“জার্মান শেখার জন্য একজীবন খুবই অল্প সময়।”

প্রখ্যাত আইরিশ সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড তার জার্মান ভাষা শেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছিলেন এভাবেই।
একথা যে কতোটা সত্য তা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছি জার্মানি আসার পর। 

জার্মানিতে থেকে ঠিকঠাক জার্মান না জানাটা এক বিশাল বিড়ম্বনা। একমাত্র ইউনিভার্সিটি ছাড়া এই বিড়ম্বনা আমার সঙ্গী সর্বত্র।ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি দিয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়। ওখানে প্রফেসর, স্টুডেন্টস বা অফিসিয়ালস সবার কমবেশি ইংরেজির দখল আছে।যদিও জার্মানদের ইংরেজি ভাষার দক্ষতা ফ্রেঞ্চ,ইটালিয়ান বা স্পেনিশদের চেয়েও ঢের বেশি তবুও জার্মান জানা ছাড়া জার্মানিতে সব কিছু ঠিকমতো চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্যই বটে।জার্মান ভাষায় একটা কথা আছে- “ইশ ফারস্টেয়া নুর বানহফ” যার অর্থ আমার জার্মান জ্ঞান রেলস্টেশন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, এর বেশি আর কিছু বুঝি না। আমার অবস্থা আসলে এর চেয়েও ভয়াবহ।জার্মান ভাষায় দেয়া রেলস্টেশনের ঘোষণা গুলোরও কিছুই বুঝা হয় না আমার।

“ইশ স্প্রেশে কাইন ডয়েচ,” “স্প্রেশেন জি ইংলিশ?” আমি জার্মান জানি না,আপনি কি ইংরেজি বলতে পারেন? দুটোমাত্র জার্মান বাক্য শিখে চালিয়ে দিয়েছি গত সাত মাস। জবাবে হাসিমুখে বেশিরভাগ জার্মানই উত্তর দিয়েছে-” ইয়া। ইশ স্প্রেশে আইন বিসিয়েন ইংলিশ।” যার অর্থ হ্যাঁ, আমি অল্পবিস্তর ইংরেজি জানি।এখানেই জার্মানদের বিনয়ের আরেকটা প্রমাণ পাওয়া যায়। যতো ভালো ইংরেজিই জানুক না কেন ওরা সবসময় এই আইন বিসিয়েন বা অল্প কথাটা ব্যবহার করবেই।কিন্তু ঝামেলা হয়েছে যখন এই মাসে পার্ট-টাইম জব করতে অ্যামাজনে আসলাম।এখানে
“স্প্রেশেন জি ইংলিশ?” এর জবাবে সবাই নিরস মুখে জবাব দেয়- “নাইন। কাইন ইংলিশ। ”

নো, নো ইংলিশ।অনলি জার্মান। আমার অবস্থা এখানে তাই পানি ছাড়া মাছের মতো হয়েছে। এখানে এসে অনুধাবন করতে পেরেছি জার্মান ছাড়া জার্মানিতে আমি কতোটা অসহায়।

অজ্ঞতার মাঝে কোনো অর্জন না থাকলেও তা সবসময় অভিশাপ না। আমার নামের শেষে খান দেখে এক জার্মান কলিগ সেদিন যেনো চমকে উঠলো।খানদের নাকি সে চিনে।শাহরুখ খানকে তো সে খুব ভালোভাবেই চিনে।শাহরুখ খানের নাম বলেই সে সাথে যোগ করে দিলো ওই যে ‘বোলে চুরিয়া’র শাহরুখ খান।
আমি বললাম- “হ্যাঁ। শাহরুখ খানকে চিনবো না? আমিও তো তাঁর ফ্যান।”
এ কথা শুনে তার যেনো বিশ্বাসই হচ্ছিলো না।চোখ বড় বড় করে সে জিজ্ঞেস করলো সত্যি? আমি বললাম- “হ্যাঁ। বোলে চুরিয়া, বোলে কাঙ্গানার শাহরুখ খান।”

কিছুক্ষণ পর ওই জার্মান আরেক টার্কিশকে নিয়ে আমার ওখানে হাজির। আমাকে দেখিয়ে সে হাসিমুখে ওই টার্কিশকে বলছিলো যে দেখো ও শাহরুখ খানকে চিনে। আমি তখনো বুঝছিলাম না একজন বাংলাদেশীর শাহরুখ খানকে চেনার মধ্যে কি বিশেষত্ব আছে। বুঝতে পারলাম তখনি যখন ওই টার্কিশ উত্তেজনা নিয়ে আমাকে ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলো-
“সত্যি? শাহরুখ খান তোমার ফ্যামিলি মেম্বার? শাহরুখ কি তোমার আংকেল হয়?”

একগাল হেসে তখন মনে মনে ভাবলাম- জার্মান ভাষার অজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত আমাকে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও শাহরুখ খানের ফ্যামিলি মেম্বার বানিয়ে দিলো। জার্মান শিখে তাহলে আর কি হবে?