উনার নামে ইউনিভার্সিটি অফ হাওয়াই এট মানওয়াতে একটা ল্যাব আছে। ল্যাবটার নাম আলম ল্যাবরেটরি। তোষা পাটের জিনোম নিয়ে কাজ না করলে বাংলাদেশে উনাকে কে চিনতেন তা নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

অনেক আগে একবার আরশাদ মোমেন স্যারের একটা কথা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে লিখেছিলাম ‘আমরা আমদের সত্যিকারের জাতীয় বীরদের চিনি না।’ কথাটা আজকে আবার প্রমাণ হল। সালমান শাহ মারা যাবার পরে আমাদের যত নাকি কান্না, আজকে কি তার শতকরা ১ ভাগও আছে?

না থাকারই কথা হয়ত। কোথাকার কোন মাকসুদুল আলম, নামের আগে একটা ডক্টর আছে বলেই কি তাকে নিয়ে মাতামাতি করতে হবে নাকি? কত লোকেরই তো আছে। আমি ব্যক্তিগত ভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা কারণে এই ব্যক্তিকে অনেক সম্মান করি। আমার পুরোপুরি ব্যক্তিগত অভিমতের জায়গাটা আমি এই লেখায় বলতে চাই।

এই ভদ্রলোকের Nature -এ পাবলিকেশনের সংখ্যা পাঁচ টা। Nature নাম উচ্চারন করামাত্র আরেক বিপদে পড়লাম। এইটা হচ্ছে এমন এক জাতের জার্নাল যেখানে স্টিফেন হকিং টাইপের লোকজন তাদের গবেষণা পত্র ছাপাইতে পাঠান আর কি। আমার বন্ধুতালিকায় এমন অনেকেই আছেন যারা এর দাম খুব ভালো করে বোঝেন তারা এই বিষয়গুলো প্লিজ স্কিপ করেন।

ভদ্রলোক মাস্টার্স করেছেন মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মাইক্রোবায়োলজি থেকে। তার বাড়ি ফরিদপুর। গভ ল্যাব স্কুল আর ঢাকা কলেজ তার কলেজ। ইন্টার পাশ করে তিনি মস্কো চলে যান। মজার ব্যাপার হল গভ ল্যাব বা ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল কি জানেন এই বিজ্ঞানী উনাদের প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছিলেন। কিংবা, ঐ স্কুলে বা কলেজে কি তার স্মরণে এক লাইন আলোচনাও হবে ?
জানতে মন চায়…

উনি প্রথম পি এইচ ডি করেন মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মাইক্রোবায়োলজি ডিপার্টমেন্টে(১৯৮২)। পরে আরেকটা পি এইচ ডি উনি করেছেন জার্মানির অন্যতম সেরা ও বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স -প্ল্যাঙ্ক ইন্সটিটিউট থেকে(১৯৮৭), বায়োকেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টে, কি কারণে দুইটা পি এইচ ডি করলেন জানতে মন চায় কিন্তু নেটে কোথাও খুঁজে পেলাম না!

তিনি কাজ করেছেন ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিট, ম্যাক্স-প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউট, জার্মান রিসার্চ ফাউন্ডেশনে। খুচরা আরো অনেক নাম বলা যাবে সেটা বলে বিরক্ত করতে চাই না। উনি শাবিপ্রবির কোন একটা বডিতেও ছিলেন যতদূর জানি।

উইকিপিডিয়া থেকে একটু উদ্ধৃত করতে পারিঃ

” ২০০০ সালে তিনি ও তাঁর সহকর্মী “রেন্ডি লারসেন” প্রাচীন জীবাণুতে মায়োগ্লোবিনের মতো এক নতুন ধরনের প্রোটিন আবিষ্কার করেন। এ আবিষ্কারের সুবাদে মাকসুদের খ্যাতি ও দক্ষতা সবার নজরে আসে। ২০০১ সাল থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে কাজ করে যান।[৩] হাওয়াইয়ান পেঁপের জিন নকশা উন্মোচনের জন্য ডাক পড়ে তাঁর। এ কাজ সম্পন্ন করার পর বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারের প্রচ্ছদে স্থান পান তিনি। পেঁপের জিন নকশা উন্মোচনের পর তিনি পাটের জিন নকশা উন্মোচনের কথা ভেবেছিলেন। সে সময় কয়েকবার বাংলাদেশেও এসেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর ডাক পড়ে মালয়েশিয়ায় রাবারের জিন নকশা উন্মোচনের জন্য, ওই কাজেও তিনি সফল হন। পরে তিনি মনোনিবেশ করেন পাটের জিন নকশা উন্মোচনে।”

উনি একজন মাইক্রোবায়োলজি, বায়োকেমিস্ট্রি, বায়োইনফরমেটিকস, জিনোমিক্সের গবেষক। এই বিষয় নিয়ে কথা বলার আগে মাফ চেয়ে নিচ্ছি কারন আমি জানি আমি কত বড় মূর্খ এই বিষয়ে। উনার উল্লেখযোগ্য কাজ গুলোর একটি হচ্ছে মেক্রোফোমিনা” ( কমন কিন্তু ডেডলি একটা ছত্রাক) এর জিন সিকোন্সিং। কারন এই ছত্রাকটা শুধু পাটের বারোটা বাজায় না, অন্তত ৫০০ প্রজাতির শষ্য যেমন গম, বার্লি, সূর্যমূখী সবকিছুকেই আক্রমন করে। মাইক্রোফোবিনার জিন সিকোয়েন্সিং জানা মানে হল এখন এই ছত্রাক কিভাবে বংশ বিস্তার করে, কি দিলে বাড়ে, কি দিলে মরে সব কিছুই ধীরে ধীরে বের করা সম্ভব। এই মাইক্রোফোবিনার জিন সিকোয়েন্সিং উনার নেতৃত্বে হয়েছে।

বড় বিজ্ঞানীরা নাকি খুব একা মানুষ হন। ব্যক্তিজীবনে উনি কেমন ছিলেন তা আমি জানি না কিন্তু উনার নেতৃত্বের ক্ষমতা অসাধারন। তোষা পাটের জিন সিকোয়েন্সিং করতে গিয়ে উনাকে বিশাল এক গবেষক দলের নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। দুর্দান্ত টিমওয়ার্ক ছাড়া এই কাজ অসম্ভব। সেটা উনি করে দেখিয়েছেন।

আমরা সবসময় শুনি সফলতার গল্প। সফলতার আগের গল্পটা কেউ আর খুঁজি না। পাটের জিনোম নিয়ে কাজ শুরু করার আগে কত দিন উনাকে এই মন্ত্রনালয় থেকে সেই মন্ত্রনালয় টাকার জন্য দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হয়েছে সেই কাহিনী আশা করি মাননীয় কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরি একদিন শোনাবেন। গবেষণা করে সাফল্য আনার চাইতে বাংলাদেশে গবেষণা করার জন্য কাউকে পয়সা ঢালতে রাজি করানো কয়েকশ গুন কঠিন। সেই কঠিন কাজটা ড. মাকসুদ করে দেখিয়েছেন। উনি একটা রাস্তা করে দিয়ে গেলেন প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের জন্য। এখন বাকিরা দেশে গিয়ে বলতে পারবেন, টাকা দেন, আমি দেশের জন্য জ্ঞান ও সম্মান বয়ে আনতে পারবো ড. মাকসুদুল আলমের মত।

উনার কোন দরকার ছিল না বাংলাদেশে ফিরে পাট নিয়ে কাজ করার। বাংলাদেশের আঠালো মন্ত্রীদের মালিশ করে পয়সার জন্য ঘোরাঘুরি করার। নিজের গবেষনা ক্ষেত্রে উনি যথেষ্ট খ্যাতিমান ছিলেন, আমেরিকাতে বসে আমেরিকার জন্য গবেষণা করলে উনার পয়সার অভাব হওয়ার কথা না, তবুও ভেবেছেন দেশের জন্য কিছু করা দরকার। ঐ প্রজেক্ট থেকে তিনি এক পয়সাও নেন নাই আমি যতদূর জানি।

ড. মাকসুদুল আলম একজন ট্রেন্ড সেটার। পাইয়োনিয়ার। ২০ ডিসেম্বর উনি হাওয়াইতে মারা গিয়েছেন। উনার লিভার সিরোসিসের সমস্যা ছিল।

আসুন আমরা আমাদের জাতীয় বীরদের চিনি। কারা হওয়া উচিত আমাদের আইকন সেটা আবার ভাবি। ড. মাকসুদুল আলম বেঁচে থাকবেন উনার কাজের মধ্যে দিয়ে। আমরা উনার নামে শোকসভা/স্মরনসভা করলাম কি করলাম না তাতে এই দুনিয়ার কিছু আসে যায় না।

————————–————————–————————–—————–
১।http://en.wikipedia.org/wiki/Maqsudul_Alam
২।http://www.hawaii.edu/microbiology/MO/docs/MaqsCV.pdf
৩।http://www.hawaii.edu/microbiology/Alam/
৪।http://www.hawaii.edu/microbiology/Alam/pubs/index.html
৫।https://www.facebook.com/pages/Dr-Maqsudul-Alam/217360121645286?sk=timeline
৬।http://bn.wikipedia.org/wiki/মাকসুদুল_আলম
৭।http://www.prothom-alo.com/bangladesh/article/67078/স্বপ্ন-বাস্তবায়নের-জাদুকর