অনেক দিন ধরেই বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা করছিল। ব্যাপারটা সুপ্ত বাসনা হয়ে আমাদের সবার মনেই ছিল। কিন্তু নানান ব্যাস্ততায় করবো, করছি বলে কারোরই আর করা হচ্ছিল না। ঠিক এরকম একটা মোমেন্টে, “Aachen i am coming” হুংকার দিয়ে আখেনে পদার্পণ করলেন জনৈক Azfar Sazid। সমাজের বড় বড় মানুষদের হুংকার দিয়ে পদার্পণ করতে হয়, সাজিদও করলেন। সাজিদ সদ্য মাস্টার্স পাস করে Huawei তে জয়েন করা একজন সফল মানুষ। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দুদিন আগে তার ডান হাত আমার কপালে ঘোষে দিয়েছি! এবার ভাগ্য পরিবর্তন হবে বলে আশা রাখি। কিছুদিন আগে ফেসবুকে “A day cannot be better than this when it’s Friday and you get the salary” স্ট্যাটাস দিয়ে সে আমাদের সবার মনের সুপ্ত বাসনাকে উস্কে দিয়েছে। তার আগমন আমাদের মনে আশার সঞ্চার ঘটায়, আমরা পেট ভরে বিরিয়ানি খাবার স্বপ্ন দেখি। আমরা সাজিদকে ট্রিট দেবার জন্য প্রবল বল প্রয়োগ করি। সাজিদ, “গরীব মানুষ, টাকা নাই” বলে গা বাঁচানোর বৃথা চেষ্টা করে, আমরা হাঃ হাঃ করে হেসে তার চেষ্টাটা উড়িয়ে দেই। ভাই, এই বল যেন-তেন বল নারে ভাই, এই বল প্রবল বল। আমাদের প্রবল বলে সাজিদ পরাজিত হয়, পয়সা খরচ করে বাজার করে আমাদের সুমি আপুর বাসায় দাওয়াত দেয়। আমরা বিপুল উৎসাহে বিরিয়ানি রান্নার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ি। সাজিদ তোমাকে ধন্যবাদ!

আনুমানিক রাত ১১:৩০ থেকে আমরা রান্নার কাজ শুরু করা হয়। মাংস, পেঁয়াজ, আলু, সালাদের জন্য টমেটো শসা ইত্যাদি ইত্যাদি কাটা বাছা শেষ হলে বিরিয়ানি সম্রাট ইসমাইল ভাই এবং স্পেশালিষ্ট সুমি আপু এসে মূল রান্নার কাজে হাত লাগান। জীবনে কতবার বিরিয়ানি খেয়েছি, কিন্তু জিনিসটা কিভাবে রান্না করে, এটা বিরাট রহস্য ছিল। বিরিয়ানি সম্রাট এবং স্পেশালিষ্ট দুজনকে একসাথে পাওয়াতে বিরিয়ানি রান্না শেখার আগ্রহ ব্যাপক আকার ধারণ করল। ইসমাইল ভাই প্রথম বিরিয়ানি রান্না করেন ক্লাস সেভেন-এইটে থাকতে। বন্ধুরা মিলে পিকনিকের আয়োজন করছিল, বিরিয়ানিটা নাকি খিচুরির মত হয়ে গিয়েছিল! ইসমাইল ভাই আমার ব্যাপক আগ্রহ দেখে বললেন, আজকে তিনি সব দেখিয়ে দিবেন, আর আমি রান্না করবো। আমি দু’বার ঢোক গিলে বললাম, “ভাইয়া, আমি রাধলেতো বিরিয়ানি খিচুড়ির মত হয়ে যাবে!” ইসমাইল ভাই সাহস দিয়ে বললেন, সে যতক্ষণ আছেন বিরিয়ানি হয় একটু খারাপ হবে, না হয় একটু চাল চাল হবে, কিন্তু খিচুড়ি কখনও হবেনা। তার কথায় আশ্বস্ত হলাম। আমাকে অবশ্য খুব বেশি কিছু করতে হয়নি। সুমি আপু নিজেই বিরিয়ানির মাংসটা রান্না করে দেখিয়ে দিলেন। আমি মাঝে মাঝে মাংসটা নেড়ে দিলাম। মাংস রান্নার প্রণালিটা সিম্পল। কিন্তু ছোট্ট একটা টুইস্ট আছে। প্রথমে আদা, রসুন, পেঁয়াজ, গরম মসলা, লবণ আর দই দিয়ে ভাল করে মাখিয়ে পাত্রে পরিমাণ তেল ঢেলে রান্না করতে হবে। মাংসটা কিছুটা হয়ে এলে তারপর বিরিয়ানির মসলা দিতে হবে! সুমি আপু না বললে এই জিনিসটা জীবনেও মাথায় আসতো না।

যাই হোক, মাংস রান্না হয়ে গেলে বিরিয়ানির চাল রান্নার পালা। কতজন মানুষ আছে, প্লাস মাংসের পরিমাণের উপর হিসেব করে পোলাওের এর চাল আর পানি দিতে হবে। চাল-পানির হিসেবটা আমার কাছে বরাবরি জটিল একটা বিষয়। আমরা ইসমাইল ভাই এর সহযোগিতা চাইলাম। ইসমাইল ভাই চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে কি যেন হিসেব করলেন, যেন গান গাইছেন, এর পর বললেন দুই কেজি চাল লাগবে! তিনি কিভাবে এত সহজে হিসেবটা করলেন, আমি জানিনা! আমি থাকতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, “হিসাবটা কি ভাইয়া?” তিনি ব্যাখ্যা করলেন, বিরিয়ানির চালটা এমন ভাবে রান্না করতে হবে যেন রান্নার পরে পাত্রের অর্ধেক পর্যন্ত বিরিয়ানিটা থাকে, তা না হলে পর্যাপ্ত নাড়ার স্পেস না থাকার কারণে চাল চাল হতে পারে! সুমি আপু আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, চালের স্তর থেকে আঙ্গুলের দু গিট উপর পর্যন্ত পানির লেভেল থাকতে হবে। বিরিয়ানিতে পানি কম লাগে, ভাপা পিঠার মত ভাপে ভাপে চালটা সেদ্ধ হয় নাকি!! তারা কথা গুলো কবিতার মত বলতে থাকেন, আর আমি অবাক হয়ে শুনি! শেখার আছে কত কিছু।

ইসমাইল ভাই এর হিসেব মত বিশাল এক পাত্রে বিরিয়ানির চাল রান্না শুরু হয়। প্রথমেই ইসমাইল ভাই আমাকে একটা আস্ত মাখন ধরিয়ে দিয়ে প্যাকেট তা খুলতে বললেন। আমি প্যাকেটটা খুললাম। এরপর তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে গোটা মাখনটাই ঢাউস সাইজের পাত্রে ঢেলে দিলেন! আমি বললাম, “ভাইয়া চাল ভাজার জন্য তেল দিবেননা?” ভাইয়া বললেন, “তেল দিতে চাও? ও.কে,দাও”…ইসমাইল ভাই গপ গপ করে তেলও ঢেলে দিলেন! মাখন গোলে তেল হল, আর তেল তো তেলি। আমি আবিষ্কার করলাম, পানি জলে মিশ না খেলেও মাখন তেলে কিন্তু মিশ খায়! ও, একটা কথা, মাখন কিন্তু নট নেসেসারি। ইসমাইল ভাই রান্নাটা মজার হবার জন্য মাখন দিয়েছেন। শুধু তেল দিলেও চলবে। মিশ খায়া গরম তেলে আমরা পেঁয়াজ ভেজে বেরেস্তা করে নিলাম। কিছুটা তুলে রাখলাম, আর কিছুটা পাত্রেই রাখা হল। এরপর পোলাও এর চালটা ভাল করে ভেজে নিলাম। চাল পর্যাপ্ত ভাঁজা হয়েছে কিনা বুজার উপায় হল চালটা একটু সাদা সাদা হয়ে যাবে। আমার ধারনা ছিল চাল ভাজলে এটা লাল লাল হয়। আমার এ ধারনাটাও ভুল! কি আর বলব! যাই হোক, চাল ভাঁজা হলে আঙ্গুলের দু’গিট উপর পর্যন্ত পানি দিয়ে সেদ্ধ করে নিলাম। চালটা কিছুটা সেদ্ধ সেদ্ধ হয়ে আসলে, রান্না করা মাংসটা ভাল করে মিশিয়ে দিলাম। শুধু মেশালে হবে না। চাল-মাংসের মিশ্রণটিকে একটি পাহাড়ের মতো আকৃতি দিতে হবে, ফ্ল্যাট হলে চলবেনা!! এরপর পুরোপুরি সেদ্ধ হবার জন্য ঢাকনি দিয়ে হালকা আচে রেখে দিতে হব। আমরা পুরোপুরি সেদ্ধ হবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম….

রান্নাটা বেশ ভাল হয়েছিল। সবাই তৃপ্তি সহকারে খেয়ে সাজিদের জন্য দোয়া করেছে, সাজিদ যেন এভাবেই প্রতি মাসে একবার করে এসে আমাদের ইচ্ছা পূরণ করে। সাবের ভাই একটু কারেকশন করে বললেন, প্রতি মাসে না হলেও বছরে যেন দু’বার গ্রামে এসে আমাদের খাইয়ে দিয়ে যায়! আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করুক। আমীন!

মেন্যুঃ বিরিয়ানি (Host: Azfar Sazid)

তপু,
১১/০৩/২০১৪
লা-বাহিয়া, আখেন, জার্মানি

10405281_10154758992500161_7958253171352556903_n

10665746_10154758992135161_1265581235131725969_n