বাংলাদেশে অমুক অফিস, তমুক ব্যাংক, এমব্যাসি, বিভিন্ন স্থানে ছুটাছুটি করে অনেক কষ্টে জার্মান ভিসা হাসিল করে আপনি জার্মানি পৌঁছালেন। পরিবার পরিজন ছেড়ে এত দূরে এসে আপনি কই নিজেকে একটু গুছিয়ে নিবেন, তা না, আপনার মাথায় আরও হাজার কাজের চিন্তা এসে জমা হবে। এই কাজ গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে

১) সিটি/এড্রেস রেজিস্ট্রেশন

২) ব্যাংক একাউন্ট এক্টিভেশন

৩) ইন্স্যুরেন্স (জার্মানিতে আসার পরে করা নতুন ইন্সুরেন্স)

৪) ইউনিভার্সিটি এনরলমেন্ট (immatrikulationsbescheinigung এই সার্টিফিকেটের নাম)

৫) সেমিস্টার ফি ট্রান্সফার করা (যদি দেয়া লাগে)

৬) ভিসার মেয়াদ বাড়ানো/ রেসিডেন্স পারমিট নেয়া।

আপনি যে ইউনিভার্সিটিতে আসছেন, তারাই সাধারনত সেমিস্টার শুরুর আগে/ আপনি জার্মানি আসার আগে আপনাকে জানিয়ে দেয় যে আপনাকে জার্মানি পৌঁছে এই কাজগুলো করতে হবে। সবার ক্ষেত্রেই কাজ গুলো উপরের ক্রমানুসারে লিপিবদ্ধ থাকে।

সিটি/এড্রেস রেজিস্ট্রেশন এর জন্য সাধারনত ইউনিভার্সিটি থেকে একজন স্টুডেন্ট টিউটর আগেই যোগাযোগ করে আপনার জন্য এপয়েন্টমেন্ট এর ব্যবস্থা করে রাখে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে আপনার জন্য যে এপয়ন্টমেন্ট নেয়া হয়েছে তা আপনার ইউনিভার্সিটি এনরলমেন্ট ডেডলাইন এর অনেক পরে। এটা দেখেই আপনি যার-পর নাই ভিত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বেন। কারন ইউনিভার্সিটি আপনাকে যে দিক-নির্দেশনা দিয়েছে তাতে দেখা যাবে যে আপনার সিটি/এড্রেস রেজিস্ট্রেশন ছাড়া ব্যাংক একাউন্ট এক্টিভ করা বা ইন্স্যুরেন্স কুনো কিছুই করা সম্ভব না। আর মাঝখানের ডকুমেন্ট গুলো ছাড়া আপনি এনরলমেন্ট ও করতে পারবেন না। তাহলে এখন আপনি কি করবেন। এত কষ্টের ভিসা, জার্মানি এসে কি ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হতেই পারবেন না!

আসলে, এসব কিছুই না! আপনি আসার পরে দেখবেন আপনি নিজেই সবকিছু অতি সহজভাবে করতে পারছেন।

১) সিটি/এড্রেস রেজিস্ট্রেশনঃ আপনি জার্মানি পৌছার পর প্রথম এডমিনিস্ট্রেটিভ কাজ হল সিটি/এড্রেস রেজিস্ট্রেশন। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তার জন্য যে এপয়েন্টমেন্ট নেয়া আছে তা ইউনিভার্সিটি এনরলমেন্ট ডেডলাইন এর অনেক পরে। এই তারিখ দেখে ভয় না পেয়ে আপনি টিউটর কে ইমেইল করুন (আমি তাইকরেছিলাম), তার কাছে জানতে চান যে আপনার এনরলমেন্ট ডেডলাইন এর আগে কুনো স্লট খালি আছে কি না? যদি না থাকে ইন্টারনেটে নিকটস্থ Rathaus এর অবস্থান এবং কার্যদিবস দেখে চলে যান। বেশিরভাগ Rathaus এর কাজ শুরু হয় সকাল ০৭ঃ০০- ০৮ঃ০০ ঘটিকার মধ্যে। আপনাকে যা করতেহবে, তা হল, আপনি সকাল ০৬ঃ৩০ এর মধ্যে গিয়ে এপয়ন্টমেন্ট নেয়ার লাইন এ দাড়াবেন। ০৭ঃ০০ থেকে এপয়ন্টমেন্ট দেয়া শুরু হবে এবং আপনার সিরিয়াল এলে অফিসার আপনাকে বলবে যে আপনার অনলাইন এপয়েন্টমেন্ট নেয়া হয় নি। তখন আপনি যদি আপনার এনরলমেন্ট ডেডলাইনের কথা তাকে বলেন তখন সে আর কুনো কথা না বলে আপনাকে একটা সিরিয়াল দিয়ে দিবে। ব্যাস, সিরিয়াল পেয়ে গেলে আপনাকে আর ঠেকায় কে? বসে থেকে নিজের এড্রেস রেজিস্ট্রেশন করে চলে আসবেন। তবে যাওয়ার সময় অবশ্যই আপনি যে ঠিকানায় অবস্থান করছেন সেখানকার কন্ট্রাক্ট পেপার, এড্রেস রেজিস্ট্রেশন এর ফর্ম (পূরন করে), আপনার পাসপোর্ট এবং ফিস বাবত ১১ ইউরো নিয়ে যাবেন। কুনো ছবে নেয়ার দরকার নেই।

২) ব্যাংক একাউন্ট এক্টিভেশনঃ এড্রেস রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে অথবা না করা গেলেও আপনি ব্যাংক এ চলে যাবেন। সাথে করে আপনার একাউন্ট নাম্বার, ঠিকানা এবং পাসপোর্ট খানা নিলেই চলবে। ব্যাংকের অফিসার আপনার একাউন্ট নাম্বার আর পাসপোর্ট দেখে সব কাজ করে আপনাকে সই করার জন্য একটি কাগজ দিবে। সেই কাগজের সব তথ্য ভাল করে পড়ে তারপর সই করবেন। ভুল থাকলে বলবেন, ঠিক করে নতুন কাগজ দিবে। এই কাজ করলেই আপনার ব্যাংক একাউন্ট এক্টিভ! এর পরে বাসায় এসে বসে থাকবেন। ব্যাংক থেকে একের পর এক কাগজ-পত্র (অনলাইন পিন, ডেবিট কার্ড, ডেবিট কার্ড পিন, ট্যান) আপনার লেটারবক্স এ জমা হতে থাকবে।

৩) ইন্সুরেন্সঃ জার্মানিতে আসার পর কে কুন ইন্সুরেন্স কোম্পানির ইন্সুরেন্স নিবেন তা সম্পুর্ণ নিজের বিবেচনার উপর নির্ভর করে। ইন্সুরেন্স গুলোর সার্ভিস একেক সিটিতে একেক রকম হয়। তবে অবশ্যই কুনো সরকারি ইন্সুরেন্স কোম্পানির ইন্সুরেন্স নিবেন। আর ইন্সুরেন্স নেয়ার আগে সিনিওরদের কাছ থেকে জেনে নিবেন কোনটা নিলে ভাল হবে। একটা ধারনা সবার থাকে, যে, এড্রেস/সিটি রেজিস্টার করার আগে ইন্সুরেন্স করা যাজাবে। ইহা সম্পুর্ণ ভুল ধারনা! আপনি যে দিন ব্যাংক একাউন্ট এক্টিভ করবেন সেদিন ই চাইলে ইন্সুরেন্স করে ফেলতে পারেন। এড্রেস/সিটি রেজিস্টার করা ইসুরেন্স এর জন্য বাধ্যতামূলক কিছু না।

৪) ইউনিভার্সিটি এনরলমেন্টঃ প্রথম কথা, ইউনিভার্সিটিতে এনরল্ড হওয়ার জন্য আপনার সিটি/এড্রেস রেজিস্ট্রেশন এর কাগজ লাগে, ইন্সুরেন্স লাগে, তবে তা এনরল হওয়ার দিন ই জমা দিতে হবে এমন কিছু না। আপনি গিয়ে বলবেন, আপনার ইন্সুরেন্স এখনও করা হয় নি, কয়েক দিনের মধ্যে করবেন। তখন তারা আপনাকে একটা নির্দিস্ট সময় বলে দিবে। এর মধ্যে আপনি আপনার ইন্সুরেন্স এর কাগজ জমা দিতে পারবেন। তাহলে বাকি থাকল এড্রেস রেজিস্ট্রেশন এবং অন্যান্ন কাগজপত্র (ইউনিভার্সিটি ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট, আই ই এল টি এস সার্টিফিকেট)। এড্রেস রেজিস্ট্রেশন না হলে ঠিকানা লিখে নিয়ে যাবেন, আর অন্যান্ন কাগজপত্র নিয়ে যাবেন। অনেক ইউনিভার্সিটি ই এনরলমেন্ট এর সময় কাগজপত্রের ফটোকপি এর সাথে মেইন কপি রেখে দেয়। তাতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারা আপনার কাগজপত্র ভেরিফাই করে কয়েকদিনের মধ্যেই আপনার অরিজিনাল কপি গুলো ফিরত দিয়ে দিবে। আর হ্যা, এনরলমেন্ট এর সময় অনেক ইউনিভার্সিটি ই পার্মানেন্ট immatrikulationsbescheinigung দিয়ে দেয়। আবার অনেকেই টেম্পরারি immatrikulationsbescheinigung দেয়। পরে আপনি সেমিস্টার ফি জমা দিলে (অবশ্যই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে) পার্মানেন্ট সার্টিফিকেট আপনার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিবে।

৫) সেমিস্টার ফি জমা দেয়া (যদি লাগে) ঃ আপনার ইউনিভারসিটিতে যদি সেমিস্টার ফি/ সেমিস্টার কন্ট্রিভিউশন ফি জমা দেয়া লাগে, তাহলে এনরলমেন্ট এর সময় ইউনিভার্সিটি থেকে আপনাকে একটি পেয়মেন্ট ডিমান্ড দিবে। আপনি সেদিন ই ব্যাংক এ গিয়ে ডিমান্ড পেপার পূরন করে জমা দিয়ে আসতে পারেন অথবা ব্যাংক থেকে ফান্ড অনলাইন ট্রান্সফার করিয়ে আসতে পারেন।

 ৬) ভিসার মেয়াদ বাড়ানো/রেসিডেন্স পারমিট নেয়াঃ রেসিডেন্স পারমিট নেয়ার জন্য আপনাকে আগের মতই  নিকটস্ত Rathaus এ গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে/ অনলাইনে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে। তবে রেসিডেন্স পারমিট এর এপয়েন্টমেন্ট নেয়ার আগে আপনার পার্মানেন্ট immatrikulationsbescheinigung এবং ইন্সুরেন্স করে ফেলতে হবে (যদিও ইন্সুরেন্স গুরুত্তপূর্ণ কিছু না এটার জন্য)। এগুলো করা হয়ে গেলে এপয়েন্টমেন্ট এর দিন রেসিডেন্স পার্মিট নেয়ার ফিল্ড-আপ ফর্ম, আপনার পাসপোর্ট, এক কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, ব্যাংক সার্টিফিকেট (টাকা জমা দেয়ার পরে ব্যাংক যে পিডিএফ পাঠায়), পার্মানেন্ট immatrikulationsbescheinigung, এড্রেস রেজিস্ট্রেশন এর সার্টিফিকেট, বাসার কট্রাক্ট এবং ১১০ ইউরো ফি নিয়ে চলে যাবেন। সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে অফিসার আপনার কাগজপত্র আর ফি রেখে আপনাকে রসিদ দিয়ে দিবে। অই রসিদ এ লিখা থাকবে আপনি কবে রেসিডেন্স পার্মিট নিতে যাবেন।

আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে উপরের সব কিছু শেয়ার করলাম। আপনাদের জার্মানিতে আগমন এবং পরবর্তি কার্যক্রমের জন্য অনেক অনেক শুভকামনা রইল।

আমি জার্মানীতে মাত্র পৌছালাম। এখন আমি কি করব?

প্রথম জার্মানি আসছেন? কিছু উপদেশ!

সিটি রেজিস্ট্রেশানের নতুন নিয়ম এবং আমাদের করণীয়