আসসালামু আলাইকুম,

সকল প্রশংসা আল্লাহ সুবাহান্নাহু ওয়াতায়ালার যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন।
সকল ভাই ও বোনদের জানাই শুভেচ্ছা যারা এই উইন্টার সেমিস্টারে জার্মানে মাস্টার্স করতে যাচ্ছেন আমার মত। আমি আজকে আমার সকল প্রসেসিং সম্পর্কে একটা বিবরন দিবো যেটা আশা করি সামনে যারা মাস্টার্স এর জন্য আবেদন করবেন ভাবছেন তাদের জন্য কিছুটা হলেও হেল্পফুল হবে। একদম শুরু থেকে যদি শুরু করি তাহলে প্রথম কাজ হচ্ছে নিজের পাসপোর্ট করা যেটা অনেকেরই আগে থেকে করা থাকে। আর করা না থাকলে এটা প্রথমে করে নিবেন। এরপর যদি বলতে হয় সেটা হচ্ছে IELTS. জার্মানিতে যেতে হলে IELTS হচ্ছে মাস্ট আইটেম

IELTS

হ্যাঁ IELTS নিয়ে আমাদের মধ্যে দুই ধরনের মতবাদ দেখা যায়। এক ধরনের মানুষ আছে যারা এটাকে অনেক কঠিন কিছু মনে করে আকাশের চাঁদ পাও্য়ার মত। পারিনা, পারবোনা, ৫ এর উপরে স্কোর তুলতে পারছিনা আর বোধ হয় কিছু হবে না এমন ডিমোটিভেশনাল কথা গুলাই বলে থাকেন এই ধরনের মানুষগুলা। অন্যদিক দিয়ে অন্য আরেক ধারনের মানুষ আছে যারা ব্যপারটা নিয়ে এতটা চিন্তিত থাকে না। আসলে আপনি মনোযোগ দিয়ে অনেক দিন ধরে কিছু করলে যেকোনো কিছই সহজ হতে বাধ্য। একটা কথা বলেই সব কিছুর একটা সহজ সমাধান করা যায় সেটা হচ্ছে IELTS এ যদি মিনিমাম একটা স্কোর করতে চান তাহলে আপনাকে আহামরি ইংরেজী জানার দরকার হয়না। অনেক প্রেক্টিস আর কিছু টিপস আর এই টিপস গুলা এক্সামে এপ্লাই করার দক্ষতা করতে পারলেই অভারঅল ৬-৭ পাওয়া যায়। এর উপরে পাইতে হলে আপনাকে একটু বেশি প্ররিশ্রম করতে হবে আর ডেডিকেশন থাকতে হবে অনেক। আমার মত যারা ২ দিন পড়ে ২ দিন লাপাত্তা পরে আবার ২ দিন কোপাইয়া পড়া

এমন হলে ৬-৭ টার্গেট করাটাই ভাল। আমার ওভারল ৬.৫ ছিল আর সবগুলাতে ৬ অথবা ৬+ ছিল। এখন অল্প করে কিছু কথা বলি কিভাবি আমি প্রিপারেশন নিয়েছিলাম। অল্প করে বলছি এই কারনে যে আমি কোন ইংরেজী পন্ডিত না, শুধু কিভাবে জার্মান যাওয়ার জন্য মিনিমাম একটা স্কোর তোলা যায় সেই ধান্ধাতেই ছিলাম

অনেকে কোচিং করার কথা বলে থাকে কিন্তু আমি মনে করি এন্ড অফ দা ডে আপনাকেই পড়তে হবে। সব কিছু বাদ দিয়ে বাসায় ৩-৪ মাস ভাল করে পরলেই হবে। শুধু যেকোনো একটা কোচিং এ ১০-২০টা মক টেস্ট দিতে হবে। মক টেস্ট না দিয়ে কেউ এক্সামে বসার কথা ভাববেন না। কারন বাসায় টেস্ট দেওয়া আর এক্সামে টেস্ট দেওয়ার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। গ্রুপ করে পড়তে পারলে অনেক ভাল হয়। আপনি আপনার কাছের বন্ধুকে নিয়ে IELTS এর প্রিপারেশন নিলে ব্যপারটা অনেক সুবিধা হয়। আমরা ৩ বন্ধু একসাথে IELTS এক্সাম দিয়েছিলাম। এছাড়াও আমার ভার্সিটির দুজন ক্লোজ ফ্রেন্ডও তখন প্রিপারেশন নিচ্ছিল। আর আপনি যদি নিজে অনেক সিরিয়াস থাকেন তাহলে ত আলহামদুলিল্লাহ। আমার এক ফ্রেন্ড নিজে নিজে পরেই ৮ পেয়েছে(বিঃ দ্রঃ এটা হচ্ছে খুব সিরিয়াস যারা তাদের জন্য।

আরেকটা জিনিস হচ্ছে ইউটিউব। এখানে টিপ্সের ভান্ডার পাবেন। আশা করি সবাই তার আকাংখিত ব্যন্ড স্কোর পেয়ে যাবেন একটু ভাল করে প্রিপারেশন নিলেই।
তারপর যেই জিনিস টা আসে সেটা হচ্ছে জার্মানে কোন ইউনিভার্সিটি তে আপনি এপ্লাই করবেন।

ইউনিভার্সিটি সিলেকশন

দাদের ওয়েবসাইট থেকে খুব সহজেই আপনি আপনার পছন্দের সাবজেক্ট সিলেক্ট করতে পারবেন। ইউনিভার্সিটির টিউশন ফিস আছে কিনা সেটা দেখতে পারবেন। কোর্স লেংগুয়েজ ইংরেজী নাকি জার্মান সেটাও দেখে নিতে পারবেন।
লিঙ্কঃ https://www.daad.de/deutschland/studienangebote/studiengang/en/?a=result&q=&degree=&courselanguage=&locations=&admissionsemester=&sort=name&page=1
এরপর আসে কিভাবে এপ্লাই করবেন। জার্মানের ম্যক্সিমাম ইউনিভার্সিটি গুলাতে এপ্লাই এর জন্য ইউনিএসিস্টের মাধ্যমে এপ্লাই করতে হয়। এছাড়াও অনেক ইউনিভার্সিটিতে সরাসরি অনলাইনেও এপ্লাই করা যায়। এখন আবেদন করার জন্য একটা জিনিস অনেক জরুরি সেটা হচ্ছে মটিভেশনাল লেটার। আপনি যেই লাইনে আপনার ক্যরিয়ার করতে চান সেটা, আর যেই সাবজেক্টে পড়তে ইচ্ছুক তার মধ্যে মিল রেখে ভাল একটা মটিভাশনাল লেটার লেখতে হবে। অনলাইনে অনেক মটিভাশনাল লেটার পাবেন আপনার সাবজেক্ট রিলেটেড, এগুলা দেখে আইডিয়া নিয়ে নিজের মত করে একটা লেখে নিতে পারেন।

ইউনিএসিস্ট

ইউনি এসিস্টের মাধ্যমে আবেদন করার জন্য আমি ইউটিউবে এক ভাইয়ের করা কিছু টিউটরিয়াল দেখে নিয়েছিলাম এতে আবেদন করার সময় অনেকটাই সহজ হয়েছিল। ইউটিউবে এমন অনেক টিউটরিয়াল পাবেন, সবগুলা ভিডিও দেখে নিতে পারেন আবেদন করার পূর্বে। এছাড়া কাছের কেউ যদি আগে করে থাকে উনার সাহায্য নিলে ভিডিও না দেখলেও হবে আশা করি। আমরা ৩ বন্ধু (আমি, আমার ভাই আদনান আর আমার ফ্রেন্ড সিয়াম) এক সাথে করেছিলাম। তাই ওদের টিউটরিয়াল গুলো দেখতে হয় নাই। আমার দেখাতেই কাজ হয়ে গিয়েছিলো।

এখন আসি পেমেন্ট করার ব্যপারটা নিয়ে। ইউনিএসিস্টে প্রথম আবেদনের জন্য ৭৫ ইউরো আর পরের গুলার জন্য ৩০ ইউরো করে লাগে, আগে ১৫ ইউরো করে লাগতো পরের গুলার জন্য। পেমেন্টের জন্য মাস্টার কার্ড হচ্ছে বেস্ট সলুউশন। পরিচিতো কারো থাকলে সহজেই পেমেন্ট করতে পারবেন। এছাড়া ইবিএল বাংক, সিটি ব্যংক ইত্যাদি ব্যংক থেকে সহজেই পেমেন্ট করতে পারেন। আমরা ইবিএল ব্যংক থেকে প্যমেন্ট করেছিলাম। উনারা অনেক হেলপফুল এই ব্যপারে। স্পেশালী বনানী ব্রাঞ্ছের উনারা ভাল হেলপফুল। আমাদের একটু তাড়া ছিল (ডেডলাইন কাছাকাছি ছিলো বলে) তাই ইবিএলে একাউন্ট খুলে অইদিনই পেমেন্ট করে আসি। এভাবে ৪০০০ থেকে একটু বেশি এক্সট্রা পে করতে হয়েছিলো। সময় থাকলে একুয়া কার্ড খুলে করতে পারেন এতে এক্সট্রা টাকা একটু কম লাগবে। পেমেন্ট করার ২-৩ দিনের মধ্যেই কনফার্ম হয়ে যায়।

একটা মজার জিনিস হলো কিছু কিছু ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করলে ৩০ ইউরোর যে চার্জটা কাটার কথা অইটা ইউনিভার্সিটি পে করে দেয়। এটা ইউনিএসিস্টের ওয়েবসাইটে চেক করেও নিতে পারেন চাইলে। আর বেশি এপ্লাই করে রাখা ভালো।

ডকুম্যন্ট মেইল বাই পোস্ট

ইউনিএসিস্টে টাকা ত দিলেন, অনলাইনে এপ্লাইও করলেন, এখন কাজ হচ্ছে উনাদের কাছে সব সার্টিফিকেটের কপি নোটারী করে পাঠানো। কিছু কিছু ইউনিভার্সিটি আবার এপ্লিকেশন ফর্মে সাইন করে পাঠাতে বলে, এমন হলে ওটাও পাঠাবেন একসাথে। এখন নোটারী সম্পর্কে যদি বলি, ফার্মগেটে যাবেন, ওখানে ফটোকপির দোকান গুলাতে ১০-১৫ টাকা পার সার্টিফিকেট নিবে যাস্ট। এখন আসি কিসের মাধ্যমে পোস্টটা করবেন। আমি ফাস্টএক্সপ্রেসের মাধ্যমে ডকুমেন্ট পোস্ট করেছিলাম। ১২৫০ টাকা লেগেছিল শুধু। মজার ব্যপার হচ্ছে আমরা ৩ বন্ধু একসাথেই ডকুম্যন্টগুলা মেইল করেছিলাম। ৩ জনের মিলে ১২৫০ লেগেছিল যাস্ট। চাইলেই কারও সাথে শেয়ারড ভাবে পোস্ট করতে পারেন আর বাকি টাকা দিয়ে ভাল করে কাচ্চি মারতে পারবেন

এরপরে কাজ হচ্ছে একটাই সেটা হল অপেক্ষা। মেইলের অপেক্ষা। খুবই পেইনফুল টাইম হচ্ছে এই টাইমটা। এপ্লিকেশনের কিছুদিনের মধ্যেই ইউনিএসিস্ট আপনাকে জার্মান গ্রেডে রেজাল্ট দিয়ে দিবে। এরপর শুধু অফার লেটার পাওয়ার পালা। এই টাইমটাতে অনেক পেশেন্ট থাকতে হয়। আসবে ইনশাআল্লাহ সবারই। আমার এম্বাসি ফেস হওয়ার ১ সপ্তাহ আগে অফার লেটার এসেছিলো আলহামদুলিল্লাহ।

জার্মান এম্বাসিতে এপোয়েন্টমেন্ট

এপোয়েন্টমেন্ট জিনিসটা কম বেশ সবাই আগে থেকে করে রাখে। আগে নিয়ে রাখলে ভালো। বাট না রাখলেও সমস্যা নাই পরবর্তীতে এম্বাসিতে মেইল করেও ডেট নেওয়া যায়। তবে সব ইউনিভার্সিটি থেকে রিজেক্ট আসলে এপোয়েন্টমেন্ট কেন্সেল করে দেওয়া উচিৎ এতে অন্যএকজনের সাহায্য হবে।

অফার লেটার পাওয়ার পর যেই কাজটা করেছিলাম প্রথম সেটা হচ্ছে ব্লক্ড একাউন্ট খুলা ফিন্তিবা তে। মাত্র ১০ মিনিটেই একাউন্ট খুলা যায়। তার পর হচ্ছে টাকাটা জার্মানিতে ট্রান্সফার করা।

ব্লকড একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার

বর্তমানে ব্লকড একাউন্টে প্রায় ১০.৫ লাখের মত টাকা দেখানো লাগে। আমার প্রায় ৮.৫ টাকা দেখাতে হইছিল, যেটা এখন বেড়ে ১০.৫ লাখের মত হয়েছে।

ব্লকড একাউন্টে টাকা ট্রান্সফার করার জন্য বেস্ট অপশন হচ্ছে Sonali Bank Wage Earners Branch, Dilkusha. মতিঝিল থেকে খুব সহজেই যেতে পারবেন। সোনালী ব্যংকের এই ব্যংকে মনির সার নামক একজন আছে উনাকে শুধু বললেই হবে স্টুডেন্ট ফাইল খুলবো, তাহলেই হবে বাদবাকি কি করতে হবে উনিই বলে দিবে।
এই গ্রুপেই এক ভাই এর একটা ভালো পোস্ট আছে এই ব্যপারে, উনার পোস্ট দেখেই ফুল ডিটেইলস আইডিয়া পেয়েছিলাম। শুধু টাকার অংকটা এখন একটু ভিন্ন হবে এই।
পোস্টের লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/groups/BSAAG/permalink/2112515618830705/
এখন শুধু এম্বাসি ফেইস করার পালা।

এম্বাসি ফেইস

এম্বাসি ফেস করার পূর্বে কি কি নিতে হবে সেই চেকলিস্টটা চেক করে নেওয়া জরুরি। এই গ্রুপেই একটি পোস্ট আছে এক ভাই এর ওটা দেখে নিলেই হবে।
লিংকঃ https://www.facebook.com/groups/BSAAG/permalink/2091937260888541/
এম্বাসি ফেইস ব্যপারটা আসলে একেকজনের একেকরকম অবিজ্ঞতা হয়ে থাকে। তবে ম্যক্সিমাম মানুষদেরই এম্বাসি ফেসের অভিজ্ঞতা পজিটিভ তেমন ঝামেলা পোহাতে হয় না অনেককেই। কিছু ব্যতিক্রম ত অবশ্যই আছে। কিছু কমন প্রশ্নের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ জার্মানীতে কেনো? এই ভার্সিটি কেনো? যেই সাবজেক্টে মাস্টার্স করতে যাচ্ছেন এটার মানে কি? একাডেমিক রিলেটেড(ব্যচেলর যেই সাবজেক্টে করেছেন) কিছু প্রশ্ন? কোথায় থাকবেন ওখানে যেয়ে? এই ত! আরও ডিটেইলস জানতে চাইলে গ্রুপে অসংখ এম্বাসি ফেইস এর এক্সপেরিয়েন্স আছে অনেক ভাই বোনদের।

এরপর হচ্ছে ভিসুম পাওয়ার অপেক্ষা। এটা একেক স্টেটের জন্য একেক টাইম লাগে সাধারণত। অন এভারেজ ২৫-৩০ দিন লাগে। অনেকে ১ সপ্তাহেও পেয়ে যায় আবার অনেকে ৪০ দিন পরেও পেয়ে থাকে তাই হতাশ হও্য়া যাবে না। আমি ২৬ দিন পরে পেয়েছিলাম আলহামদুলিল্লাহ।

লেখায় ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। কোন কিছু মিসিং হলে বলবেন এডিট করে দিবো। ধন্যবাদ।

Mohammad Abralur Rahman Akash
University of Potsdam
Masters in Digital Health

mm

By Mohammad Abralur Rahman Akash

Msc in Digital Health University of Potsdam

Leave a Reply