জার্মানির ঘরের দরজা-জানালা এক আজব জিনিস। এই বস্তুর খোলা এবং বন্ধ করা ঠিকমতো আয়ত্তে আনতে আমাকে ভালোই বেগ পেতে হয়েছিল।

প্রথম কথা হচ্ছে, আমি ঘর থেকে বের হবার সময় চাবি লাগবে না। টান দিলেই দরজা খুলে যাবে। কিন্তু একবার যদি বাছাধন চাবি ছাড়া বের হয়ে যাও— তাহলে বাহিরেই দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। কারণ চাবি ছাড়া ভেতরে ঢোকা যাবে না। যদি না ভেতর থেকে কেউ দরজা খুলে না দেয়!

তো আজকের গল্পটা হচ্ছে এক বাংলাদেশি আপুর। বেচারি পিএইচডি করতে বিদেশ এসেছে। ইয়া বড় এক অ্যাপার্টমেন্ট তাঁর! সেই অ্যাপার্টমেন্টে তিনি একা। দেশ থেকে ভাইয়াকে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। কিন্তু তখনো সেই চেষ্টা সফলতার মুখ দেখেনি। তো ভাইয়ার শোকে হোক, কিংবা যে কারণেই হোক উনি একদিন চাবি না নিয়েই বের হয়ে গেলেন করিডোরে। দুমিনিট যেতে না যেতেই দরজা খুলতে গিয়ে বুঝলেন— কাজতো সেরেছে! দরজাতো আর খোলে না!

আশার বাণী এই যে, ওনার সাথে অন্তত ওনার মোবাইলটা ছিল। তাড়াতাড়ি ফোন দিল হাউস লর্ডকে (বাড়িওয়ালা)। আর বিচ্ছিরি বিষয়টা হচ্ছে, ওনার বাড়িওয়ালা থাকেন আরেক শহরে। আরো ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, সেদিন ছিল রবিবার। এখানে রবিবার বড় আরাধ্য জিনিস। সপ্তাহিক ছুটির দিন। এইদিন জার্মানরা তাদের পরিবারের সাথে সময় কাটায়। দুনিয়া ওলট-পালট হয়ে গেলেও এরা রবিবারে কোনো কাজ করবে না। এমনকি ই-মেইল চেক করাও না। দোকানপাট, অফিস-আদালত সব বন্ধ। ছুটি মানে ছুটি!তো বলছিলাম আপুর কথা, উনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িওয়ালাকে ফোন দিয়েই যাচ্ছেন, ও, হ্যালো! আমিতো বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। ঢুকতে পারছি না। তুমি একটু আসো না, প্লিজ! দরজাটা খুলে দিয়ে যাও।

বাড়িওয়ালাতো আসবে না! আজকে রবিবার। সে তাঁর পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হবে। তারওপর কাছেধারে হলেও একটা বিবেচনার বিষয় ছিল। ভদ্রলোক থাকেন আরেক শহরে। এদিকে আপুর অবস্থাতো খারাপ! উনি কিছুক্ষণ পরপর ফোন দেন— ও, হ্যালো! শুনছ? একটু আসো না, প্লিজ! আমাকে বাঁচাও!

উল্লেখ্য, আপু খুবই মেধাবী ছাত্রী। DAAD স্কলারশিপ প্রাপ্ত পিএইচডি শিক্ষার্থী। জীবনে তিনি অনেক পড়াশোনা করেছেন সত্য। কিন্তু জার্মানির দরজা সম্পর্কে কোথাও কিছু লেখা ছিল না। থাকার কথাও না।

তো যাইহোক, দীর্ঘ অনুনয়বিনয়ের পরে ওনার বাড়িওয়ালা জার্মান ভদ্রলোক অন্য শহর থেকে দুই ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে এসে ওনাকে দরজা খুলে দিলেন এবং ঝাঁঝালো গলায় দু-চারটা কথাও শোনালেন— এই তুমি জানো! আমি এখন আমার বউয়ের সাথে ঝগড়া করে আসছি! আজকে আমাদের বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। তোমার জন্য সেটাও হলো না! আমি তোমার ৫০ ইয়োরো (বাংলাদেশি প্রায় পাঁচ হাজার টাকা) জরিমানা করলাম। মনে রেখো, এটাই প্রথম, এটাই শেষ। আমি আর কখনো তোমার দরজা খুলতে আসব না।

আপুও মনে রাখলেন— এটাই প্রথম, এটাই শেষ। আর জীবনেও উনি পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিবেন না।আপুর মুখ থেকে সেই জরিমানা এবং জান বের হয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার ভয়াবহ বর্ণনা শুনে আমার নিজেরই গলা শুকিয়ে গেলো। তারপর থেকে যতবারই নিজের ঘরের চাবির দিকে চোখ পড়ে, ততবারই বিড়বিড় করে মুখ থেকে একটাই গান বের হয়—

কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে,

সিনার লগে বাঁধি রাইক্কুম তোঁয়ারে, ও, ন’নাইরে!

কইলজার ভিতর গাঁখি রাইক্কুম তোঁয়ারে!