লিখেছেন -ড. খাজা রহমান

০৯/০৫/২০২০, জার্মানি।

একবার এক গাড়ি দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ঘটনাস্থলে জার্মান পুলিশের মুখোমুখি –

অফিসার: (ভিকটিমকে উদ্দেশ্য করে) “তোমার গাড়ির ক্ষতিতে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বীমা কোম্পানি। তোমার পছন্দের ওয়ার্কশপ থেকে গাড়িটা মেরামত করে বিলটা রেখে দিও।”

অফিসার: (পলায়নরত অপরাধীকে ধরে ফেলার পর) “তুমি চাইলে মুখ বন্ধ রাখতে পারো, কারণ জার্মান আইনে সেটা তোমার সাংবিধানিক অধিকার। যা বলার তুমি তোমার লইয়ার (Rechtsanwalt) কে বলবে। আইনবিদ খুঁজে না পেলে আমরা কয়েকজনের ঠিকানা দিয়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি।”

সম্ভাব্য অপরাধী: “কিন্তু আমি নির্দোষ। ঐ গাড়ির সাথে আমার গাড়ির কোনো স্পর্শও হয়নি!!!”

অফিসার: “কাউকে অপরাধী বা নির্দোষ প্রমাণ করা পুলিশের কাজ না। আমরা শুধু সাক্ষ্য-প্রমাণ-ছবি-সিসিটিভি ফুটেজ দেখে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করবো। Staatsanwaltschaft বা পাবলিক প্রসিকিউটররা তদন্ত রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত নিবে, ক্রিটিকাল কেইসে বিচারকের কাছে পাঠাবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তারা জরিমানা নির্ধারণ করবে, না হলে মামলা ডিসমিস। আর প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজ নিজ ঠিকানায় চিঠি পেয়ে থানায় এসে ঘটনার লিখিত সাক্ষী দিবে। মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়া জার্মান আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।“

এরপর কেইস লিপিবদ্ধ করে যে যার মতো চলে গেলো। কয়েকদিন পর চিঠি পেয়ে নিকটস্থ থানায় গিয়ে আমি সাক্ষ্য দিয়ে এসেছিলাম।

“আইনের দেশ” জার্মানিতে যে কোনো আইন ভঙ্গ করলে বা অপরাধে জড়িয়ে পড়লে ধরেই নিতে হবে যে কেউ না কেউ সেটি দেখে পুলিশকে খবর দিয়েছে। এরা এতোটাই সচেতন এবং আইন মেনে চলে! জার্মান পুলিশও প্রচণ্ড রকমের হেল্পফুল। পুলিশ নিয়ে আমাদের যে ভীতি ছোটবেলা থেকে তৈরি হয়, তা এই দেশের পুলিশের আচরণ দেখে কেটে গেছে।

জার্মানির অফিস-আদালত, রাস্তাঘাটে বা হোটেল-রেস্তোরায় আপনার দ্বারা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বা আপনি নিজেই ভিকটিম হলে সঙ্গে সঙ্গে আপনার ম্যানেজারকে বা কলিগকে (কর্মস্থলে হলে) শতভাগ সততা নিয়ে জানাবেন। কর্মস্থলের বাইরে হলে অবশ্যই পুলিশকে ফোন করে সাহায্য চাইবেন এবং শতভাগ সহায়তা পাবেন নিশ্চিত থাকতে পারেন!

কোনো ক্রিমিনাল অফেন্সে পুলিশ কেইসে জড়ালে (যেখানে আপনিই সম্ভাব্য অপরাধী, যদিও জানেন আপনি নির্দোষ) আপনার প্রথম কাজ হলো পুলিশের কাছেই শুধু না, এই ঘটনায় জড়িত বা সাক্ষীর সাথে ঝগড়াঝাঁটি না করে বরং একটা অক্ষরও প্রকাশ না করা। আই রিপিট, একটা অক্ষরও না। পুলিশকে দেয়া আপনার একটা ছোট্ট ইনফরমেশনেও আপনার লইয়ার সেই কেইসটি হেরে যেতে পারেন। পুলিশকে কিছু বলতে না চাওয়া জার্মান আইনে আপনার অধিকার। পুরো ঘটনা শতভাগ সততা দিয়ে বিস্তারিত বলবেন আপনার আইনজীবীকে। শুধুমাত্র একজন আইনজীবীই আপনাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারবে, আপনি-আমি-পুলিশ বা অন্য পেশার কেউ তা পারবে না।

অসংখ্য সড়ক আইন মাথায় নিয়ে এদেশে গাড়ি চালাতে হয়। আপনার একটি ছোট ভুলে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পয়েন্ট কাটা থেকে শুরু করে জরিমানাসহ ৩ থেকে ৬ মাসের জন্য লাইসেন্স বাতিল হতে পারে (সাধারণ শাস্তি)। আর ক্রিমিনাল অফেন্সে জেল বাদেও জরিমানাটা কিন্তু দুই/চারশো টাকার ডাংগুলি খেলা বা পুলিশকে একটা খিলি-পান খাওয়ানো বা গা চুলকিয়ে দেয়া না। মাসের বেতন হিসেবে জরিমানা নির্ধারিত হয়। জার্মান জাতীয় দলের তারকা ফুটবলার মার্কো রয়েসকে বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানোর অপরাধে তার ৩ মাসের বেতন হিসেবে ৫৩০,০০০ ইউরো (প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা) জরিমানা দিতে হয়েছিল!! পরে সে সুবোধ বালকের মতো ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হয়ে সব পরীক্ষায় পাশ করে তবেই লাইসেন্স পেয়েছে।

“বাক স্বাধীনতা” বা “ফ্রিডম অফ স্পীচের” নামে হলোকাস্ট বা গণহত্যাকে অস্বীকার করা জার্মানিতে একটি ফেডারেল অপরাধ। কুখ্যাত হিটলারের নাৎসি বাহিনীর কোনো প্রশংসা, সমর্থন বা চিহ্ন প্রদর্শন, নাৎসি-কায়দায় স্যালুট দেওয়া এখানে দণ্ডনীয় অপরাধ। কুখ্যাতদের নামে বাচ্চার নামকরণও এখানে আইনত নিষিদ্ধ।

আরও আছে। অনুমতি ছাড়া কোনো মেয়ে/মহিলার গায়ে হাত দেয়া বা মৌখিক টিজ করলেও তা যৌন-নিপীড়ন হিসেবে পুলিশের রেকর্ডে চলে যায় এবং বিদেশী হলে সাজা শেষে ডিপোর্ট নিশ্চিত। ইহজনমেও আর ইইউভুক্ত দেশগুলোতে ঢুকতে না পারার সম্ভাবনাই বেশি!

এদেশে মাছ ধরতেও লাইসেন্স লাগে, বীমা করা অন্যের গাড়িতে হাত দিতে কলিজা লাগে, লেকের হাঁস বা পাখি ধরে খেয়ে ফেললেও বিশাল জরিমানা গুণতে হয় (ডিম পাড়া স্ত্রী হাঁস/পাখি হলে তো জরিমানার অঙ্কটা আকাশছোঁয়া!), মাটি আর ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হবে বলে খোলা রাস্তায় গাড়ি পরিষ্কার করাও এখানে দণ্ডনীয় আপরাধ।

প্রতি বছরের মতো এইবারও আমার অফিসে একটা ডকুমেন্টে স্বাক্ষর দিতে হয়েছে, যেখানে লেখা আছে যে আমি/আমরা কোনো ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ২৫ ইউরোর বেশি উপহার সামগ্রী নেয়ার প্রমাণ পেলেই তা সরাসরি দুর্নীতি হিসেবে গণ্য হবে। পরিণতিতে চাকুরী চলে যাওয়া থেকে শুরু করে মুখোমুখি হতে হবে পুলিশ, আইন-আদালত আর বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তির।

এখানে অনেক চাকুরীতে নিয়োগের পূর্বে চাকুরিদাতা কোম্পানির কাছে একটি “খামবন্ধ” ডকুমেন্ট অবশ্যই জমা দিতে হয়। সেই ডকুমেন্টটি হলো আপনার পুলিশ রেকর্ড বা ক্রিমিনাল রেকর্ডের কপি। রেকর্ড খারাপ থাকলে চাকুরীতে নিয়োগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এটি ‘ক্লিন’ রাখা অতি জরুরী ভাই/বোনেরা।

যারা জার্মানিতে চাকুরী-বাকরি ও স্থায়ীভাবে থাকতে চান বা এমনকি যদি নাগরিকত্বের আবেদন করতে চান, তাদেরকে এই ক্রিমিনাল রেকর্ডের ঘরটি “অতি অবশ্যই” পূরণ করতে হবে। জালিয়াতি বা বিভিন্ন অপরাধে বিশাল জরিমানা খেয়ে জার্মানিতে স্থায়ীত্ব বা নাগরিকত্বের আবেদন বাতিল হয়েছে, এরকম অসংখ্য উদাহরণ আছে এবং আমার দীর্ঘ প্রায় ২০ বছরের জার্মান জীবনে এরকম অনেকজনের ঘটনাই শুনেছি। অপরাধভেদে এই ক্রিমিনাল রেকর্ডটি সেন্ট্রাল-ডাটাবেজে ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্তও “লাল দাগে” থেকে যায়। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা অনায়াসেই রেকর্ডটি আপনার আইডি/পাসপোর্ট চেক করে দেখে নিতে পারে। বেইজ্জতি অবস্থা!!

জরিমানার টাকা পরিশোধ না করে নিজদেশে পালিয়ে গিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি অনেকের। নোটিশ ঠিকই ঐ দেশের জার্মান দূতাবাসেও পৌঁছে যাবে এবং টাকাটি পরিশোধ না করা পর্যন্ত হয়তো আপনি বা আপনার পরিবারের কেউই পরবর্তীতে ভিসা অনুমতি পাবেন না।

কেমন বুঝলেন আইনের শাসন? রাষ্ট্রই আইন তৈরি করবে এবং তার কঠোর প্রয়োগের ব্যবস্থা নিবে। তাহলে জার্মানিতে স্বাধীনতা কোথায়? অন্য কারো ক্ষতি না করে, প্রতিটি আইন কঠোরভাবে মেনে চললে আপনার চেয়ে স্বাধীন মানুষ জার্মানিতে আর দ্বিতীয়টি নেই।

জার্মান সংবিধানে “মানুষের অধিকার রক্ষার” অঙ্গীকার করা হয়েছে, দানবের নয়। এর অর্থ হলো, আপনার অপরাধে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে। আপনি স্বদেশী না বিদেশী, ধর্মযাজক না মুনি-ঋষি, ছাত্র-পেশাজীবী না শরণার্থী, আপনি আঙ্গেলা ম্যার্কেলের খালু না মামু, দেখার টাইম নেই কারো। আইন সবার জন্যই “বরাবর সমান” এই দেশে।

বি.দ্র.: জ্বী না। আমি নিজে আইনবিদ না, কিন্তু একজন সচেতন মানুষ। যারা জার্মানিতে পড়াশোনা শেষ করে ভালো একটা ক্যারিয়ার গড়তেই এসেছেন বা আসতে চাচ্ছেন, সচেতনতামূলক এই লেখাটি শুধুমাত্র তাদের উদ্দেশ্যেই লিখলাম। আর যারা “ধুরর্, এতো নিয়ম মানার কি আছে” – এই নীতিতে বিশ্বাসী, তারা সম্ভবত ভুল দেশে এসে পড়েছেন বা আসার চিন্তা করছেন। এই পোস্ট তারা দয়া করে এড়িয়ে যাবেন। এই দেশে আমার বা আপনার একটা অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত যেন ভবিষ্যত প্রজন্মের বাংলাদেশী ছাত্র-ছাত্রীদেরকে করতে না হয়, এই বোধটা থাকা খুবই খুবই জরুরী।