আমাকে অনেকেই ইনবক্স করে স্টুটগার্টের বিষয়ে জানতে চাচ্ছেন। এর পুর্বে আলাদা করে  স্টূটগার্ট বিষয়ে কোন লেখা এসেছে কিনা আমার তা জানা নেই। যারা শুধুমাত্র স্টুটগার্ট কেনো জার্মানীর যে কোন শহরেই আসতে চান তাদের জন্যে ফরজ দুটি কাজ হলো;

১) অন্তত পক্ষে বেসিক ডয়েচটা জানা। আপনি যদি বরিশালে বেড়াতে যান তাহলে শুদ্ধ ভাষায় কথা বললে যতনা আন্তরিকতা পাবেন তার থেকে বরিশালের ভাষায় কথা বললে আন্তরিকতা বেশি পাবেন। বাস্তবতা এটাই। নিজ প্রচেষ্টাতেই হোক আর কোন প্রতিষ্ঠান থেকেই হোক ডয়েচ ভাষাটার উপরে সামান্য হলেও জ্ঞান নিয়ে আসেন। কোন একটি প্রতিষ্ঠানে যদি আপনাকে নাম লিখতে বলা হয় আর আপনি না বুঝেন তাহলে বিপদ। এরা ইংরেজি বুঝেনা এটা ঠিক না। তবে প্রফেশনাল জাতী হিসেবে তারা চায় আপনি ডয়েচে কথা বলেন।

ডয়েচ ভাষায় নুন্যতম কিছু জ্ঞান অর্জনের জন্যে আমরা আপনাদের শেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের গ্রুপ https://www.facebook.com/groups/BSA.learngerman/ তে জয়েন করেও আপনি আপনার ভাষার লেভেল কে কিছুটা হলেও উন্নত করতে পারবেন।

২) জার্মানীতে চলে এসেছেন। অনেকেই যে ভুলটা করে তাহলো এসেই কাজ করতে মরিয়া হয়ে যায়। দেখেন, আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয় আর জার্মানীর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আসমান-জমিন ফারাক। আপনি এসেই যদি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে চেনার চেষ্টা না করেন তবেই পেছাতেই থাকবেন। এভাবে এক সময় দেখবেন আপনি মুল স্রোত থেকে দূরে সরে গেছেন।

আমার পরামর্শ প্রথম ছয়মাস নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মানায় নিতে চেষ্টা করেন। আপনার সহপাঠী এবং সহপাঠিনীর সাথে পরিচিত হন। কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েব সাইট থেকে নিজের প্রয়োজনীয় বিষয় জানবেন, রেজাল্ট জানবেন, পরীক্ষার সময় সুচি জানবেন সেগুলা খুব ভালভাবে জেনে নিন। এরপরে প্রথম ছয় মাসেই নিজের পরিকল্পনা ঠিক করে ফেলেন। কোন কোন বিষয় আপনি সিলেক্ট করবেন, কোন কোন সেমিষ্টারে কি কি বিষয়কে সিলেক্ট করবেন, কোন সেমিষ্টারে কয়টা মডিউল করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি জানার দরকার আছে। এভাবে দেখবেন প্রথম ছয়মাস চলে যাবে।

তাছাড়া আরও বিষয় থাকে। যেমন, আপনি নতুন দেশে এসেছেন। এদেশের খাবার, পানি, রাস্তাঘাট, মানুষ অথবা যানবাহনের সাথে পরিচিত না হয়েই কাজে ঝাঁপ দেয়াটা ঠিকনা। টাকা পরে চিনেন। একটু সময় নেন। আপনি যে রাস্তা দিয়ে হাঁটবেন সেটা যদি পাহাড়ি রাস্তা হয় তাহলেও আপনার উচিৎ নিজের শরীরকে সেই উঁচু নীচু পথের সাথে মানিয়ে নিতে সময় দেয়া। এদের সংস্কৃতিকে জানতে চেষ্টা করেন। বন্ধুত্ব করেন। কথা বলেন। ভাষাকে আরও পার্ফেক্ট করেন। তারপরের ছয়মাসে কাজের দিকে মনোযোগ দেন।

যাইহোক, মেলা উপদেশ দিয়ে ফেললাম। এখন মুল বিষয়ে আসি। স্টূটাগার্টে আসলে আপনার আবাসান খরচ কেমন হবে এটা অনেকেই জানতে চান। আমার অভিজ্ঞতা থেকে স্টূডেন্ট ডরমেটরীতে যদি থাকতে চান তাহলে নুন্যতম ২৫০ ইউরো ভাড়া গুণতে হবে প্রতিমাসে। এরসাথে ডিপোজিশন হিসেবে ৪০০ কিংবা ক্ষেত্র বিষয়ে তার বেশি। যদি বাসা করে থাকেন তবে সেটা অনেক কিছুর উপরেই নির্ভর করে। ভাড়া নুন্যতম ২৫০ ইউরো। সাথে কোন কোন সময় নেবেন কস্ট নামক টাকা গুণতে হয়। দুই ধরনের বাসা পাওয়া যায়। মবিলিয়ের্ট তারমানে হলো, কাঠ পালংক, কিচেন সামগ্রী সবই থাকবে। এক্ষেত্রে ভাড়াটে বেশি। আর একটি হলো, অহনে মবিলিয়ের্ট। এই ধরণের বাসাতে আপনাকে সবকিছু কিনে নিতে হবে। ছাত্রদের জন্যে অহনে মবিলিয়ের্ট বাসায় থাকাটা একার জন্যে পোষায় না। সমমনা কয়েকজন হলে থাকতে পারেন। ভাড়া কম পড়বে। এপার্ট্মেন্ট অথবা রুমের জন্যে জার্মানীর অন্যতম ভরসা করার মত ওয়েব সাইট হলো,

http://www.wg-gesucht.de

‎হেলথ ইন্সুরেন্সের বিষয়ে সবাই একটা ভুল তড়িৎ করে ফেলেন। সেটা হলো না বুঝেই এদেশের পাবলিক ইন্সিউরেন্স করে ফেলেন। অনেকে বলেন এটা নাকি বাধ্যতামুলক। আমি বলছি না। আই রিপিট না। আপনি এসে কোন একটা প্রাইভেট হেলথ ইন্সিরেন্স করেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তপক্ষ দেখতে চাইলে বলবেন আমি এটা করে ফেলেছি। ভিসা কতৃপক্ষ এটা নিয়ে চিন্তিত নয়। তারা দেখবে আপনার হেলথ ইন্সুরেন্স আছে কি নেই? এখন প্রশ্ন হলো পাব্লিকে করলে আপনার বয়স যদি ত্রিশ না হয় তাহলে ত্রিশ বছর পর্যন্ত প্রায় ৮০ ইউরো গুণতে হবে প্রতি মাসে। ত্রিশ পার হলে প্রতি মাসে ১৫৮ ইউরো গুণতে হবে প্রতি মাসে। যদি প্রাইভেটে করেন তবে প্রতি মাসে প্রায় ৪০ ইউরো গুণবেন প্রতি মাসে। প্রথম বার মাসের জন্যে করেন। তের মাসের আগেই পরিবর্তন করে আরেক প্রাইভেটে চলে যান। ভাবছেন পাগলের প্রলাপ? আসল তথ্য হলো আপনি যদি বোকা না হন এবং মারাত্বক কোন দুর্ঘটনা না ঘটিয়ে ফেলেন তবে কোন সমস্যা নেই। তবে আপনি প্রতি মাসে ৪০ ইউরো করে বাঁচাতে পারবেন। এটা আমার মতামত আরকি।

যাতায়াত খরচ তেমন একটা বেশি নয়। যদি সেমিষ্টার টিকেট করতে চান তাহলে গুণতে হবে ১৯০ ইউরো কিংবা তার বেশি। তবে কথা হচ্ছে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া সেমিষ্টার টিকেট না করাটাই ভালো। শনিবার, রবিবার এবং জাতীয় ছুটির দিন আপনি স্টুডেন্ট আইডি কার্ড শো করেই ছয় জোনের মধ্যে ঘুরতে পারবেন। এছাড়া অফিসিয়াল দিনে সন্ধ্যা ছয়টার পর থেকে রাত বারটা উনষাট পর্যন্ত ফ্রী।

খাওয়া খরচ আপনার খাদ্যাভ্যাসের উপরে নির্ভর করবে। খুব খাদ্য রসিক হলে আপনি যেমন প্রতি কেজি ১৫ ইউরো দিয়ে ভেড়ার মাংস খেতে পারবেন অথবা আমার মত গরীব হলে ৯০ সেন্ট দিয়ে মুরগীর মাংস কিংবা ৪ ইউরো দিয়ে গরুর মাংস কিনে খেতে পারেন। বাসমতি চাল কিনে খেতে পারেন প্রতি কেজি প্রায় ৩ ইউরো দিয়ে অথবা আমার মত মিস্কিন হলে ৮০ সেন্ট দিয়ে চাল কিনে খেতে পারেন।

জামা কাপড় কিনতে হলে চালাক চতুর হতে হবে। শীত শেষ হলেই গ্রীষ্মের শুরুতে তারা বিশাল একটা ছাড় দেয়। এইজন্যে আমি অপেক্ষা করি। এই যেমন যেদিন, ১৫ ইউরো প্রতি পিছ হাফ প্যান্ট কিনলাম তিন ইউরো দিয়ে। এভাবে শীতের শেষে কিনতে পারবেন শীতের পোশাক অথবা গ্রীষ্মের শেষে কিনে ফেলতে পারেন গ্রীষ্মের পোশাক, জুতা কিংবা ট্রাউজার। মোট কথা ছাড় বছরের সব সময়ই দেয়। আপনাকে খোঁজ রাখতে হবে।

চাকরী চাকরী এবং চাকরী। কাজের কথায় কেবল আসলাম। স্টূটগার্ট এ চাকরীর বাজার আমার কাছে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনেহয়। প্রচুর এজেন্সি আছে। চলে যান সরাসরি। রেজিষ্ট্রেশন করে ফেলুন। ডাক পাবেন। বেতন সীমা এখন সর্বনিম্ন সাড়ে আট ইউরো। সর্বচ্চ সীমা জানা নেই। অনেক সময় মাস ভিত্তিক বেতন দেয়। এটা আপনার চুক্তির উপরে নির্ভর করবে। চুক্তি করার সময় একদম পরিস্কার করে পড়ে অথবা কাউকে দিয়ে পড়িয়ে সকল শর্তগুলো জেনে নিন। তারপরেই সই করুন। সম্পুর্ণ মাস কাজ করতে পারেন অথবা শুধুমাত্র উইক এন্ডে। এখানে ৪৫০ ইউরো পর্যন্ত ট্যাক্স ফ্রী। সুতরাং আপনি যদি সাড়ে চারশো বেসিসে কাজ করেন তাও ভাল ভাবেই আপনার চলে যাবার কথা।

এইতো স্টুটগার্ট। চলে আসেন। শুভ হোক আপনার স্টুটগার্ট জীবন।

শাহ্‌ ওয়ায়েজ।

ইন্সটিটিউট অব ক্রপ সাইন্স।

উনিভার্সিটেট হোনহাইম।

স্টুটগার্ট, জার্মানী।