বিদেশী একটা মাস্টার্স ডিগ্রী না হলে লাইফ ১৬ আনাই বৃথা এই মহা ভুয়া ডায়লোগ টা আমার মাথায় গেথে দিয়েছিলেন আমার খুব কাছের এক দাদু। আমিও বাদরের মত তার কথায় নেচে আধা জল খেয়ে লেগে গেলাম। জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম কোনোটাই বাদ রাখি নাই। ঠিক যে পরিমান আগ্রহ আর স্পিড নিয়ে এসব দেশের ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করেছিলাম তার থেকে কয়েকগুন বেশী স্পিডে রিজেকশন লেটার আসা শুরু করল। প্রেম করে ছ্যাকা খেয়ে মানুষ যেরকম কস্ট পায় তার থেকে বেশী কস্ট পাইতাম রিজেক্ট খাওয়ার পর।

বেজলিয়ামের জেন্ট ইউনিভার্সিটি তো মুখের উপর না করে দিয়ে ক্ষান্ত হয় নাই বরং নিজের পকেটের টাকা খরচ করে চিঠি দিয়ে আমাকে জানিয়ে দিলো

” বেটা, তোমার দেশের ব্যাচেলর হইল প্রাক্টিকাল বেজ আর আমাদের টা হইল থিউরিটিকাল। তুমি আমাদের এইখানে মাস্টার্স করিতে চাইলে আগে এখানে এসে ব্যাচেলর স করতে হইবে। উহা না পারিলে রাস্তা মাপো “

এত বড় অপমানে ঢেকুর গেলা ছাড়া উপায় ছিল না। চারিদিকে রিজেক্টের বন্যা। বাসা থেকে প্রতিদিন ফোন দিয়ে আব্বা আমার ফিউচার প্লান জানতে চায়। আমি নির্লিপ্তের মত বলি ” সময় হলেই জানবে ”

ঈদুল ফিতরের দুইদিন আগে হুট করে ফ্রান্সের ” Grenoble Institute of Technology ” থেকে অফার লেটার পেলাম Electrical for Smart Grid and Buildings সাব্জেক্টে। সত্যি বলতে কি যেখানে আমাকে অনেক লো রাংকিং এর ইউনিভার্সিটি রিজেক্ট করেছে সেখানে ফ্রান্সের ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর জন্য টপ ইউনিভার্সিটি থেকে অফার লেটার আমি কেন পেয়েছিলাম আমি নিজেও জানি না‍। এদিকে জার্মানি থেকে রিজেকশন খাচ্ছি তো খাচ্ছি। আমি ঠিক কতগুলো জার্মান ভারসিটিতে আবেদন করেছি সেটা শুনতে চেয়ে আর আমাকে লজ্জা দিবেন না। 😛

অবশেষে ফ্রান্সে যাবার জন্য সিধান্ত নিলাম। ভিসা পাবার জন্য যে প্যারা খাইছি তা মনে করলে এখনো চিন্তায় পরে যাই। মোট ২৬ টা ডকুমেন্ট ম্যানেজ করতে হয়েছিল। ৩ আগস্ট ফ্রান্স এম্বাসি ফেস করি। ৭ আগস্ট ঈদুল আযহার জন্য বাড়িতে যাবার জন্য রাতের গাড়িতে উঠার প্লান করছি এই সময় হুট করে ৩ টা ইমেইল এলো। আলহামদুল্লিলাহ, অবশেষে জার্মানি দুইটা ভার্সিটি আমার দিকে মুখ তুলে তাকালও । আব্বুকে কল দিয়ে সাফ জানিয়ে দিলাম আমি জার্মানি যাবো। উনি কিছু বললেন না। শান্ত ভাবে বললেন ” জা ভালো বুঝো ”

২০ আগস্ট ফ্রান্স এম্বাসি স্টুডেন্ট ভিসা সহ পাসপোর্ট ফেরত দিলো। আমি পরলাম নতুন বিপদে। ভিসা পাবার পরে খুশির ঠ্যেলায় ভিসা অফিসার কে বলেছিলাম যে আমি তো ফ্রান্সে যাবো না। আমার প্লান হলো জার্মানি যাওয়া। উনি বললেন ভিসা উইথড্র করতে হবে। আমি সেসময় তেমন কিছু ভাবি নাই। পরে বাসায় এসে নেট ঘেটে দেখলাম ইউরোপে সেঞ্জেনের একসাথে দুই দেশের ভিসা এলাউ না। একটা ইউথড্র করতে হবে। পরলাম মহা ফ্যাসাদে। ফ্রান্সের মত দেশের ভিসা ফেলে দেওয়ার মত কখনোই না।

এদিকে জার্মান এম্বাসিতে কোন এপোয়েন্মেন্টের ডেট নাই। উপায় না দেখে ফ্রান্সের ভিসা সহ এম্বাসিতে ইমেইল দিলাম। উনারা পরেরদিন অধিক আগ্রহ নিয়ে আমাকে জানালেন যে আমার জন্য ৩ সেপ্টেম্বরে ডেট দেওয়া হয়েছে। আর জার্মান ভিসা উথড্র করতে হবে কিনা সেটা ইন্টার্ভিউ এর দিন আমাকে জানানো হবে। আমি ওদের আশা পেয়ে লেগে গেলাম শপিং করতে। আমি ঠিক কতটা রিস্ক নিয়ে শপিং করেছি সেটা আমি জানি।

ব্লক অ্যাকাউন্ট এ টাকা পাঠানোর সময় আব্বুকে কল দিয়ে বললাম ” আব্বু আমি ঠিক কাজ করছি তো “। এত পরিশ্রম করে ফ্রান্সের ভিসা পাওয়া, টপ ইউনিভার্সিটি এসব বাদ দিয়ে জার্মানি ? । উনি নরম সুরে আমাকে সাহস যুগিয়ে গেলেন। বুঝলাম উনি নিজেও চিন্তায় আছেন। অবশেষে ব্লক অ্যাকাউন্ট এ টাকা পাঠিয়ে যথারীতি গেলাম জার্মান এম্বাসিতে ইন্টার্ভিউ দিতে। ইন্টার্ভিউ শেষে আমাকে বলা হলো আগেই যাবেন না। আপনাকে নিয়ে জার্মান এবং ফ্রান্স কর্মকর্তারা মিটিং করবে। সেই মিটিং ১ দিনে শেষ হয় নাই। আমাকে পরপর ২ দিন বিকাল তিনটায় জেতে হয়েছিল। আশা করছি বুঝতেই পারছেন মানসিক অবস্থা কি হয়েছিল। টেনশনে অবস্থা খারাপ। ফ্রান্স এম্বাসির কথা হলো জার্মান এম্বাসি ভিসা দিলেই আমরা আমাদেরটা ক্যান্সেল করব। এদিকে জার্মান এম্বাসির কথা হলো তাদের কিছু দপ্তরিক কাজ আছে। সেগুলো না করে তারা আমার ভিসার নিশ্চয়তা দেবে না। যাই হউক অবশেষে ফ্রান্স আমার ভিসা উথড্র করে নেয় এবং জার্মান এম্বাসি আমার পাসপোর্ট গ্রহন করে।

নিজের ভিতর দিয়ে ঝড় চলছিল। আমি কি ঠিক কাজ করলাম নাকি ভুল। কতদিন ধানমন্ডি লেকের পানির দিকে চেয়ে থেকেছি আল্লাহ ভালো জানে। তবে জার্মান এবং ফ্রান্স এম্বাসি আমাকে যেভাবে সহযোগিতা করেছেন তা বলার বাহির। জার্মান কন্সুলেট থেকে আমার ভার্সিটিকে কল দিয়ে বলা হয়েছিল যদি আমার ভিসা পেতে দেরী হয় তাহলেও যেন আমাকে লেট এডমিশন নেওয়া হয়।

এখানে বলে রাখা ভালো যে আমি যে ডিপার্টমেন্টে চান্স পেয়েছি তাদের শুধু এই ডিপার্টমেন্টের আবেদন করার লাস্ট ডেট ছিল ১৫ আগস্ট। আর বাকি গুলো জুনেই শেষ হয়েছিল খুব সম্ভবত। বাকিরা যখন জুলাইয়ে অফার লেটার পেয়েছে তখন আমরা পেয়েছিলাম আগস্টের দিকে। কিন্তু ভার্সিটি ভুল করেই আমাদের অফার লেটারে তাদের মত ১ অক্টোবরের মধ্যে এডমিশন না নিলে অফার লেটার ভ্যালিড থাকবে না সেটা লিখে দিয়েছিল। বুঝতেই পারছেন আমি বেশ রিস্ক নিয়েই সামনের দিকে যাচ্ছিলাম। কেন জানি ব্যাপারটায় মজা পেয়ে গেলাম। ঝামেলা গুলোকে ভালো লাগত। ভার্সিটির ইন্টারন্যাশলান ডেস্কের মিস পার্ক কে ইমেইল দিয়ে বললাম বাংলাদেশ থেকে আমি এডমিশন নিতে পারব কিনা। উনি বললেন হ্যা মেডিকেল ইন্সুরেন্স এবং সেমিস্টার ফি ১২৬ ইউরো দিলেই সম্ভব। উনি এটাও আমাকে বলেছিল যে আমি ৩১ শে অক্টোবর পর্যন্ত সময় পাব এডমিশনের। এই সংবাদ জানার পরে হাফ ছেড়ে বাচলাম। বুদ্ধি করে এই ব্যাপারে একটা লেটার ইসু করাতে বললাম। উনি জানালেন এমন কিছু ভার্সিটি ইস্যু করে না।

গ্রুপ ঘেটে জানলাম একমাত্র TK এই সুবিধা দেয়। ওদের ইমেইল করে ইন্সুরেন্সের কাগজ নিলাম। বন্ধু আতিক অসম্ভব রকমের হেল্প করেছিল। তাকে দিয়ে ফি টাও দিলাম। অবশেষে সব কিছু ইমেইলে পাঠিয়ে ২৮ তারিখের মধ্যে এডমিশন নিয়ে নিলাম। ভিসা ফ্রান্স ভিসা ইউথড্র এবং জার্মানির ভিসা পাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে শপিং করতে হয়েছে। কারন আমি জানতাম ভিসা পাবার পরে আমি সময় পাবো না। আমি জানি কি পরিমান প্যারা নিয়ে শপিং করেছি। ভিসা রিজেক্ট খেলে সব কিছুই মাটি। যাই হউক ২৯ তারিখ সুসংবাদটা পেলাম। ৩০ তারিখ এম্বাসি গিয়ে ভিসাটা কালেক্ট করলাম। ভিসার ছবি দিয়ে মিস পার্ক কে ইমেইল করলাম। উনি খুশি হয়ে আমার জন্য সেই লেট এডমিশনের লেটার ইস্যু করলেন যাতে ইমিগ্রেশনে আমার কোন ঝামেলা না হয়। হ্যা ফাইনালী আমি জার্মানি যাচ্ছি আমার পছন্দের সাব্জেক্টে। মহান আল্লাহ আমাকে দুই দুইবার সুযোগ দিয়েছেন। আল্লাহর কাছে একটাই চাওয়া আমি যেন সারা জীবন তার অনুগত থাকতে পারি।

সবার শেষে একটু উপদেশ দেই 😛 সবাই দেয় তাই আমিও দিলাম আর কি। আশা হারাবেন না। কোন কিছুকে বেশী যোগ্য ভেবে নিজেকে ছোট করবেন না। আপনি হয়তবা নিজেই জানেন না আপনার অবস্থান আসলে কোথায়। চেষ্টা করে যান। আল্লাহ আপনার জন্য যা ভালো তাই করবেন।

বাই দ্যা ওয়ে যে সাব্জেক্টের জন্য এত নাটক করেছি তার পরিচয় না দিলে কেমন জানি হবে । হা হা হা….

FH Schmalkalden University of Applied Sciences
Mechatronics and Robotics (M.Eng.) 
Winter 19/20

নোটঃ আমি কিন্তু এই ডিপার্টমেন্ট এর প্রথম ব্যাচ। আই মিন ২০১৯ সালের উইন্টারের তারা নতুন এই ডিপার্টমেন্ট চালু করেন। জার্মানির কোন ভার্সিটির প্রথম ব্যাচ কেউ হতে পারার মত দুর্লভ সৌভাগ্য অর্জন করেছেন কি না জানি না  😛