জার্মানির নামকরা গ্যোটিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মস্তিষ্করোগ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রে পোস্ট ডক্টরাল হিসেবে আছেন তরুণ গবেষক ডঃ রেজাউল ইসলাম নাঈম। তাঁর গবেষণার বিষয় কিভাবে আমাদের মস্তিষ্কের মনে রাখার ক্ষমতা বাড়ানো যায় তা জানা। ল্যাবরেটরিতে কাজের পাশাপাশি তিনি বায়োলজিক্যাল সিকোয়েন্সিং ডাটা এনালাইসিস করেন, যেমন কোভিড-১৯।
একজন গবেষকের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ আরো কি করতে পারে, বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায় তাই নিয়ে লিখেছেন জার্মান প্রবাসে’র পেইজে। পুরো লেখাটি নিচে পড়ুন। এছাড়া করোনা ভাইরাস নিয়ে তাদের গবেষণা ইংরেজিতে পড়তে পারেন এখানেঃ https://www.preprints.org/manuscript/202004.0399/v1

SARS-CoV-2 এর জীবাণুতে আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। যদিও ইতোমধ্যে ভাইরাসটি অনেক প্রাণহানী করেছে, তবে কোভিড-১৯ রোগ থেকে সুস্থ হয়ে যাবার সংখ্যাটাই বেশি। আবার ভাইরাসটি যেসব দেশকে ইতোমধ্যেই আক্রান্ত করেছে, সর্বত্র সমানভাবে জীবনের ক্ষতি করেনি। সুতরাং এই রোগকে ভয় না, বরং কিছুদেশে কি কারণে এটি তুলনামূলক কম প্রাণহানি করেছে সেটি গবেষণা করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে সতর্কতামূলক প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিতে হবে। ভয়, আতঙ্ক আমাদের মনে ও মস্তিষ্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, এবং আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।

করোনা মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে ৬০ টির অধিক ভ্যাক্সিন তৈরির প্রকল্প শুরু হয়েছে (৪ঠা এপ্রিল, ২০২০, WHO)। তবে ভ্যাক্সিন তৈরির এই প্রকল্পগুলির সুফল বিশ্বব্যাপী সবার কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য একটি দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। সুতরাং বাস্তবচিন্তা করলে কোভিড-১৯ থেকে চলমান মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি থামাতে ভ্যাক্সিন আমাদের বর্তমান এবং নিকট ভবিষ্যতের সমাধান নয়। যেহেতু রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রাথমিক উপসর্গ থাকতে পারে আবার নাও পারে সেজন্য সম্ভাব্য রোগী খুঁজে পাওয়াটা ক্ষেত্রবিশেষে কঠিন। সেজন্য সর্বসাধারণকেই কোভিড-১৯ মোকাবেলায় শারীরিক প্রতিরক্ষা (immune system) বাড়িয়ে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে এখন থেকেই এবং নিয়মিত ভাবে।

উপসর্গের উপর ভিত্তি করে আক্রান্ত রোগীকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে ১) প্রাথমিক ২) মধ্যম এবং ৩) মারাত্মক। বিশ্বের অধিকাংশ রোগী প্রাথমিক এবং মধ্যম অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে উঠেন। এর মধ্যে যারা মারাত্মক পর্যায়ে উপনীত হন তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে রোগী মৃত্যু ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু সকল রোগীর উপসর্গ মধ্যম পর্যায় থেকে মারাত্মক অবস্থায় পরিবর্তন হয়না।



ছবিঃ শরীরের জীবাণু প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলি কমিয়ে মারাত্মক কোভিড-১৯ প্রতিরোধ করা যেতে পারে। 

ফুসফুসে রাসায়নিক পরিবর্তন ও প্রদাহ
রোগের প্রাথমিক এবং মধ্যম পর্যায়ে ফুসফুসে প্রদাহ (Inflammation) তৈরি করে এমন ফ্যাক্টর এর পরিমান বেড়ে যায়। কিন্তু এগুলি আরও অতিমাত্রায় বেড়ে যায় মারাত্মক কোভিড-১৯ রোগীর ক্ষেত্রে। মারাত্মক কোভিড-১৯ এ তাদের অনিয়ন্ত্রিত মাত্রা প্রদাহকে অনেক গুনে বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলশ্রুতিতে ফুসফুসসহ শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে অকেজো করে দিতে পারে, যাকে বলা হয় সেপ্টিক শক। এখন পর্যন্ত দেখা গেছে বড় একটা অংশের মারাত্মক কোভিড-১৯ রোগী সেপ্টিক শকে মারা গেছেন। 

প্রদাহ উদ্দেপনাকারি এসব ফ্যাক্টরগুলির মাত্রা ওষুধ দিয়ে কমিয়ে (উদাহরণঃ TNF- α এবং NF-kβ inhibitor,  IL-1 inhibitor, IL-6 inhibitor) রোগটি বাবস্থাপনাকরা যেতে পারে কিনা তা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার (clinical trial) মাধ্যমে দেখার জন্য গবেষকদের পরামর্শ থাকছে এবং কিছু ক্ষেত্রে সেটি ইতমধ্যেই শুরু হয়েছে। রোগীকে ওষুধ এর মাধ্যমে সুস্থ করাটা নির্ভর করবে কত আগে থেকে তা প্রয়োগ করা হয়েছে তার উপর। রোগটির শুরুতেই না প্রয়োগ করে শুধুমাত্র মারাত্মক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হবার পরে এধরনের ওষুধের যথেষ্ট প্রতিষেধকমূলক প্রভাব না থাকার আশঙ্কা রয়েছে। 

তাছাড়া শরীরের প্রদাহ কমাতে পারে এমন যে কোন স্বাভাবিক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা রোগটির মারাত্মক পর্যায়ের পরিণতিতে বাধা দিতে পারে কিনা তা যথাযথ বিশ্লেষণ করে দেখার প্রয়োজন। 

এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কি ধরনের সম্ভাব্য সতর্কতা অবলম্বন করা যেতে পারে ?

ভিটামিন ডি 
ভিটামিন ডি কমার সাথে সাথে শরীরে প্রদাহ তৈরি করার ফ্যাক্টর গুলি বেড়ে যেতে পারে। উল্লেখ্য কোষের ভিটামিন ডি তৈরি ও ব্যবহার ক্ষমতা বয়স বাড়ার সাথে সাথে কমতে থাকে। ভিটামিন ডি এর ঘাটতি আমাদের শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়। 

ভিটামিন ডি এর ঘাটতির সাথে করোনায় মৃত্যুর একটি সম্ভাব্য ঝুঁকির সম্পর্ক থাকতে পারে। উদাহরণ সরূপ সুইডেনের স্টকহোমে যারা মারাত্মক কোভিড-১৯ এ মারা গেছেন তাদের ৪০% সোমালিয়ান অভিবাসী। কিন্তু তারা শহরটির জনসংখ্যার মাত্র ০.৮৪%। আরেকটি গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সোমালিয়ানদের মধ্যে ৭৩% মানুষের ভিটামিন ডি এর অভাব  (<২৫ nmol/L) পাওয়া গেছে। সাম্প্রতিক মারাত্মক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন এমন ৭০০ জন ইতালীয় নাগরিকদের রক্তেও ভিটামিন ডি (<২৫ nmol/L) এর ঘাটতি পাওয়া গেছে। 

প্রশ্ন হল আমাদের দেশে ভিটামিন ডি এর ঘাটতির প্রকোপ কেমন? ২০১৯ সালে ডঃ ইসলাম (NICVD, বাংলাদেশ) এবং তাঁর সহকর্মীরা ৭৯৩ জন বাংলাদেশির (বয়সঃ ২১ থেকে ৬০ বছর) উপর এই  বিষয়ে একটি গবেষণা করে দেখতে পান যে ৬১.৪% মানুষ ভিটামিন ডি এর অভাবে ভুগছেন এবং ২৪.১% মানুষের রক্তের প্লাসমাতে এর পরিমাণ স্বাভাবিক প্রয়োজনের তুলনায় কম আছে। যদিও ভবিষ্যতে এধরনের গবেষণা আরও বড় জনসাধারণ সংখ্যা নিয়ে দেখা দরকার, তবুও এই সুন্দর গবেষণাটি আমাদের একটি ধারণা দেয় যে আমাদের দেশে বড় একটি জনসংখ্যার  মধ্যে ভিটামিন ডি এর একটি বড় রকমের ঘাটতি থাকতে পারে। 

এক্ষেত্রে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি পূরণ না করলে এবং উপরের সম্পর্ক সত্য হলে দেশের বড় একটি জনসংখ্যা মারাত্মক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। এক্ষেত্রে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের পরামর্শ নিন, এবং রক্তে ভিটামিন ডি কম থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ মত সাপ্লিমেন্ট নিন। 


ভিটামিন সি 
ভিটামিন সি কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। ভিটামিন সি মারাত্মক কোভিড-১৯ রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি সম্ভাব্য কমাতে পারে এবং ইতোমধ্যেই মারাত্মক কোভিড-১৯ এর প্রতিকারে ভিটামিন সি এর ভূমিকা বোঝার জন্য একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (clinical trial) শুরু হয়েছে। যেহেতু ভিটামিন সি সহজলভ্য, আমরা এর সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য সতর্কতামূলকভাবে আমাদের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যোগ করতে পারি। 

ভিটামিন ই
গবেষণায় দেখা গেছে যে, সাধারণত ভিটামিন ই এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে মানুষের শরীরে প্রদাহ কমাতে। প্রতিরক্ষামূলকভাবে প্রদাহ কমিয়ে মারাত্মক কোভিড-১৯ এর সম্ভাব্য ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত খাবারে ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাবার যোগ করার জন্য জোরাল উপদেশ রইল। 

রক্তে গ্লুকোজের পরিমান
যদিও নভেল করোনাভাইরাসটি একটি নতুন ধরণের ভাইরাস, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার পরে কোষের ভিতরে যে প্রক্রিয়ায় প্রদাহ (inflammation) তৈরি হয়, সেটিতে এর নিজস্বতার পাশাপাশি আমাদের অতিসাম্প্রতিক একটি গবেষণায় এটির সাথে অন্যান্য ফ্লু ভাইরাসের (উদাহরণঃ ইনফ্লুয়েঞ্জা) অনেকটা সাদৃশ্য দেখতে পেয়েছি। উল্লেখ্য, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উপরে পূর্বের গবেষণা আমাদের কোভিড-১৯ এ প্রদাহ তৈরিতে অন্যান্য ঝুঁকিগুলি সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করবে। সাম্প্রতিক একদল গবেষক দেখিয়েছেন যে, যেসব ইনফ্লুয়েঞ্জা আক্রান্ত রোগীর রক্তে গ্লুকোজের পরিমান বেশি তারা বেশি প্রদাহতে ভোগেন এবং তাদের শরীরে ভাইরাসের প্রভাব বেশি বিস্তার করে। সুতরাং এটি অনুমেয় যে, রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেশি থাকলে মারাত্মক কোভিড-১৯ এর ঝুঁকি থাকতে পারে। এর সাথে মিল রেখে যে সব রোগীর ডায়াবেটিস আছে তারা মারাত্মক কোভিড-১৯ এর ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই এটি মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

কম কার্বোহাইড্রেট, বেশি চর্বিযুক্ত (ভাল চর্বি) খাবার
আমরা জাতীয়ভাবে খাবারে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ খুব বেশি রাখি। এধরণের খাদ্যাভ্যাস রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সেক্ষেত্রে উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন না আনলে আমাদের বড় একটি জনসংখ্যা মারাত্মক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হবার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।  

কম কার্বোহাইড্রেট এবং বেশি ভাল চর্বিযুক্ত খাবার রক্তে গ্লুকোজ কমাতে পারে এবং শরীরে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন কমাতে সাহায্য করে। আমরা আমাদের গবেষণায় প্রাথমিক ফলাফলে দেখেছি এধরণের খাবার ভাইরাস সংক্রমণের পরবর্তীতে প্রদাহ কমাতে কার্যকরী হতে পারে। 

শারীরিক ব্যায়াম
রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমানোর আরেকটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হচ্ছে নিয়মিত ব্যায়াম, বিশেষ করে দৌড়,  না পারলে অন্তত হাঁটা। নিয়মিত ব্যায়াম মনে প্রচ্ছন্ন আনে, শরীরের প্রতিরক্ষা ক্ষমতা বাড়ায়, প্রদাহ কমায়, মস্তিষ্কের মনে রাখার সক্ষমতাও বাড়ায়। যেহেতু আমরা বাসাবাড়িতে এ সময় বেশি থাকছি, এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আমাদের সম্ভাব্য মানসিক অস্থিরতা এবং অন্যান্য সমস্যা সমাধানেও নিয়মিত ব্যায়াম একটি বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করবে। 

এছাড়া পরিমিত বিশ্রাম ও ঘুম আমাদের শারীরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে মজবুত রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। 

সুতরাং আসুন, আমরা রোগটিকে ভয় না করে বরং তাকে মোকাবেলার জন্য প্রস্তুতি নেই। মনে রাখবেন করোনা আক্রান্ত মানেই মৃত্যু নয়। সেই সাথে মারাত্মক কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হবার ঝুঁকিগুলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা হয়তো অনেকাংশে রোগটিকে প্রতিহত করতে পারব। 

মোঃ রেজাউল ইসলাম, PhD
ওয়েবসাইটঃ  http://mdrezaulislam.com/
জার্মান মস্তিষ্করোগ বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র
গ্যোটিঙ্গেন, জার্মানি।