পালকের মতো হালকা টাইটানিয়ামের ফোল্ডিং ক্রাচটা নেড়েচেড়ে দেখে লতার হাতে ফিরিয়ে দিলাম। সে এক ঝটকায় সেটা খুলে পরে নিল। নীলচে ধাতব ফ্যাশনেবল ক্রাচে লতাকে বায়োনিক ওম্যান বায়োনিক ওম্যান লাগছে। ঝকঝকে চেহারায় মন খারাপের চিহ্নমাত্র নেই। নিয়তিকে মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়ার জন্য লতাকে মেডেল দেওয়া উচিত। সেখানে লেখা থাকবে, ‘ফিনিক্স পাখির জন্য এক আকাশ ভালোবাসা।’ না না, ‘শুভেচ্ছা’; শুভেচ্ছাই ভালো। নিরীহ শব্দ। উল্টোপাল্টা কথা লিখে আবার ‘মেড ইন জার্মানি’ টাইটানিয়াম ক্রাচের আঘাতে বেঘোরে প্রাণ হারাবার ইচ্ছে নেই।

লতার এই চেহারার সঙ্গে সেদিনের চেহারা আকাশ আর পাতাল। আমি পঁচাত্তর ভাগ নিশ্চিত এই মেয়ের বাই পোলার গোছের অসুখ আছে। গত এক সপ্তাহ নাওয়াখাওয়া ছেড়ে একঘরে নিজেকে বন্দী করে রাখা লতার কাণ্ডকারখানায় অতিষ্ঠ হয়ে ফ্রাউ কেলনার খবর দিয়েছিলেন। চাপাচাপিতে গিয়েছিলাম বটে। কিন্তু লতার ঘরে শখানেক টোকা দেওয়ার পর লাভের লাভ যা হলো, সে দরজাটা সামান্য ফাঁক করে সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন ওজনের এক ডাক্তারি বই ছুড়ে মারল। চট করে মাথা সরিয়ে স্পট ডেড হওয়ার হাত থেকে বাঁচলাম। রণে ভঙ্গ দিয়ে কোনোমতে জান হাতে ফিরে আসতে হয়েছিল সেদিন।

তাই আজকে যখন সে নিজ থেকে দেখা করতে চাইল, তখন অবাকই হলাম। কিন্তু খুশিমনেই লাঞ্চের সময়টুকু তার জন্য বরাদ্দ রাখলাম। টাই খুলে ফাঁসমুক্ত হয়ে জ্যাক উলফস্কিনের স্পোর্টস জ্যাকেটটা চাপিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কাছের ক্যাফেটেরিয়ায় টুকটাক কিছু খেয়ে নিয়ে কাগজের কফি কাপ হাতে এগোচ্ছি দুজন। সামনের ট্রাম স্টেশনে লতাকে বিদায় জানিয়ে ফিরে যাব। এই লতাবিহীন সাতটা দিনকে মনে হয়েছে যেন সাত বছর। সে খবর কি কেউ রাখে? থাক, মামুলি খবর রাষ্ট্র করে কাজ নেই। তার চেয়ে লতার কথা শোনায় মন দিলাম। এই এক সপ্তাহ লতা নাকি ঘরে বসে নেট ঘেঁটে বিস্তর গবেষণা করে এই ক্রাচ খুঁজে বের করে আমাজন থেকে অর্ডার দিয়ে অপেক্ষায় ছিল। আজকে পার্সেল হাতে পৌঁছাতেই সে আড়মোড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছে। আগের হোৎকা বেঢপ ক্রাচে নাকি অসুখ অসুখ গন্ধ।

লতার চলার গতি এতই স্বাভাবিক যে বোঝাই যাচ্ছে না, ক্রাচের আশ্রয়ে চলছে তার এক পা। ভালো জিনিসই খুঁজে বের করেছে দেখা যাচ্ছে। উৎফুল্লচিত্তে মাথা নেড়ে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে কিশোরীর চপলতায় কথা বলে যাচ্ছে লতা। তার আনন্দটুকু আস্তে আস্তে আমার পুরো ভেতরটা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। সেটুকু লুকানোর প্রাণান্ত চেষ্টায় যখন অস্থির, তখন হঠাৎ কোথা থেকে বেয়াড়া বাতাস এসে লতার খোলা চুল উড়িয়ে এনে মুখের ওপর ফেলল। সোনালি রেশমের নরম ছোঁয়ায় আর ল্যাভেন্ডারের তীব্র ঘ্রাণে মুহূর্তেই মাতাল হয়ে টলে উঠলাম যেন। সব কেমন ঝাপসা দেখাচ্ছে। থমকে গিয়ে লম্বা একটা নিশ্বাস নিতে চাইলাম। লতা ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘অনীক, শরীর খারাপ লাগছে নাকি?’ ‘নাহ্ তো!’ সামলে নিতে নিতে হাতঘড়িটার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলাম।

সহজ হয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি যোগ করলাম, ‘তোমাদের যাওয়া কবে?’ লতা রহস্য করে বলল, ‘সেটা বললে কী দেবে?’ মনের কোণে হালকা আশা যে, লতা বলবে তার যাওয়া হচ্ছে না। কিন্তু তাজ্জব করে দিয়ে লতার উত্তর এল তারা এবারও বাংলাদেশ যাচ্ছে। সামনের সপ্তাহে। শেষ মুহূর্তে ওরা সিদ্ধান্ত বদলেছে। নতুন দেশে গিয়ে নতুন অভিজ্ঞতার দরকার নেই। বরং আগের অভিজ্ঞতা থাকায় বাংলাদেশে গিয়ে কাজটা সহজ হবে, এই যুক্তি তাদের।

জায়গাটার নাম ‘কারিগ্রাম’। লতা সাগ্রহে বলেই চলছে, ‘নামটা কারিগ্রাম কেন, সেখানে কি ভালো কারি পাওয়া যায়?’ আমি তখনো খবরটা হজম করে উঠতে পারিনি। তার মধ্যেই বললাম, ‘নামটা বোধ হয় কুড়িগ্রাম হবে।’ আর মনে মনে বাংলাদেশের মানচিত্র ঘেঁটে বের করার চেষ্টা করছি কুড়িগ্রামটা কোথায়। আহ্, পেয়েছি, কুড়িগ্রাম, রংপুর বিভাগ, উত্তরবঙ্গ। কিন্তু লতারা দল বেঁধে বাংলাদেশে গেলে আমি কী করব? আমার তো ছুটি মিলবে না এবার। তাই উদাস দৃষ্টি ছুড়ে দুপুরের নীল আকাশে ভেসে যাওয়া মেঘগুলোর ভেতর হাতি-ঘোড়া খুঁজতে লাগলাম। আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজে আর কী লাভ? তবুও নেহাত ভদ্রতা করে জানতে চাইলাম, ‘কত দিনের জন্য যাওয়া হচ্ছে?’ আমার নির্লিপ্ততায় আহত হয়েই কিনা জানি না, ছোট করে উত্তর এল, ‘তিন সপ্তাহ।’ তার মানে একুশ দিন?! তত দিনে মিউনিখের রাস্তায় কোনো একজনকে ডাঙায় তোলা মাছের মতো খাবি খেতে খেতে ঘুরতে দেখা যাবে।

লতাকেও আর বেশি কিছু বলতে শোনা গেল না। এর মানে কী ভেবে কুলাতে পারলাম না। আমার ছুটির কথা তো লতার জানার কথা। ট্রাম এসে গেছে। ট্রামকে এখানে বলে স্ট্রাসে বান। বায়োনিক ওম্যান ফ্রাউ শার্লট তার টাইটানিয়াম ক্রাচে ভর দিয়ে অবলীলায় তাতে চেপে বসল। ফুরিয়ে যাওয়া কফি কাপটা সামান্য তুলে তাকে বিদায় জানালাম। স্ট্রাসে বান বিন্দু হয়ে ছুটে চলল। নিখুঁত নিশানায় কাপটা ঝুড়িতে ছুড়ে অফিস বরাবর পা চালাব, কিন্তু শ্বাসকষ্টটা আবার পেয়ে বসল। ভারী উৎপাত তো! কোন অগোচরে কে যে কার নিশ্বাসের বাতাসটুকু কেড়ে নিয়ে পালায়, কে তা বলতে পারে?

পকেটে মুঠোফোনটা কেঁপে উঠে জানান দিল, হাওয়ায় উড়ে ছোট্ট একটা চিঠি এসেছে। আঙুলের স্পর্শে মেলে ধরে দেখি তাতে লেখা, ‘শনিবারে ফ্লাইট। এয়ারপোর্ট অবধি কি পৌঁছে দেওয়া যায়?’ ঠোঁটের কোণে অব্যক্ত হাসি ফুটিয়ে লিখে দিলাম, ‘জো হুকুম, মহারানি!’ তারপর আরও একটা লাইন জুড়ে দিলাম। কী ভেবে আবার মুছেও দিলাম। বলা আর না বলা কথার চিঠি পায়ে বেঁধে উড়ে গেল অদৃশ্য শ্বেত পায়রাটা।

দেখতে দেখতে শনির পিঠে ভর করে শনিবার চলে এল। অফিস ছুটির দিন বলে সুবিধে হয়েছে। কিন্তু ইচ্ছেমতো তুষার পড়ে শহরের অবস্থা দফারফা। ছোট ছোট কমলা প্লাউ ট্রাকগুলো রাস্তার বরফ সরিয়ে কুল পাচ্ছে না। ফ্রাউ কেলনারের গাড়ি করে লতাকে নিয়ে এসেছি। গাড়িতে দুই নারী প্রচুর কথা বলে মাথা ধরিয়ে দিয়েছে। সাবধানে চালাতে গিয়ে শিরা দপদপ করছে রীতিমতো। সুবিধামতো পার্ক করে টার্মিনাল ১-এ ঢুকে দেখি লতাদের দলটা জন্ডিস রঙের কটকটে জ্যাকেট পরে ভিড় করে দাঁড়িয়ে। হলুদ জ্যাকেটের বুকে বড় বড় করে লেখা ‘অ্যার্জটে ওনে গ্রেনজেন’। মানে ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস। লাগেজ ড্রপ আর চেক-ইন করবে বলে লতা তাদের সঙ্গে চলে গেল। বলে গেল, আবার এসে বিদায় নিয়ে যাবে।

ফ্রাউ কেলনারের জন্য দৌড়ে গিয়ে ডোনাট আর আইস টি নিয়ে আসতে হয়েছে। এই শীতে কেউ আইস টি খেতে পারে জানা ছিল না। চুকচুক করে আইস টি খেতে খেতে ভদ্রমহিলা বকবক করেই চলছেন, বেশিক্ষণ না খেয়ে থাকলে নাকি তার সুগার কমে গিয়ে মাথা ঘোরে, হ্যানো ত্যানো কী সব। হঠাৎ বলে বসলেন, ‘তোমরা কয় ভাইবোন, অনীক?’ ফ্রাউ কেলনারের লো সুগারের সঙ্গে আমার ভাইবোনের কী সম্পর্ক বুঝলাম না। তা–ও বললাম, বড় তিন বোন, আর সবার ছোট আমি। কেন বলুন তো?’ ফ্রাউ কেলনার লতারা যেদিকে গিয়েছে সেদিকে ইশারা করে দুষ্টুমি হাসি হেসে বললেন, ‘এ জন্যই কি তুমি এত সেনসিটিভ?’ প্রায় এক হালি বোন থাকলে যে লোকে সেনসিটিভ হয়ে যায়, এই তথ্য উনি কোথায় পেলেন? ধুৎ, কী সব হাতির মাথা, ব্যাঙের ছাতা মার্কা কথাবার্তা। বিরক্ত হয়ে বিড়ি ধরানো ভঙ্গিতে ঠোঁটে দুই আঙুল চেপে ধরে উঠে দাঁড়ালাম লতার ফিরে আসার অপেক্ষায়।

লতা দলছুট হয়ে তাড়াহুড়া করে ছুটে আসছে। হাতে বেশি সময় নেই আর। তার গায়েও জন্ডিস জ্যাকেট। আর লাল কোট হাতে ধরা। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, এটা বেশি ভারী হবে, গায়েরটা দিয়েই চলবে। বঙ্গদেশের শীতের দৌড় তার জানা আছে। রোবটের মতো হাত বাড়িয়ে লতার কোটটা নিলাম। হায়, কে কার দেশে যাচ্ছে আর কে কার দেশে পড়ে থাকছে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল। লতাও দেখি ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। লতার এই কথাবিহীন খেলাটা আমি জানি। কিন্তু আজকে সে সেই খেলায় গেল না। মুখ ফুটে বলে বসল, ‘আচ্ছা, তাহলে, আসি।’ ভাঙাচোরা হাসি ফুটিয়ে শুধু বলতে পারলাম, ‘হুমম্…’। লতার ফোন বেজে উঠতে এক পাশে সরে গিয়ে বাঁচলাম।

ম্যাক্স আর মায়ের সঙ্গে দুই কথা সেরে লতা পায়ে-পায়ে এদিকেই এগিয়ে এল। আসতে থাকল, আসতেই থাকল। তার চোখে গভীর দুরভিসন্ধি। বেগতিক দেখে এক পা, দু পা করে পেছোতে থাকলাম। এ কোন বিপদ! এমন সময় মুশকিল আসান হয়ে ফ্রাউ কেলনার এসে সামনে দাঁড়ালেন। জানে পানি ফিরে পেলাম। লতা অগ্নিদৃষ্টি হেনে আমাকে ভস্ম করে দিয়ে ফ্রাউ কেলনারের সঙ্গে কিচিরমিচির কী সব বলে উঠল। আমিও যেচে পড়ে মুখস্থ আওড়ে গেলাম, ‘ভালো থাকা হয় যেন, মজার মজার ছবি তুলে পাঠানো হয় যেন, ইত্যাদি ইত্যাদি’। আসল কথা, এখান থেকে বেরোতে পারলে হয় এখন। ছটফট লাগছে। হাত ঘামছে।

অস্বস্তিকর বিদায়পর্ব শেষ হলো অবশেষে। মনেপ্রাণে চাইছি লতা যেন একবারও পেছন ফিরে না তাকায়। তাকালেই জারিজুরি ফাঁস। তার ওপর ফ্রাউ কেলনার আজকে জহুরির চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন আমাকে। কিন্তু ভোগান্তির আরও বাকি ছিল। টার্মিনালের পার্কিং থেকে গাড়ি বের করে মিনিট দশেক পর একটা বিরতি না নিয়ে আর পারা যাচ্ছিল না। ওয়াইপার চলছে ডানে–বাঁয়ে। তবুও উইন্ডশিল্ড অস্পষ্ট আর ঝাপসা লাগছিল। বুঝলাম, সমস্যাটা ওয়াইপারের না। অন্য কোথাও। এক পাশে গাড়ি থামিয়ে ফ্রাউ কেলনারকে ‘আসছি একটু’ বলে নেমে পড়লাম। আজকে শূন্যে মিলিয়ে যেতে পারলে ভালো লাগত। ‘এই অনীক, দেরি হচ্ছে যে। গাছে পানি দিচ্ছ নাকি?’ কথার বাহার দেখে চিলিক দিয়ে মাথায় রক্ত উঠে গেল। আমি বাঁচি না আমার জ্বালায়, আর উনি মজা লুটছেন। জোর করে বাষ্পটা গিলে ফেলে সেনসিটিভিটির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে করতে গাড়িতে এসে বসলাম। সাঁই শব্দে মাথা বের করে তাকালাম। দেখলাম, অতিকায় ধাতব রাজহাঁসটা তার অ্যালুমিনিয়ামের ডানায় উড়িয়ে নিয়ে গেল লতাকে। (চলবে)

ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: মিউনিখ, জার্মানি।