আঙ্গুলগুলো আজকে চিবিয়ে খেয়েই ফেলবো। দাঁত কিড়মিড় করছে। ঠিক দশ মিনিটের মাথায় নবাবপুত্রের খানা-পিনার পাট চুকিয়ে টেলি-কন্সফারেন্স ধরতে হবে। হোম অফিস চলছে আজকে দেড় মাস। হোমের ভেতর অফিস ঢুকে যাবার পর থেকে জীবন অতিষ্ঠ। ঘরকন্না আর চাকরি মিলিয়ে জগা খিচুড়ি। এই লক্ষী হয়ে হাড়ি ঠেলো, তো পর মূহুর্তেই সরস্বতী সেজে রিসার্চ নিয়ে ভাবো রে। তার উপরে শিশু পালন তো আছেই। অন্য সময় হলে শিশুর বাবার কাছ থেকে কিছু সাহায্য মেলে। সে সুযোগ নেই এখন। করোনাকে চোখ রাঙ্গিয়ে সপ্তাহের সব দিনই তাকে অফিস যেতে হচ্ছে। সুতরাং, একাই দশভূজা দূর্গা হয়ে দশ দিক সামলাতে গিয়ে আমার মেজাজটা আজকাল মা কালির মত সপ্তমে চড়ে থাকে। চোখা একটা ত্রিশূল হাতে বাড়ির লোকদের তাড়া করতে পারলে খুব শান্তি পেতাম।

আর বাড়ির লোকেরাও বটে। এই যেমন ছেলেটা। সেই যে তখন বিশাল এক পোটলা খাবার মুখে ঢুকিয়ে গালটাকে উঁইয়ের ঢিঁপি বানিয়ে বসে আছে, আর গেলার নাম নেই। বন্ধ চোখে তার মৌনি সাধুর ধ্যান। গিলে খেয়ে নিলে সাধনা ফুরিয়ে যাবে, এই ভয়ে গালে জিইয়ে রেখেছে। এভাবে চলতে থাকলে সাধু বাবার আঙ্গুলও কামড়ে দিতে পারি। সাধু বাবার নাম তাফসু মিয়া। বয়স পাঁচ হয়ে সারে নি। কিন্তু সারাক্ষন আমাকে সাপের পাঁচ পা দেখাতে থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে বাহানা দেখার সময় নেই হাতে। কোনোমতে খাদ্য পর্ব চুকিয়ে তাকে খেলতে পাঠিয়ে দিয়ে কিচেনেরই ছোট্ট টেবিলে ল্যাপটপ টেনে বসলাম।

জুম লিঙ্কটা টিপে দিতে কাতিয়ার হাসি মাখা চেহারা ভেসে উঠল। কাতিয়া আমার বস। এক্সপেরিমেন্টাল প্যাথলজি বিভাগেরর হেড। এক নামে তাকে মিউনিখের টেকনিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই চেনে। জাঁদরেল বিজ্ঞানী। করনোর ভেতর আমাদেরকে হোম অফিসে পাঠিয়ে দিলেও নিজে প্রতিদিনই অফিসে যাচ্ছে, ল্যাব সামলাচ্ছে। টেলি কনফারেন্সে আজকে আরো একজন যোগ দিয়েছে। প্রফেসর ডাক্তার রালফ্ হুস। আউগসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ষাট পেরোনো শান্ত, সৌম্য চেহারা। একই সাথে হাসপাতালের ডিজিটাল মেডিসিন বিভাগের প্রধান, আবার নামী গবেষকও বটে। তার সাথে মিলে আমরা একটা কোম্পানির সাথে ক্যান্সারের উপর নতুন একটা প্রজেক্ট শুরু করবো।

কিন্তু আলোচনা শুরু করবো কি, অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম, প্রফেসর হুস্ আর কাতিয়া হাঁ করে কি যেন দেখছে আমার ঘাড় ডিঙ্গিয়ে। “এ্যাই, ওটা কি ঝুলছে ওখান থেকে?“। তাদের দৃষ্টি বরাবর তাকিয়ে একেবারে মরমে মরে গেলাম। রান্নাঘরের আঙটায় এবড়ো-থেবড়ো এক ফালি কাপড় ঝুলছে। সনাতনী রান্নাঘরীয় ভাষায় যাকে বলে ‘ত্যানা’। বাঙালি হেঁশেলের অবিচ্ছেদ্য অপরিহার্য অংশ। জবা ফুলের মত লাল হয়ে মস্তিষ্ক হাতড়ে বাংলা ত্যানার একটা ভদ্রস্থ ইংরেজি নাম খুঁজে নিয়ে জবাব দিলাম, ‘এ্যাঁ, ইয়ে মানে, ওটা কিচেন টাওয়েল’। বলেই সিমেন্টের মেঝে খুড়ে তাতে সেঁধিয়ে যাব কি না ভাবছি।

এদিকে হো হো হাসির রোল উঠেছে। কাতিয়া খানিকটা দম নিয়ে বলল, ‘বুঝলে প্রফেসর, মাস খানেক ধরে এই কিচেনই সাবরিনার হোম অফিস। সুতরাং হাসলে চলবে না কিন্তু, হা হা হা…।‘ ততক্ষনে ল্যাপটপ ঘুরিয়ে নিয়েছি। ব্যাকড্রপে এখন কোনো পাঁচকোনা ত্যানা ঝুলে নেই। আছে কালো হুমদো চেহারার রেফ্রিজারেটর। তাও সই। আর জার্মানদের ত্যানা প্যাঁচানো স্বভাব কম থাকায় পেশাদার কথা বার্তায় ডুবে যেতে সময় লাগলো না।

ঠিক মোক্ষম সময়ে মিটিং শেষ হল। আর সাথে সাথেই ‘মাআআ…’ বলে হুংকার ছেড়ে এক দস্যু ঢুকে পড়লো। কপট ভয় পাবার বদলে দস্যুর কিম্ভূত পোশাক দেখে হেসেই ফেললাম। তার হাতে কার্ডবোর্ডের ঢাল আর গলায় আমার কালো ওড়নাটা সুপার হিরোর কায়দায় ঝালর বানিয়ে ঝোলানো। কিন্তু পরনে শুধু সবুজ রঙের এক চিমটে জাঙ্গিয়া। এমনতর ডাকাত আগে দেখি নি, যার নিজের মান-ইজ্জতই ডাকাতি হয়ে গেছে। হাসিটা সরিয়ে খুব গম্ভীর স্বরে বললাম, ‘তুমি কে গো?’। উত্তর আসলো, সে নাকি একই সাথে ক্যাপ্টেন আমেরিকা, ব্যাটম্যান আর হাল্ক। সিনেমার পর্দায় হাল্ক নামের অতিনায়ককে কখনো জাঙ্গিয়া পরে উড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি বলে মনে পড়লো না।

সে যাক গে, চাপাচাপিতে পড়ে খানিকক্ষনের জন্যে কাজে বিরতি দিতে হল। কাগজের তলোয়ার বানিয়ে নিয়ে পরের আধা ঘন্টা ধরে দুই ফুটি হাইব্রিড সুপার হিরোর বনামে চলল এক তুমুল ঝন ঝন লড়াই।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে টনক নড়ল। আরেকটা মিটিং আছে। ঢাল-তলোয়ার ফেলে একটা যুদ্ধ বিরতি দিয়ে আবার ল্যাপটপের বোতাম চাপলাম। এক সাথে তিনটা মুখ দেখা গেল। তার ভেতর একজন ক্রিস্টিয়ান। ভীষন লম্বা, ঢ্যাঙ্গা মতন জার্মান ছেলেটা নিউরো-ফার্মাকোলজি বিভাগে পিএইচডি করছে। কাজটা অ্যালঝেইমার্স রোগের উপর। আমার সাথে তার কোলাবরেশন আছে। বাকি দু’জন ক্যারোলিন আর আনাস্টাসিয়া। জাতে একজন ফ্রেঞ্চ, আরেক রাশিয়ান। মাস তিনেকের জন্যে এই মেয়ে দু’টোর ব্যাচেলর থিসিস সুপারভাইজ করতে হবে। নিজের জ্বালায় বাঁচি না, আবার পরের কাজের তদারকি।

তবে, সানন্দেই রাজি হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাবিলিটেশন প্রোগ্রামে ঢুকেছি। হাবিলিটেশন এক রকমের ডিগ্রি। থাকলে ভালো, না থাকলে ক্ষতি নেই। অধ্যাপনা পেশায় আসলে অবশ্য কাজে দেয়। তাই গবেষনার পাশাপাশি পরীক্ষার হলে ডিউটি দেয়া, ছোটখাট সুপারভিশন ইত্যাদির সুযোগ পেলে লুফে নিচ্ছি। বছর খানেক খেটে খুটে হাবিলিটেশন করে হাবিলদার বনে গেলে মন্দ হয় না। আর হতে না পারলেও আফসোস নেই। ভেবে নেবো, চেষ্টা তো করেছি।

আলোচনায় তন্ময় আমরা চারজন। ঠিক এমন সময়ে হুড়মুড়িয়ে খানিক আগের সুপারহিরো, ‘দ্যা জাঙ্গিয়াম্যান’ ঢুকে পড়লো। তার সাথে খেলতে হবে। এখন এবং এখনই। ইশারায় মাথা নেড়ে মাফ চাইলাম। সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে রীতিমত আস্ফালন আর হম্বিতম্বি চলতে থাকলো। সাথে ব্রহ্মাস্ত্র হিসেবে ভ্যাক কান্না শুরু হল। এবার সত্যি বিপদে পড়ে গেলাম। ঘরে ঘরে নারী নির্যাতনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আসলে শিশুদের হাতে ঘটে থাকে- এই তথ্য কি কেউ জানে?

ক্রিস্টিয়ান, ক্যারোলিনদের কাছে এক মিনিটের জন্যে আলাব্বু নিয়ে নারী নির্যাতনকারী শিশু অপরাধীকে এক টুকরো চকলেট ঘুষ দিয়ে বাগে আনার চেষ্টা চালালাম। লাভের লাভ যা হল, চকলেটটা টপ্ করে মুখে পুরে সেই তো ভেউ ভেউ বিলাপে ফিরে গেল। যেই লাউ, সেই কদু। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে ক্রিস্টিয়ানদের সাথে শর্টকাটে আলাপ সেরে কাজের সাথে সে বেলার মত আড়ি দিতে হল।

আড়ি দিয়ে এবার হাড়ি চড়ালাম চুলায়। হাউ মাউ কান্নাকাটির আরেকটা কারন, খিদে। কারন, বেলা গড়িয়ে ঘড়ির কাটা দুই ছুঁই ছুঁই। খেয়ালই হয় নি যে দুপুরের খাবারের সময় যায় যায়। সরস্বতীটা আজকে খামচে খুমচে খুব ভাল মত ধরা গিয়েছিল, লেকিন লক্ষী বিবি তো ছুট গায়া। এমনিটাই হয় এক এক দিন। ওদিকে, কালো হুমদো ফ্রিজের পেটও গড়ে মাঠের মত ফাঁকা।

কি আর করা! চালে-ডালে-সবজিতে একটা গোঁজামিলের খিচুড়ি চাপিয়ে দিলাম। সকালে কল্পনার যে ত্রিশূল হাতে গজগজ করছিলাম, এখন সেটাকেই উলটে ধরে বাস্তবের খুন্তি বানিয়ে প্রবল বেগে খিচুড়ি নাড়তে লাগলাম। আর পুরোটা সময়ে কেউ একজন ঢাল তলোয়ার হাতে এলোপাথাড়ি শত্রু বিনাশ করতে লাগলো। তবে, মায়েদের জান বড় শক্ত। সামান্য কাগুজে তলোয়ারেই নাশ হয়ে গেলে জগত সংসার চলবে কি করে?

পেট ঠান্ডা তো সব ঠান্ডা কথাটা পুরোপুরি সত্য না। ছড়রা গুলির শব্দ তুলে লেগোর ব্লক ছুটে আসছে। আবার কেনো মা কাজে বসেছে, তাই এই অভিনব প্রতিবাদ। গা বাঁচিয়ে নির্বিকার একটা রিপোর্ট লিখে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ঠকাশ্ করে মাথার ঠিক পেছনে একটা আধলা ইটের মত কি যেন ছুটে এসে লাগলে আত্মহারা হয়ে হুংকার দিলাম, ‘অ্যাইই…একদম খেয়ে ফেলবো কিন্তু এবার!’। বেদম এক ফ্যাঁচ কান্না শুরু হল এবার। বেচারার দোষ নেই। মিউনিখের কিন্ডারগার্টেন করোনার কারনে ছুটি। ঘরে থাকা প্রতিটা মুহূর্ত শিশুরা সঙ্গ চায়, খেলার সাথী চায়। তার দুঃখটা বুঝে নিয়ে কাজ ফেলে আবারো হার মানলাম। তবে এভাবে আরো কিছুদিন চলতে থাকলে আমাকেও ফ্যাঁচফোঁচ কানতে দেখা যাবে। হোম অফিস না ভোম অফিস! দূর ছাই! রিপোর্ট লেখা রাতের জন্যে শিকেয় তুলে রেখে লেগো খেলতে বসে গেলাম।

আর কেউ শিশু পালন আর চাকরি নিয়ে এমন টালমাটাল অবস্থায় আছে কিনা জানতে দিন কয়েক আগে ডরোথিকে ইমেইল দিয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মহিলা বিজ্ঞানীদের একটা মাসকাবারি আড্ডা বসে। ডরোথি সেটার আয়োজন করে। বিষয়বস্তু সাধারনত একটা গন্ডির ভেতর ঘুরপাক খায়। যেমন, ছোট বাচ্চাওয়ালা মায়েরা কেন বিজ্ঞানকে সেলাম ঢুকে ঘরের ভেতর হারিয়ে যাচ্ছে। কেন জার্মানিতে নারী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা কমে কমে ডোডো পাখির মত ভ্যানিশ হবার যোগাড়। তাদেরকে কি কি সাহায্য-সুবিধা দিলে তারা আবার গ্রীক মিথোলজির ফিনিক্স পাখির মত জেগে উঠে বিজ্ঞানের জগতে একটা প্রলয় বইয়ে দিবে, ইত্যাদি ইত্যাদি।

মুশকিল হচ্ছে, আড্ডার লোকসংখ্যা ভয়াবহ কম। মহিলারা এদেশে ফিনিক্স পাখী হয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। তবুও বাকিরা যারা আসে, তাদের প্রানশক্তি প্রচুর। আমি আগ্রহভরে এই আড্ডায় যাই। চুপচাপ তাদের আলোচনা শুনি। গোটা খানেক স্যান্ডুইচ আর তিন-চার কাপ কাপাচিনো নামিয়ে সন্তষ্ট চিত্তে চলে আসি। ফ্রি ফ্রি খানাপিনার যেকোনো আয়োজন খুব গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। একটা লাভ অবশ্য হয়েছে। বেশ কিছু পিএইচডি, পোস্টডক আর জুনিয়র গ্রুপ লিডারদের সাথে হালকা সখ্য গড়ে উঠেছে।

ভাবলাম, করোনার এই ফাপরকালীন সময়ে তাদের সাথে কথা বললে হয়তো মনের ক্ষেদ মিটবে কিছুটা। বাচ্চা কাচ্চা চ্যাও ভ্যাও নিয়ে হোম অফিস নামের প্যারার ভেতর তো তারাও আছে। এই গ্রহে আমি একাই এই মাইনকা চিপায় পড়ে নেই নিশ্চয়ই।

তাজ্জব ব্যাপার। দেখা গেল, তারা কেউ কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে, কেউ বাবাদের সাথে ভাগ করে ছানাপোনা পালছে, কেউ এক ঘন্টা কাজ করছে তো পরের ঘন্টায় ঘর সামলাচ্ছে ইত্যাদি। মোদ্দা কথা, সব কিছু দারুন পেশাদারি হাতে সুচারুভাবে চলছে। এই না হলে জার্মান ডিসিপ্লিন আর নিঁখুত যান্ত্রিক প্রোডাক্টিভিটি। তাদের বাচ্চারা নাকি অহেতুক কাঁদেও না। নিপাট ভদ্রলোকের মত পাশে বসে নিজের মনে খেলে। দেখেশুনে বিরাট লজ্জায় পড়ে গেলাম। সামাল দিতে না পারার অপরাধবোধটা ছোট্ট পিঁপড়া থেকে এত্ত বড় হাতি হয়ে গেল। তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, একটা দেশী ছানা পেলে-পুষে দেখো পারলে। ও তোমাদের পাঁচটা জার্মান বাচ্চা পালার সমান, হুঁ হুঁ। ব্যর্থ লোকজন অজুহাত বেশি খোঁজে আর কি।

সবুজ সাগরে সফেদ ফেনা বুদ্বুদ তুলছে। কি চমৎকার দৃশ্য। কিন্তু মুহূর্তেই ভুলটা ভাঙলো। রান্নাঘরের মেঝেতে ডিটারজেন্টের সবুজ বোতলের পেটে চেপে সমুদ্দুর বানানো হয়েছে। তাতে হুটোপুটির ফলস্বরূপ খানিকটা ফেনা তৈরি হয়েছে। দৃশ্য দেখে অধিক শোকে পাথর হবার যোগাড়। শরৎচন্দ্রের ভাষায়, “তাহারি মাঝখানে হাতে পায়ে পিচ্ছিল তরল মাখিয়া ভূত হইয়া যে পঞ্চবর্ষীয় বালক দাঁড়াইয়া নিষ্পাপ শিশুতোষ হাসি হাসিতেছে, উহাকে দেখিয়া তাহার মাতার পিত্তি জ্বলিয়া একেবারে খাক হইয়া গেল”। দুই মিনিটের জন্যে এক সহকর্মীর সাথে ফোনালাপে ছিলাম পাশের ঘরে। আর ফাঁকতলে একি কান্ড!

পরিস্থিতির কাছে হেরে যাওয়াটা হেড়ে গলায় ডাক ছেড়ে গান গাওয়ার মতই সহজ। এই মুহূর্তে তাই করবো কি না ভাবছি। চিন্তায় গাল চুলকে প্রায় ছাল তুলে ফেললাম। তারপর সিদ্ধান্ত হল, মেজাজ হারালে চলবে না। তাই বিশাল একটা বাজখাঁই হুংকার দিতে গিয়েও থেমে গেলাম। কারন, ছোট শিশুদের সাথে চ্যাঁচামেচির ফল মারাত্মক। তারা তখন মাকে শত্রু ধরে নিয়ে আরো পাঁচ রকমের অনাসৃষ্টির ফন্দি আঁটে।

চার দেয়ালে বন্দী থাকলে লোকের এমনিতেই কিছুদিন পর পাগল পাগল লাগে। আর আমরা প্রায় দুই মাস ধরে করোনা কা ধামাল সামাল দিতে বসত বাড়ির কয়েদে আছি। চার হাতে পায়ে বানরের মত হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটছি না যে এটাই বেশি। শিশুদের তো আরো জ্বালা। তাদের পেট ভর্তি এনার্জি। অথচ খরচ করার জায়গা নেই। এই প্রথম বোধহয় রাগ না করে বেচারার দুঃখটা বোঝার চেষ্টা করলাম। দ্রুত হাতে ডিটারজেন্টের সবুজ সাগর শুকিয়ে খটখটে করে শুধালাম, ‘এক পাক দৌড়ে আসি, চলো’। উত্তরে যেন একশো ওয়াটের বাল্ব জ্বলে উঠলো।

তাফসু মিয়া দৌড়াতে পছন্দ করে। এই স্বভাব খুব সম্ভবত সে তার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছে। বাড়ির কাছেই নদী আছে এক চিলতে। নাম তার ইজার। নদীর পাড় ঘেঁষে খোলা মাঠে দৌড়ে বেড়ানোর মজাই আলাদা। ল্যাপটপের ঝাঁপি ফেলে চটপট পোষাক পাল্টে নিলাম। তাফসু মিয়াকে দুর্দান্ত লাগছে ট্রাইজারের সাথে ছোট্ট নীল স্পোর্টস টি-শার্টে। মুখে মাস্কের কারনে তাকে আসলেই সুপার হিরোদের মত দেখাচ্ছে। ওদিকে, একই মাস্ক পরে আমাকে সাক্ষাৎ সিঁধেল চোরের মত লাগছে।

যাহোক, মিউনিখের লকডাউন আস্তে আস্তে ডাউন হয়ে আসছে। দোকানপাট, অফিস- আদালত খুলছে। হাঁটা চলা কি দৌড়ে অবশ্য আগে থেকেই বাধা ছিল না। কাজের চাপে সামান্য ঘুরে আসার ইচ্ছাটাও কাজ করে না। আজকে তাই বহুদিন পর গর্ত থেকে মাথা বের করে সুর্যের ঝিলিকে আনন্দে অন্ধ হবার যোগাড়।

খানিক আগে হোম অফিসের মন্ত্রনায় আর ছোট শিশুর যন্ত্রনায় চোখে সর্ষে ফুল দেখছিলাম। আর এখন অবারিত সবুজে চোখ ধাঁধিয়ে রীতিমত হতভম্ব হয়ে গেলাম। মানুষের উৎপাত থেকে ক’টা দিন রেহাই পেয়ে প্রকৃতি ইচ্ছেমত সেজেছে। নন্দন কানন কোন ছাড়। এলোমেলো পা চালিয়ে দৌড়াতে থাকা তাফসু মিয়ার ছোট্ট চোখে বিস্ময় আর ধরে না। সে একবার নদীর পাড়ের হাঁসদের ধাওয়া করে তো, পর মুহূর্তেই পড়ে থাকা কঞ্চি তুলে রাখাল বনে গিয়ে অদৃশ্য ভেড়ার পাল চড়ায়।

সপ্তাহের মাঝের দিন। লোকের আনাগোনা কম। ছেলেটার উচ্ছ্বাসের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াচ্ছি। চার দেয়াল যেন ক্রমশ চেপে ধরেছিল। হঠাৎ ইট কাঠের কব্জা থেকে মুক্তি পেয়ে পাঁজরের ফুসফুস বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে। অবাক হয়ে দেখলাম, মনেরও একটা ফুসফুস আছে, সেও আজকের খোলা হাওয়ায় মরচে ঝেড়ে ঝকঝকে চেহারা নিয়েছে। শিশু পালন আর কাজকর্মের চাপকে আর পাহাড়ের মত ভারী লাগছে না। ছোটখাট টিলা মনে হচ্ছে বড় জোর। যেন অনায়াসে তাকে লাফিয়ে ডিঙ্গিয়ে পেরোনো যাবে। এই আনন্দটাই যে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো এই কয়দিন। আজকে রোদের কনায়, শিশুর হাসিতে, উড়ে যাওয়া হাঁসের ডানায় তাকে ফিরে পেয়ে নিজেকে শিমুল তুলার মত হালকা লাগছে। বেঁচে থাকার কুসুম কুসুম বোধটা আড়মোড়া দিয়ে জেগে উঠে হতবিহ্বল করে দিচ্ছে।

তুলার মতই প্রায় উড়ে উড়ে দু’জন ঘরে ফিরলাম। আঙ্গুলের ইশারায় অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সারাদিনের লন্ড ভন্ড ঘর গুছিয়ে, আরেক প্রস্থ হাড়ি নেড়ে রেঁধে বেড়ে, ছেলেকে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে হদ্দ ক্লান্ত না হয়ে, দারুন চনমনে মন নিয়ে আবার কাজে বসলাম। মনের অতলে যে বল পেলাম, আকারে সে প্রায় ছোটখাট একটা ফুটবলের মতই প্রমান সাইজ। এই মনের বল আর কিছুতেই হারাতে দেয়া যাবে না। মহামারির এই প্রচন্ড সময়ে বেঁচে থাকাটাই আসল জিতে যাওয়া। সামান্য গেরস্থালি উৎপাতে হেরে ভূত হয়ে গেলে ষোলো আনাই যে জলে গেল।

কি মনে করে এক পলকের জন্যে টেবিল থেকে উঠে গেলাম। নিপাট বিছানার ঠিক মাঝখানে ঘুমের রাজ্যে বিভোর ছোট্ট তাফসু মিয়া। শিশুদের গায়ে ধোঁয়া ওঠা ভাতের সফেদ একটা বিশুদ্ধ ঘ্রান থাকে। নাক ডুবিয়ে সেই ঘ্রান টেনে নিলাম। এই ক’টা দিন তাকে শত্রু ঠাউরে কতই না বিরক্ত হয়েছি। কাজকেই এক নম্বরে রেখেছি। আর তাকে দুইতে। অথচ উল্টোটাই সহজাত, উল্টোটাই প্রাকৃতিক। শিশুরা নক্ষত্রের মতন। তাদের ঘিরেই আসলে ক্যারিয়ার, ঘর-গেরস্থালি নামের গ্রহগুলোর ঘুরে বেড়ানোর নিয়ম। ঠিক করলাম, ছোট শিশু কোলে কাঁখে হাসিমুখে যতটুক এগোনো যায়, তাই সই। কালকে থেকে ব্যক্তিগত সৌরজগতটা তাই ঢেলে সাজাতে হবে নতুন করে।

এতে কোনো হার নেই, বরং পুরোটাই জিত।

-ডঃ রিম সাবরিনা জাহান সরকার
গবেষকঃ ইন্সটিটিউট অব প্যাথোলজি, স্কুল অব মেডিসিন,
টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি
১৯.০৫.২০২০