সম্প্রতি ভারতের তরুণ অভিনেতা সুশান্তের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতার মতো  একটি অতি জরুরী বিষয় নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। এই তরুণের কোন ছবি দেখা হয়নি বিধায় তাঁর সম্পর্কে জানতে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম আর অন্তর্জালের সহায়তা নিতে হল। এতে বুঝলাম এই অভিনেতা অত্যন্ত হাসিখুশি বন্ধুপরায়ণ আড্ডাবাজ আর অপরের প্রতি সদা সদয় ছিলেন। আরো বুঝলাম, আমরা বাইরে থেকে মানুষকে যেমন দেখি, ভেতরটা তেমন নাও হতে পারে, হয়ত আমরা একজনকে সদা হাসতেই দেখছি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে প্রতিনিয়ত হয়ত সে আত্মহত্যার মতো একটি নির্মম আর কঠিন বিষয়কে মাথায় নিয়ে ঘোরে।  

বিষণ্ণতার চূড়ান্ত পর্যায়ে একটা মানুষ নিজ প্রাণ হরণ করার সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। বিশ্বে এই সংখ্যা নেহাত কম নয়। ব্রিটেনে প্রতিদিন গড়ে সতেরোটি পরিবার তাঁদের একজন করে স্বজন হারায় আত্মহত্যার দরুণ। আমেরিকায় টিনেজাদের মধ্যে আত্মহত্যার পেছনে বিষণ্ণতা তিন নম্বর কারণ। ২০১১ সালে বাংলাদেশে আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১৯,৬৯৭ জন। আগের বছর ২০১০ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৬,৫০০,০০ জন মানুষ আত্মহত্যা প্রবণ হয়েছিল। প্রতিবছর ১০০,০০ জনে ১২৮.০৮ জন আত্মহত্যা করে সেখানে। জার্মানিতে বিশ বছর আগের তুলনায় বিষণ্ণতায় ভুগে আত্মহত্যার পরিমাণ কমে এলেও সেটি প্রতিবছর প্রায় দেড় হাজার।

যদি বলি আমি নিজের চোখে জার্মানিতে একজনকে আত্মহত্যা করতে দেখেছি, বিশ্বাস করা অনেকের জন্যই কঠিন হবে। কিন্তু ঘটনা সত্যি। উঁচু দালান থেকে এক বৃদ্ধা দুম করে পড়ে গেল, আমরা সেই দালানের নিচে দাঁড়িয়ে। বছর পাঁচেক পূর্বে হ্যানোভারে আমরা তুর্কি মসজিদে যেতাম ইফতার করতে। ওখানে চা-ও দেয়। ইফতার শেষে চা নিয়ে আমরা কয়েকজন বাংলাদেশি দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের হতে বড়জোর বিশ/ত্রিশ হাত দূরে এক মহিলা দালান থেকে পড়ে গেল।  

আমি সিগমুন্ড ফ্রয়েড নই, মানুষের হৃদয় কতখানি ক্ষতবিক্ষত হলে এই চূড়ান্ত পরিণতিকেই মুক্তির পন্থা হিসেবে অবলম্বন করে তা আমার মত নির্বোধের পক্ষে ব্যাখ্যা অসম্ভব। কিন্তু দীর্ঘকাল আমি নিজে মানসিক অবসাদে ভুগেছি, অসংখ্যবার আমি আত্মহত্যার প্রস্তুতিও নিয়েছি, সাহসের অভাবে ফিরে এসেছি। আমি আসলে মরতে চাইনি, আমি মূলত বেঁচে থাকতে চাইনি। জার্মানিতে আমি বহুদিন কগনিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি নিয়েছি। অথচ বাইরের কেউ যদি আমার কাছের মানুষদের আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করত, তারা এক কথায় বলত, হিমনের মত হাসিখুশি মানুষ জীবনে দেখিনি, যে তাঁর জীবনকে তাঁর মতো করে উপভোগ করে, যে হাসে তাঁর পেট থেকে, আর যে বিশ্বাস করে সবকিছুই সম্ভব।      

নিজের এই ঘটনা থেকে বুঝতে পেরেছি, আমার আশেপাশেও এমন মানুষ থাকতে পারে যে অনন্ত দুঃখ বুকে নিয়ে বেড়ায়, সুখহীন জীবনে এই দুঃখের কথা বলার মানুষটিও পায় না হয়ত। এই বোঝাপড়া জীবনে অপরের প্রতি আমাকে সহানুভূতিশীল হতে সাহায্য করেছে। 

লেগ পুলিং

বিদেশে যারা আসে এমনিতেই তারা পরিজন হতে দূরে থাকে, একাকীত্ব তাঁদের নিত্যসঙ্গী। এর মাঝে কঠিন পড়ালেখা, চাকরি, আর্থিক সমস্যা, প্রেম-সম্পর্ক সবমিলিয়ে সবারই ত্রাহি অবস্থা। এর মাঝেই সামান্য আনন্দের সংযোগ ঘটে সবাই মিলে যখন আড্ডা দেয়। কিন্তু খুব সূক্ষ্মভাবে খেয়াল করে দেখবেন, আমাদের দুই ঘণ্টার আড্ডায় দুই ঘণ্টাই ব্যয় করি একজন আরেকজনকে লেগ পুলিং করে। বিষয়টি আমি ভেবে দেখেছি আর কিছু আড্ডায় গিয়ে চুপ থেকে সবার আচরণ লক্ষ করেছি, আমাদের বাংলাদেশিদের মধ্যে এই লেগ পুলিং, বুলিং করোনার মতোই মহামারী। আপনি যদি এই লেখা পড়ে থাকেন, চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখুন শেষ আড্ডায় আপনি যাদের বন্ধু বলে বেড়ান তাঁদেরকে অপমানের সুরে কি কি বলেছেন। তাঁদের জামার রং, তাঁদের চোখ, গতরাতের ফেসবুক স্ট্যাটাস, লাইব্রেরীতে ইউরোপীয় সহপাঠিনীর সাথে দেখেছেন বলে দশজনের সামনে কী পরিমাণ হাসাহাসি করেছেন? অথবা কেউ বেশি ভাত খায়, ঢোলা প্যান্ট পরে, কেউ হয়তো মমতাজ বা আসিফের গান শোনে, কারো উচ্চারণ হয়ত শুদ্ধ হয় না- এসবের কোনটা নিয়ে আমি আপনি হাসাহাসি করিনি? যদি করেই থাকি, তবে আমাদের এও জানা উচিত, আড্ডা শেষে আমার আপনার বন্ধুটি হয়ত বাসায় ফিরে একাকী রুমে কেঁদেছে। আমার আপনার আচরণ তাঁকে তিলে তিলে বিষণ্ণতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অত্যন্ত বিকারগ্রস্থভাবে  অপরকে ছোট করা, অপমান করা আর তাচ্ছিল্যকে আমরা নাম দিয়েছি, “ফান”।          

জাজমেন্ট

আমরা সবাই জাজমেন্টাল। বিষয়টি যেন স্বাভাবিক। এত বড় জাজ আমরা, কথায় কথায় রায় দিয়ে দেই। আসিফের গান শোনে বলে আপনি যতজনকে খ্যাত বলে রায় দিয়েছেন ততবারই আপনি জাজমেন্টাল হয়েছেন। কিন্তু আমাদের চরিত্র যাই হোক, চাপার জোরে পাহাড় গুড়িয়ে দিতে জানি। জাজমেন্ট নিয়ে কথা উঠলেই গলা উঁচিয়ে বলে দেই, আমি জাজমেন্টাল নই। 

জার্মানিতে একজন বাংলাদেশি মেয়েকে চিনি যিনি একটু স্বাধীনচেতা, গড়পড়তা বাঙ্গালি মেয়েদের মতো ঘরকন্যা, স্বামীসেবা আর সন্তান উৎপাদনমুখী নন। তিনি সাইকেল চালাতে ভালবাসেন, ভালবাসেন দৌড়ে বাস ধরতে, ইচ্ছা স্বাধীন পোশাক পরতে। বাংলাদেশে এসবের অনেক কিছু কঠিন, তাই জার্মানিতে আসা। কিন্তু এখানে এসেও কি রক্ষা হয়? যেকোন বাঙ্গালি অনুষ্ঠান বা আড্ডায় গেলে প্রথম কথা, বিয়ে করেছ? এত বয়স তবু বিয়ে করনি? একটু দূরে গিয়েই বলেন, যে বয়স তাতে আর বিয়ে হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। তাঁর সাথে আমার মাঝে মাঝে কথা হয়। তিনি আমাকে তাঁর প্রতিনিয়ত বিষণ্ণ জীবন নিয়ে আলাপ করেন, চারিদিকের মানুষ কি করে তাঁর জীবনকে বিষবাষ্পে ভরে দিয়েছে তা নিয়ে দুঃখ করেন।

আমার মতে “আপনার বেতন কত?”- এই প্রশ্নের পরেই পৃথিবীর সবচেয়ে অভদ্রোচিত প্রশ্ন হল, “বিয়ে করেন না কেন?”। সময় হওয়ার পরেও এই সমাজে একটা মানুষ কেন বিয়ে করে না, একটি সুচিন্তিত মন-মানসিকতা নিয়ে সেটি ভাবার সক্ষমতা আমাদের অনেকেরই নেই। এই ধরণের মানুষের একটু বেশিই সময় লাগে পরিপক্ব আচরণ শিখতে। হতে পারে মেয়েটি বিয়ের চেষ্টা করেছে বা করেই যাচ্ছে, ব্যাটে-বলে মিলছে না, হতে পারে মেয়েটি কাউকে পছন্দ করে বড় আঘাত পেয়েছে, বা মেয়েটি কর্মজীবন নিয়ে ব্যস্ত, হতে পারে সে কোন ছেলেকে নয়, সে আসলে ভালবাসে আরেকটি মেয়েকেই, আমি আপনি এমন একটা পৃথিবী তৈরি করতে পারিনি যেখানে সে তাঁর ভালবাসার প্রকাশ করতে পারে, অথবা হতে পারে যেকোন কিছুর সাথেই নিয়ত সংগ্রাম করে তাঁকে জীবনে চলতে হয় যা আমরা জানি না। আমরা কতজন অপর মানুষের দুঃখে ভাগীদার হই? কতজন বুঝতে পারি তাঁদের ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের হাহাকার? তাই যদি না হয় তাহলে আমাদের কতখানি অধিকার আছে এই ব্যাপারে নাক গলানোর। 

সেই মেয়ের কথা কি বলবো? আমি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিনিয়ত এই বিরক্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হই। স্বীকার করি আমার বিয়ের বয়স হয়েছে। কিন্তু এই বয়সে ক্যান্সার সংক্রান্ত দুটি ব্যাধির সাথে আমি সংগ্রাম করে চলেছি। কিন্তু বাঁচি মরি সেটি বড় নয়, নিজ পরিবার থেকে যত মানুষকে চিনি সবার এক দুশ্চিন্তা আমি বিয়ে করি না কেন। তবে মনরোগবিদের সহায়তায় মানুষের কথায় আর আচরণে বিষণ্ণতা হতে মুক্ত থাকার উপায় আমি শিখে গেছি। এরপর থেকেই রুচিশীল আর উন্নত মানসিকতা নিয়ে জীবনটা উপভোগ করার চেষ্টা করি। 

যারা এখনো অপরের নিষ্ঠুর কথা শুনে মনকে কি করে শান্ত রাখতে হয় তা শেখেননি তাঁদের জন্য প্রথম অনুরোধ- টক্সিক মানুষ থেকে দূরে থাকুন। না থাকলে বিষণ্ণতা হতে মুক্তি পাওয়ার কোন পথ নেই। যে সম্পর্কে সম্মান নেই, ভাল বোঝাপড়া নেই, যারা সম্মান দিয়ে কথা বলতে জানে না, যারা অপরের সমস্যা আর মানসিকতা বুঝে কথা বলতে অক্ষম, তারা হোক সমবয়সী বন্ধু বা বড় ভাই বা বোন, তাঁদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শেখা উচিত। 

আর আপনি যদি নিজেই bully বা উৎপীড়ক হয়ে থাকেন তবে নিজেকে শোধরানো অতি দরকার। এর জন্য একটা জরুরী বিষয় আমাদের শেখা উচিত সেটি হল পরদুঃখকাতর বা কমপ্যাশনেট (compassionate) হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা। প্রায় একই অর্থ বহন করে এটিকে আরেকটা ভিন্ননামে বলা যায় empathy বা সহমর্মিতা। এটি এমন একটি গুন যা টুপ করে আকাশ থেকে পড়ার নয়, পরিবার থেকেও শেখা যেতে পারে কিছুটা, কিন্তু সত্যিকার অর্থে এই গুন চর্চা করতে হয় দীর্ঘকালব্যাপী। একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়ার আগে ভেবে দেখা দরকার এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে। আমার একটি মন্তব্য আরেকজনের হৃদয়ে কতখানি প্রতিঘাত করতে পারে, আমার কোন আচরণ আরেকজনের মনোবেদনার কারণ হয়ে যাচ্ছে কিনা, এইসব ভাবার সক্ষমতা যারা অর্জন করে তারাই কমপ্যাশনেট, তারাই এম্প্যাথেটিক। কিন্তু তাই বলে কি আমাদের কখনো ভুল হবে না? অবশ্যই হবে। তবে সেটি বুঝতে পারার সাথে সাথে ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাসটাও জরুরী। এসবের কোনকিছুই আমাদের সমাজে শেখানো হয় না। তাই এই পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হোক আমার আপনার থেকেই। 

বিশেষ দ্রষ্টব্যঃ জার্মানিতে কোন বাংলাদেশি যদি বিষণ্ণতায় ভুগে থাকেন, যদি মনে করেন কারো সাথে কথা বলা উচিত বা কথা বললে নিজেকে একটু হালকা মনে হবে, তবে আমাদের সাথে যোগাযোগের অনুরোধ রইলঃ [email protected]
জার্মান প্রবাসের পক্ষ থেকে তানজিয়া আপু, আমি বা আমাদের যে কেউ আপনার সাথে কথা বলে আপনার দুঃখ ভাগ করতে প্রস্তুত।


ধন্যবাদান্তে 
জাহিদ কবীর হিমন
২০ জুন ২০২০