2

কথা হচ্ছিল আয়নার সাথে- জানতে চাইলাম সাঁতার জানে কিনা; জানে না। স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইলাম পানিতে নামতে ভয় করে কিনা; করে। এটাই স্বাভাবিক, সাঁতার না জানলে তো পানিতে নামতে ভয় করবেই- তা পানি যতই আকর্ষণীয় হোক; কিংবা নামলেও অতি সন্তর্পণে- পা টিপে টিপে, গভীরে না গিয়ে থাকা লাগে।

প্রসঙ্গত ছোটবেলার একটা ঘটনার কথা বলি- আমি আর আমার এক মামাতো ভাই মাঠে খাবার নিয়ে যাচ্ছিলাম মামার জন্যে; যেতে হবে নদীর ওপার; যেতেও সমস্যা নাই, ঘাটে নৌকোর ব্যবস্থা আছে, সমস্যা বাঁধল যখন ওপারে নামলাম- যেখানে নামলাম সেখানে আড়াআড়ি একটা খাল আছে; আমাদের যেতে হবে খালের অন্য পাড়ের মাঠে। খালটা বেশি চওড়া না, তাই ভেবেছিলাম পানিও বেশি হবে না; কিন্তু জলে নেমে দুই কদম যেতেই ধপ করে গলা সমান পানি হয়ে গেল; সাঁতার জানতাম না কেউই; আতঙ্ক আর ভয় সম্পূর্ণ সত্তাকে গ্রাস করে ফেলেছিলো, মাঝি এসে উদ্ধার করায় বেঁচে যাই সেদিন; কিন্তু জল আমার কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়েছিল আরো বেশ কিছুদিন- আরো পরে যখন সাঁতার শিখেছি তখন এই আতঙ্ক দূর হয়েছে; তবুও স্বচ্ছ-শান্ত জলে বাঁকা চাঁদের প্রতিবিম্ব ভালো লাগলেও তরঙ্গায়িত জলের উত্তল-অবতল চলনে নিজের প্রতিবিম্ব যখন দোলায়িত হতে থাকে তখন মনে হয় কিসে যেন খামচে ধরে টেনে যাচ্ছে চেহারাখানি; চেহারার এই বিকৃত হওয়া দেখে আতঙ্ক অনুভূত না হলেও তা সুখকর নয়।

সেই একইরকম একটা অনুভূতি হয়েছিল যখন আজ আয়নার মুখোমুখি; যখন তাঁকে গ্রামের মেয়ে ভেবে ভুল ভেবেছিলাম তখন এ ভুল ভাঙ্গাতে গিয়ে বাঁধভাঙা জোয়ারের তোড়ে কিছুটা স্মৃতিচারণ করেছিলেন। বলেছিলেন তাঁর শহুরে গতানুগতিক জীবনের কথা- তিন কক্ষের এক বাসার কলাপ্সিবল গেটের ভিতরের জীবন। শৈশবে বারান্দায় ক্রিকেট খেলা- গ্রীলের নিচের দিকে লাগলে চার আর উপরের দিকে লাগলে ছয়; ছাদে দাগ কেটে কুতকুত খেলা; সিড়ির নিচে দড়িলাফ কিংবা সামনের রাস্তায় বউচি খেলা। একসময় রাস্তায় বউচি খেলা বন্ধ, বারান্দা বন্ধ, দড়ি লাফের সাথি নেই, ছাদে গেলে সমস্যা- কুনোব্যাঙের মতো সেঁটে যান দেয়ালে। তবু বিশ্ববিদ্যালয়ে ফুটবল খেলা- ভোরবেলা ছেলেদের দৃষ্টি এড়িয়ে।

কথাগুলো হয়তো স্বাভাবিক, গতানুগতিক কিংবা হয়তো নয়; তবে আমার কাছে অন্যরকম মনে হয়েছে- সেচের পানি যেমন নালা দিয়ে এসে জমিতে ঢোকার খোলা মুখে এসে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে বিশাল একটা ব্যাপ্তিতে, আমার মনে হয়েছে কথাগুলোও সেরকমই; প্রাচীরের মধ্য দিয়ে চিন্তা করলে গতানুগতিক স্মৃতিচারণই মনে হবে; শুধু মনে হবে ছুটে চলা জলের ফেলে আসা অতীত; কিন্তু এই কথাগুলোতেই বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থার শৃংখলের চিত্রটি বেরিয়ে আসে যার শিকার নারীরা; বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথেই বিধি নিষেধের আরোপ একজন নারীর চলার পথটা করে তোলে সরু নালার মত, কেড়ে নেওয়া হয় তার কাছ থেকে উম্মুক্ত বিশ্ব, ছুঁড়ে ফেলা হয় ঘরের কোণে। নিজের সাথে যখন তুলনা করি তখন দেখি বিধিনিষেধে আমাদের খেলার মাঠ যাওয়া বন্ধ হয় নি, ছাদে ঘুড়ি উড়ানোতে কেউ বাঁধা দেয় নি, আমাদের টেনে নিয়ে আসা হয় নি ঘরের কোণে, লুডুর ছোট ক্ষেত্রটাই আমাদের মাঠ হয়ে যায় নি, আমাদের অপেক্ষা করতে হয়নি শুনশান নীরবতার- বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে খেলার জন্য। আর তাই আজ আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মনে হয় এই সামাজিক দ্বিচারিতা যে উত্তল-অবতল তরঙ্গ তৈরি করেছে তাতে নিজের বিকৃত প্রতিবিম্বখানিই ধরা পড়ে।

তবে সমাজের জন্য সুখবর হল, প্রাচীরের মধ্যকার সরু নালায় চলতে চলতেই এক জীবন কেটে যায়, বিস্তৃত ব্যাপ্তির পৃথিবী আর দেখা হয় না; তাই আয়নার কথাগুলো আয়নার কাছেই স্বাভাবিক স্মৃতিচারণ হয়ে যায়- ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহী কাব্য হয়ে উঠে না। কিংবা হয়তো ঘরের কোণে পড়ে থাকার হেতু বহির্জগতে সাঁতার কাঁটা হয় না, তাই অদ্ভুত এক বহিরাতঙ্কে কেটে যায় জীবন।