বলেন কি, স্যার? পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা সম্পর্কে আপনি জানেন না?” “এ ভাষাই তো এশিয়াতে প্রথম নোবেল নিয়ে এসেছিলো। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস তো বাংলা ভাষার সম্মানেই।””তাই নাকি? ইন্টারেস্টিং। আমার জানা ছিলো না।”

বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য সম্পর্কে না জানায় প্রফেসরের ভাব দেখে মনে হলো তিনি যেন কিছুটা অপরাধ বোধ করছেন।প্রফেসরের এই অপরাধ বোধে অন্তপ্রাণ বাঙ্গালি আমি যখন গর্বে গর্বিত ঠিক তখনই পাশে বসা রাশিয়ান বান্ধবীর প্রশ্ন- “তুমি কি সিউর যে মোট স্পিকারের সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম ভাষা? আমি তো জানি স্পেনিশ ফোর্থ। বাংলা সম্ভবত সপ্তম।”- “রাশিয়ান কতোতম?”- “অষ্টম।”- “থ্যাংক ইউ।”পারলে তাকে আমি আরেকটা ধন্যবাদ দিতাম। ইউরোপিয়ান হয়েও সে যে অন্তত বাংলা ভাষা সম্পর্কে জানে এটাই আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।

প্রথমে ভাবতাম হয়তো আমার গায়ের রং এর জন্য ইউরোপের লোকজন আমাকে শ্রীলঙ্কান কিংবা ভারতীয় ভাবে। এতো বছর এখানে থেকে ওদের সাথে কথা বলে এখন বুঝি- আসলে বাংলাদেশ নিয়ে ওদের খুব একটা ধারণা নেই যতোটা আছে শ্রীলঙ্কা আর ভারত নিয়ে। দক্ষিণ এশিয়াতে ঘুরতে গেলেও এরা এই দুদেশের কথাই আগে ভাবে। পুরো ইউরোপে অনেক মানুষের সাথেই মেশার সৌভাগ্য হয়েছে। এখনো আমি এরকম কাউকে পাইনি যে বা যারা বাংলাদেশ ভ্রমণে গেছে। বিষয়টা আমাকে অনেক কষ্ট দেয়। উন্নয়নের জোয়ারে দেশ ভেসে গেলেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের পরিচিতি এখনো ভাটায় পড়ার পর্যায়েও নেই। সেন্টমার্টিনে একবার এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক আমাকে তার বাংলাদেশ ভ্রমণে আসার গল্প শুনিয়েছিলেন।

ট্রাভেল এজেন্সিকে বাংলাদেশ ভ্রমণে যাবার কথা বলায় তারা নাকি হাসাহাসি শুরু করে ভদ্রলোক ঠিক আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করেছিলো। সেন্টমার্টিনের সমুদ্র সৈকতে বসে বঙ্গোপসাগরের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বিড়বিড় করে বলেছিলেন- “আহা। এতো সুন্দর একটা দেশ অথচ কেউ তার সম্পর্কে জানে না।” সেই ব্রিটিশ ভদ্রলোকের সাথে এখনো আমার কথা হয়। পুরো বিশ্ব ঘুরে আসার পর তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সমুদ্র সৈকত আর দ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন আইল্যান্ড। নিজের দেশ আর জাতিস্বত্বা নিয়ে আমাদের বাংলাদেশিদের মানসিকতা আমাকে প্রায়ই দ্বিধায় ফেলে। আমরা মুখে মুখে বলি বাঙ্গালি হিসাবে আমরা গর্বিত কিন্তু অন্তরে এই গর্ব কতোটা ধারণ করি সেটা অনেকটাই প্রশ্ন সাপেক্ষ।

আমার এক ইন্ডিয়ান বান্ধবী একবার দুঃখ করে আমাকে বলেছিলো তার বয়ফ্রেন্ড তাকে নিষেধ করেছে যেন সে কোনো বাংলাদেশির সাথে না মিশে। বাংলাদেশিদের চিন্তাচেতনা নাকি খুব নিম্নমানের। শুনে আহত হইনি খুব একটা। নিজেকে কিছুটা ধিক্কার দিয়েছি। ইন্ডিয়ান বান্ধবীর বয়ফ্রেন্ডটি যে আমার মতোই এক বাংলাদেশি।নটর ডেমে পড়ার সময় আমাকে একবার দেশপ্রেমের সংজ্ঞা জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো। ঠিকমতো উত্তর দিতে না পারায় হাদি স্যার বলেছিলেন- খেলার মাঠে বাংলাদেশ হারলে যে কষ্ট পাস আর জিতলে যে ফুর্তি করিস এটার নামই দেশপ্রেম। বাংলা ভাষার প্রতি আমার আদৌ কোনো ভালোবাসা ছিলো কিনা তা জানা নেই। জার্মানি আসার পর প্রথম তিন/চার মাস আমার ফ্ল্যাট,ক্লাস কিংবা ফ্রেন্ডসার্কেলে কোনো বাংলাদেশি না থাকায় সারাদিনে শুধুমাত্র একবার বাসায় ফোনে কথা বলা ছাড়া আর বাংলা বলা হতো না আমার।

ট্রামে বা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কাউকে বাংলা বলতে দেখলে দৌড়ে গিয়ে অযথাই বাংলায় কথা বলে তাদের যখন বিরক্ত করতাম তখনো বাংলা নিয়ে আমার কোনো ফিলিংস আছে কিনা বুঝিনি। ইউটিউবে বাংলা গান শুনে বিদেশি বন্ধুরা যখন বলতো অনেক সুইট একটা ল্যাংগুয়েজ তখন শুধু ভিতরে একটা অদ্ভুত তৃপ্তি অনুভব করেছি। গভীর রাতে বার্সেলোনার কোনো এক সুপার স্টোরের ম্যানেজারের মুখে চট্টগ্রামের ভাষা, মিলানের ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে কারো মোবাইল ফোন থেকে ভেসে আসা পুরোনো দিনের বাংলা গান, লন্ডনে বাংলা অক্ষরে লেখা বিরিয়ানির দোকানের নাম কিংবা প্যারিসে আইফেল টাওয়ারের সামনে কোনো এক চাইনিজ দম্পতির ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মেয়েকে বাংলায় বার্থডে উইশ করার পর পকেট থেকে টিস্যু বের করে চোখের কোনাটা পরিষ্কার করতে করতে জেনেছিলাম আমার আবেগ একটু বেশি।

বাংলা ভাষার জন্য ভালোবাসা আছে কিনা তা কখনোই জানা হয়নি আমার।