নরওয়ে

নরওয়ে

কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে বিশ্বব্যাপী মানব বন্ধন
আজ ৭ জানুয়ারী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো বাংলাদেশী প্রায় ২৫ টির বেশী ভাষায় ‘আমার জীবন সুন্দরবন, কয়লা হতে দেব না’ ,‘Yes to Life, No to Coal, Save Sundarban’ স্লোগানে কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ প্রদর্শন এবং মানব বন্ধন করে।

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো যখন সম্মিলিত ভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ও ক্লিন এনার্জি নিয়ে নানারকম পদক্ষেপ নিচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের কার্বন বা কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এর মত আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভাবমুর্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
তাই এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সচেতন মানুষ নানারকম প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে । আজ প্রবাসী বাংলাদেশীদের পক্ষ থেকে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল এবং সুন্দরবন রক্ষার জন্য সংহতি জানিয়ে পৃথিবীর প্রায় বিভিন্ন দেশে সামনে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। এ সময় দেশে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে সংহতি জানান বক্তারা। বিক্ষোভ সমাবেশে এবারের স্লোগান ছিল ‘আমার জীবন সুন্দরবন, কয়লা হতে দেব না’ ,‘Yes to Life, No to Coal, Save Sundarban। স্লোগানটি সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইংরেজি ছাড়াও জার্মান , ফ্রেঞ্চ , ইটালিয়ান, স্পানিশ, পর্তুগীজ, চাইনিজ, টার্কিশ, হিন্দি, কোরিয়ান, বসনিয়ানসহ প্রায় ২৫ টির মত ভাষায় পৃথিবীর germany-2

সুন্দরবন রক্ষা’র দাবিতে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মেলবোর্নে বিক্ষোভ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান শাকিল, মেলবোর্ন,অস্ট্রেলিয়া থেকে শনিবার, ৭ই জানুয়ারী, ২০১৭ সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। স্থানীয় সময় সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত মেলবোর্নের প্রাণকেন্দ্র ফেডারেশন স্কয়ারে এ বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের বিরোধিতা করেন। এ ধরনের প্রকল্পের ফলে সুন্দরবনের আশপাশের প্রাণ-প্রকৃতি কিভাবে হুমকির মুখে পড়বে, তা যুক্তিসহ তুলে ধরেন প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীরা। বক্তারা সরকারকে সব হীন স্বার্থ থেকে মুক্ত হয়ে দেশের মানুষের স্বার্থে জনবিরোধী ও হঠকারী এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান। এ সময় দেশে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলনে সংহতি জানান বক্তারা। বিক্ষোভ সমাবেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ‘সেভ সুন্দরবন, স্টপ রামপাল’, ‘সুন্দরবন ধ্বংস করে বিদ্যুৎকেন্দ্র চাই না’, 'Yes to Life, No to Coal, Save Sundarbans' ইত্যাদি লেখা প্লাকার্ড ও ব্যানার নিয়ে আসেন । এর আগে গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীরা বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি জমা দেন এবং অস্ট্রেলিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিসে হাইকমিশনারের কাছেও স্মারকলিপি প্রদান করেন। আজকের প্রতিবাদ তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির পক্ষ থেকে ঘোষিত গ্লোবাল প্রোটেস্ট ডে এর অংশ; এদিন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের বেশ কিছু শহরে রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। পৃথিবীর নানা দেশে বসবাসরত সচেতন প্রবাসীরা বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ বিধ্বংসী এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে নানা কর্মসূচী পালন করছেন। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো সম্মিলিতভাবে কার্বন নিঃসরণ কমাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে ও ক্লিন এনার্জি নিয়ে নানারকম পদক্ষেপ নিচ্ছে। ইউনেস্কো এর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ঘোষিত বনাঞ্চল সুন্দরবনের পাশে কার্বন বা কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ করে, এবং এদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জীবনের উপরে সরাসরি হুমকি নিয়ে আসে। বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রবাসীদের প্রত্যাশা, এই আত্মঘাতী কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল করে দেশে সম্ভাবনাময় ক্লিন এনার্জি ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে যুগোপযোগী ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে মানব কল্যাণকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। মেলবোর্নের এই প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান শাকিল, সিদ্দিকুর রহমান, জালাল আহমেদ রিফাত, সাদীয়া দীন, নাদিয়া দীন, আশরাফুল আলম, তাহমিনা আখতার, শেখ হাফিজুর রহমান, রাজীবুল ইসলাম ও আরো অনেক সচেতন প্রবাসী বাংলাদেশি। তারা পরবর্তীতে রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তেল, গ্যাস ও বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির সাথে সংহতি প্রকাশ করে আন্দোলন ও প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

সুন্দরবন রক্ষা’র দাবিতে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মেলবোর্নে বিক্ষোভ

সুন্দরবনের পাশে রামপালে কয়লাভিত্তি

pবিভিন্ন প্রান্তে প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতিবাদ কর্মসুচিতে ব্যানার ও প্লাকার্ড এ শোভা পায়।

সুন্দরবন এর কয়লা বিদ্যুৎ এর নেতিবাচক দিক নিয়ে জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা পত্রের রিপোর্টঃ

ছবিটি সুন্দরবনের ২০০০-১০ সালের ট্রি কভার পরিবর্তনের ছবি, যেখানে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের দিকের সুন্দরবনের অবস্থা ভারতের চেয়ে অনেক বেশি খারাপ। বিশেষ করে ব্লক ০২, ১০, ১২, ১৫ এবং ৩৫ এ অবস্থা শোচনীয়। এই ব্লকগুলোর পাশ দিয়েই শেলা এবং পশুর নদী বহমান, যেখান দিয়ে তেল, কয়লা বা অন্যান্য আমদানিকৃত জিনিসবাহী কার্গো শিপ চলাচল করে। চলার সময় এই শিপগুলো থেকে ক্রমাগত তেল দূষিত পানি বের হতে থাকে। এই অল্প পরিমাণ তেলই ম্যানগ্রোভের কাদায় জমা হয় এবং পরে আস্তে আস্তে নদীর জোয়ার ভাটার মাধ্যমে জঙ্গলের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তেল দূষণ বাদেও আমরা আরও কিছু প্রাকৃতিক (স্যালাইনিটি, সাইক্লোন) এবং মানবসৃষ্ট কারণ (তেল দূষণ, আগুন) যেগুলো এই ক্ষতির জন্য দায়ী।রামপাল প্রকল্পের জন্য বছরে ৪০০-৫০০ ট্রিপ দিতে হবে জাহাজগুলোর। দূর্ঘটনা বাদেই এসব জাহাজ থেকে ক্রমাগত যে তেল, দুষিত পানি পড়তে থাকে তাতেই সুন্দরবন অনেক বেশী ঝূকির মধ্যে পড়বে।এছাড়া শব্দদূষণ তো থাকবেই, (আসিফ ইশতিয়াক, ২০১৬)

প্রথম বারের মত বিশ্বনেতারা ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলনে (ডিসেম্বর, ২০১৫) চুক্তি সাক্ষর করে যে তারা বিশ্ব তাপমাত্রা কমাতে কার্বন নিঃসরণ কমাবে । সেই লক্ষে তারা জীবাশ্ম জালানী যেমন ঃ তেল, কয়লা যুগ এর অবসান এর মাধ্যমে ক্লিন এনার্জি বা পরিবেশ বান্ধব টেকসই উন্নয়নে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন কারি দেশগুলোও চুক্তিতে সাক্ষর করে।বাংলাদেশ সেই জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫০ টি দেশের নেতারা সেই চুক্তিতে সাক্ষর করে। সেখানে বাংলাদেশের কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উতপাদন ফ্রান্সের এই ঐতিহাসিক জলবায়ু সম্মেলনে চুক্তির বিপক্ষে।কেননা কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাতাসে কার্বন নিঃসরণ বাড়াবে যেটা সরাসরি গ্রিন হাউজ এফেক্ট এর জন্য দায়ী এবং সেটা পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা বৃদ্ধির ধনাত্মক নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। ফলে বাংলাদেশের খুব কাছেই হিমালয় এর বরফ গলা পানি বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার নিচু অংশগুলোকে বন্যা ও লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়বে ।

জলবায়ু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উন্নত দেশ গুলো উন্নয়নশীল দেশকে রিনিউয়েবল এনার্জি যেমন সোলার বিদ্যুৎ,পানিবিদ্যুৎ, উইন্ডমিল ইত্যাদি থেকে ক্লিন এনার্জি উৎপাদনে ১০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার চুক্তি করে, এছাড়া ক্লিন এনার্জি উৎপাদনের বিনিয়গে ২৭০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এর কথা বলে কিন্তু ইতিমধ্যে জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলের (জিসিএফ) নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে যে পরিষদ, সেই পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ হারিয়েছে বাংলাদেশ।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম সবার ওপরে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী উন্নত দেশগুলো—বিশ্বে ক্রমেই যখন এ দাবি প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, ঠিক তখন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলের (জিসিএফ) নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে যে পরিষদ, সেই পরিষদের স্থায়ী সদস্য পদ হারায়।যেটা পরবর্তিতে বিশ্বব্যাপী যে সাড়ে ছয় মিলিয়ন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশিদের প্রবেশ বাধাগ্রস্থ করবে।

বাংলাদেশ সরকারের কাছে প্রত্যাশা এই আত্মঘাটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের জনগনের আর বড় ধরনের ক্ষতির আগে বাতিল করে দেশে সম্ভাবনাময় ক্লিন এনার্জি ও পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ প্রকল্প সেই সাথে টেকসই উন্নয়ন নিয়ে যুগোপযুগি ও মানব কল্যাণ কর পদক্ষেপ নেওয়া ।

রাশা বিনতে মহিউদ্দীন
লেখক, পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অফ হোয়েনহেইম জার্মানী।


সুত্রঃ
১। বিজ্ঞান গবেষনাপ্ত্র ২০১৬
Asif Ishtiaque, PhD student in School of Geographical Sciences and Urban Planning, Arizona State University, USA
Examining the ecosystem health and sustainability of the world’s largest mangrove forest using multi-temporal MODIS, Science of the Total Environment, 569–570 (2016) 1241–1254
https\://www.researchgate.net/publication/304815340

২। COP21 (n.d.) United Nations conference on climate change. Learn act follow. Available at: http\://www.cop21.gouv.fr/en/

৩। বাংলাদেশের স্থায়ী সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছে।
লিংক ঃ http\://www.kalerkantho.com/print-edition/…/2016/12/18/442024

http://greenwatchbd.com/demonstration-held-globally-against-coal-fired-power-plant/