চড়ুই পাখিটা আকাশে পা তুলে চিৎ হয়ে পড়ে আছে সাদা বরফের চাতালে। কাছে এগিয়ে গেলাম দেখার জন্যে, সত্যিই মরে গেছে, নাকি পায়ের শব্দের ফুড়ুৎ উড়াল দেয়। কিন্তু এগোনোর আগেই সম্পূর্ণ অকারনে দাঁতে-ঠোটে কামড় লেগে বাজেভাবে কেটে গেল। পকেটে রুমাল বা টিস্যু কিছু নেই। খুব বেশি ব্যস্ত না হয়ে ধবধবে এক মুঠ বরফ তুলে ঠোঁটে চেপে ধরে ঝুঁকে পড়ে চড়ুইটাকে টোকা দিলাম। বেঁচে থাকলে টুপিতে তুলে বাসায় নিয়ে যাব। কিন্তু নাহ, জ্যান্ত নেই। অথচ শরীরটা কি গরম এখনো। হাঁটু মুড়ে বসে সামান্য খুঁড়ে তুষার চাপা দিয়ে ঢেকে দিলাম ওটাকে। কাটা ঠোঁট থেকে গড়িয়ে দু’ফোটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল ছোট্ট কবরের উপরে। দৃশ্যটা যেন কেমন অতিপ্রাকৃত। কি দরকার ছিল চড়ুইটা চোখে পড়ার?

এমনিতেই আজকে মন খাঁ খাঁ করছে। তার উপর ঝিং করে সেই যে মাথা ধরেছে। লতার কোটটা টুক করে নাকে চেপে ধরেছিলাম ফ্রাউ কেলনারের হাতে ফেরত দেয়ার আগে। নির্ঘাৎ এক কেজি বিস্কুটের নির্যাস থেকে এই পারফিউম তৈরি। আর যদি ভুল করেও কোনদিন মেয়েদের কাপড়চোপড় শুকতে গিয়েছি! কি যে সব অদ্ভূতুড়ে কাজ-কারবার পারফিউম কোম্পানিগুলোর। এখন সারাদিন মাথায় বিস্কুটের টিন নিয়ে ঘুরতে হবে। বিনা দোষের শাস্তি আর কি!

বাসায় এসে দেখি আরো শাস্তি অপেক্ষা করছে। ঘরের কোনে ঝুড়ি উপচে পড়া কাপড়গুলো ক্রুর হাসি হাসছে। মেঝের এক ইঞ্চি পুরু ধূলো ধূসর রঙা ইরানী কার্পেটের ছদ্মবেশ নিয়েছে। এদেশে তো আর ময়নার মা নেই যে ঝুড়ি উপচানো কাপড় ধুয়ে ইস্ত্রি করে দিবে। তাই সপ্তাহান্তে নিজেকেই ময়নার মা, না মানে, ময়নার বাপ সাজতে হয়। ঘরটাও ভ্যাক্যুম করতে হয় মাথা নিচু করে, অভিযোগবিহীন। কিন্তু আজকে যে কিছুতেই মন লাগছে না কোন কাজে। জুতার ফিতাটাও না খুলে কি এক শোকে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছি ধুলার ভেতর। বিড়াল ছানা হারিয়ে ফেলা বাচ্চা ছেলের মত। মুশকিল একটাই। এই ছেলেটা আর ছোট নেই। ছাব্বিশ বসন্ত পাড়ি দিয়ে কখন যে সে হাতে-পায়ে সে কত বড় হয়ে গেছে। ছেলেমানুষি মন খারাপ তাকে মানায় না। তাছাড়া, বিড়াল ছানা সপ্তাহখানেক পর পথ চিনে ঠিক ফিরে আসবে নিশ্চয়ই। তখন তাকে খপ করে ধরে বুক পকেটের ওমের ভেতর পুরে ফেলা হবে।

ভ্লাদিমিরের বাজখাঁই গলা শোনা গেল। “বউ মরা চেহারা করে আর কতক্ষন কাত হয়ে থাকবে? এদিকে এসে হাত লাগালে কি হয় রাজপুত্রের?” অনিচ্ছা স্বত্তেও রাজপুত্র উঁকি দিয়ে দেখল, কোটালপুত্র ভ্লাদিমির প্রকান্ড বায়ান্ন ইঞ্চি টিভিটা দেয়ালে লাগাবার তোড়জোড় করছে। ওপরের চাইনিজ ছেলেটা গ্রাজুয়েশন শেষে দেশে ফিরে যাচ্ছে। এতদিন বড়লোক বাপের পয়সা বেহিসাবী উড়িয়ে যাবার কালে বেচারা তার সহায়-সম্পত্তি দরাজ হাতে বিলিয়ে কুল পাচ্ছে না। ভ্লাদিমির আর আমার এই ফ্ল্যাটে কোন টিভি ছিল না। অভাবও বোধ করি নি এতকাল। তবুও ছেলেটার চাপাচাপিতে এরকম নিমরাজি হয়ে গিয়েছিলাম। ড্রিল মেশিন নিয়ে আধ ঘন্টা ধস্তাধস্তির পর ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত হাতে রিমোট নিয়ে বসলাম। ভ্লাদিমির দু’কাপ কফি বানাতে গেছে কিচেনে।

উল্টো পাল্টা বোতাম চেপে যাচ্ছি উদ্দেশ্যবিহীন। খবরে এসে থামলাম। “অমুক এয়ারলাইন্সের শেয়ার ধসের প্রথম ধাক্কাটি লেগেছে নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটের স্টক এক্সচেঞ্জে। সেই সাথে এয়ারলাইন্সটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নতুন করে সামনে চলে এসেছে…।“ অপ্রয়োজনীয় খবর। চ্যানেল উল্টে যেতে যেতে মনে পড়ে গেল, লতার ফ্লাইট স্ট্যাটাসটা একবার ফোনে চেক করে দেখা দরকার। তাদের যাত্রা মিউনিখ-টু-ঢাকা ভায়া দুবাই। তারপর শুরু হবে আসল খেলা। ঢাকা-টু-কুড়িগ্রাম ভায়া বগুড়া। জার্নি বাই লক্কর ঝক্কর হানিফ বাস। কেন যে লতাকে যেতে দিলাম! কিন্তু দেয়া-না দেয়ার আমি কে?

যাক গে, এতক্ষনে তো তাদের দুবাই পৌঁছে যাবার কথা। দলটা বড় থাকায় লম্বা বিরতির ট্রানজিট খুঁজেছিল তারা। কিন্তু পায় নি। দেড় ঘন্টার ট্রানজিটে ঢাকার প্লেন ঠিকঠাক মত ধরতে পেরেছে কিনা লতারা দুশ্চিন্তা হচ্ছে। তাড়াহুড়ায় লতার অসুবিধা হয় নি তো? আর ঝাঁকড়া চুলের ঐ গাট্টাগোট্টা ছেলেটা যে কিনা বারবার দৌড়ে লতার খোঁজ নিচ্ছিল এয়ারপোর্টে, সে আবার লতার পিছেপিছে ঘুরঘুর করছে না তো? পিনপিনে একটা জ্বলুনি টের পেলাম কোথায় যেন। মনে মনে ছেলেটাকে বার দুই ল্যাং মেরে ফেলে দিলাম। আবার লতার কাছে-পিঠে দেখা গেলে সত্যি সত্যিই তাকে বাংলা মাইরের প্রকারভেদ বুঝিয়ে দেয়া হবে।

ফোনে লতাদের ফ্লাইট স্ট্যাটাস দেখা যাচ্ছে না। ৪০৪ নট ফাউন্ড দেখাচ্ছে। ল্যাপটপ খুলে বসলাম। বড় বড় লাল হরফে একটা লেখা ‘অনিবার্য কারনবশত ফ্লাইট ই.এক্স. ৬৮৫ -এর গতিবিধি প্রদান বন্ধ আছে।‘ ধাঁধায় পড়ে গেলাম। কি হল আবার? অবচেতনভাবে রিমোট হাতড়ে খুঁজে খবরে ফিরে এলাম। ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে স্থানীয় সময় বিকাল পাঁচটায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া ই.এক্স. ৬৮৫ যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে কবলিত হয়েছে। উড্ডয়নের পর সামনের চাকা গুটিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় পাঁচ হাজার ফিট উচ্চতায় থাকা বিমানটি যে কোনো সময়ে দুবাই অথবা পাশ্ববর্তী বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।‘ ধড়াস করে ধাক্কার মত খেলাম যেন। হাত গলে রিমোট পড়ে গেল মেঝেতে। শব্দ শুনে কফির মগ হাতে ভ্লাদিমির এসে দেখে ফ্যাকাসে চেহারায় পর্দায় তাকিয়ে আছি। সব রক্ত সরে গিয়েছে মুখ থেকে।

ভ্লাদিমির যখন খবরটা হজম করছে, ততক্ষনে কোথা থেকে যেন শক্তি যোগাড় করে উঠে দাঁড়িয়েছি। যুক্তি-বুদ্ধি গুলিয়ে সব একাকার। কিন্তু কি করতে হবে যেন বুঝে গিয়েছি। লতার কাছে যেতে হবে। আর যেতেই হবে। প্লেন নামুক আর নাই নামুক। হাতে সময় নেই একদম। ছোঁ মেরে কাঁধের ব্যাগে পাসপোর্ট আর ক্রেডিট কার্ড পুরে জ্যাকেটটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে উড়ে গেলাম। ভ্লাদিমির লাফিয়ে উঠে বাঁধা দিতে চাইল বুঝি। কিন্তু না, বরং উল্টোটা। ‘এক মিনিট! ট্যাক্সি ডাকছি, তাড়াতাড়ি হবে। বাস-ট্রেন ঠেঙ্গিয়ে কতক্ষনে যাবে এয়ারপোর্ট?‘ বিপদে বন্ধু চেনা যায়। আমি ভ্লাদিমিরকে চিনলাম।

ফোনের স্ক্রিনে পড়ছি, ‘বিমানটিতে জার্মানিসহ তেরো দেশের নাগরিক মিলিয়ে দুইশ আটাশ জন যাত্রী রয়েছেন।‘ ট্যাক্সির ভেতরটা এত বদ্ধ কেন? নিশ্বাসের জন্যে মরিয়া হয়ে কাঁচ নামিয়ে দিলাম। হাতে চাপ লেগেছে ভেবে নিয়ে আফগানী ড্রাইভার আবার বোতাম টিপে কাঁচ তুলে দিল। তার রিফিউজি হয়ে এদেশে আসার গল্প আর দেশে রেখে আসা বউ-বাচ্চার কেচ্ছা এখন যন্ত্রণা ঠেকছে। প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে ফোনে হাত চলে যাচ্ছে। আতঙ্কে দিশেহারা।

‘আজকের কোন ফ্লাইটে সিট পাবেন না। অল বুকড আউট। দুঃখিত।‘ নির্বিকারভাবে আউড়ে গেল এয়ারপোর্টের টিকেট অফিসের মাঝবয়সী ভদ্রমহিলা। দপ করে নিভে গেলাম। কিন্তু নিভে যাওয়া চেহারাতেও স্পষ্ট একটা অনুনয় ছিল বোধহয়। ভদ্রমহিলা সামান্য নরম হয়ে বলল, ‘আবার দেখছি। সময় দিন।‘ তারপর দুই মিনিট না যেন দুই বছর পর কম্পিউটার থেকে মুখ তুলে জানালো, ‘বিজনেস ক্লাসের একজন ফ্লাইট ক্যান্সেল করেছেন এইমাত্র। আপনি কি আগ্রহী? টিকেটের দাম কিন্তু ইকোনমির চেয়ে আড়াইগুন।‘ বিনা বাক্যব্যয়ে ক্রেডিট কার্ড বের করে দিয়ে অস্থিরভাবে ফোনটা নিলাম। ‘বিমানটি অবতরনজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে জ্বালানি কমানোর উদ্দেশ্যে গত আধা ঘণ্টা ধরে আট হাজার ফিট উচ্চতায় আকাশে উড়ছে।‘ ভয়ংকর একটা অবিশ্বাস জেঁকে ধরেছে আমাকে। আর বুকের খাঁচায় হৃদপিন্ডটা অসহায়ের মত ডানা ঝাঁপটাচ্ছে বিরামহীন।

প্লেনে চড়ে অন্ধের মত হাতড়ে হাতড়ে সিট খঁজে নিয়ে ভাবছি, আদৌ লতার কাছে আমার পৌঁছানো হবে কিনা। দুবাই এয়ারপোর্টের অর্ধেকটা নাকি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অবস্থা বুঝে অনেক ফ্লাইট ঘুরে গিয়ে বিকল্প বন্দরে নামবে। ঘোষনা ভেসে এল, ‘আমরা টেকঅফ করতে যাচ্ছি। সিট বেল্ট বাঁধুন আর দয়া করে মোবাইল ডিভাইস বন্ধ করুন কিংবা এয়ারপ্লেন মোড-এ রাখুন।‘ নিরুপায় হয়ে শেষবারের মত দেখে নিলাম। ‘এই মাত্র জানা গেছে, গত নব্বই মিনিট ধরে পর্যাপ্ত জ্বালানি খরচ করে ই.এক্স. ৬৮৫ এই মুহূর্তে জরুরী অবতরনের জন্য প্রস্তুত…।‘ ঝাপসা চোখে বাকিটুকু আর পড়া হল না। চুরমার হয়ে যাচ্ছে ভেতরটা।

কাঁচঢাকা স্বচ্ছ সুবিশাল দুবাই বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না দূরের ধোঁয়ার কুন্ডলীটা লতাদের প্লেন থেকে উড়ছে। রানওয়ে থেকে ছিটকে অনেক দূর ঘেঁষটে গিয়ে থেমেছে বিরাট উড়ুক্কু তিমিটা। বাঁ দিকের ভাঙ্গা ডানার ওপর কাত হয়ে আছে অতিকায় শরীর। নিহতের সংখ্যা শূন্য শুনে হাঁপ ছাড়ছি কি ছাড়ি নি, আবার শুনলাম, আহতের সংখ্যাটা যথেষ্টই বড়। জনা তিরিশেক গুরুতর। তাদেরকে ভাগে ভাগে হাসপাতালে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাকিদের এখানেই চিকিৎসা চলছে। কিন্তু অগুনতি ফ্লাইট বাতিল হয়ে জায়গাটা এখন লোকে লোকারন্য। এর ভেতর আমি কোথায় লতাকে খুঁজবো? গলা বুজে এল নতুন শঙ্কায়। তবুও এলোমেলো পা ফেলে এগোলাম সামনে।

এয়ারপোর্ট সিকিউরিটি আর পুলিশের কাছে অনেক অনুরোধের কাঠখড় পুড়িয়ে আর অজস্র জিজ্ঞাসাবাদ পেরিয়ে অবশেষে হাতের পাসপোর্ট জমা দিয়ে পৌঁছালাম ই.এক্স. ৬৮৫ ফ্লাইটের যাত্রীদের যেখানে রাখা হয়েছে। প্যারামেডিক, স্ট্রেচার আর আহতদের বহর মিলে এ যেন হাশরের ময়দান। সব দেখে শুনে পাগল পাগল লাগছে। দিগ্বিদিক দৌড়ে তন্ন তন্ন করে বিশাল এলাকা খুঁজে খুঁজে হয়রান হলাম। তবুও লতারদের জন্ডিস জ্যাকেটের কোন দল বা কাউকে দেখতে পেলাম না। প্রায় ধরে নিয়েছি লতা নেই এখানে। মন তবু মানছে না তার কিছু হয়েছে আর তাকে এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গেছে বাইরে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা লাল-নীল-সাদা রঙের কোন অ্যাম্বুলেন্স। হতাশায় নুয়ে পড়ে আবারো এগিয়ে গেলাম দাঁড়িয়ে থাকা সিকিউরিটির লোকগুলোর কাছে।

লাউড স্পিকারে জরুরী কন্ঠ একটানা বলে চলছে, ‘জার্মানি থেকে আগত মিস শার্লট স্নাইডারকে ইনফো ডেস্কের কাছে আসতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এখানে অনীক আহমেদ অপেক্ষা করছে…। লতা যেন মেলায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট মেয়ে। কিন্তু আসলো না কেউ। মাথার ভেতর তখনও চলছে তুফান মেল, আর কোথায় খুঁজবো তাকে? লতাকে যে পেতেই হবে আজকে। বাকি থাকে হাসপাতাল। কিন্তু ট্রানজিট যাত্রীর তো অনুমতি নেই এয়ারপোর্টের বাইরে যাবার। এতটা অসহায় আর পঙ্গু সময় এই অনীকের জীবনে আর আসে নি। হাঁটু ভেঙ্গে আসতে চাইছে যেন।

গাঢ় অবষাদে ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হল চারিদিক যেন ছেয়ে গেছে বিস্কুটের মুচমুচে ঘ্রানে। এয়ারপোর্ট বদলে গিয়ে হয়ে গেছে অতিকায় বিস্কুটের ফ্যাক্ট্ররি। বুঝলাম, অবচেতন মনের খেলা। কি অদ্ভূত, মস্তিষ্কের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে পড়া লতার ঘ্রানটা ক্লান্তিতে ভেঙ্গে আসা হাঁটু জোড়া আবার সোজা করে আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল। কপালের ঘেমে যাওয়া চুলগুলো সরিয়ে সামনে তাকালাম কি এক আশায়। ভুল দেখছি, একদম ভুল। মরীচিকা ভেবে চোখ বুজে আবার খুললাম। না, লতাই তো। বাম গালে রক্ত জমে নীলচে কালশিটে। আর ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা ডান হাতটা গলায় ঝোলানো আর্ম স্লিংয়ের ভাঁজে।তাই নিয়ে ক্রাচে খুড়িয়ে যেন উল্কার বেগে ছুটে আসছে লতা। হাঁ হয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চল আমিও ধুমকেতু হয়ে ছুটলাম লতার দিকে। হুঁশই হয় নি যে, দুম করে একটা গল্ফ কার্টের সামনে চলে এসেছি। সজোর ধাক্কায় ছিটকে গিয়ে পড়লাম। তারপর ব্ল্যাকহোলে ব্ল্যাকআউট।

বৃষ্টির টুপটাপ ফোঁটাগুলো ক্রমশ বড় হতে থাকল। বন্ধ চোখেই হাত বাড়িয়ে ছাতাটা খুঁজলাম। কিন্তু রেশম নরম কি যেন ঠেকল। লতাদের ধড়িবাজ পারিবারিক বিড়াল কাঠমুন্ডু না তো? লেজ দিয়ে কান চুলকে দিচ্ছে নাকি? হ্যাঁচকা টান দিলাম বদমাশটার লেজ ধরে। কেউ উহ্ করে উঠল। মাথার উপর তীব্র আলো সয়ে নিয়ে পিটপিটিয়ে চেয়ে দেখি কোথায় কাঠমুন্ডুর ধুমসো লেজ? এ যে লতার আধ খোলা এলো বেনী। আর বৃষ্টিটা যে একজোড়া সবুজ মেঘের আকুল কারসাজি! মুহূর্ত পেরিয়ে গেলেও কথা সরলো না আমার। তারপর আরেক হ্যাঁচকা টানে লতার ভেজা মুখটা নামিয়ে আনলাম বুকের ওপর।

পাশার দানে হিসেব উল্টে গন্তব্য পাল্টে গেছে। কুড়িগ্রাম-বুড়িগ্রাম সব বাদ। আমরা যাচ্ছি টাঙ্গাইল। আমার বাড়ি। ঢাকা নেমে লতাদের টুকটাক চোট পাওয়া প্রায় অক্ষত দলকে বিদায় জানিয়ে সোজা বাস ধরব এখন। গাট্টাগোট্টা ছেলেটা লতার সাথে সেলফি তুলতে এসেছিল। দু’জনের মাঝে মাথা গলিয়ে সেটার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি।

অফিসে ইমেল লিখে পাঠিয়েছি, “কাম শার্প, মাদার সিরিয়াস” শুনে তড়িঘড়ি করে দেশে আসতে হয়েছে। ফিরতে দিন কয়েক। কথা তো মিথ্যা না। মাদার সিরিয়াস নেই, কিন্তু সিরিয়াস তো নির্ঘাত হবে খানিক বাদে। পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বিদেশী মেম নিয়ে উৎপাতের অপরাধে মা বাংলা সিনেমার কায়দায় পুরানো জুতা ছুড়ে মারছে।

আসন্ন জুতা বর্ষনের দুর্ভোগ ভাবতে ভাবতে আড়চোখে লতার দিকে তাকালাম। একটু আগে অনেক সাহস জড়ো করে গুঁজে দেয়া কাগজের টুকরোটা সে পড়েছে কিনা বোঝার উপায় নেই। লেখা ছিল ‘শার্লট স্নাইডার আহমেদ’ নামটা কেমন? উত্তরের থোড়াই না করে সোনালি চুলের লাজুক লতা রহস্যময় এক রুপালি হাসিতে শীতের সকালটা ভাসিয়ে দিল। এই মেয়েলি হেঁয়ালীর মানে আমি ধরতে পারছি না। অপমান অপমান লাগছে। আর পাঁচ মিনিটের ভেতর মন মতো উত্তর না পেলে হানিফ বাস থামিয়ে নেমে যাব। (সমাপ্ত)

-ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।
১৫.০২.২০১৯