প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে হাজার মাইল দূরে যে বাংলাদেশিদের বসবাস, দূর থেকে দেখলে মনে হবে সেই প্রবাসীরা যা করছে সবই বুঝি তার নিজের ও পরিবারের জন্য। অধিকাংশের বেলায় হয়ত তা সত্য, তবে কারো কারো বেলায় নয়। দূর প্রবাসে থেকেও প্রিয় দেশ বাংলাদেশের জন্য কিছু একটা করার তাগিদ কারো কারো বোধ হয়। তেমন কিছু দেশপ্রেমিক বাংলাদেশি গত আট বছর যাবৎ জার্মানির মিউনিখ থেকে বাংলাদেশি এতিম হতদরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি কার্যক্রমের মত মহতী কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এদের সাথে যুক্ত হয়েছেন আরো কিছু ভিনদেশি মানুষ।

শুরুটা সেই এপ্রিল ২০০৮ এ। কিছু উদ্যমী বাঙালি আর বিদেশী বন্ধু মিলে শুরু করেন Bangladesch Jugendförderung নামের একটি সম্পূর্ণ অলাভজনক একটি বেসরকারী সংস্থা যা মিউনিখের ট্যাক্স অফিসের সাথে রেজিস্টার্ড। এই নামের ইংরেজী করলে দাঁড়ায় Bangladesh youth promotion। মোটা দাগে বাংলাদেশের দরিদ্র এবং মেধাবী শিক্ষার্থী যারা স্কুলের বিভিন্ন পর্যায়ে মেধার স্বাক্ষর রেখেছে অথচ শুধুমাত্র অর্থের অভাবে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারছে না তাদের সাহায্যার্থে এই সংগঠন। ষষ্ঠ হতে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই এই বৃত্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

৭ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদ, ৪ জন উপদেষ্টা, ২ জন অডিটর নিয়ে গঠিত এই সংগঠনে জড়িত আছেন ৫ জন বিদেশি। সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় এর কার্যক্রম ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এখন পর্যন্ত বিশটি জেলায় বৃত্তি প্রদান করা হচ্ছে। এই জেলাগুলো হতে ২০১৩ সালে ২৫২ জনকে বৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।

পুরো বৃত্তি কার্যক্রমটি পরিচালিত হয় এটির ওয়েবসাইট হতে, লিংকঃ http://www.bangladesch-jugendhilfe.de সাইটটিতে তাদের অতীতের সকল কর্মকান্ডের বিবরণ রয়েছে। কিভাবে শুরু, কার দ্বারা পরিচালনা, কিভাবে ডোনার সংগ্রহ করা হয়, কিভাবে মেম্বার হওয়া যায়, বৃত্তির জন্য আবেদনের প্রক্রিয়া সহ অন্যান্য নিয়মিত কাজের আপডেট প্রতিনিয়ত দেয়া হয়। কোন জেলার শিক্ষার্থী এই সুবিধা পেয়ে থাকে, কোন স্কুল হতে কতজন বর্তমান শিক্ষার্থী এই বৃত্তি পাচ্ছে নাম ঠিকানা ছবিসহ তাদের তথ্য এই সাইটে দেয়া আছে।

যে কেউ এখানকার সদস্য হতে পারেন। প্রতিটি সদস্যকে প্রতিমাসে সর্বনিম্ন ১০ ইউরোর সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে। তবে জার্মানিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি বা বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থের পরিমাণ ৩ ইউরো। এখন পর্যন্ত ১৫২ জন সদস্য রয়েছে এই সংগঠনের এবং তাদের প্রদেয় টাকাতেই বৃত্তি কার্যক্রম চলছে। ওয়েব সাইটে নিজেকে মেম্বার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে না চাইলে নিচের ব্যাংক একাউন্টের মাধ্যমে অর্থ পাঠানো যায়ঃ

Account holder: Bangladesch Jugendförderung e.V.
IBAN: DE91300606010007370520
BIC-Code: DAAEDEDDXXX

Bangladesch Jugendhilfe e.V. এর খাঁটি বাংলা অর্থঃ বাংলাদেশের তরুণ/কিশোর/শিশুদের সাহায্য করার নিমিত্তে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এই ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে এই প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার পেছনের অন্যতম কারিগর জিয়াউল মালিক (Ziaul Mallik) বলেনঃ

আমরা চাইছিলাম বাংলাদেশের মানুষের জন্য কিছু করার। এই ব্যাপারে একটা গল্প না বললেই না। আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগে আমি আমার বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু টাকা তুলে যশোরে আমাদের গ্রামে গেলাম। আমি গ্রামের মানুষের কাছে যখন এই ব্যাপারে কথা বলি, তাঁদের খুবই আগ্রহ লক্ষ্য করলাম। কিন্তু সবশেষে যা বুঝলাম তা হল তাঁরা শুধু টাকাটাই চায়। আমাদের যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য অর্থাৎ বাংলাদেশের দরিদ্র কিন্তু মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সহায়তা করা, তা যেন অনেকটা ম্লান। আমি পরে টাকাটা নিয়ে ফিরে আসি জার্মানিতে এবং ফিরিয়ে দেই সবাইকে।

তো সেই ইচ্ছা থেকে ২০০৭ এর শেষের দিকে আমি, সাইফুল্লাহসহ আরো কিছু বন্ধু-বান্ধব এবং জার্মান বন্ধু মিলে একটি এসোসিয়েশন করার দিকে এগিয়ে যাই। বলে রাখা ভাল আমাদের অর্গানাইজেশনটি পুরোপুরি নন-প্রফিট অর্থাৎ এখানে ডোনেট করা সকল টাকা-পয়সা প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে আমরা বিতরণ করে থাকি। আরেকটা মজার ব্যাপার হল কিছু অর্গানাইযেশনের নিজেদের খরচ থাকে অনেক। কিন্তু আমাদের এখানে এরকম কোন খরচই নেই। মজার ব্যাপার হল আমাদের “ট্যাক্স বেরাটার” কাগজপত্র “ফিনাঞ্জআমট” এ পাঠানো নিয়ে যে পারিশ্রমিক নেন তাঁর ৮০% সে আবার আমাদের অর্গানাইযেশনেই ডোনেট করে দেয়। এছাড়া এটা কঠোরভাবে জার্মান নিয়ম-কানুন মেনে পরিচালিত। তাই ভুল হওয়ার বা করার অবকাশ নেই এতটুকু।

তো যা বলছিলাম, প্রায় ২২ জন মেম্বার নিয়ে এবং প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রী নিয়ে কাজ শুরু করে আজ আমাদের অর্গানাইজেশনের মেম্বার সংখ্যা ১৫০ জন এবং প্রায় ৩০০ জনের মত দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের আমরা সাহায্য করছি প্রতিনিয়ত।

আমাদের কাজের পদ্ধতি নিয়ে কিছু বলা উচিত। আমরা আমাদের মেম্বারদের আমরা দায়িত্ব দেই ছাত্রছাত্রীদের মাঝে স্কলারশিপের টাকা বিতরণের জন্য। তাঁদের এলাকায় যদি কোন দরিদ্র শিক্ষার্থীদের তাঁরা সাহায্য করতে চায় তবে আমরা তখন সেই শিক্ষার্থীর দায়িত্ব তাঁকে দিয়ে দেই। এরপর মাস/বছর শেষে তাঁর কাছ থেকেই অর্গানাইযেশন আপডেট নেয়। মাঝেমাঝে আমরা ক্রস চেক করি যখন জার্মানি থেকে আমরা বাংলাদেশে যাই বা ফোন করে। তাই পুরো ব্যাপারটায় স্বচ্ছ রাখা হয়।

আমরা শুরু করেছি ক্লাস সিক্স থেকে ক্লাস টুয়েল্ভ পর্যন্ত। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মাঝে আমরা হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও সাহায্য করব। এই পর্যায়ে আমাদের জার্মান কলিগদের কথা না বললেই না। বিশেষ করে ড. মার্টিন ব্রাউন, মি. গেরহার্ড বেলিটজ এবং ড. রালফ হেরটিং।

আমার বন্ধু ব্রাউন এর ৯০ দশকের দিকে অনেক বাংলাদেশি পেশেন্ট ছিল এবং তিনি বাংলাদেশেও গিয়েছিলেন। তাঁর অনেক ইচ্ছা বাংলাদেশকে তিনি সাহায্য করবেন সেই কারণেই আমাদের সাথে সে জড়িত হয়েছে। আর বেলিটজ টুরিস্ট হিসেবে বাংলাদেশে গিয়ে বাংলাদেশের প্রেমে পড়ে যান। বিশেষ করে চিটাগং হিল ট্র্যাক্স। এছাড়া সে আমার কাছে এই গল্পও করেছে বাংলাদেশের মানুষ এত বন্ধুবৎসল কীভাবে হয়! সেই থেকে তাঁর বাংলাদেশের প্রতি অনুরাগ।ফলে আমাদের সাথে তাই যোগ দেয়ার কথা তাঁকে দুবার বলতে হয় নি! আর প্রফেসর হেরটিং আমাদের অর্গানাইযেশনের জন্য অনেক কিছু করেছনে। উনি হখশুলে আলেন এর প্রফেসর। বর্তমানে আমাদের এডভাইজর কমিটির একজন সম্মানিত মেম্বার।

এছাড়া জনাব সাইফ সাইফুল্লাহকে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে প্রশ্ন করে হলে তিনি বলেনঃ

“আমাদের কাজের ফাঁকে দেশের জন্য কিছু করার প্রত্যাশা নিয়ে আমরা এটা শুরু করি এবং বাংলাদেশিরা ছাড়াও দুইজন জার্মান রয়েছেন আমাদের সাথে।” তিনি  আরো বলেন,”আমাদের এই অর্গানাইযেশন এর মূল লক্ষ্য হল মেধাবী বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের সাহায্য করা। আমি যখন স্কুলে পড়তাম তখন আমার একজন বন্ধু ভোরে উঠে আগে দুধ বিক্রি করত। এরপর স্কুলে আসত। বর্তমানে সে জাপানে রিসার্চ এবং চাকরি নিয়ে আছেন। আমার এই কথা বলার কারণ হল যারা মেধাবী/উদ্যমী তাদের ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু তাদের যদি আমরা কিছুটা হলেও সাহায্য করতে পারি, তবেই আমরা পারস্পরিক সহযোগিতার একটা সংস্কৃতি তৈরি করতে পারব। যেখানে থাকবে পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালবাসা-সম্মান। এটা এই মুহুর্তে খুব দরকার।”

ওয়েব সাইটের তথ্য হতে জানা যায়, ষষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেণির জন্য ৪০০ টাকা, নবম হতে দশম শ্রেণি ৬০০ টাকা এবং একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির জন্য ১১০০ টাকা মাসিক হারে প্রদান করা হয়। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত সংগঠনটির সদস্যের মাধ্যমে যাচাই বাছাই করে বৃত্তির জন্য শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হয়। আবেদন করার সকল নিয়মকানুন ওয়েব সাইটে দেয়া আছে। সংগঠনটির সাথে জড়িতদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভবিষ্যতে এই বৃত্তি কার্যক্রমকে আরো প্রসারিত করা হবে। এছাড়াও বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের মধ্য হতে মেধাবীদের পরবর্তীতে পূর্ণকালীন বৃত্তি দিয়ে জার্মানিতে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগদানের ব্যবস্থা আর জার্মানি ও বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালুর ব্যাপারে পদক্ষেপে চেষ্টা করা হবে বলে জানান তারা।

অনুলিখনেঃ রশিদুল হাসান, জাহিদ কবির হিমন