জার্মানের মাটিতে পা দিয়েছি আজ ৬৩ দিন। অভিজ্ঞতার ঝুলিতে বেশ কিছু অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে,স্বভাবতই আজকে লিখার সুযোগ পেয়ে খানিকটা উগড়ে দিচ্ছি। 🙂
জার্মানিতে এসে কোন জিনিস ভালো লেগেছে কেউ জানতে চাইলে আমার উত্তর হবে- এদের ট্রাফিক সিস্টেম। বাস,ট্রেইন,ট্রাম সবকিছু ঘড়ি ধরে সময় মতো ছুটে চলছে। যানজটের ঝক্কি নাই,রাস্তা পার হওয়া নিয়ে ভয় নাই। কোথাও যেতে চাইলে কিভাবে যাবেন,গুগল এ্যাপ আপনাকে সহজ মাধ্যম বলে দিচ্ছে। অসুবিধা হলো এখানকার বাসগুলো হাল্টেশটেলে (স্টপেজ) ছাড়া মধ্যি পথে থামেনা। ক্লাস থেকে বাসায় ফেরার পথে বাস যখন আমার বাসা ক্রস করে আরো সামনের দিকে এগিয়ে যায়, মনে হয় চিল্লায়া বলি ‘ওই মামা রাইখা যান,বাসার সামনে আইসা পরসি’। বলা হয়ে উঠে না। দেশকে বড্ড মিস করি তখন। আবার ধরেন ,আপনার কোনো ডয়েশ লোকের উপর বেজায় ক্ষোভ,শাস্তি দিতে পারলে শান্তি লাগতো। আমি বাজি রেখে বলতে পারি আপনার তখন মন চাইবে ওই ব্যাটাকে বাংলাদেশে নিয়ে আজিমপুর ছেড়ে দিতে। বেশি দূর না,আজিম্পুর টু এয়ারপোর্ট বাসে চড়লেই ব্যাটার শাস্তি হয়ে যাবে। 😀

Bavaria, Mountain biking in the Alps

যদি জানতে চান জার্মানির কোন দিক আমার অপছন্দের-আমি একা কেন,যে কেউ বলবে এখানকার আবহাওয়ার কথা। এই বৃষ্টি,এই রোদ,তো খানিক পরেই আবার তুষারপাত! বৃষ্টির কথা শুনে খুশি হয়ে লাভ নাই। এখানকার বৃষ্টি আমাদের দেশের মতো না। কখনো আপনার ইচ্ছে করতেই পারে- ঝুম বৃষ্টিতে চুলগুলি পিঠে মেলে দুই হাত প্রসারিত করে বৃষ্টিতে ভিজবেন। অথবা ইচ্ছে করতে পারে বারান্দায় বসে আরামসে চেয়ারে গা এলিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বৃষ্টি দেখবেন কিংবা রিক্সার হুড তুলে ভেজা শহরময় ঘুরে বেড়াবেন। এখানে রিকশা নাই,ঝুম বৃষ্টিও নাই। :'( এ ধরনের ফ্যান্টাসি থাকলে সযত্নে সেসব বাক্সবন্দী করে এদেশে আসতে হবে।
এবার একটু ভিন্ন প্রসংগ নিয়ে কথা বলি- ছোট্ট একটা দেশ ‘বাংলাদেশ’ সম্পর্কে এদেশের মানুষের জ্ঞানের পরিধি নিতান্তই কম। আপনি/আপনার জাতীয়তা/আপনার উৎসব এসবের সাথে এদেশের মানুষকে পরিচয় করানোর দায়িত্ব সম্পূর্ন আপনার। ডয়েশদের কোন দায় পড়ে নাই যেচে এসে আপনার দেশ সম্পর্কে জানার। ইন্ডিয়ানদের সাথে আমাদের গাত্র বর্ন,চেহারা, উচ্চতাগত মিল থাকায় এরা ৯৫% ক্ষেত্রে আমাদের ইন্ডিয়ান মনে করে। যেদিন আমি A2 কোর্সে ভর্তি হতে গেলাম,ভর্তি শেষে আমাকে বিদায় জানানো হলো এভাবে- bye, tschüss und namaste! আমি কিছু বলার সুযোগ নেয়ার আগেই ভদ্রমহিলা উঠে কোথাও চলে গেলেন। এখানকার ইন্ডিয়ানগুলাও এক কাঠি সরস। তারা বাংলাদেশীদের কাছ থেকে প্রত্যাশা করে আমরা তাদের ভাষা জানবো এবং সে ভাষায় কথাও বলবে ওদের সাথে! ল্যাংগুয়েজ ক্লাসে এক ইন্ডিয়ান আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলো আমি তাদের ট্রেডিশনাল কাইট ফেস্টিভ সম্পর্কে জানি কিনা। পারতপক্ষে আমি হিন্দি গান শোনা ছাড়া আর কিছুই জানিনা। এমনকি ভাষাও না। যাই হোক,গত পরশু ল্যাংগুয়েজ ক্লাসে পাঁচ মিনিটের একটা প্রেজেন্টেশন ছিল নিজ,পরিবার এবং দেশ সম্পর্কে বলার। সবাই যখন পরিবার সম্পর্কে বলতে বলতে পাঁচ মিনিট পার করে দিচ্ছিল আমি তখন ভাবছি পাঁচ মিনিটে আমি আমার দেশ সম্পর্কে কতটুকু কাভার করতে পারবো। আবার ভাবলাম আগে শুরু তো করি!! বললাম আমার দেশের সি বিচ,ম্যাংনগ্রোভ ফরেস্টের কথা,আরো বললাম বৈশাখ,শাড়ি,পাঞ্জাবির কথা। প্রেজেন্টেশন এর আগের দিন মিউনিখে বাঙলা বর্ষবরন অনুষ্ঠান ছিল,ক্লাসের সবাইকে দেখালাম সেইসব ছবি। সবাই বেশ উচ্ছাস নিয়ে দেখছিলো। ইউটিউব থেকে শুনালাম ‘এসো হে বৈশাখ’ গান। এরপর যখন বুকে হাত দিয়ে বলছিলাম ‘Ich glaube meine mutter sprache ist sehr schöner denn deutsch’. কি যে অদ্ভুত অনুভুতি হচ্ছিল! সবাই তখন শুনতে চাচ্ছিল আমার বাংলা ভাষা! ich liebe dich & willkommem এর বাংলা বোর্ডে লিখে দেখালাম,উচ্চারন করলাম। আর শিখালাম তাদের দেশের aber আমাদের দেশে nochmal. ক্লাসটিচার তখন বারংবার ‘আবার’ শব্দটা আওড়াতে আওড়াতে বলে উঠলেন ‘I can speak bangla now’. আহ, সেই মুহুর্ত!!! 🙂 আমার শান্তি এটাই,আমি অন্তত দশটা মানুষের কাছে আমার দেশকে পরিচয় করিয়ে দিতে পেরেছি।

Waldsassen, Pilgrimage Church of the Holy Trinity with a dusting of snow

ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে শেষ করবো,বাসে করে বাসায় যাচ্ছিলাম। সামনের সিটে এক ইন্ডিয়ান বালক আয়েশ করে কচ কচ করে পেয়ারা চিবুচ্ছে। এক বৃদ্ধা বলে উঠলো- ‘keep quiet when u r eating. u r making sound, this is not normal in Germany’. সুবোধ বালক খাওয়া ছেড়ে মাথা নিচু করে আছে,মায়া হচ্ছিল বেচারার জন্য। আর বৃদ্ধার চেহারা দেখে অভিব্যক্তি বুঝার চেষ্টা করছিলাম। মনে হলো এসব উটকো ঝামেলা তার দেশে চলে আসায় বৃদ্ধা যারপনারই বিরক্ত। আমার নিজেকে নিজের কাছে ওই সময় আগাছা,পরগাছা টাইপ কিছু একটা মনে হচ্ছিল। শেষ ঘটনার সারমর্ম: আপনার দেশকে রিপ্রেজেন্ট করছেন আপনি। কাজেই এমন কিছু করবেন না যাতে করে দেশের সম্মানহানী হয়।

আরো পড়তে পারেনঃ